
শেষ আপডেট: 4 March 2024 18:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেরুপ্রভার মায়াবী আলোর বিচ্ছুরণ লাদাখের আকাশে!
মেরজ্যোতি বা মেরুপ্রভা যা উত্তর মেরুর আকাশে রঙিন আলোর ঢেউ তোলে, তাই এবার ‘আলোকের ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দিল’ লাদাখের আকাশ। উজ্জ্বল সবজে-লাল মেরুপ্রভা যেন লাদাখের আকাশে নৃত্যু করছে। ইন্ডিয়ান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি লাদাখের আকাশে রঙিন আভাকে ক্যামেরাবন্দি করেছে।
তীব্র সৌরঝড়ের কারণে উত্তরের মেরুজ্যোতি (অরোরা) স্বাভাবিকের চেয়ে আরও দক্ষিণে সরে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আমেরিকার উইসকনসিন, ওয়াশিংটন, কলোরাডো, ক্যালিফোর্নিয়া, নিউ মেক্সিকো, অ্যারিজোনার বাসিন্দাদের পাশাপাশি লাদাখের আকাশে দেখা গেল বিরল দৃশ্য। সূর্যের করোনা উত্তপ্ত। প্রচণ্ড ঝড় উঠেছে সূর্যে। কিছুদিন আগেই সৌরপদার্থ বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছিলেন, সূর্য থেকে ধেয়ে আসা গনগনে সৌরবায়ু পৃথিবীতে আছড়ে পড়তে পারে। সৌরঝড়ে তছনছ হতে পারে পৃথিবীর টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে ততটা প্রভাব না পড়লেও লাদাখের আকাশে সৌরঝড়ের কারণেই বিরল মেরুজ্যোতি দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিজ্ঞানীরা বলছেন, লাদাখে প্যাংগং হ্রদের তীরে মেরাকের আকাশ রঙিন আলোর ছটায় ভরে উঠেছে। তবে শুধু লাদাখ নয়, ইদানীং কালে পৃথিবীর নানা প্রান্তেই এমন আলোর ছটা চোখে পড়েছে আকাশে। তবে লাদাখে তার আবির্ভাব বিরল। গত বছরও লাদাখের আকাশে মেরুপ্রভা দেখা গিয়েছিল।
রূপকথা নয় প্রাকৃতিক কারণেই তৈরি হয় মেরুজ্যোতি
দেশবিদেশের নানা উপকথায় অরোরাকে বর্ণনা করা হত এক রহস্যময় শক্তি হিসেবে। যা কিনা অপদেবতাদের সংহার করে। মেরু অঞ্চলের বাসিন্দারা মেরুজ্যোতিকে মনে করত স্বর্গীয় আলো। সুমেরুপ্রভা বা মেরুজ্যোতিকে অনেক উপজাতি দেবতাদের ভবিষ্যতবাণী বলে মনে করত। সবুজ রঙের মেরুপ্রভা আকাশে দেখা গেলে তারা ভাবত সুখের দিন আসছে। মেরুপ্রভার রঙ লাল হলে তাদের মনে হত দুর্ভাগ্য আসছে বা যুদ্ধ হতে চলেছে। কিন্তু ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ের বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান বার্কল্যান্ড বলেন এটি নিছকই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এর মধ্যে কোনও অতিপ্রাকৃত নেই। পৃথিবীর উত্তর অক্ষাংশে যে অরোরা বা মেরুজ্যোতি দেখা যায় তাকে বলা হয় Aurora Burealis বা সুমেরুপ্রভা। পৃথিবীর দক্ষিণ অক্ষাংশে একে বলা হয় Aurora Australis বা কুমেরুপ্রভা।
সুমেরুপ্রভা সবচেয়ে ভালো দেখা যায় কানাডার হাডসন উপসাগরীয় অঞ্চল, উত্তর স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ নরওয়ে এবং সুইডেনের কিছু অঞ্চল থেকে। কুমেরুপ্রভা দেখা যায় নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা থেকে। এইসব জায়গা থেকে রাতের বেলায় প্রায় নিয়মিতই মেরুজ্যোতি দেখা যায়। বিজ্ঞানী বার্কল্যান্ড মেরুজ্যোতি সৃষ্টি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন সূর্যের বুকে ওঠা সৌরঝড়ের প্রভাবে বিদ্যুৎযুক্ত কণা (প্লাজমা) মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সব কণা পৃথিবীতে এসে পৌঁছানোর পর, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডলে সঙ্গে এইসব কণার বিক্রিয়া ঘটে বা সূর্য থেকে আসা বিদ্যুৎযুক্ত কণাগুলি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল থাকা গ্যাসীয় অণু-পরমাণুকে আঘাত করে। সেই আঘাতে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় অণু-পরমাণুগুলি আন্দোলিত হয় এবং উজ্জ্বল আলোক বিকিরণ করতে থাকে।
মোদ্দা কথা বায়ুমণ্ডলের থার্মোস্ফিয়ারে থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন পরমাণুর সঙ্গে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার থেকে বিদ্যুৎযুক্ত কণাগুলির ( প্রধানত ইলেকট্রন, কিছু ক্ষেত্রে প্রোটন) সংঘর্ষের ফলেই মেরুজ্যোতি তৈরি হয়। সংঘর্ষের কারণে বায়ুমণ্ডলে থাকা গ্যাসের পরমাণু বা অণুগুলি সূর্য থেকে আগত বিদ্যুৎযুক্ত কণাগুলি থেকে কিছু শক্তি সংগ্রহ করে। যা কণাগুলির মধ্যে অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসেবে সঞ্চিত হয়। এই অভ্যন্তরীণ শক্তি যখন আলোকশক্তি হিসেবে কণাগুলি থেকে বেরিয়ে আসে, তখনই মেরুজ্যোতি দেখা যায়।
মেরুজ্যোতি বিভিন্ন রঙের হতে পারে। তবে মেরুজ্যোতি কোন রঙের হবে সেটা নির্ভর করে কোন গ্যাসীয় পরমাণুকে ইলেকট্রন উদ্দীপ্ত হচ্ছে, এবং সেই বিক্রিয়ায় কত পরিমাণ শক্তির বিনিময় হচ্ছে তার উপর। বেশিরভাগ মেরুজ্যোতি রঙ হলো সবুজাভ-হলুদ বা গোলাপি ও সবুজের মিশ্রণ। এর কারণ হলো অক্সিজেন পরমাণুর সঙ্গে ইলেকট্রনের বিক্রিয়া। তবে অক্সিজেন পরমাণু থেকে অনেকসময় লাল রঙের মেরুজ্যোতিও তৈরি হয়।