
শেষ আপডেট: 8 March 2020 04:30
আমি বলতে চাই, ওই অ্যাসিড হামলার আগে পর্যন্ত কিন্তু প্রতি মুহূর্তে প্রত্যাখ্যান করে এসেছি সেলিমকে। এবং কাউকে বোঝাতে পারিনি, সে আমার প্রেমিক নয়। সে একজন ক্রিমিনাল, যে আমায় প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি পর্যন্ত দিয়ে আসছে। কেউ শোনেনি আমার কথা। বরং ওর ওই ধরনের আচরণ অনেকের কাছেই 'প্রেমে পাগল হয়ে যাওয়া' ছিল।
আমার মনে হয়... না আমার শুধু মনে হয় না। আসলে এই পোড়া শরীরের মাসুল দিয়ে আমি যেটা শিখেছি, সেটা হল নারীবাদের প্রথম ধাপ এই প্রেম আর অপরাধের পার্থক্য করতে পারা। অ্যাসিড ছেড়ে দিলাম, শুরু করা যাক সঙ্গীর গায়ে হাত তোলা দিয়েই। না। এটা ভালবাসা নয়। মারা, গায়ের জোরে শরীরি অধিকার চাপানো, আবেগপ্রবণ হুমকি-- এগুলো কোনওটাই ভালবাসা নয়। এটা আমাদের আগে বিশ্বাস করতে হবে, মাথায় ঢুকিয়ে নিতে হবে। তা আমার নিজের ক্ষেত্রে হোক বা প্রতিবেশী কোনও মহিলার ক্ষেত্রে। ভালবাসা আর অ্যাবিউজ়িং এক নয়। আমি কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অ্যাবিউজ়ড হয়ে এসে তার পরে অ্যাসিডের মুখে পড়েছি। তাই কোনও কিছুকেই আমরা যেন হালকা করে না দেখি।
'প্রেমিকের' অপরাধ না হয় আজ স্পষ্ট। কিন্তু আমি সেই মানুষগুলোকে কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করাব, যাঁরা একটা অ্যাসিডে পোড়া মেয়ের দিকে প্রতিনিয়ত আঙুল তুলে বলে গেছে, "এত বাড় বাড়লে এমনই হয়।" আমি তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি, আমি বাড় বেড়েছিলাম। মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়েও আমি পর্দা করতাম না। আমি চাকরি করতাম। আমি সাজতে ভালবাসতাম। আমি জিন্স পরতাম। আমি টিভিতে গান চালিয়ে নাচতাম। আমি ধরেই নিচ্ছি, আমি খুউউউব বাড় বেড়েছিলাম। তার শাস্তি হিসেবে বুঝি অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়াটাই যুক্তিযুক্ত? এটা ভাববেন না, এমনটা আমি একা শুনেছি। আপনি যে কোনও মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত সমাজের ধর্ষিতা বা অ্যাসিডে পোড়া বা নির্যাতিত মেয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখুন, প্রত্যেকে কোনও না কোনও ভাবে 'বাড় বাড়ার' শাস্তি পেয়ে চলেছে, এক শ্রেণির মানুষের চোখে।
কেন ঢাকব বলুন তো? ততদিনে দু'বছর পেরিয়েছে, আর অপরাধীরা ধরা পড়ে জামিনও পেয়ে গেছে। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়া। মূল অপরাধী তখন আমার গ্রামের চোখে রীতিমতো ট্র্যাজিক হিরো, যে প্রেমে দাগা খেয়ে উন্মত্তের মতো অ্যাসিড ছুড়ে ফেলেছে! হ্যাঁ, ছুড়ে মেরেছে নয়, 'ছুড়ে ফেলেছে।' একটা আস্ত ক্রিমিনাল যদি এভাবে বাঁচতে পারে, আমি কেন মুখ লুকিয়ে বাঁচব? ঠিক কোন যুক্তিতে? বাড় তো নাকি আমি আগেই বেড়েছিলাম। এখন আমার আর হারানোর কী আছে? মরে যেতে হবে বড় জোর! তাই যাব। তবু মুখ ঢাকব না।
প্রশংসার বন্যা বয়ে গেছে। আমার সাহসের কথা কত জন কত ভাবে বলেছেন। এই যে আজ নারী দিবস, আমি নিজের অজান্তেই কত মানুষের শক্তি। কিন্তু এ শক্তির স্বীকৃতি আমায় যতটা অনুপ্রাণিত করে, ঠিক ততটাই হতাশ করে বিচারের প্রহসন। একটা আস্ত অপরাধীর ছাড়া পেয়ে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য আমায় প্রতিটা মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয়, শত বাহবার পরেও আমি পরাজিত। আমি আসল জায়গাটায় হেরে গেছি। সমাজ আমায় আগেই হারিয়েছিল, আইন আমায় এখন হারিয়ে দিচ্ছে রোজ। এ হারের জ্বালা অ্যাসিডের চেয়ে অনেক অনেক অনেক বেশি।
এখন আমি ভাল আছি। পড়াশোনা, নাচ, গান, লেখালেখি, টুকটাক কাজ-- সব আছে আমার। একেবারে স্বাভাবিক। আমি চামড়ার ঊর্ধ্বে উঠে বাঁচতে শিখে গেছি। পাশাপাশি, আমি দল বাঁধতেও শিখে গেছি। আমি তো একা নই। আমার মতো কত কত মনীষা চারপাশে। প্রত্যেকের একদিকে যেমন নিজেদের আইনি লড়াই , অন্যদিকে চিকিৎসার লড়াই। সামাজিক লড়াই তো রয়েইছে। সেই সঙ্গে দলবেঁধে আরও একটা লড়াইয়ে ঝাঁপিয়েছি আমরা। খোলা বাজারে অ্যাসিড বিক্রি হওয়া কী করে বন্ধ করা যায়, তাই নিয়ে লড়ছি আমরা। স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পথসভা করছি সচেতনতা বাড়াতে।
নারী দিবস তো আরও একটা পেরিয়ে গেল। আরও অনেক অনেক নারীর সাফল্য আমরা জেনে ফেললাম। আমি আরও একবার সুযোগ পেলাম চিৎকার করে কথাগুলো বলার। কিন্তু তার পরে? এই দিবস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কি আমার চিৎকারটুকুর রেশ রয়ে যাবে কোথাও? নাকি আমরা অপেক্ষা করব, পরের বছরে আরও নতুন কয়েক জন অ্যাসিড আক্রান্তের খবর পাব বলে?