
শেষ আপডেট: 5 July 2018 12:45
অনার্য তাপস[/caption]
সেই গল্পটা শুনেছেন তো? সেই যে, এক জামাই অনেক শখ করে ইয়া বড় এক পাঙ্গাস মাছ নিয়ে রাতের বেলা শ্বশুরবাড়ি হাজির। শাশুড়ি পাঙ্গাস দেখে খুব খুশি। তবে তিনি ভাবলেন, এখন যা আছে জামাই তাই দিয়ে খাক। আমি বরং কাল জম্পেশ করে রেঁধে দেব। জামাই খেতে বসে আর পাঙ্গাস পায় না! কথাটা কাউকে বলতেও পারছে না। কষ্ট করে সেই শাকপাতা দিয়েই খেয়ে ফেলল।
মধ্য রাতে জামাই স্বপ্ন দেখছে, শাশুড়ি পুরো পাঙ্গাস একলা খেয়ে ফেলছে! ঘুমের ঘোরেই জামাই চেঁচিয়ে উঠলো— পাঙ্গাস...
পাশের ঘর থেকে শাশুড়ি বললো— কাল খাস।
-পাঙ্গাস…
-কাল খাস।
আমার অবস্থা হয়েছে সেরকমই। ফ্রিজে একেকটা প্রায় সোয়া কেজি ওজনের চারটে ইলিশ শুয়ে আছে হিম হয়ে, আর আমি হোটেলের খাবার কিনে খাচ্ছি! মাঝে মাঝে ফ্রিজ খুলে দেখছি— তারা আছেন। খেতে পারছি না, কারণ ইলিশ প্রসেস করাটা
আমার পক্ষে ইয়ে, মানে একটু কঠিন। আমার এখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে— ইলিশ, ইলিশ।
আর শুনতে ইচ্ছা করছে কেউ বলছে— কাল গিলিশ!
ছুটির দিনগুলো বেশ নিরামিষ কাটছিলো কিছুদিন থেকে। বউ-বাচ্চা গ্রামের বাড়ি আম-কাঁঠাল খেতে। আর আমি বাসায়, অফিস করি, ঘুরিফিরি, ঘুমাই, অফিস করি। বিবাহিত ব্যাচেলরের বড্ড একঘেয়ে ছুটির দিন সেসব। হঠাৎ খুব স্নেহের ছোটভাই ফোন করে বললো— আইতাছি ভাই। মাওয়া যামু, ইলিশ খামু। আমি দু’পায়ে ভর দিয়ে বললাম— আয়। ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে কোথাও যেতে আমার ভালো লাগে না, সত্য। এই জ্যাম ঠেলার চেয়ে ছুটির দিনের ঘুমটা বেশি আরামদায়ক। কিন্তু ভরা মৌসুমে ইলিশ খাবো না! তাও আবার মাওয়া ঘাটে? মাইরি বলছি, এতটা পাষাণ হৃদয় হতে পারিনি এখনও। যাইহোক, স্নেহের ছোটভাই চলে এলো সুদূর নরসিংদী থেকে। ঠিক হলো শনিবার ছুটি, সেদিনই হবে অভিযান।
সকাল ৬টায় উঠে রেডি। অটো করে গুলিস্তান মোড়। ‘ইলিশ’ নামক এক বাসে উঠে ১ ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম মাওয়া ঘাট— পদ্মার একেবারে তীরে। সকাল নটা। বাস থেকে নেমেই খোঁজ খোঁজ। কোথায় ইলিশ পাবো? পুরো লঞ্চঘাট খুঁজতে শুরু করলাম দু’জনে মিলে। হঠাৎ করে মাথায় এলো, আমরা সকাল থেকে কিছু খাইনি। অবশ্য সেই ভোরবেলা, গুলিস্তান মোরে দুই গ্লাস মাঠা আর দুই দলা ছানা খেয়েছিলাম আমরা দু’টিতে মিলে। বাসের ঝাঁকুনিতে সেসব কোথায় উড়ে গেছে! খুঁজে পেতে ট্রাক স্ট্যান্ডের দিকে একটা হোটেলে ঢুকলাম। পরিষ্কার হয়ে বসে অর্ডার দিলাম— গরম ভাত, ইলিশ মাছ ভাজা আর
চাকা চাকা করে কাটা বেগুন ভাজা। পিসও পছন্দ করা যাবে ইচ্ছে মতন। ছোট ভাই গিয়ে ইলিশের পিস পছন্দ করে দিয়ে এলো। বসে আছি। উপরে টিনের চালা আর নিচে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা হোটেলটা একেবারে পদ্মার তীরে। দু’তিন হাত দূরেই পদ্মা— বর্ষায় প্রমত্তা! ভয়ঙ্করী! এই টালমাটাল যুবতী পদ্মার বুকে এক খণ্ড কাঠের পাটাতনে চড়ে দুঃসাহসী কিছু মানুষ রাতের পর রাত জেগে, হু হু বাতাসে দরদরিয়ে ঘামতে ঘামতে তুলে আনে রূপালী ফসল— ইলিশ। সে যে কী কষ্টসাধ্য কাজ, যারা আমরা ইলিশ খেতে যাই মাওয়া ঘাটে, তাদের কাছে সেই কষ্টের কোন বিহাইন্ড দ্য সিন থাকে না। না থাকাই ভালো। থাকলে আর খেতে পারতাম না। যারা সমরেশ বসুর গঙ্গা কিংবা আবদুল জব্বার এর ইলিশমারির চর পড়েছেন তারা কিঞ্চিৎ বুঝতে পারবেন।
সকালবেলা ভরপেট খেয়ে আমরা দু’জন ঘুরতে শুরু করলাম। ঘোরার তেমন কিছু নেই। সামনে প্রমত্তা পদ্মা আর তীরে এক বিরাট বাস ও ট্রাক টার্মিনাল। সাথে একটা ফেরি ঘাট। প্রচুর মোটরযান আর লঞ্চ-ফেরি। তার সাথে প্রচুর মানুষ— ড্রাইভার-কুলি-রিকশাওয়ালা-দোকানদার-যাত্রী-সহযাত্রী ইত্যাদি। এত মানুষের ভিড়ে বেশ বিরক্তই হলাম। শেষে আমরা ইলিশের বাজারের সন্ধানে চললাম।
ট্রাক টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে সোজা লঞ্চঘাটের দিকে চলে হাঁটতে লাগলাম। প্রচুর ফল আর বিস্কুট-পাউরুটির দোকান। বেশ খানিকটা হাঁটার পর ছোট্ট একটা বাজার আর তার লাগোয়া অনেক খাবারের দোকান। আমরা ইলিশের বাজারে ঢুকলাম।
লঞ্চঘাট যত বড়, বাজারটা তার চেয়ে অনেক ছোট। কয়েকটা মাত্র দোকান। তবে ইলিশ দেখে নয়ন সার্থক! ইয়া বড় বড় সাইজ একেকটার। এক কেজির নীচে খুব কমই দেখলাম। মোটামুটি ২ কেজি বা তার কিছু বেশি ওজনের ইলিশ বেশির ভাগ। হুট করে ছোটবেলার কথা মনে হলো। উনিশশো ছিয়াশি বা সাতাশি দিকে এই ওজনের ইলিশ আমি নিজে কিনেছি প্রতি পিস ৩০-৫০ বাংলাদেশি টাকা বা কিছু বেশি দামে। রংপুর জেলায় এমনও দেখেছি, মানুষ তামাক বিক্রি করে জোড়া ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরছে। এখন সেটা ভাবাই যায় না। আমার বাবা সম্ভবত সপ্তম বারের মতো স্ট্রোক করে বেঁচে আছেন— লোকে বলে ওই ইলিশের তেলের গুণেই!
স্নেহের ছোটভাই ইলিশের দরদাম করতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। একেক দোকানদারকে দাম জিজ্ঞেস করে আর আমার দিকে তাকায়। চারটেয় এক হালি। হালি ষোল হাজার! শুনেই চিত্তির! নাহ, ইলিশ খাওয়া আর হবে না। সাহস করে আর একটা দোকানে জিজ্ঞেস করে। হালি ছ’হাজার পাঁচশো। ভাবলাম, আশা আছে এখনও। দেখেশুনে হালি প্রতি চার হাজার টাকায় কেনা হলো দুই হালি।