
শেষ আপডেট: 14 September 2022 17:55
দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: সময়টা ১৯৯৪ সালের গ্রীষ্মকাল। এ দেশের বাজারে ঠাণ্ডা নরম পানীয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে বছরের এই সময়টাই। অথচ রহস্যজনকভাবে সেবছর গরমেই বাজার থেকে প্রায় কর্পূরের মতো উবে গেল নরম পানীয়ের এক জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। যেন জাদুমন্ত্রবলে দেশের সমস্ত বাজার থেকে কেউ ইচ্ছে করেই লোপাট করে দিয়েছে একটি বিশেষ পণ্য। ক্রেতারা অবাক হলেন। গুঞ্জন উঠল। খবরের কাগজগুলোতে লেখালিখিও হল। কিন্তু সে অর্থে রহস্যের সমাধান হল না। উলটে চাহিদার মুখে ক্রেতারা বাধ্যই হলেন অন্য পানীয়ের দিকে ঝুঁকতে। কিন্তু একটা খটকা থেকেই গেল। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে ভারতের এক নম্বর সফটড্রিংক 'থামস আপ'-এর জনপ্রিয়তা আর তার অজানা পরিণতি নিয়ে।
নরম পানীয় হিসাবে 'থামস আপ' প্রথম এ দেশের বাজারে আসে ১৯৭৭ সালে। পার্লে গ্রুপের রমেশ চৌহানের ব্রেন চাইল্ড ছিল এই কোল্ডড্রিংক। জনপ্রিয়তার নিরিখেও বেশ এগিয়ে ছিল এই পানীয়। প্রায় ১৫ বছর পর, ৯৩ সাল নাগাদ 'থামস আপ'এর যাবতীয় স্বত্ব কোকাকোলা কোম্পানি কিনে নেয়। আর তার মাস কয়েক পরেই বাজার থেকে বেমালুম উবে যায় থামস আপ। এই ঘটনায় দুইয়ে দুইয়ে চার করেছিলেন অনেকেই। মনে করা হয়েছিল, এই হস্তান্তর আসলে 'কোকাকোলা'র বাণিজ্যিক কূটনীতি। সেসময় বাজারি প্রতিযোগিতায় কোকের জনপ্রিয়তম প্রতিপক্ষ ছিল 'থামস আপ'। তাই কি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়াতে নরম পানীয়টির অস্তিত্বই মুছে দিতে চেয়েছিল 'কোকাকোলা'? (Thums up vs Cocacola)

যদিও 'কোকাকোলা'র তরফে এই অভিযোগ গোড়া থেকেই অস্বীকার করা হয়। কিন্তু বাজার-বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ একেবারে অমূলকও ছিল না৷ আন্তর্জাতিক কোম্পানি হলেও উদার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের বিশাল বাজারে থাবা বসাতে চাইছিল 'কোকাকোলা'। এর আগেও তাদের লোভের বলি হয়েছে সিট্রা আর গোল্ডস্পটের মতো দু-দুটো নরম পানীয় ব্র্যান্ড। সবাই ধরে নিয়েছিল এবারও সেই একই পরিণতি চলে চলেছে 'থামস আপ'এর। কিন্তু কথায় বলে না, ভালোবাসায় কী না হয়! এক্ষেত্রেও অবশ্যম্ভাবীকে বদলে দিল মানুষের ভালোবাসা। দেশিয় পণ্যের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা৷ থামস আপের জনপ্রিয়তাই সেদিন নিশ্চিত অবলুপ্তির হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছিল তাকে, বাণিজ্যিক স্বার্থের বলি হতে দেয়নি। (Thums up vs Cocacola)
ঠিক কী ঘটেছিল সেই উথালপাতাল নব্বইয়ের দশকে? ভারতীয় উপমহাদেশে 'কোকাকোলা' কোম্পানি সর্বপ্রথম প্রবেশ করে স্বাধীনতার কয়েক বছর পরেই, ১৯৫৩ সালে। কিন্তু শেয়ার সংক্রান্ত কিছু আইনি জটিলতায় ভারত সরকারের সঙ্গে মতানৈক্য ঘটায় ১৯৭৭ সাল নাগাদ ভারত ছেড়ে চলে যায় এই আন্তর্জাতিক কোল্ডড্রিংক ব্র্যান্ড। দেশের বাজারে তাদের বোতলজাত পানীয়র সিক্রেট রেসিপিও না কি ফাঁস হয়ে গেছিল এইসময়! এই সুযোগটাকেই কাজে লাগান পার্লে গোষ্ঠীর দুই ভাই, রমেশ চৌহান ও প্রকাশ চৌহান। বাজারি চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয় পার্লে গ্রুপ। তৈরি হয় এক অভিনব ঝাঁঝালো ফর্মুলা, যার উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনির মতো জনপ্রিয় ভারতীয় মশলা আর হালকা কমলা ফ্লেভার। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ঐ ১৯৭৭ সালেই সম্পূর্ণ নিজেদের রেসিপিতে লঞ্চ করে এ দেশের জনপ্রিয়তম কোল্ডড্রিংক 'থামস আপ'। তারপর বাকিটা তো ইতিহাস... (Thums up vs Cocacola)

খুব অল্প সময়ের ভেতরেই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছিল থামস আপ। হু হু করে বিক্রি বাড়ছিল। বাড়ছিল অনুরাগীর সংখ্যাও। সে সময় বাজারে ক্যাম্পাকোলা, ডাবল সেভেন, Duke’s McDowell’s Crush, ডাবল কোলা এইসব নামে আরও বেশ কয়েকটা কোলা ব্র্যান্ড ছিল। এর ভেতর ডাবল সেভেন ছিল সরকারীভাবে উৎপাদিত পানীয়। কিন্তু থামস আপের জনপ্রিয়তার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি কেউ। বিজ্ঞাপণের ক্ষেত্রেও সেসময় বেশ কিছু চমক এনেছিল থামস আপ। সেসময় লোকের মুখে মুখে ফিরত এই কোল্ডড্রিংকের ট্যাগলাইন 'টেস্ট দ্য থান্ডার'।

১৯৯৩ সাল নাগাদ মুক্ত বাজারনীতির হাত ধরে ভারতে আবার ফিরে আসে কোককোলা। 'পার্লে'র থামস আপ ততদিনে ভারতীয় বাজারের শীর্ষস্থানীয় পণ্য। দেশের বাজারে সে সময় থামস আপ ও পেপসির মার্কেট শেয়ার ছিল যথাক্রমে ৩৬% ও ২৬%! ঐ বছরের শেষের দিকে পেপসিকে বেকায়দায় ফেলতে কোকা-কোলা কোম্পানি ৬০ মিলিয়ন ডলারে থামস আপ, লিমকা আর গোল্ড স্পট- তিনটা ব্র্যান্ডকেই একত্রে কিনে নেয়। আসলে দেশের বোতল প্রস্তুতকারক কোম্পানিদের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করত পার্লে। আর এখানেই ষড়যন্ত্রের ছক কষে কোকা-কোলা। একটা সময় এমন দাঁড়ায়, যখন কোল্ডড্রিংক প্যাক করা আর বিক্রি করার মতো বোতলের যোগান বন্ধ হয়ে যায়। পার্লে বাধ্য হয়, মাত্র ৪০ মিলিয়ন ডলারে 'কোকাকোলা'র কাছে দেশের এক নম্বর নরম পানীয়ের স্বত্ব বিক্রি করতে।
কোক প্রথমে চেয়েছিল থামস আপকে কেনার পর বাজার থেকে এই নামটাই একেবারে গায়েব করে দিতে। অধিগ্রহণের পর, দেশের সমস্ত বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয় থামস আপের যাবতীয় বোতল। বিক্রি আর বিজ্ঞাপন- দুইই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কোকাকোলার এই বাজারি কূটকৌশল শেষমেশ কাজে দেয়নি। দেখা যায়, লোকেরা থামস আপ না পেয়ে পেপসি কিনতে শুরু করেছে। কোলার বাজার বাড়াতে থামস আপকে গুমখুন করার পরিকল্পনা বাস্তবিক ব্যাকফায়ার করে।
নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় কোমল-পানীয়ের বাজারের প্রায় ৬১ শতাংশ শেয়ার ছিল কোকাকোলার হাতে। কিন্তু থামস আপ বন্ধ করে দেওয়ায় এ দেশের ক্রেতাদের কাছে ক্রমশ বাড়তে থাকে পেপসির জনপ্রিয়তা। কোক বুঝলো, এভাবে হবে না। তাই তারা অন্য স্ট্রাটেজিতে গেল। বলা চলে, ক্রেতাচাহিদার কাছে হার মেনে ১৯৯৭ সাল নাগাদ দেশের বাজারে থামস আপ ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয় তারা। (Thums up vs Cocacola) পরবর্তীতে থামস আপকে নিজের মতো করেই চলতে দেয় কোক কোম্পানি।

কীভাবে আর কবে থেকে থামস আপ পুরুষদের পানীয় হয়ে গেল বলা মুশকিল। এই নরম পানীয়ের বিজ্ঞাপনে অক্ষয় কুমার, সালমান খান, মহেশ বাবু থেকে আজকের রণভির সিং-এর মতো অভিনেতাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দেখানো শুরু হল। ক্রিড়াপ্রেমীদের মনে আজও গেঁথে আছে একটি বিরল বিজ্ঞাপণ দৃশ্য, যেখানে ক্রিকেটার সুনীল গাভাসকর এবং ইমরান খান, ভিন্ন দেশের দুই ক্রীড়াবিদ একসাথে স্পোর্টস ম্যাগাজিনে থামস আপের জন্য বিজ্ঞাপন করেছিলেন। সব মিলিয়ে কোথাও যেন পৌরুষেড় প্রতীক হয়ে উঠল এই বিশেষ পানীয়। আজও এ দেশের ক্রেতাদের অন্যতম পছন্দের পানীয় 'থামস আপ'। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে থামস আপের মার্কেট শেয়ার ছিল ৪২%। যা তার নিকটতম প্রতিযোগী কোক ও পেপসির চাইতে ঢের বেশি।