
শেষ আপডেট: 9 April 2024 18:29
ফোনের রিসিভারটা নামিয়ে রেখে শান্তিবাবু (Shanti Ghatak) বললেন, ‘বুঝলেন, অনিল (Anil Biswas) এখন আবার বিদেশ ছেড়ে স্বদেশ নিয়ে পড়েছে। বলছে চেন্নাইয়ে যান।’ শান্তিবাবু মানে রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী শান্তি ঘটক এ কথাটা বললেন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব তাপস চক্রবর্তীকে। আমরা কয়েকজন সাংবাদিক তখন মন্ত্রীর ঘরে।

তাপসবাবু মন্ত্রীকে বললেন, ‘এই কথাটা অন্তত রাখার চেষ্টা করুন স্যার। সেই কবে থেকে ভদ্রলোক বলছেন।’ শান্তিবাবু জবাব দিলেন, ‘সে হবেখন, সরকার বা পার্টির কাজে যদি কখনও চেন্নাই যেতে হয়, তখন দেখব।’ সেই সঙ্গে বললেন, ‘শুনুন, অনিল, বিমানরা (বিমান বসু) শুধু আমাকে নয়, পার্টিতে আরও যাঁরা আমার বয়সি আছেন, একেবারে নিজের ছেলেমেয়ের মতো করে ওঁরা সকলের খোঁজখবর নেয়।’
‘বলো কম, শোনো বেশি’-- এই আপ্তবাক্যটা যেন জীবনের আদর্শ করেছিলেন শান্তিবাবু। কিন্তু দু-চার কথা যা বলতেন, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনার মতো ছিল। ব্যারিটোন ভয়েসে তা আলাদা মাত্রা পেত।
কলকাতার একটি কাগজে তখন খুব গোলমাল চলছে কর্মী ছাঁটাই নিয়ে। অনেক সাংবাদিকেরও চাকরি গিয়েছে। সে সময়ে পিএফ, গ্র্যাচ্যুইটির বালাই নেই। একদিন তাঁর ঘরে সেই প্রসঙ্গ উঠল। অবশ্য মাঝেমধ্যেই তিনি এই বলে আক্ষেপ করতেন যে, সাংবাদিকেরা বাকিদের নিয়ে লেখালেখি করে, কিন্তু তাঁদের শ্রম অধিকার বলে কিছু নেই। চাকরির নিশ্চয়তাও নেই। সবই আমরা জানি। কিন্তু সে সব কাগজে ছাপা হয় না। সরকারের কাছে কেউ নালিশও করে না। সাংবাদিকদের থেকে কলকারখানার শ্রমিকেরা বরং অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।
সেদিন শান্তিবাবুর টেলিফোন কথোপকথনের বিষয়ে বাকিটা আমরা তাপসবাবুর মুখ থেকে শুনলাম। অনিল হলেন সিপিএমের তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস। এর কিছুদিন আগে উপমুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কলকাতার ডাক্তারদের পরামর্শে কিউবা যান চোখ দেখাতে। তাঁর রেটিনা শুকিয়ে যাচ্ছিল। তিনি ফেরার পর থেকেই অনিল বিশ্বাস বারে বারে শান্তিবাবুকে তাগাদা দিতে থাকেন— ‘শান্তিদা আপনিও একবার কিউবায় গিয়ে চোখটা দেখিয়ে আসুন। বুদ্ধ তো এখন ভালই আছে। আপনিও যান।’
শান্তিবাবুকে কিছুতেই রাজি করানো যাচ্ছে না। তিনি রাজ্য সরকারের হাসপাতাল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ কম্পাউন্ডে থাকা রিজিওন্যাল ইনস্টিটিউট অফ অপথ্যালমোলজির বাইরে কোথাও যেতে নারাজ।
এর কিছুদিন পর চেন্নাইতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি তথ্যকেন্দ্র ও অতিথিশালা তৈরির বিষয়ে তামিলনাড়ু সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য রাজ্যের একজন পদস্থ মন্ত্রী ও অফিসারের যাওয়ার দরকার পড়ল। অনিল বিশ্বাস সেই খবর জানতে পেরে জ্যোতিবাবু, বুদ্ধদেববাবুদের সঙ্গে কথা বলে অনেক করে বুঝিয়ে শান্তিবাবুকে রাজি করালেন।
শান্তিবাবুর চোখের অবস্থা তখন আরও খারাপ। ঠিক হল, সিনিয়র জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসাবে তাপসবাবুই মন্ত্রীর সঙ্গে যাবেন। মন্ত্রী-অফিসারের অফিসিয়াল রিলেশন ছাপিয়ে তাঁদের পিতা-পুত্রের সম্পর্ক তখন। তাপসবাবুর চেষ্টায় চেন্নাইতে সরকারি কাজের ফাঁকে একদিন একটি চোখের হাসপাতালের আউটডোরে চোখ দেখালেন শান্তিবাবু।
কিছুদিন পর এক বিকালে শান্তিবাবুর ঘরের বাইরে তাপসবাবুর চেম্বারে অপেক্ষা করছি। শান্তিবাবু ভিতরে বৈঠকে ব্যস্ত। তাপসবাবু হঠাৎ হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেখুন, মন্ত্রী মশাই কেমন কাজ বাড়িয়ে দিয়েছেন আমার।’ বললেন, চেন্নাই যাওয়ার আগে হাজার দুই টাকা মন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছিল হাতখরচ বাবদ। তার পুরোটাই এখন আবার সরকারের ঘরে ফেরাতে এক গাদা কাগজপত্র আমাকে তৈরি করতে হচ্ছে। মন্ত্রী এক পয়সাও খরচ করেননি।
আড়িয়াদহের বাসিন্দা, কামারহাটির বিধায়ক শান্তিরঞ্জন ঘটক ১৯৮২ থেকে ২০০১ পর্যন্ত বিধায়ক ছিলেন। গোড়ায় অর্থ দফতরের প্রতিমন্ত্রী। তারপর দীর্ঘদিন শ্রম দফতর সামলেছেন। ব্যারাকপুর মহকুমার শ্রমিক মহল্লায় একডাকে তাঁকে চিনত মানুষ। ১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বরাহনগর কেন্দ্রে বিজয়ী জ্যোতি বসুর নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন শান্তিবাবু।
সরল সাধারণ জীবনযাপনের পাশাপাশি শান্তিবাবুর আর একটি বড় গুণ ছিল তাঁর নিরহংকার মানসিকতা। তাপসবাবু এবং সেই সব দিনে শ্রম দফতরের অফিসারদের কথায় মন্ত্রীর পড়াশোনা, পাণ্ডিত্য নিয়ে মুগ্ধতা ধরা পড়ত। তেমনই ছিল মন্ত্রীর প্রতি তাঁদের অপার শ্রদ্ধা।
ছোটখাটো কলকারখানার সমস্যা মেটাতেও নিজের চেম্বারে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক ডাকতেন শান্তিবাবু। সরকারি বৈঠকে মালিক-শ্রমিক, উভয়পক্ষকেই সমান মর্যাদা দিয়ে সম্বোধন করতেন।
ক্যান্সারে আক্রান্ত শান্তিবাবু ২০০২ সালের নভেম্বরে এসএসকেএম হাসপাতালে মারা যান। অনিল বিশ্বাস, বিমান বসুরা প্রায়ই দেখতে যেতেন তাঁকে। সে বছর, অথবা তাঁর আগের বছর অর্থাৎ ২০০১-সালের মে-ডে’তে শহিদ মিনারের সভায় দেখি শান্তিবাবুকে মঞ্চে ধরাধরি করে তোলা হল। বক্তৃতা দেওয়ার অবস্থায় ছিলেন না তিনি। পরে শুনেছিলাম, এসএসকেএমের ডাক্তারদের কাছে অনেক আবদার জোরাজুরি করে কয়েক ঘণ্টার ছুটি নিয়ে মে ডে-তে শ্রমিক দিবসের সমাবেশে ঘুরে গিয়েছিলেন তিনি।
শান্তিবাবু প্রয়াত। ইতিহাস তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মন্ত্রী হিসাবে শান্তিরঞ্জন ঘটকের নাম উজ্জ্বল হয়ে থাকা উচিত।