Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

কে এই দুঃসাহসী অভিযাত্রী, যাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছিল 'টারজান'

রূপাঞ্জন গোস্বামী ১৯৫৪ সাল, দক্ষিণ পুর্ব লন্ডনের স্ট্রেথাম এলাকার ‘ল’ ফার্মের দোতলায় উদবিগ্ন চিত্তে পায়চারি করছিলেন দুঁদে আইনজীবী স্যার এডমন্ট বেনেট। উত্তেজনায় ছটফট করছিলেন পার্টনার স্যার হেনরি র‍্যানডলফ ও ফার্মের দুই প্রবীন ও মুহুরী। ক

কে এই দুঃসাহসী অভিযাত্রী, যাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছিল 'টারজান'

শেষ আপডেট: 5 May 2023 11:32

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৫৪ সাল, দক্ষিণ পুর্ব লন্ডনের স্ট্রেথাম এলাকার ‘ল’ ফার্মের দোতলায় উদবিগ্ন চিত্তে পায়চারি করছিলেন দুঁদে আইনজীবী স্যার এডমন্ট বেনেট। উত্তেজনায় ছটফট করছিলেন পার্টনার স্যার হেনরি র‍্যানডলফ ও ফার্মের দুই প্রবীন ও মুহুরী। কিছু অজানা তথ্য পাওয়ার আশায়।

স্ট্রেথামের পঞ্চদশ আর্ল প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বিপুল সম্পত্তির অধিকারী লর্ড এডুইন জর্জ মাইল্ডিন ছিলেন নিঃসন্তান। তাই তিনি সমাজ সেবার কাজে দান করে গিয়েছিলেন সমস্ত সম্পত্তি। পরিবারের সমস্ত দলিল দস্তাবেজ কুড়ি বছরের জন্য বন্দি করে রাখা হয়েছিল কয়েকটি বিশাল সিন্দুকে।

কেটে গিয়েছিল কুড়ি বছর। তাই জনসমক্ষে অজানা তথ্য বোঝাই সিন্দুক খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পারিবারিক আইনজীবীরা। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে স্ট্রেথামের পঞ্চদশ আর্ল পরিবারের আত্মীয় ও উৎসাহী মানুষদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল।

কিন্তু ঘড়ির কাঁটা নির্ধারিত সময় ছুঁলেও উপস্থিত হননি একজনও। তাই আইনজীবীরা ভেঙেছিলেন অতিকায় সিন্দুকগুলির তালা। সিন্দুকগুলিতে সযত্নে রাখা ছিল ব্রিটেনের রাজা, রানি, ডিউক ও আর্লদের লেখা অসংখ্য চিঠি। পরিবারের প্রাচীন উইল, জমির দলিল ও অসংখ্য হিসেবের খাতা। সিন্দুকগুলির মধ্যে কোনও রহস্যের সন্ধান না পেয়ে, কোনও মিউজিয়ামের হাতে সিন্দুকগুলি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বর্তমান স্ট্রেথামের এক রাস্তা

ধূসর পাণ্ডুলিপি

হঠাৎ প্রবীন মুহুরী মিস্টার গ্রিম্পসনের চোখ পড়ে দলিলের বাক্সে অনাদরে পড়ে থাকা এক বিবর্ণ পান্ডুলিপির ওপর। কাঠের ব্লকে ছাপা প্রচ্ছদটি সরিয়েছিলেন মিস্টার গ্রিম্পসন। উত্তেজনায় চেঁচিয়ে বলে উঠেছিলেন,"ওহ মাই গড।" সবাই ছুটে এসেছিলেন তাঁর কাছে। পাতাটিতে বড় হরফে লেখাছিল, "লর্ড উইলিয়াম চার্লস মাইল্ডিনের এক অবিশ্বাস্য অভিযান। স্ট্রেথামের চতুর্দশ আর্ল, লর্ড উইলিয়াম চার্লস মাইল্ডিন, যিনি প্রায় পনেরো বছর কাটিয়েছিলেন আফ্রিকার অরণ্যে। বানর ও অন্যান্য পশুদের সঙ্গে (Real-life Tarzan)।"

প্রায় ১৫০০ পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপিটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল টেবিলে। স্যার বেনেট পড়তে শুরু করেছিলেন ধূসর পাণ্ডুলিপি। চুয়াত্তর বছর পর কেউ উল্টেছিল পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।

.

স্ট্রেথামে চতুর্দশ আর্ল লর্ড উইলিয়াম মাইল্ডিন লিখছেন, "১৮৬৮ সাল। আমার বয়স তখন মাত্র এগারো। বাড়ি থেকে পালিয়ে উঠে পড়েছিলাম চার মাস্তুলের জাহাজ আন্টালিয়ায় । আটলান্টিক পেরিয়ে আন্টালিয়া যাবে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপের কোনও বন্দরে।"

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। বাড়ি ফেরেননি কেউ। এক করতে পারেননি চোখের পাতাও। কারণ পান্ডুলিপির পৃষ্ঠাগুলি ক্রমশ উন্মোচিত করে চলেছিল এক বিস্ময়কর কাহিনি, যা হার মানিয়ে দেবে কল্পকাহিনিকেও।

আফ্রিকায় উইলিয়াম (Real-life Tarzan)

উত্তর আটলান্টিক পেরিয়ে আন্টালিয়া চলেছিল ৭২০৯ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপের উদ্দেশে। কয়েক মাস পরে চলে এসেছিল দক্ষিণ আটলান্টিকে। আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব উপকূল ছুঁয়ে থাকা গালফ অফ গায়ানার কাছাকাছি।

আন্টালিয়াকে আক্রমণ করেছিল ভয়াবহ হারিকেন। তান্ডব চালিয়েছিল বাহাত্তর ঘণ্টা ধরে। আফ্রিকার (Africa) উপকূলে ডুবে গিয়েছিল আন্টালিয়া। সহযাত্রী ও নাবিকেরা প্রাণ হারালেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিল বালক উইলিয়াম। ঢেউয়ের নীচে তলিয়ে যাওয়ার আগে আঁকড়ে ধরেছিল ভাসতে থাকা মাস্তুল।

ঝোড়ো বাতাস তাকে ঠেলতে শুরু করেছিল তীরের দিকে।এক সময় উইলিয়াম পৌঁছে গিয়েছিল ফরাসি শাসিত কঙ্গোর পইন্টে-নোইরে ও গ্যাবনের লিব্রেভিলের মধ্যে থাকা এক নির্জন সৈকতে।

ক্লান্ত, বিধ্বস্ত উইলিয়াম সৈকতের বালিতেই শুয়ে থেকেছিল বেশ কয়েক ঘণ্টা। কিছুটা বল ফিরে পাওয়ার পর খাবার ও জলের আশায় হাঁটতে শুরু করেছিল অরণ্যের দিকে। ডেকে চলেছিল ঈশ্বরকে, যাতে তাকে নরখাদক ও মুণ্ডশিকারীদের মুখোমুখি না পড়তে হয়।

দুর্গম অরণ্যের ডালপালা সরিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর, উইলিয়াম দেখতে পেয়েছিল এক পাল বানরকে। তাকে দেখেও পালিয়ে যায়নি বানরগুলি। দলবেঁধে আক্রমণও করেনি। অবাক হয়ে দেখছিল উইলিয়ামকে। কারণ সাদা চামড়ার মানুষ আগে তারা দেখেনি।

ঘাসের ওপর আবার শুয়ে পড়েছিল উইলিয়াম। দু'দিন পেটে কিছু না পড়ায় শরীর আর চলছিল না। হঠাৎ কেউ স্পর্শ করেছিল শরীর। আঁতকে উঠেছিল উইলিয়াম। পরক্ষণেই চোখে এসে গেছিল জল। উইলিয়ামকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল এক অতিকায় স্ত্রী বানর।

একে একে এগিয়ে এসেছিল আরও কিছু স্ত্রী বানর। উইলিয়ামের পাশে বানরগুলি রেখেছিল কাঠবাদাম, কচু জাতীয় ফল ও পোকার লার্ভা। ভয় কেটে গিয়েছিল উইলিয়ামের। পাথর ঠুকে কাঠবাদামের খোলা ভেঙে শাঁস খেয়েছিল। পাথরের খাঁজে জমে থাকা বৃষ্টির জল চুমুক দিয়ে খেয়েছিল পশুর মত।

আশ্রয় দিয়েছিল বানরের পাল

গাছে চড়া জানত না উইলিয়াম। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ও বিপদসঙ্কুল রাত কাটত গাছের নীচে শুয়ে। গাছের ওপর ঠায় জেগে থাকত তার পালক মা। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই বানর মা শিখিয়ে দিয়েছিল গাছে চড়া।

বড় গাছের ঝুরি ধরে দোল খেয়ে তীরের গতিতে এগিয়ে যেতে শিখেছিল বানরদের উইলিয়াম। শিখেছিল তরতরিয়ে পাহাড় বাইতে। গাছগুলির মোটা ডালের ওপর দিয়ে অনায়াসে ছুটতে। কুমিরে ভরা নদী সাঁতরে পার হয়ে যেতে।

বানরের পালের সঙ্গে উইলিয়াম ঘুরে বেড়াত অরণ্যের আনাচে কানাচে। মাঝে মাঝে চলে যেত সমুদ্রের ধারে। যদি দেখা মেলে কোনও জাহাজের। ফিরত নিরাশ হয়ে। একদিন অরণ্যের গভীরে কয়েকটি কুঁড়ে ঘর দেখতে পেয়েছিল উইলিয়াম।

ঘরগুলিতে সেই মুহূর্তে কোনও মানুষ ছিল না। আদিবাসীদের গ্রাম থেকে উইলিয়াম চুরি করে এনেছিল তির-ধনুক, ছুরি,গুলতি ও চকমকি পাথর।

অস্ত্রগুলি পেয়ে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল উইলিয়ামের। খরগোস ও পাখি শিকার করে, আগুনে ঝলসে খেতে শুরু করেছিল উইলিয়াম।

বানর পালে 'মানুষ' রাজা (Real-life Tarzan)

১৮৬৯ সালে কঙ্গোর জঙ্গলে থাকা উপজাতিগুলির মধ্যে শুরু হয়েছিল ভয়াবহ সংঘর্ষ। টানা তিন বছর চলেছিল এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। তোলপাড় হয়েছিল অরণ্য। বানরের পাল পালিয়ে গিয়েছিল পাহাড়ের ওপরে। এই তিন বছর উইলিয়ামকে শিখিয়েছিল নির্মম অরণ্যের বুকে লড়াই করে বেঁচে থাকার অজস্র কৌশল।

বানরদের ভাষা না শিখতে পারলেও, আকার ইঙ্গিতে ভাববিনিময় করতে শিখে নিয়েছিল উইলিয়াম। জেনেছিল
এক অদ্ভুত আওয়াজের মাধ্যমে তাকে ডাকে বানরেরা। উইলিয়াম বুঝতে পেরেছিল বানরের পালের কাছে তার নাম 'ওখুঘ'।

বানরের পালটিকে আক্রমণ করতে এসে প্রতিবারই হেরে পালিয়ে যেত অন্য পালের বানরেরা। যুদ্ধ জয়ের অন্যতম কারিগর ছিল উইলিয়াম ও তার তির ধনুক। একবার লড়াইয়ে আহত হয়েছিল এক বানর। কিশোর উইলিয়াম জল দিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করে, ক্ষতের ওপর দিয়েছিল, ঠান্ডা মস ও কাদার প্রলেপ।

উইলিয়ামের সেবায় সেরে উঠেছিল বানরটি। প্রচণ্ড খুশিতে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছিল বানরের পাল। এভাবেই আফ্রিকার দুর্ভেদ্য অরণ্যে, বানরদের রাজা হয়ে গিয়েছিল অভিজাত ইংরেজ পরিবারের সন্তান উইলিয়াম।

ছ'বছর পর মানুষ দেখেছিল উইলিয়াম

ইংল্যান্ডে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিল উইলিয়াম। যদিও সে জানত অনেক শ্বেতাঙ্গ বাস করে আফ্রিকার শহরগুলিতে। কিন্তু তারপক্ষে কখনওই শ্বেতাঙ্গদের কাছে পৌঁছনো সম্ভব নয়। কারণ সে জানত আফ্রিকা মহাদেশের আয়তনও। তাই আফ্রিকার অরণ্যে অস্তিত্বের লড়াই লড়তে লড়তে কাটিয়ে চলেছিল বছরের পর বছর।

১৮৭৪ সালে, শিকার করতে গিয়ে এক উপজাতীয় শিকারি দলের দেখা পেয়েছিল উইলিয়াম। মৃত্যুর আগে শেষ লড়াই লড়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল সে। কিন্তু উইলিয়ামকে কিছুটা অবাক করে, বুকে টেনে নিয়েছিল উপজাতি সর্দার এন'ডুন্ডা। নিয়ে গিয়েছিল তাদের গ্রামে। কিছুক্ষণ গ্রামে কাটিয়ে উইলিয়াম আবার ফিরে এসেছিল বানরের পালে।

একমাস পর, বানরের পাল ছেড়ে পাকাপাকিভাবে উপজাতিদের গ্রামে চলে গিয়েছিল উইলিয়াম। প্রায় পাঁচ বছর থেকে গিয়েছিল উপজাতিটির সঙ্গে। শিখে নিয়েছিল তাদের ভাষা। সর্দার এন'ডুন্ডা যুবক উইলিয়ামের বিয়ে দিয়েছিল পাঁচ উপজাতীয় সুন্দরীর সঙ্গে। পাঁচ স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিল সোনালি চুল ও তামাটে চামড়ার বেশ কিছু সন্তান।

উইলিয়ামের খোঁজে বানরের পাল প্রথম প্রথম আসত গ্রামে। ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত বানরকূলের মানব রাজাকে। একসময় আসা বন্ধ করেছিল বানরেরা। তারা বুঝতে পেরেছিল, পশু হয়ে যতই ভালবাসো, মানুষ খোঁজে মানুষকেই। বানর পালের কাহিনি গ্রামের মানুষদের বলেছিলেন উইলিয়াম। অবিশ্বাস্য কাহিনিটি শুনে বানর শিকার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল উপজাতি সর্দার।

নতুন এক গ্রামে

উপজাতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল ১৮৮০ সালে। উপজাতিটির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন উইলিয়াম। তাঁর ইংরেজ রক্ত, ক্ষুরধার মস্তিষ্ক, নিখুঁত রণকৌশল জিতিয়ে চলেছিল একটার পর একটা যুদ্ধ। এরকমই এক যুদ্ধের সময়, পরাজিত শত্রুপক্ষকে অনুসরণ করতে করতে উইলিয়াম চলে গিয়েছিলেন প্রায় আড়াইশো মাইল উত্তরে। দেখা হয়েছিল আর এক দল উপজাতীয় যোদ্ধার সঙ্গে।

পেশিবহুল চেহারার শ্বেতাঙ্গ যুবককে প্রায় নগ্ন অবস্থায় দেখে অবাক হয়েছিল যোদ্ধারা। উইলিয়াম আগের গ্রামে শেখা ভাষায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, এলাকায় কোনও শ্বেতাঙ্গ মানুষ থাকে কিনা। মাথা নেড়ে 'না' বলেছিল যোদ্ধারা। তারাও উইলিয়ামকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের গ্রামে।

প্রায় চার বছর উইলিয়াম কাটিয়েছিলেন দ্বিতীয় উপজাতিটির গ্রামে। এই গ্রামেও তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুই কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরীর। সন্তানও হয়েছিল বেশ কয়েকটি। সোনালি চুল ও তামাটে চামড়ার।

নদীর তীরে সাদা চামড়ার মানুষ

১৮৮৪ সালে, এক উপজাতি যুবক দিয়েছিল বহু প্রতীক্ষিত সংবাদ। যুবকটি বলেছিল, চারি নদীর তীরে থাকে এক সাদা চামড়ার মানুষ। সেই রাতেই দুই স্ত্রী ও সন্তানদের ফেলে পালিয়েছিলেন উইলিয়াম। তিন সপ্তাহ হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিলেন চাদের রাজধানী এঞ্জামিনা থেকে পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণে থাকা সেই আড়তে। দিনটি ছিল ১৮৮৪ সালের ২২ শে মার্চ।

চাদ প্রজাতন্ত্রের চারি নদী

নদীর ধারে, এক কাঠের বাড়ির বারান্দায় এক শ্বেতাঙ্গ যুবকে দেখে উইলিয়ামের বুকের রক্ত চলকে উঠেছিল। অরণ্যের দিক থেকে প্রায় নগ্ন, কাঁধ ছোঁয়া চুলের এক শ্বেতাঙ্গকে আসতে চোখ কপালে উঠেছিল সেই যুবকেরও। যুবকটি ছিলেন ফরাসি। তাই একবর্ণও বুঝতে পারেননি উইলিয়ামের ইংরেজি। তবে যুবকটি বুঝতে পেরেছিলেন জংলি শ্বেতাঙ্গটি ইংরেজ এবং সে ইংল্যান্ডে ফিরতে চায়।

সবার আগে উইলিয়ামের পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন ফরাসি সেনা চৌকির যুবকটি । ১৮৬৮ সালের পর সেই প্রথম সভ্যজগতের পোশাক পরেছিলেন উইলিয়াম। তিন মাস পর তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল সুদানের ব্রিটিশ উপনিবেশে। তাঁর কথা বিশ্বাস করেনি প্রবাসী ব্রিটিশেরা। তবে দিয়েছিল আশ্রয়।

দেশের পথে

১৮৮৫ সালে সুদানের খার্তুমে শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী দাঙ্গা। প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। তল্পিতল্পা গুটিয়ে ইংল্যান্ডগামী জাহাজে উঠেছিলেন ব্রিটিশরা। সেরকমই এক জাহাজে ঠাঁই পেয়েছিলেন উইলিয়াম।

কয়েক মাস পরে জাহাজ থেমেছিল ব্রিস্টল বন্দরে। পায়ে হেঁটে উইলিয়াম পৌঁছে গিয়েছিলেন স্ট্রেথামের পারিবারিক প্রাসাদে। পনেরো বছর পর। রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া উইলিয়ামকে চিনতে পারেননি কেউই। ছেলের শোকে আগেই মারা গিয়েছিলেন উইলিয়ামের বাবা ও মা।

খবর পেয়ে তদন্ত শুরু করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। লয়েডের রেজিস্টার ঘেঁটে জানা গিয়েছিল, সত্যিই আন্টিলিয়া নামে একটি চার মাস্তুলের জাহাজ, ১৮৬৮ সালে ব্রিস্টল বন্দর ছেড়েছিল। কোনও রহস্যময় কারণে যাত্রী সহ হারিয়ে গিয়েছিল আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে।

সে যুগের ব্রিস্টল বন্দর

পৃথকভাবে অনুসন্ধান চালিয়েছিল ফরাসি পুলিশও। চারি নদীর তীরে অবস্থিত ফরাসি সেনা চৌকির রেজিস্টার ঘেঁটে জানা গিয়েছিল এক ইংরেজের কথা। যিনি ১৮৮৪ সালের ২২ মার্চ, প্রায় বিবস্ত্র অবস্থায় অরণ্যের দিক থেকে এসে চৌকিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

স্থানীয় উপজাতিরা জানিয়েছিল শ্বেতাঙ্গটি বাস করত বানরদের সঙ্গে। দুটি উপজাতি গ্রামেও কাটিয়েছিল বেশ কিছু বছর। গ্রামগুলিতে গেলে দেখা মিলত বেশকিছু সোনালি চুল ও তামাটে চামড়ার বালক বালিকার। তারা সম্ভবত এই শ্বেতাঙ্গ মানুষটির সন্তান।

মাইল্ডিন পরিবারের আইনজীবীরা উইলিয়ামকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করেছিলেন। একসময় মেনে নিয়েছিলেন, অজ্ঞাতবাস থেকে হঠাৎ উদয় হওয়া মানুষটিই, ১৮৬৮ সালে হারিয়ে যাওয়া উইলিয়াম মাইল্ডিন। উইলিয়াম ফিরে পেয়েছিলেন বাবা চার্লসের সুবিশাল সম্পদ। উইলিয়াম হয়েছিলেন স্ট্রেথামের 'চতুর্দশ আর্ল' লর্ড উইলিয়াম চার্লস মাইল্ডিন।

পুলিশের কাছ থেকে উইলিয়াম সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য পেয়েছিলেন কয়েকজন ব্রিটিশ সাংবাদিক। তথ্যগুলি নিবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়েছিল তৎকালীন ব্রিটেনের বিভিন্ন পত্রিকায়। আলোড়ন উঠেছিল ইউরোপ আমেরিকা জুড়ে। কিন্তু এক অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারকে নিয়ে পত্রপত্রিকার এই টানাটানি মেনে নেয়নি ব্রিটেনের রক্ষণশীল সমাজ ও আইন ব্যবস্থা। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল পত্রিকাগুলি।

সভ্যজগতে ফিরেও ছিলেন অজ্ঞাতবাসে (Tarzan)

দেশে ফেরার কয়েক বছর পর বিয়ে করেছিলেন উইলিয়াম। সন্তান এডুইন জর্জ জন্ম নিয়েছিল ১৮৮৯ সালে। সব কিছু ফিরে পেয়েও সভ্যসমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন উইলিয়াম। হয়ত অগ্নিপরীক্ষা দেওয়ার অপমানে। হয়ত তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকত আফ্রিকার অরণ্য। হয়ত তাঁর মনে পড়ত বানর মা'কে।

প্রাসাদের উঁচু প্রাচীরের ভেতরে তাই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন উইলিয়াম। তাই তাঁর কোনও ছবি তোলা হয়নি। হয়ত তিনি তুলতেও চাননি। তবে কালির আঁচড়ে ধরে রেখেছিলেন তাঁর সেই অবিস্মরণীয় অজ্ঞাতবাসের রোমাঞ্চকর কাহিনিটি। ১৯১৯ সালে সবার অগোচরেই প্রয়াত হয়েছিলেন উইলিয়াম।

আত্মপ্রকাশ করেছিল 'টারজান' (Edgar Rice Burroughs)

উইলিয়াম মাইল্ডিনের মৃত্যুর ঠিক সাত বছর আগে, আমেরিকার অল-স্টোরিজ ম্যাগাজিনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, আমেরিকার জনপ্রিয় কল্পকাহিনি লেখক এডগার রাইস বারোজের (Edgar Rice Burroughs) উপন্যাস 'টারজান অফ দ্য এপস'(Tarzan of the Apes)।

উপন্যাসে বলা হয়েছিল গ্রেস্টোকের ভাইকাউন্ট জন ক্লেটন ও ভাইকাউন্টেস অ্যালিসের কথা। ১৮৮৮ সালে যাঁরা অ্যাঙ্গোলার উপকূলে জাহাজডুবির কবলে পড়েছিলেন। সাঁতরে উঠেছিলেন তীরে। আশ্রয় নিয়েছিলেন দুর্গম অরণ্যে।

অ্যালিস ছিলেন গর্ভবতী। জন ক্লেটনের বানানো গাছবাড়িতে ভূমিষ্ট হয়েছিল পুত্র দ্বিতীয় জন ক্লেটন। একবছরের মধ্যেই শিশুটি হারিয়েছিল ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত মাকে। তার কয়েকদিন পরেই বাবাকে হত্যা করেছিল মাঙ্গানি প্রজাতির বানরদের রাজা 'কার্চাক'। অপত্য স্নেহে অনাথ শ্বেতাঙ্গ শিশুটিকে বড় করে তুলেছিল বানর মা 'কালা'।

বানর সমাজে শিশুটির নাম হয়ে গিয়েছিল 'টারজান' (Tarzan)। বানরদের ভাষায় শব্দটির অর্থ 'সাদা চামড়া'। বানর মায়ের কোলে বড় হতে হতে টারজান শিখে নিয়েছিল অরণ্যের ভাষা। শিখে নিয়েছিল অস্তিত্বের লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার সমস্ত কৌশল। পদ হারানোর আশঙ্কায় যুবক টারজানকে একদিন আক্রমণ করেছিল বানররাজ কার্চাক। বাবার হত্যাকারী কার্চাককে হত্যা করে টারজান হয়ে গিয়েছিল অরণ্যের অধিপতি।

টারজানের ভূমিকায় জনি ওয়েসমুলার(১৯৩২)

কারণ তার প্রভুত্ব স্বীকার করেছিল গরিলা, সিংহ, গন্ডার, কুমির, পাইথন, চিতাবাঘদের দল। এমন কি অরণ্যে থাকা উপজাতিগুলিও। পরবর্তীকালে টারজান ফিরে গিয়েছিল ব্রিটেনে। কিন্তু সভ্যতার বিবেকহীন মুখ টারজানকে বাধ্য করেছিল অরণ্যে ফিরে যেতে।

শেষের অঙ্কটা না মিললেও, ইতিহাস জানে, 'আর্ল অফ গ্রেস্টোক' ওরফে 'দ্বিতীয় জন ক্লেটন' ওরফে 'টারজান'-এর আড়ালে লুকিয়ে আছেন 'আর্ল অফ স্ট্রেথাম' উইলিয়াম চার্লস মাইল্ডিন নামের এই দুঃসাহসী মানুষটা। ভাগ্যিস ১৯৫৭ সালে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল উইলিয়ামের সেই ধূসর পাণ্ডুলিপি। না হলে হয়ত কালের অতলে তলিয়ে যেত, ইতিহাসের এই অবিস্মরণীয় পাতাটি।

আরও পড়ুন: হিমালয়ে লুকিয়ে বিশুদ্ধ আর্যদের গ্রাম! ইউরোপ থেকে আসেন রহস্যময়ী নারীরা!

আরও পড়ুন: অ্যালার্জি থাকলে হার্টের অসুখেরও ভয় আছে? নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর দাবি


```