শেষ আপডেট: 10 September 2021 11:41
সান নিকোলাস[/caption]
জাহাজে করে এসেছিল সভ্য মানুষের দল
সান নিকোলাস দ্বীপে পশু শিকারের উদ্দেশ্যে জাহাজ নিয়ে এসেছিল আলাস্কা ও রাশিয়ার 'ফার' শিকারিরা। ১৮১১ এবং ১৮১৪ সালে। দ্বীপে সেই সময় নেকোলেনো উপজাতির প্রায় তিনশোর মত মানুষ ছিল। দু'বারই তারা বাধা দিয়েছিল। শিকারে বাধা দেওয়ার পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ। শিকারিদের দল পশু শিকার বাদ দিয়ে নির্বিচারে মানুষ শিকার করেছিল।
দুটি আক্রমণে মারা গিয়েছিল প্রায় ২৮০ নেকোলেনো। বন্দুকের সামনে তাদের তির ধনুক কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি। সান নিকোলাস দ্বীপে নেকোলেনোদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল মাত্র জনা কুড়ি। জুয়ানা তখন ছিল শিশু। ঝোপের আড়াল থেকে ভয়ে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে সে দেখেছিল তার উপজাতির মানুষদের রক্তাক্ত মৃতদেহ মাড়িয়ে জাহাজে উঠে যাচ্ছে আক্রমণকারীরা। হয়তো সেই শবদেহের স্তূপে ছিল তার বাবা, মা, ভাই-বোনের দেহও।
গণহত্যার ২০ বছর পর, আবার দ্বীপে হানা দেয় তথাকথিত সভ্য মানুষের দল। তবে এবার হানাদারদের হাতে ছিল না বন্দুক, ছিল বাইবেল। সান্তাবারবারার স্প্যানিশ ক্যাথলিক মিশনারিরা সান নিকোলাস দ্বীপে থাকা অবশিষ্ট নেকোলেনোদের দ্বীপ থেকে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে তুলে আনার জন্য জাহাজ পাঠিয়েছিলেন। ১৮৩৫ সালের নভেম্বরের শেষে ক্যাপ্টেন চার্লস হাবার্ড তাঁর 'পেওর এস নাদা' জাহাজটি ভিড়িয়েছিলেন সান নিকোলাস দ্বীপে।
২০ বছর আগের রক্তাক্ত স্মৃতি জ্বলজ্বল করছিল সভ্যতা থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে থাকা জনা কুড়ি অর্ধনগ্ন মানব মানবীর বুকে। তাই তারা প্রাণভয়ে তাদের শিশুদের নিয়ে দৌড় মেরেছিল জঙ্গলের গভীরে। কিন্তু চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে এক এক করে তাদের খুঁজে বার করা হয়েছিল।
জুয়ানা মারিয়া তখন যুবতী
জঙ্গলের গভীর থেকে সব শেষে সে ধরা পড়েছিল। জাহাজে কিছুতেই উঠতে চায়নি জুয়ানা মারিয়া। কিন্তু অতগুলি পুরুষের সঙ্গে গায়ের জোরে পেরে ওঠেনি। সেদিন সমুদ্র ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠছিল। বিশাল বিশাল ঢেউ জাহাজের গায়ে আছড়ে পড়তে শুরু করেছিল। ঘূর্ণিঝড় আসার সংকেত পেয়েছিলেন জাহাজের ক্যাপটেন চার্লস হাবার্ড। বুঝতে পেরেছিলেন জাহাজ ছাড়তে আর কয়েক মিনিট দেরি করলেই বড় বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে গুঁড়িয়ে যাবে জাহাজ।
নোঙর তুলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল জাহাজ। প্রশান্ত মহাসাগরে উঠেছিল তুমুল ঘূর্ণিঝড়। নাবিক থেকে ক্যাপ্টেন, সবাই তখন জাহাজ বাঁচাতে ব্যস্ত। উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জুয়ানা মারিয়া। সে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জেনেও জাহাজ ডুবির ভয়ে ক্যাপ্টেন জাহাজ ঘোরাতে পারেননি। হতবাক হয়ে সবাই দেখেছে উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে জুয়ানা মারিয়া ডলফিনের মত অনায়াস ভঙ্গিতে সাঁতার কাটতে কাটতে এগিয়ে চলেছে সান নিকোলাস দ্বীপের দিকে। পরবর্তীকালে গবেষকেরা অনুমান করেছিলেন জুয়ানা তার শিশু সন্তানকে দ্বীপে লুকিয়ে এসেছিল। নাড়ির টানেই উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক মা।
কেউ বাঁচেনি
সান নিকোলাস দ্বীপ থেকে জোর করে তুলে আনা নেকোলেনোদের ঠাঁই হয়েছিল সান গ্যাব্রিয়েল মিশনে। সভ্য মানুষদের জগতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বিয়োগান্তক পরিণতি। যে পরিবেশে তারা ১৩০০০ বছর ধরে অস্তিত্বের সংগ্রামে জয়ী হয়ে আসছিল সে পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে এসে তারা ভয়ঙ্কর বিপদে পড়ে। আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের রোগগুলি তাদের আক্রমণ করে। সেই রোগগুলি প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। একে একে সবাই মারা গিয়েছিল মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই। নেকোলেনো উপজাতির শেষ প্রতিনিধি হয়ে রয়ে গিয়েছিল জুয়ানা মারিয়া। নির্জন সান নিকোলাস দ্বীপে।
পরের দশকগুলিতে জুয়ানা মারিয়াকে খুঁজে বের করার অনেক চেষ্টা করা হয়। হোসে গঞ্জালেস রুবিও নামে সান্তা বারবারার এক যাজক ১৮৫০ সালে থমাস জেফ্রি নামে এক অভিযাত্রীকে ২০০ ডলার দেন। জুয়ানা মারিয়াকে খুঁজে বার করার জন্য। কিন্তু সে সফল হয়নি। এরপর ফাদার রুবিও অভিযাত্রী জর্জ নিদেভারকে অনুরোধ করেন জুয়ানাকে খুঁজে বার করার জন্য। ফাঁদ পেতে পশু ধরতে ওস্তাদ পশু শিকারি নিদেভার তাঁর দল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলেন সান নিকোলাসের উদ্দেশে। প্রথম দুটি অভিযানে সাফল্য আসেনি।
১৮৫৩ সালের শরৎকালে হয়েছিল তৃতীয় অভিযান
দিন পনেরো সান নিকোলাস দ্বীপের আনাচে কানাচে ঘুরে নিদেভারের একজন সহযোগী কার্ল ডিটম্যান, দ্বীপের উত্তরদিকের সৈকতে মানুষের পদচিহ্ন খুঁজে পান। দলনেতা নিদেভার ও ডিটম্যান পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে করতে পৌঁছে যান একটি পাথরের স্তূপের কাছে। কাছে গিয়ে চমকে ওঠেন তাঁরা। হাঁসের পালকের পোশাক পড়া এক নারী অতিদ্রুত একটি অতিকায় সিলের চামড়া ছাড়াচ্ছে। সিলের বুকে তখনও বিঁধে রয়েছে হারপুন। সিলের রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারদিক।
তাঁর স্মৃতিকথা The Life and Adventures of George Nidever বইটিতে নিদেভার লিখেছিলেন তাঁকে ও ডিটম্যানকে দেখে জুয়ানা মারিয়া পালায়নি বা হাতে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও আক্রমণ করেনি। মাথা নিচু করে অভিবাদন জানিয়েছিল, মুখে ছিল হাসি। নিদেভাররা অবাক হয়ে দেখেছিলেন সৈকতের বিভিন্ন পাথরের উপর শুকোতে দেওয়া আছে মাছ, সিল, হাঁস ও অজানা কোনও প্রাণীর মাংস ও চর্বি। বুঝতে পেরেছিলেন নির্জন দ্বীপে ১৮ বছর ধরে এগুলি খেয়েই বেঁচে আছে জুয়ানা মারিয়া।
[caption id="attachment_193695" align="aligncenter" width="300"]
ক্যাপটেন জর্জ নিদেভার[/caption]
তাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন জুয়ানার কুঁড়ে ঘর। যেটি বানানো হয়েছিল তিমি মাছের পাঁজরের হাড় দিয়ে। খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল কিছু গুহা। প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় জুয়ানা যেগুলির মধ্যে বাস করত। স্মৃতিকথায় নিদেভার লিখেছেন, জুয়ানা নিজস্ব ভাষায় কথা বলে যাচ্ছিল। তার উচ্চতা ছিল মাঝারি। খুঁজে পাওয়ার সময় তার বয়স ছিল প্রায় ৫০ বছর, কিন্তু দেখে মনে হয়েছিল তিরিশ বছরের তরুণী। বয়সের তুলনায় জুয়ানা ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী ও কর্মঠ। সে হেসেই যাচ্ছিল। হয়তো হাসি দিয়ে মৃত্যু এড়ানোর চেষ্টা করছিল, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে।
১৮৫৩ সালের ১৩ অক্টোবর, আমেরিকার সান্তাবারবারার ‘ডেইলি ডেমোক্রেটিক স্টেট জার্নাল’ ছেপেছিল এক বিস্ময়কর প্রতিবেদন,
” সান্তাবারবারার পশ্চিমে ,সমুদ্রের সত্তর মাইল দূরে থাকা 'সান নিকোলাস' দ্বীপে এক বন্য নারীকে খুঁজে পাওয়া গেছে। জানা যাচ্ছে সে ওই দ্বীপে ১৮-২০ বছর ধরে একা বাস করছিল। মাছ, ঝিনুক আর সিলের চর্বি খেয়ে বাঁচত। বুনো হাঁসের চামড়া ও পালক দিয়ে বানানো পোশাক পরত, সেই পোশাক সে সিলের নাড়ি দিয়ে সেলাই করত। সে কোনও এক অজানা ভাষায় কথা বলছে। মধ্যবয়স্কা নারীটি দেখতে ভাল। সম্ভবত সান্তাবারবারার ভালোমানুষদের মধ্যে সে তার নতুন ঠিকানা খুঁজে নিতে চলেছে।"
জুয়ানাকে আনা হয়েছিল সান্তাবারবারায়
জুয়ানার সঙ্গে নিদেভাররা দ্বীপ থেকে নিয়ে এসেছিলেন তার ব্যবহৃত ও তৈরি করা বেশ কিছু জিনিসপত্র। যেগুলি সে বানিয়েছিল ১৮ বছর ধরে। কিন্তু জুয়ানার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার কোনও ভাষা জানা ছিল না কারও। স্থানীয় চুমাশ রেড ইন্ডিয়ান, টোংভা ইন্ডিয়ানরাও বুঝতে পারেনি জুয়ানার ভাষা। নিদেভারের সঙ্গেই একমাত্র আকার ইঙ্গিতে ভাব বিনিময় চলতে থাকায় নিদেভারের বাড়িতেই জুয়ানাকে রাখা হয়েছিল।
[caption id="attachment_193660" align="aligncenter" width="585"]
জুয়ানা মারিয়ার একমাত্র ছবি[/caption]
জুয়ানা অবাক হয়ে চেয়ে থাকত ঘোড়া, ইউরোপীয় পোশাক পরা মানুষ ও প্লেটে দেওয়া খাবারের দিকে। নিদেভার লিখেছিলেন, জুয়ানা সবুজ ভুট্টা, কাঁচা সবজি ও তাজা ফল খেতে ভালবাসত। স্থানীয়দের কাছে তুমুল কৌতুহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গিয়েছিল জুয়ানা মারিয়া। দলে দলে মানুষ দেখতে আসত জুয়ানাকে, যেন সে চিড়িয়াখানায় থাকা কোনও জন্তু। জুয়ানা হাসি মুখে বসে থাকত দর্শকের সামনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দর্শকদের সামনে তাকে মদ ও কফি খাওয়ানো এবং নাচানোর চেষ্টা করা হত।
জুয়ানা আনমনে গুনগুন করে গান গাইত। তাই আকারে ইঙ্গিতে জুয়ানাকে দর্শকের সামনে গান গাইতে অনুরোধ করতেন নিদেভার। হাসিমুখে সার্কাসের জন্তুর মতো প্রভুর হুকুম তামিল করত জুয়ানা। হৃদয়বিদারক সুরের সেই গানটা রেকর্ডও করা হয়েছিল। গানটির কথাগুলি ছিল,
"টোকি টোকি ইয়াহামিমেনা (৩ বার)
ওয়েলেশকিমা নিশুইয়াহামিমেনা (২ বার)
টোকি টোকি...।"
[caption id="attachment_193665" align="alignnone" width="800"]
ক্যালিফোর্নিয়ায় আছে জুয়ানা মারিয়ার স্ট্যাচু। কাঁধের পাশে দেখা যাচ্ছে তার শিশু সন্তানের মুখ।[/caption]
সভ্যতার সার্কাস থেকে জুয়ানা মুক্তি পেয়েছিল অচিরেই
সব অত্যাচারেরই বুঝি শেষ আছে। সান নিকোলাস দ্বীপ থেকে উঠিয়ে আনার মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিল জুয়ানা। সভ্যজগতের রোগগুলিকে প্রতিরোধ করতে না পারায়। ১৮৫৩ সালের ১৯ অক্টোবর, যেদিন জুয়ানা মারিয়া তার মৃত্যুশয্যায় শুয়ে পরাধীনতার শেকল ছেঁড়ার অপেক্ষায় মুহূর্ত গুণছিল, ঠিক তখন তার বিছানার পাশে তাকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন ফাদার স্যাঞ্চেজ। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর 'বুনো নারী'র নাম হয়েছিল ‘জুয়ানা মারিয়া’, মৃত্যুর মাত্র কয়েক মিনিট আগে। যার আসল নাম কেউ জানে না।
যে শিশুর জন্য জুয়ানা জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়েছিল। সেই শিশুকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। হয়তো এই ১৮ বছরের কোনও সময় মায়ের কোলেই নিথর হয়ে গিয়েছিল সে। তার কত বয়েস হয়েছিল কেউ জানে না। তবে এটা নিশ্চিত, নাড়ি ছেঁড়া ধনকে নিজের হাতে সমাধি দিয়েছিল জুয়ানা। বুকে পাথর বেঁধে। আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে তাকে উঠিয়ে আনার পর তবুও হাসত জুয়ানা। কেন হাসত কেউ জানে না। মৃত্যুর সময়ও তার মুখে ছিল হাসি। সে কি বুঝতে পেরেছিল, দ্বীপের স্বর্গ থেকে কাল্পনিক স্বর্গে তাকে পাঠাবার নারকীয় চেষ্টা দেখে খুশি হননি স্বয়ং ঈশ্বর।