
শেষ আপডেট: 10 July 2020 16:15
অব্লজাজ গ্রামে প্রিন্সিপদের বাড়ি।[/caption]
গাভ্রিলো প্রিন্সিপ[/caption]
হাল ছাড়েননি প্রিন্সিপ
বেলগ্রেডেই দেখা করেছিলেন অটোমান তুর্কদের বিরুদ্ধে গেরিলা হামলা চালানো 'চেটনিক' গুপ্ত সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জিভজিন রাফাজলোভিচের সঙ্গে। তিনি প্রিন্সিপকে পাঠিয়েছিলেন গেরিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেখানে প্রিন্সিপ বিভিন্ন ধরণের আগ্নেয়াস্ত্র চালাতে শিখেছিলেন। শিখেছিলেন গেরিলা যুদ্ধের নানান কৌশল। গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত প্রিন্সিপকে সদস্য করে নিয়েছিল সার্বিয়ার গুপ্ত সংগঠন 'দ্য ব্ল্যাক হ্যান্ড'।
অন্যদিকে, বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় আর্চ ডিউক ফার্দিনান্দের অপশাসন ও অত্যাচার চরমে উঠেছিল। ১৯১৩ সালে জারি করা হয়েছিল জরুরী অবস্থা। জেনারেল অস্কার পোটিওরেকের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল মিলিটারি শাসন। সমস্ত স্কুল, কলেজ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সংগঠনের নির্দেশে প্রিন্সিপ বেলগ্রেড থেকে চলে এসেছিলেন সারাজেভো। অত্যন্ত গোপনে তৈরি করতে শুরু করেছিলেন, নিজের গেরিলা বাহিনী।
[caption id="attachment_239197" align="aligncenter" width="478"]
অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা 'ব্ল্যাক হ্যান্ড' সংগঠনের মাথারা।[/caption]
হুড খোলা গাড়িতে ডিউক এবং ডাচেস। সেই অভিশপ্ত দিনের ছবি[/caption]
বিধির বিধান কে এড়াবে!
কনভয়ে গ্রেনেড হামলার পরেও, অবিচলিত ডিউক ফার্দিনান্দ তাঁর স্বভাবচিত উঁচু গলায় ভাষণ দিয়েছিলেন সারাজেভোর টাউন হলে। ভাষণের পর ডিউক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, গ্রেনেডে আহত সঙ্গীদের দেখতে যাবেন। জেনারেল অস্কার পোটিওরেক বিপদের ঝুঁকি এড়াতে অন্য রাস্তা দিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সে কথা তিনি ডিউকের ড্রাইভারকে বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। ডিউককে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সময় ড্রাইভার আগে থেকে ঠিক করে রাখা পথই ধরে ছিলেন। যে পথে শিকারী চিতার মতো অপেক্ষায় ছিলেন প্রিন্সিপ।
ভুল রাস্তায় গাড়ি চলেছে দেখে, জেনারেল অস্কার পোটিওরেক ড্রাইভার লজকাকে গাড়ি ঘোরাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। গাড়ি ঘোরাতে গিয়ে আটকে গিয়েছিল গিয়ার। গাড়িটি দাঁড়িয়ে পড়েছিল, ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা প্রিন্সিপের সামনে। মুহুর্তের মধ্যে পকেট থেকে পিস্তল বের করে, একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে দুটি গুলি ছুঁড়েছিলেন গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপ। প্রথমটা লেগেছিল ডিউকের গলায়, দ্বিতীয়টি ডাচেসের পেটে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছিলেন দুজন।
আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন প্রিন্সিপ
পিস্তলটি নিজের কানের পাশে ঠেকিয়ে ট্রিগার টেপার মুহুর্তে, পিছন থেকে আঘাত করে কেউ হাত থেকে ফেলে দিয়েছিল পিস্তল। প্রিন্সিপের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ডিউকের নিরাপত্তারক্ষীরা। গ্রেফতার হয়েছিলেন যুবক প্রিন্সিপ। শুরু হয়েছিল বিচার। কোর্টে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে প্রিন্সিপ বলেছিলেন, তিনি গর্বিত ডিউককে হত্যার জন্য। তবে তিনি ডাচেসকে মারতে চাননি। মারতে চেয়েছিলেন অত্যাচারী জেনারেল অস্কার পোটিওরেককে। কিন্তু ঘটনাটির অভিঘাত যে কী ভয়াবহ হতে চলেছিল, তা বুঝি আন্দাজ করতে পারেননি উনিশ বছরের প্রিন্সিপ।
[caption id="attachment_238819" align="aligncenter" width="600"]
গ্রেফতার হয়েছিলেন প্রিন্সিপ।[/caption]
বিচারের সময় প্রিন্সিপের ফাঁসির দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু অস্ট্রো-হাঙ্গারিয়ান কোর্টের আইনে কুড়ি বছরের কম বয়েসি কাউকে ফাঁসি দেওয়ার নিয়ম ছিল না। হত্যাকাণ্ডের দিন প্রিন্সিপের বয়েস ছিল ১৯ বছর ১১ মাস ১৫ দিন। বয়েস মাত্র ১৫ দিন কম হওয়ার জন্য ফাঁসি হয়নি প্রিন্সিপের।
কুড়ি বছরের জন্য প্রিন্সিপকে পাঠানো হয়েছিল, মিলিটারির আওতায় থাকা টেরেজিন ফোর্ট্রেসের কারাগারে। নির্জন কারাকক্ষে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছিল প্রিন্সিপকে। দিনে একবার মাত্র খাবার দেওয়া হতো। কারাকক্ষের মধ্যেই মলমুত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হতেন প্রিন্সিপ। সপ্তাহে একবার,মলমুত্র পরিষ্কার করার সুযোগ দেওয়া হতো প্রিন্সিপকে।
বেজে ছিল বিশ্বযুদ্ধের দামামা
ডিউকের হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করেছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। হত্যাকান্ডের ঠিক একমাস পর, ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। পরের দিনই সার্বিয়ার পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল রাশিয়া। রাশিয়া যুদ্ধে নামায় অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়েছিল জার্মানি, অটোমান সাম্রাজ্য ও বুলগেরিয়া।
সার্বিয়ার পক্ষ নিয়ে, একে একে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল ফ্রান্স, ব্রিটেন, জাপান, ইতালি ও আমেরিকা। বারুদের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছিল অন্য মহাদেশেও। দক্ষিণ ইউরোপের মাটিতে শুরু হওয়া যুদ্ধ, পরিণত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। যে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন নব্বই লক্ষ সেনা এবং পঞ্চাশ লক্ষ সাধারণ মানুষ। আহত হয়েছিলেন প্রায় এক কোটি সেনা এবং দু'কোটি দশ লক্ষ সাধারণ মানুষ।
বাইরে জ্বলছিল আগুন, নির্জন কক্ষে ফুরিয়ে আসছিলেন প্রিন্সিপ
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, শিকল বাঁধা অবস্থায়, দিনের পর দিন থাকতে থাকতে যক্ষ্ণা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রিন্সিপ। ভুগছিলেন শোচনীয় অপুষ্টিতে। ক্ষয়ে যেতে শুরু করেছিল শরীরের হাড়। বাদ দিতে হয়েছিল পচতে থাকা হাত। সেলের ভেতরেই তোয়ালে দিয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন প্রিন্সিপ। সফল হননি। ডিউককে হত্যার প্রায় চার বছর পর, ১৯১৮ সালের ২৮ এপ্রিল, কারাগারের সেই নির্জন কক্ষেই প্রয়াত হয়েছিলেন প্রিন্সিপ। গোপনে কবর দেওয়া হয়েছিল প্রিন্সিপকে।
[caption id="attachment_238825" align="aligncenter" width="600"]
প্রিন্সিপ[/caption]
প্রিন্সিপের মৃত্যুর কয়েকমাস পর, ১১ নভেম্বর থেমে গিয়েছিল প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ। যে চেক সৈন্যের ওপর প্রিন্সিপকে কবর দেওয়ার দায়িত্ব ছিল, তিনি চিনিয়ে দিয়েছিলেন প্রিন্সিপের কবর। স্লাভ জাতীয়তাবাদীদের কাছে 'জাতীয় বীর' হয়ে ওঠা, গ্যাভ্রিলো প্রিন্সিপের অস্থি নিয়ে আসা হয়েছিল সারাজেভোতে। তৈরি করা হয়েছিল স্মৃতিসৌধ। সৌধের ফলকে লেখা হয়েছিল একটি লাইন, " তিনিই ঈশ্বরপুত্র, যাঁর মৃত্যু হয় না। যিনি জন্ম নিয়েছিলেন কিছু দেওয়ার জন্য।"
আরও পড়ুন: নির্জন দ্বীপে আঠারো বছর একা কাটিয়েছিল এই নারী, তবুও তাকে বাঁচতে দেয়নি সভ্যতা