
শেষ আপডেট: 4 September 2021 11:57
রূপাঞ্জন গোস্বামী
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ব্রিটেনের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেন জর্জ এডওয়ার্ড হার্বারট বা লর্ড কার্নারভন। জার্মানিতে গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তিনি গিয়েছিলেন মিশরে। মিশরের শুকনো আবহাওয়ায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা আরও কিছুদিন কায়রোতেই বিশ্রাম নিতে বলেন তাঁকে। এদিকে কায়রোর হোটেলে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন লর্ড কার্নারভন। [caption id="attachment_278417" align="aligncenter" width="1200"]
লর্ড কার্নারভন[/caption]
তাই সময় কাটাতে মিশরের পুরাকীর্তি নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেছিলেন। জানতে পেরেছিলেন, প্রখ্যাত আমেরিকান প্রত্নতত্ত্ববিদ থিওডোর ডেভিসের নেতৃত্বে মিশরের 'ভ্যালি অফ কিংস'-এ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলছে। লর্ড কার্নারভনের ইচ্ছা হয়েছিল তিনিও আবিষ্কার করবেন নতুন কোনও পুরাকীর্তি। ইতিহাসের পাতায় চিরতরে থেকে যাবে তাঁর নাম।
লর্ড কার্নারভনের আগ্রহের কথা জেনে মিশর সরকার তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল হাওয়ার্ড কার্টারের। প্রত্নতত্ত্ববিদ থিওডোর ডেভিসের আহ্বানে প্রায় এক দশক আগে টেমসের ঘন সবুজ তীর ছেড়ে নীল নদের রুক্ষ হলুদ তীরে এসেছিলেন একত্রিশ বছরের হাওয়ার্ড কার্টার। ভ্যালি অফ কিংস-এ খননের পারমিট নেওয়া ডেভিসের কাজ শেষের পথে। হাওয়ার্ড কার্টার তাই নতুন কাজ খুঁজছিলেন। ভেবেছিলেন, খননের কাজ না পেলে চিত্রশিল্পীর পেশায় ফিরে যাবেন। সেই সময় দেবদূত হয়ে দেখা দিয়েছিলেন লর্ড কার্নারভন। তিনি কার্টারকে বলেছিলেন, নতুন করে খনন শুরু করতে। অর্থ কোনও সমস্যা হবে না। শুরু হয়েছিল দুই ইংরেজের একসাথে পথচলা।
[caption id="attachment_278420" align="aligncenter" width="414"]
হাওয়ার্ড কার্টার ও লর্ড কার্নারভন[/caption]
কার্টার খুঁজছিলেন অজানা এক কিশোরের সমাধি
বিভিন্ন ফারাওয়ের সমাধি থেকে প্রচুর মূল্যবান শিল্প সামগ্রী উদ্ধার করেছিলেন ডেভিস ও কার্টার। যার মধ্যে ছিল মাত্র ন'বছর রাজত্ব করা, কিশোর ফারাও তুতেনখামেনের নাম লেখা কিছু লিনেন ও অন্যান্য সামগ্রী। ইতিহাসে তখনও পর্যন্ত আবছা হয়ে ছিলেন মিশরের কিশোর রাজা। তাঁর সম্বন্ধে ইতিহাসবিদেরাও কেউ কিছু জানতেন না। হাওয়ার্ড কার্টারের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই কথা। এই এলাকাতেই আছে কিশোর রাজা তুতেনখামেনের সমাধি। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ববিদ ডেভিস, তাঁর সঙ্গী হাওয়ার্ড কার্টারের কথায় আমল দেননি। তিনি ভেবেছিলেন এই এলাকায় আর নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই লর্ড কার্নারভন ও হাওয়ার্ড কার্টারকে ভ্যালি অফ কিংসে খননের অনুমতি দিয়েছিলেন ডেভিস।
আরও পড়ুন: ধ্বংস হয়েছে বার বার, তবুও যিশুর আঁতুড়ঘর আগলে রেখেছে 'চার্চ অফ নেটিভিটি'
১৯১৪ সালে লর্ড কার্নারভন ও কার্টার খননের পারমিট পেলেও, সে বছরই শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। খননের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে আবার শুরু হয়েছিল কিশোর ফারাওয়ের সমাধি খোঁজার কাজ। ইংল্যান্ড থেকে হাওয়ার্ড কার্টারকে অর্থের জোগান দিয়ে যাচ্ছিলেন লর্ড কার্নারভন।
এরপর কেটে গিয়েছিল পাঁচ পাঁচটা বছর। মেলেনি তুতেনখামেনের সমাধি। ১৯২২ সালে লর্ড কার্নারভন হতাশ হয়ে কার্টারকে বলেছিলেন খননের কাজ বন্ধ করে দিতে। তিনি আর অর্থ ঢালতে পারবেন না। লর্ড কার্নারভনকে কার্টার বলেছিলেন আর একটা বছর অন্তত সুযোগ দেওয়া হোক। কার্টারের অনেক অনুরোধের পর এক বছরের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন লর্ড কার্নারভন।
[caption id="attachment_278425" align="alignnone" width="800"]
মেয়েকে নিয়ে প্রথমবার খননক্ষেত্রে এসেছিলেন লর্ড কার্নারভন। ছবিতে আছেন কার্টারও।[/caption]
পাথরের নীচে দরজার মাথা
অর্থ হাতে আসার পর, ১৯২২ সালের পয়লা নভেম্বর নতুন করে খননের কাজ শুরু করেছিলেন হাওয়ার্ড কার্টার। নভেম্বরের চার তারিখেই খুঁজে পেয়েছিলেন পাথরের টুকরোর তলায় চাপা পড়ে থাকা একটি সিঁড়ি। যা ক্রমশ নীচের দিকে নেমে গিয়েছিল। সিঁড়ি থেকে ভারী পাথরগুলি সরানোর পর খননক্ষেত্রে জেগে উঠেছিল একটি বন্ধ দরজার ওপরের অংশ। দরজাটির ওপর প্লাস্টারের আস্তরণ। সেই প্লাস্টারের ওপর মারা আছে মিশরের রাজকীয় কবরখানার সিল। উদ্দাম বেগে ছুটতে শুরু করেছিল কার্টারের ধমনির রক্ত। উপত্যকার বুক চিরে তীব্র গতিতে বইতে শুরু করেছিল শুকনো বাতাস। দরজাটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ ও মিশরীয় খননকারীদের বুকের ভেতরেও ফুটছিল রক্ত। কিন্তু কারও মুখে কোনও কথা ছিল না। প্রত্যেকের মনে তুফান তুলেছিল একটাই প্রশ্ন, তবে কি খুঁজে পাওয়া গেল তুতেনখামেনের সমাধি?
[caption id="attachment_278430" align="alignnone" width="768"]
আবিষ্কৃত হলো তুতেনখামেনের সমাধি। ছবির ডানদিকের ওপরে প্রবেশ পথ দেখা যাচ্ছে।[/caption]
সবাই দরজাটি খোলার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। পাথরের ওপর বসে পাইপ ধরিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন সন্ধানকারী দলের নেতা হাওয়ার্ড কার্টার। কিছুক্ষণ ভাবার পর কার্টার সহকর্মীদের বলেছিলেন, পাথর দিয়ে সিঁড়িটাকে আবার ভর্তি করে দিতে। পাথরের আড়ালে আবার হারিয়ে গিয়েছিল দরজার মাথা। ক্যাম্পে ফিরে কার্টার টেলিগ্রাম করেছিলেন লর্ড কার্নারভনকে। সেই টেলিগ্রামে লেখা ছিল, "মহাশয়, অবশেষে আমরা একটি নতুন ও অসামান্য সমাধি আবিষ্কার করেছি, যার সিল এখনও অক্ষত আছে।" টেলিগ্রাম পেয়েই লর্ড কার্নারভন ইংল্যান্ড থেকে চলে এসেছিলেন মিশরে। অক্ষত সমাধিটির খোলার সাক্ষী হওয়ার জন্য।
২৯ নভেম্বর, ১৯২২
ভ্যালি অফ কিংসে উপস্থিত হয়েছিল একটি বিশাল দল। সেই দলে ছিলেন মিশরের যুবরাজ, সরকারি অফিসার, সরকারি অতিথি, মিশরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, কার্টারের টিম ও লর্ড কার্নারভন। সরানো হয়েছিল সিঁড়ির পাথর, দৃশ্যমান হয়েছিল সম্পূর্ণ দরজাটি। আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠেছিলেন কার্টার। তাঁর অনুমান একেবারে সঠিক লক্ষ্যে আঘাত করেছে। এটাই তুতেনখামেনের সমাধি। দরজার প্লাস্টারে মারা আছে ফারাও তুতেনখামেনের সিল।
দরজাটির ওপরের কোণে ড্রিল দিয়ে একটি বড় ছিদ্র করেছিলেন কার্টার। তারপর গর্তের ভেতরে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি ঢুকিয়ে দেখবার চেষ্টা করেছিলেন সমাধির ভেতরটা। উত্তেজনায় মোমবাতির শিখার মতো কাঁপছিল লর্ড কার্নারভনের পা দুটিও। তিনি কার্টারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "ভেতরে কিছু দেখতে পাচ্ছ কার্টার?" উত্তেজিত কার্টার চিৎকার করে উঠেছিলেন, "অপূর্ব, অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়।"
[caption id="attachment_278428" align="aligncenter" width="1200"]
খোলা হলো তুতেনখামেনের সমাধির দরজা। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কার্টার।[/caption]
এরপর খোলা হয়েছিল সমাধির দরজা। একে একে সবাই প্রবেশ করেছিলেন তুতেনখামেনের সমাধির ভেতরে। সমাধির আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু তিনহাজার বছরের নিশ্ছিদ্র ঘুম ভাঙাবার জন্য কি রুষ্ট হয়েছিল কিশোর রাজার বিদেহী আত্মা! কেন এরপরই ঘটতে শুরু করেছিল একের পর এক ভয়াবহ ঘটনা! তুতেনখামেনের সমাধির দরজা খোলার দিনেই হাওয়ার্ড কার্টারের পোষা ক্যানারি পাখিটিকে ছোবল দিয়ে মেরে ফেলেছিল কেউটে সাপ। ফণা তোলা কেউটে সাপের মুকুটই তো পরতেন মিশরের ফারাওরা।
[caption id="attachment_278435" align="alignnone" width="515"]
এরকম নানান সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল সমাধির ভেতর। বেশিরভাগই নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি।[/caption]
ফেব্রুয়ারি, ১৯২৩
সমাধিকক্ষে প্রবেশ করেছিলেন কার্টার ও লর্ড কার্নারভন। কক্ষের ভেতরে আলো ফেলতেই তাঁদের চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। হতবাক হয়ে তাঁরা দেখেছিলেন সমাধিকক্ষের দেওয়ালগুলি নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি। সমাধিকক্ষের ভেতরে কার্টার ও লর্ড কার্নারভন খুঁজে পেয়েছিলেন সোনা দিয়ে মোড়া তুতেনখামেনের প্রকাণ্ড সমাধিবেদিটি। বেদির ভেতরে থাকা তুতেনখামেনের সোনার কফিনটি বের করে আনতে সময় লেগেছিল আরও এক বছর। যেটির ভেতরে প্রায় তিনহাজার বছর ধরে শুয়েছিলেন পনেরো বছর বয়েসে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করা তুতেনখামেন। না, তুতেনখামেনের মমি দেখার সৌভাগ্য হয়নি লর্ড কার্নারভনের।
[caption id="attachment_278439" align="alignnone" width="1200"]
কার্টার আবিষ্কার করলেন তুতেনখামেনের মমি।[/caption]
তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের কয়েকমাস পর, ১৯২৩ সালের ৫ এপ্রিল, কায়রোতেই বিষাক্ত মশার কামড়ে মারা গিয়েছিলেন লর্ড কার্নারভন। লর্ড কার্নারভনের মৃত্যুর সময় নাকি কায়রো শহরের সব আলো হঠাৎই নিভে গিয়েছিল। লর্ড কার্নারভনের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পর, তাঁর ইংল্যান্ডের বাড়িতে থাকা কুকুর সুজি, অদৃশ্য কাউকে তাড়া করতে গিয়ে মারা গিয়েছিল। এরপর একের পর এক ঘটতে শুরু করেছিল অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ।
সবই কি কাকতালীয়, না তুতেনখামেনের অভিশাপ!
● রক্তে বিষক্রিয়ার কারণে দাদার মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল লর্ড কার্নারভনের সৎ-ভাইয়ের।
● তুতেনখামেনের সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন আমেরিকার ধনকুবের জর্জ গোল্ড। তিনিও অজানা জ্বরে ভুগে মারা গিয়েছিলেন কয়েক মাসের মধ্যে।
● তুতেনখামেনের সমাধির ভেতরের ছবি তুলেছিলেন মিশরের যুবরাজ আলি কামেল ফাহমি। ১৯২৩ সালেই তাঁর স্ত্রী তাঁকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন।
● স্যার আর্চিবোল্ড ডগলাস বে, যিনি তুতেনখামেনের মমির এক্স-রে করেছিলেন, অস্বাভাবিকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ১৯২৪ সালে।
● তুতেনখামেনের সমাধিতে প্রবেশ করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ধনী ব্যবসায়ী ওলফ জোয়েল। কয়েকমাসের মধ্যে তাঁকে হত্যা করেছিল অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা।
● ১৯২৪ সালে সমাধিটি দেখার কয়েকদিনের মধ্যেই কায়রো শহরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল সুদানের গভর্নর জেনারেল স্যার লি স্ট্যাককে।
● হাওয়ার্ড কার্টারের খননকারী দলের সদস্য ছিলেন আর্থার মেস, ১৯২৮ সালে তিনি মারা গিয়েছিলেন আর্সেনিকের বিষক্রিয়ায়।
● ১৯২৯ সালে হাওয়ার্ড কার্টারের সেক্রেটারি রিচার্ড বেথেলকে মৃত অবস্থায় বিছানায় পাওয়া গিয়েছিল।
● পরের বছরেই কার্টারের সেক্রেটারি রিচার্ড বেথেলের বাবা ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।
● লর্ড কার্নারভনের আরও এক সৎ-ভাইয়ের ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হয়েছিল দাদার মৃত্যুর ছ'বছর পর।
[caption id="attachment_278441" align="aligncenter" width="866"]
তুতেনখামেনের মমি[/caption]
মমির অভিশাপ নাকি পরিকল্পিত গুজব!
অনেক মিশরবিদ বলেন, তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কারের প্রায় একশো বছর আগেই ১৮২০ সাল নাগাদ মমির অভিশাপ সংক্রান্ত নানান কাহিনির জন্ম হয়েছিল ইংল্যান্ডে। মিশর থেকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া মমিগুলির কফিন খোলা হত লন্ডনের দর্শক ঠাসা প্রেক্ষাগৃহে। শ্বাসরোধকারী ভূতুড়ে পরিবেশে মমির শরীর থেকে ধীরে ধীরে সরানো হত ব্যান্ডেজের আবরণ। এই শো'গুলি দেখে অনুপ্রাণিত কিছু লেখক লেখিকা মমিকে নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন রোমাঞ্চকর গল্প। লেখিকা লুইজা এলকট লিখে ফেলেছিলেন এক শিহরণ জাগানো গল্প, 'লস্ট ইন আ পিরামিড'। সেই গল্পে, পিরামিডের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া এক বিবাহিত দম্পতিকে হত্যা করেছিল মিশরীয় যুবরাজের আত্মা।
[caption id="attachment_278442" align="alignnone" width="600"]
ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের স্টেজে মিশরের মমি।[/caption]
তবে তুতেনখামেনের মমির অভিশাপ সংক্রান্ত গুজবটি ছড়িয়েছিল কিছু সংবাদপত্র। তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পরে বিশ্বের নামিদামি মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সমাধিটির ওপর। ফলে সমাধিক্ষেত্রে খননের কাজে অসুবিধা হচ্ছিল। মিডিয়ার অত্যাচারে তিতিবিরক্ত লর্ড কার্নারভন বাধ্য হয়ে লন্ডনের বিখ্যাত কাগজ দ্য টাইমসের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন।
সেই চুক্তি অনুযায়ী কেবল দ্য টাইমসের সাংবাদিকরাই সমাধির ভেতরে প্রবেশ করতে পারতেন। তাই সমাধির ভেতরের খবর পাওয়ার জন্য বিশ্বের বাকি কাগজদের নির্ভর করতে হত দ্য টাইমসের ওপর। ফলে তারা তুতেনখামেনের সমাধি নিয়ে হাতে গরম খবর পাঠকদের দিতে পারতো না। তাই তারা অবাস্তব ও অনুমানভিত্তিক খবর ছাপাতে শুরু করেছিল। কয়েকমাস পর এই কাগজগুলির কাছেই সোনার খনি হয়ে দেখা দিয়েছিল লর্ড কার্নারভনের অসুস্থতা ও অকালমৃত্যু। দ্রুত ঘুরে গিয়েছিল খবরের অভিমুখ। শুরু হয়েছিল তুতেনখামেনের অভিশাপ নিয়ে পাতা জোড়া খবর ছাপানো।
[caption id="attachment_278447" align="aligncenter" width="640"]
সেই সময়কার কিছু কাগজে মমির অভিশাপ সংক্রান্ত খবর।[/caption]
ইন্ধন যুগিয়েছিলেন কিছু বিখ্যাত মানুষ
লর্ড কার্নারভনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর, তুতেনখামেনের অভিশাপের কথা প্রথম তুলেছিলেন লেখিকা মেরি কোরেলি। তিনি বলেছিলেন, শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে থাকা ফারাওয়ের ঘুম ভাঙানো এবং সমাধি থেকে জিনিসপত্র বের করে আনাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ তাঁর কাছে থাকা একটি প্রাচীন আরবি পুঁথিতে তিনি পড়েছিলেন মমির অভিশাপের কথা। লেখিকা মেরি কোরেলি বলেছিলেন, "আমার কেবল একটাই প্রশ্ন, শুধুমাত্র মশার কামড়ে মারা গেলেন লর্ড কার্নারভন?" জনমানসে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল এই প্রশ্নটি। কেবলমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার নামী কাগজগুলি কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিল, মমির অভিশাপ তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।
সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে, শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল স্বয়ং বলেছিলেন, লর্ড কার্নারভনের মৃত্যুর কারণ হতে পারে তুতেনখামেনের অভিশাপ। মমির অভিশাপে লর্ড কার্নারভনের মৃত্যু হয়েছে, এই সংবাদ পেয়ে উপহার হিসেবে পাওয়া মমিকে প্রাসাদ থেকে পত্রপাঠ বিদেয় করেছিলেন ইতালির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা মু্সোলিনি।
[caption id="attachment_2356054" align="aligncenter" width="600"]
মমির অভিশাপ গ্রাস করতে পারেনি কার্টারকে[/caption]
অভিশাপ! সমাধি আবিষ্কারের পঞ্চাশ বছর পর!
তুতেনখামেনের অভিশাপের তত্ত্ব আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল সমাধি আবিষ্কারের পঞ্চাশ বছর পর। ১৯৭২ সালে একটি প্রদর্শনীর জন্য লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তুতেনখামেনের সমাধিতে পাওয়া বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী। তুতেনখামেনের অভিশাপ নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পুরাকীর্তি বিভাগের প্রধান ডঃ গামাল মেহরেজকে। উত্তর দিতে গিয়ে হেসে ফেলেছিলেন ডঃ গামাল মেহরেজ। তিনি বলেছিলেন মমির অভিশাপ তত্ত্বটি মানেন না। সব মৃত্যুই কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে এবং সেগুলিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখাই ভাল। পরের দিন ইংল্যান্ডের রয়েল এয়ার ফোর্সের বিমান তুতেনখামেনের সমাধিতে পাওয়া সামগ্রীগুলি নিয়ে লন্ডনের মাটি ছুঁয়েছিল। সিল করা বাক্সগুলি মিলিয়ে নিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন ডঃ গামাল মেহরেজ। পরের দিন সকালে তাঁকে মৃত অবস্থায় বিছানায় পাওয়া গিয়েছিল।
তুতেনখামেনের অভিশাপের কথা বিশ্বাস করতেন না সমাধির আবিষ্কারক হাওয়ার্ড কার্টারও। তাই তুতেনখামেনের সমাধির ভেতর তিনি নির্ভয়ে নিজের কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন ১৯৩২ সাল পর্যন্ত। কাজের শেষে ফিরে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। ১৯৩৯ সালে ৬৪ বছর বয়েসে ইংল্যান্ডেই প্রয়াত হয়েছিলেন হাওয়ার্ড কার্টার, হজকিনস রোগে আক্রান্ত হয়ে। এখানেই মনে প্রশ্ন জাগে, যদি তাঁর ঘুম ভাঙানোর জন্য অভিশাপই দিয়েছিলেন তুতেনখামেন, সেই অভিশাপ হাওয়ার্ড কার্টারের গায়ে লাগল না কেন! উত্তর হতে পারে একটাই। হাওয়ার্ড কার্টারই সেই মানুষ, যিনি তাঁর অবিশ্বাস্য অনুমান ক্ষমতা দিয়ে তুতেনখামেনের সমাধি আবিষ্কার করে, তখনও পর্যন্ত অজানা ও অচেনা কিশোর ফারাওকে বিশ্ববিখ্যাত করে দিয়েছিলেন। তাই বুঝি হাওয়ার্ড কার্টারকে ক্ষমা করে দিয়েছিল তুতেনখামেনের আত্মা।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'