
শেষ আপডেট: 26 November 2019 15:26
রূপকুণ্ড[/caption]
বেদিনি কুণ্ড, এর জলই নাকি পান করেছিলেন নন্দাদেবী[/caption]
গ্রীষ্মকালে রূপকুণ্ড[/caption]
বিস্মিত ও কিছুটা আতঙ্কিত মাধওয়াল সাহেব বিশদভাবে সব লিখে পাঠিয়েছিলেন তাঁর উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে। মাধওয়ালের পাঠানো রিপোর্ট পড়ে ব্রিটিশরা অনুমান করেছিল ওই কঙ্কালগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের হতে পারে। জাপানি সেনারা সম্ভবত জুনারগলি গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। প্রবল তুষারঝড়ের কবলে পড়ে প্রাণ হারায়।
পরীক্ষা থেকে জানা যায় কঙ্কালগুলি দুটি ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষদের। বড় কঙ্কালগুলি দীর্ঘদেহী ইরানীয় মানুষদের এবং ছোট কঙ্কালগুলি সম্ভবত স্থানীয় মানুষদের। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, কেন ইরানিরা ওই পথ দিয়ে ভারতে আসবেন? স্থানীয়রা কি তাঁদের আসতে সাহায্য করেছিলেন? ইরানিদের ভারতে আসার কারণই বা কী ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
[caption id="attachment_162486" align="aligncenter" width="700"]
এসব কাদের দেহাবশেষ?[/caption]
তবে আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ওয়াল কুমায়ুনের বিভিন্ন লোকগাথার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল রহস্যময় রূপকুণ্ড। রূপকুণ্ডের বরফে জমে যাওয়া মানুষগুলি কারা, তা বলে দিয়েছিল চামৌলির লোকগান ও লোকগাথা। তবে বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে লোকগাথার দেওয়া তথ্যের কোনও মিল ছিল না। থাকার কথাও নয়। কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা সেগুলিই বিশ্বাস করেছিল।
লোকগাথা, লোকগানগুলি পরবর্তীকালে বিভিন্ন এলাকায় পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হলেও সব কাহিনির অন্যতম চরিত্র হয়ে আছেন কনৌজ রাজ যশদয়াল সিং।
পাথরনাচুনির সেই পাথরগুলি[/caption]
নন্দাদেবীর রুদ্ররূপে ভীত রাজা ও রানি ক্ষমা চেয়েছিলেন দেবীর কাছে। শান্ত হয়েছিলেন নন্দাদেবী। ক্ষমা করেছিলেন রাজাকে। প্রতি ১২ বছরে একবার তীর্থ যাত্রা করার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন রাজাকে। রাজ্যে ফিরে এসেছিলেন কনৌজ রাজ যশদয়াল সিং, তীর্থযাত্রা অসমাপ্ত রেখে।
কিন্তু কয়েক বছর পর নন্দাদেবীর আদেশকে অমান্য করে রাজা আবার গিয়েছিলেন হোমকুণ্ডের পথে। সে বছরও সঙ্গে ছিলেন রানি ও কয়েকজন নর্তকী। রূপকুণ্ড পেরিয়ে দলটি যখন জুনারগলির ওপরে, ঠিক সেই মুহূর্তে নন্দাদেবীর অভিশাপে শুরু হয় প্রবল শিলাবৃষ্টি। একই সঙ্গে ফণা তোলে প্রবল তুষারঝড়।
ঝড়ের ঝাপটায় অসহায়ভাবে তীর্থযাত্রীরা একে একে জুনারগলি থেকে রূপকুণ্ডের বুকে আছড়ে পড়েছিলেন। জীবন্ত অবস্থায় তুষার সমাধি ঘটেছিল রাজা রানি সহ সম্পূর্ণ দলটির। গাড়ওয়াল, কুমায়ুনের লোকবিশ্বাস অনুসারে, রূপকুণ্ডের কঙ্কালগুলি কনৌজ রাজের দলটির সদস্য সদস্যাদের।
[caption id="attachment_162492" align="aligncenter" width="662"]
জুনারগলি কল থেকে নীচে দেখা যাচ্ছে রূপকুণ্ড[/caption]
নন্দা জাত চলেছে[/caption]
এই তত্ত্বটিও খারিজ করলেন অনেকে। তাঁরা বললেন, নন্দা জাত-এ মহিলাদের যাওয়া নিষেধ। কিন্তু রূপকুণ্ডে মিলেছে বেশ কিছু মহিলার কঙ্কাল। তাছাড়া কুণ্ডের জলে তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে যা যা থাকার কথা সে সব কিছুই পাওয়া যায়নি।
● কেউ বলেছেন এঁরা হতে পারেন ব্যবসায়ীর দল। যাঁরা তিব্বত থেকে পণ্য নিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তখনকার দিনে পশুর পিঠে করে ভিনদেশ থেকে পাহাড়ি গিরিপথ ধরে বিক্রয়যোগ্য পণ্য আসত ভারতে। হ্রদের জলে থাকা মানুষের কঙ্কালের সঙ্গে কোনও জন্তুর কঙ্কাল খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই এই কঙ্কালগুলি ভিনদেশী ব্যবসায়ীদেরও নয়। তাছাড়া এই পথে ব্যবসায়ীদের আসা যাওয়া ছিল বলে কোনও রেকর্ড নেই।
[caption id="attachment_162498" align="aligncenter" width="4000"]
সুদূর অতীতে এভাবেই পশুর পিঠে পণ্য আসত ভারতে[/caption]
● কারও মতে ওই অঞ্চলে 'কিদা জড়ি' নামে ওষুধের ক্ষমতা যুক্ত মাশরুম খুঁজতে গিয়ে শিলাবৃষ্টির কবলে পড়েছিলেন কোনও দল। যুক্তিবাদীরা বলছেন, কিন্তু প্রায় তিনশ মানুষ একসঙ্গে মাশরুম খুঁজতে যাবেন?
● কেউ বলেছেন হত্যভাগ্য মানুষগুলি হয়তো নরবলীর মতো ধর্মীয় কোনও ভয়ঙ্কর উৎসর্গ প্রথার শিকার। যুক্তিবাদীরা বলছেন তা হলেও সেটাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকার কথা ছিল।
●কেউ বলেছেন কঙ্কালগুলি ফিরোজ শাহ তুঘলকের হারিয়ে যাওয়া সৈন্যদলের। কিন্তু এই যুক্তির সপক্ষে মেলেনি কোনও প্রমাণ।
● কেউ বলেন কঙ্কালগুলি ডোগরাদের সেনাধক্ষ্য জোরাওয়ার সিং ও তাঁর সৈন্যদলের। ১৮৪১ সালের মে মাস থেকে ১৮৪২ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত চলেছিল ডোগরা- তিব্বতিদের মধ্যে যুদ্ধ। জোরাওয়ার সিং-এর তত্ত্ব খারিজ হয়ে গিয়েছিল, কারণ ইতিহাস বলছে তিব্বতিদের সঙ্গে মিসসারের যুদ্ধে তিনি প্রাণ হারান। এই পথে তাঁর আসার কোনও সম্ভবনাই ছিল না।।
বিজ্ঞানীরা করেছেন বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা[/caption]
বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, ভয়ঙ্কর শিলাবৃষ্টির কারণে মানুষগুলির মৃত্যু হয়েছে। শিলাগুলির আকৃতি ছিল ক্রিকেট বলের মতোই। কিন্তু এই দলের বিজ্ঞানীরাও বলতে পারেননি মানুষগুলি কারা? ওই উচ্চতায় কী জন্য এসেছিলেন?
●অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির Radiocarbon Accelerator Unit কঙ্কালগুলির রেডিও কার্বন ডেটিং করে জানতে পেরেছিল সেগুলি ৮২০ থেকে ৮৮০ বছর পুরোনো।
●কোনও বিজ্ঞানী দল বলেছেন কিছু কঙ্কাল ১২০০ বছরের পুরোনো। কিছু কঙ্কালের বয়েস মাত্র ২০০ বছর। তাই এটা প্রমাণিত, দুটি দল প্রায় ১০০০ বছরের ব্যবধানে রূপকুণ্ডের পথে একই রকম দুর্ঘটনায় পড়েছিল ।
● ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে, ভারতীয়, আমেরিকান ও ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের নিয়ে গড়া একটি আন্তর্জাতিক দল ৩৮ টি কঙ্কালের Biomolecular analyses বা Genome-wide DNA study রিপোর্টর Nature Communications জার্নালে প্রকাশ করেন। উঠে আসে চমকে দেওয়ার মত তথ্য।
[caption id="attachment_162505" align="alignnone" width="800"]
কঙ্কালগুলির জিনোম স্টাডিও করা হয়েছে[/caption]
কঙ্কালগুলির জিনোম স্টাডি থেকে জানা গেছে, ১২০০ বছরের পুরোনো কঙ্কালগুলির বেশিরভাগই দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের এবং ২০০ বছরের পুরোনো কঙ্কালগুলির সঙ্গে মিল আছে পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের মানুষদের।
পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের দেশগুলি হল সাইপ্রাস, গ্রীস, লেবানন, সিরিয়া, ইজরায়েল,প্যালেস্টাইন,তুরস্ক, মিশর, লিবিয়া ও জর্ডন। কিন্তু এখন উঠছে প্রশ্ন অত দূর থেকে মানুষগুলি ভারতে আসতে বা যেতে এই কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন কেন?
সব শেষে এটা পরিষ্কার, এত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরেও রূপকুণ্ডের কঙ্কাল রহস্যের সমাধান করা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে বিজ্ঞানীদের নেওয়া সিদ্ধান্তের মধ্যে দেখা গেছে বিস্তর ফারাক। আজও জানা যায়নি ওরা কারা। আজও সেটা অনুমান হয়েই রয়ে গেছে।
কঙ্কালগুলিকে ঘিরে থাকা সব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু জানে রূপকুণ্ড ও জুনারগুলি কল। কিন্তু তারা ভাষাহীন। তাই কয়েকশ হতভাগ্যের মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেও চুপ করে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তাই রূপকুণ্ড রহস্য আজও অমীমাংসিত। তাই কঙ্কালগুলিকে ঘিরে থাকা ঘন কুয়াশা সামান্য ফিকে হলেও, একেবারে সরানো হয়ত আর কোনওদিনই সম্ভব হবে না।