
শেষ আপডেট: 9 December 2020 07:41
দলীপ সিং রানার বয়েস যখন পনেরো[/caption]
সমবয়সি সব কিশোরের থেকে দলীপ আলাদা
গ্রামের সমবয়সি ছেলেরা তাকে খেলায় নিত না। গ্রামের মেয়েরা তাকে দেখে হাসত। কারণ, ১৯৭২ সালে জন্মানো দলীপের উচ্চতা কিশোর বয়েসেই ছ'ফুট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে অনিয়ন্ত্রিত হারে নির্গত হতে শুরু করেছিল 'বৃদ্ধি সহায়ক হরমোন'। চিকিৎসকরা বলেছিলেন রোগটির নাম 'জায়গান্টিজম'। খুবই ব্যয়সাপেক্ষ এ রোগের চিকিৎসা। দলীপের চিকিৎসা করাতে পারেনি তার পরিবার। ফলে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছিল দলীপের শরীর। সঙ্গে যোগ হয়েছিল অস্বাভাবিক খিদে। এক এক বারে ত্রিশটা পর্যন্ত রুটি খেয়েও তার খিদে মিটত না। কিন্তু বাবা মা ও সাত ভাই বোনের সংসারে দলীপকে ভরপেট খাওয়ানো সম্ভব ছিল না।
[caption id="attachment_284528" align="aligncenter" width="800"]
খিদে মেটাতে চলে গিয়েছিলেন সিমলা[/caption]
বেশ কয়েক বছর শ্রমিকের কাজ করার পর দলীপ শুনেছিলেন, শহরে গিয়ে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করলে নাকি বেশি রোজগার হবে। ধিরাইনা ছেড়ে শৈলশহর সিমলা চলে গিয়েছিলেন সদ্য যুবক দলীপ। একটু বেশি পয়সা পেলে অন্তত ভরপেট খাওয়া যাবে, এই আশা নিয়ে। উচ্চতা তখন প্রায় সাত ফুট ও ওজন একশো কুড়ি কেজিরও বেশি। দৈত্যাকৃতি চেহারার সুবাদেই সিমলার এক ফার্মহাউসে নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি পেয়েছিলেন দলীপ সিং রানা। মাস মাইনের হাজার টাকার পুরোটাই খেয়ে খরচ করে ফেলতেন। তবুও পেট ভরত না। তাঁর মাপের খাট না মেলায় শুতে হত মেঝেতে। এমনকি শীতের রাতেও। মুখচোরা যুবকটির চোখের জলে কম্বল ভিজে যেত। নিজেকে নিজেই অভিশাপ দিতেন।
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও দলীপের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে 'গ্রোথ' হরমোনের ক্ষরণ হয়েই চলেছিল। দেখা দিয়েছিল আরও জটিল রোগ 'অ্যাক্রোমেগালি'। উচ্চতা আর তেমন না বাড়লেও, অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করেছিল দলীপ সিংয়ের চোয়াল, নাক, কান, ঠোঁট, হাতের আঙুল, পায়ের পাতা। ভয়াবহ চেহারা হয়ে গিয়েছিল দলীপ সিংয়ের। লোকে তাঁকে দেখলে ভয় পেত। বাচ্চারা কাছে আসতে চাইত না। রাতের অন্ধকারে রাস্তায় বের হতে পারতেন না দলীপ, পাছে পর্যটকরা ভয় পেয়ে যান। ক্রমশ জড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল দলীপের কথা।
দুঃখের জীবনে মোড় ঘুরিয়েছিল ১৯৯৩ সাল
পাঞ্জাব পুলিশের ডিজিপি মেহল সিং ভুল্লার ১৯৯৩ সালে সপরিবারে সিমলা বেড়াতে গিয়েছিলেন। সিমলার রাস্তায় মর্নিংওয়াক করার সময় হঠাৎই তাঁর নজর পড়েছিল দৈত্যাকৃতি যুবকটির ওপর। দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন ডিজিপি সাহেব। দলীপ সিংয়ের উচ্চতা ও শারীরিক গঠন দেখে মনে হয়েছিল, ঠিক মতো ট্রেনিং দিলে সর্বভারতীয় স্তরে এমনকি আন্তর্জাতিক স্তরেও 'বডি বিল্ডিং' প্রতিযোগিতায় পদক ছিনিয়ে আনতে পারেন এই যুবকটি। ডিজিপি সাহেব এগিয়ে গিয়েছিলেন দলীপ সিংয়ের দিকে। কারণ স্পোর্টস কোটায় পাঞ্জাব পুলিশে চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর।
দলীপ সিংয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে ডিজিপি সাহেব জেনে নিয়েছিলেন তাঁর নাড়িনক্ষত্র। তারপর সরাসরি দলীপকে পাঞ্জাব পুলিশের চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁকে অবাক করে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন দলীপ সিং। সিমলা থেকে বাসে মাত্র সাড়ে ছ'ঘণ্টা লাগে গ্রামের বাড়ি ফিরতে। এর থেকে দূরে তিনি যাবেন না। কর্মজীবনে কাউকে এভাবে সরকারি চাকরি ফিরিয়ে দিতে দেখেননি ডিজিপি সাহেব। স্পোর্টস কোটায় একটা চাকরি পাওয়ার জন্য তাঁর অফিসের বারান্দায় ভোর থেকে লাইন পড়ে যায়।
[caption id="attachment_284536" align="aligncenter" width="516"]
ডিজিপি মেহল সিং ভুল্লার[/caption]
নাছোড়বান্দা ছিলেন ডিজিপি সাহেবও। সরাসরি গিয়েছিলেন দলীপ সিং রানার গ্রামের বাড়িতে। প্রস্তাব ও মাইনে শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন দলীপের বাবা ও মা। সিমলা থেকে গ্রামের বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছিল দলীপকে। কিন্তু ঘরকুনো দলীপ তখনও অনড়। শেষে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন ডিজিপি সাহেব। দলীপ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর ভাইকেও চাকরি দেবে পাঞ্জাব পুলিশ।
১৯৯৩ সালেই পাঞ্জাব পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন দলীপ সিং রানা ও তাঁর ভাই। হিমাচল ছেড়ে তাঁরা চলে এসেছিলেন পাঞ্জাবের জলন্ধরে। দলীপ সিংকে ট্রেনিং দিতে শুরু করেছিলেন ভারত বিখ্যাত বডি বিল্ডাররা। কয়েক বছরের মধ্যেই একের পর এক 'বডি বিল্ডিং' প্রতিযোগিতায় জিততে শুরু করেছিলেন দলীপ সিং। ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে জিতেছিলেন জাতীয় খেতাবও। জহুরী ডিজিপি সাহেবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিল পাঞ্জাবের সর্বস্তরের মানুষ।
[caption id="attachment_284531" align="aligncenter" width="1400"]
বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় দলীপ সিং[/caption]
জীবনের দ্বিতীয় মোড়টি এসেছিল ২০০০ সালে
আন্তর্জাতিক 'বল্ডি বল্ডিং' প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে দলীপ গিয়েছিলেন আমেরিকা। সেখানে তাঁর ভয়ঙ্কর চেহারা দেখে কার্যত স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল আমেরিকার 'অল প্রো রেসলিং' প্রতিযোগিতার সংগঠকরা। তাঁরা 'বল্ডি বিল্ডিং' প্রতিযোগিতার আসরে এরকমই একজন অস্বাভাবিক চেহারার মানুষকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। দেরি না করে তাঁরা বিপুল অর্থের প্রস্তাব দিয়েছিলেন পাঞ্জাব পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর দলীপ সিংকে। দলীপ তাঁদের বলেছিলেন তিনি 'বডি বিল্ডার', তাই কুস্তির বিন্দুবিসর্গ জানেন না। 'অল প্রো রেসলিং' প্রতিযোগিতার সংগঠকরা দলীপকে বলেছিলেন, সে চিন্তা তাঁদের।
দলীপ সংগঠকদের বলেছিলেন, যদি পাঞ্জাব সরকার তাঁকে ছুটি দেয় তাহলে তিনি চুক্তিপত্রে সই করবেন। দেশের সম্মানের কথা ভেবেই দলীপ সিং রানাকে ছুটি দিয়েছিল পাঞ্জাব পুলিশ। 'বডি বিল্ডার' দলীপ সিং হয়ে গিয়েছিলেন পেশাদার কুস্তিগির। তবে কুস্তির প্যাঁচ-পয়জার বিশেষ কিছু শিখতে হয়নি। 'অল প্রো রেসলিং' প্রতিযোগিতার সংগঠকেরা দলীপকে বলেছিলেন, প্রতিযোগিতার প্রত্যেকটি লড়াই সিনেমার চিত্রনাট্যের ছকে বাঁধা থাকবে। ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত থাকবে। সেটা জানবেন সংগঠকরা, জানবেন কুস্তিগিরেরাও, জানবেন না শুধু দর্শক।
[caption id="attachment_284539" align="alignnone" width="801"]
'অল প্রো রেসলিং' চ্যাম্পিয়নশিপের রিংয়ে 'জায়ান্ট সিং' ওরফে দলীপ সিং রানা।[/caption]
'অল প্রো রেসলিং' চ্যাম্পিয়নশিপের রিংয়ে প্রবেশ করেছিলেন 'জায়ান্ট সিং' ওরফে দলীপ সিং রানা। প্রথম আবির্ভাবেই জিতে নিয়েছিলেন দর্শকদের মন। চুক্তি শেষ হওয়ার পর ২০০১ সালে যোগ দিয়েছিলেন সান ফ্রান্সিস্কোর WCW বা 'ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ রেসলিং'-এ। আট মাস ধরে রিংয়ে তুফান তোলার পর চলে গিয়েছিলেন জাপানে। 'নিউ জাপান প্রো-রেসলিং' প্রতিযোগিতায় লড়বার জন্য।
জীবনের তৃতীয় এবং শ্রেষ্ঠ মোড় এসেছিল ২০০৬ সালে
দলীপের সঙ্গে বিশাল অঙ্কের চুক্তি করেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় রেসলিং শো 'ওয়ার্ল্ড রেসলিং এন্টারটেইনমেন্ট'-এর (WWE) সংগঠকেরা। কিন্তু জায়ান্ট সিং নামটা তাঁদের পছন্দ ছিল না। নতুন নামে তাঁরা দলীপ সিংকে রিংয়ে আনতে চাইছিলেন। তাই তাঁরা খুঁজছিলেন দলীপ সিংয়ের চেহারার সঙ্গে যুতসই একটা নাম।
কুস্তির রিংয়ে ভয়ঙ্কর আগ্রাসী দলীপ কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে খুবই ধার্মিক মানুষ। রোজ সকাল সন্ধ্যায় ধ্যান করতেন। ঘরে থাকত মা কালীর ছবি। কালীভক্ত দলীপের ঘরে মা কালীর ছবি দেখার পর, মায়ের ভয়ঙ্কর রূপটি সংগঠকদের মনে ধরেছিল। তাই ঠিক হয়েছিল দলীপ সিং রানা WWE-এর রিংয়ে নামবেন 'দ্য গ্রেট কালী' নাম নিয়ে। আমেরিকানদের উচ্চারণে 'দ্য গ্রেট কালী' পরে হয়ে গিয়েছিল 'দ্য গ্রেট খালি'।
[caption id="attachment_284542" align="alignnone" width="1440"]
WWE-এর রিংয়ে এলেন দলীপ সিং ওরফে 'দ্য গ্রেট খালি'। সামনে আন্ডারটেকার।[/caption]
২০০৬ সালে WWE-এর আঙিনায় প্রবেশ করেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন 'দ্য গ্রেট কালী'। হারিয়ে দিয়েছিলেন অপরাজেয় আন্ডারটেকারকে। হারাতে শুরু করেছিলেন একের পর এক বিখ্যাত কুস্তিগিরকে। পরাজিতদের তালিকায় ছিলেন ট্রিপল-এইচ, বিগ-শো, শন মাইকেল, জন সিনা সহ প্রায় সব বিখ্যাত কুস্তিগির। ডেভ ব্যাতিস্তাকে ২০০৭ সালে হারিয়ে জিতেছিলেন WWE -এর হেভিওয়েট চাম্পিয়নের খেতাব। বাকিটা ইতিহাস। আজ পুরো বিশ্ব চেনে গ্রেট খালিকে।
কুস্তি থেকে অবসর নিয়ে ফিরে এসেছিলেন দেশে
২০১৫ সালে দেশে ফিরে পাঞ্জাবের কাঙ্গনিওয়াল গ্রামে কুস্তির একটি অত্যাধুনিক স্কুল বানিয়েছেন দলীপ সিং ওরফে গ্রেট খালি। অপরাধ ও ড্রাগের নেশার মেতে থাকা নবীন প্রজন্মকে আবার টেনে এনেছেন কুস্তির আখড়ায়। সে কাজেও সফল দলীপ সিং রানা। তাঁর হাতে তৈরি আট কুস্তিগীর আজ আমেরিকার বিভিন্ন বিখ্যাত কুস্তি প্রতিযোগতায় লড়ছেন। আজ খালির স্কুলে নাম লিখিয়েছে প্রায় ২০০ কিশোর, কিশোরী যুবক যুবতী। তাঁদের প্রত্যেকের স্বপ্ন 'গ্রেট খালি' হওয়া।
[caption id="attachment_284550" align="alignnone" width="670"]
ছাত্রদের সঙ্গে গ্রেট খালি[/caption]
আমেরিকার টেক্সাসে প্রাসাদোপম বাড়ি থাকলেও, স্ত্রী হরমিন্দর কউর ও মেয়ে আলভিনকে নিয়ে দলীপ বছরের বেশিরভাগ সময় কাটান ভারতেই। ভারতে থাকলে মাঝে মাঝে চলে যান হিমাচলে, নিজের গ্রামে। আনমনে ঘুরে বেড়ান ঝর্নার ধারে। সিমলার ওপর দিয়ে ফেরার সময়, আশি লাখ টাকা দামের রেঞ্জ রোভারের জানলা দিয়ে দলীপ আজও ফিরে ফিরে দেখেন সেই কালো দরজাটিকে। যার সামনে তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দলীপকে একটু দেখার জন্য সিমলার রাস্তা আজ জনজোয়ারে স্তব্ধ হয়ে যায়। সাতফুট এক ইঞ্চি লম্বা ও ১৯০ কেজি ওজনের প্রাক্তন নিরাপত্তারক্ষীকে দেখবার জন্য রাস্তার ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তাঁর প্রাক্তন মালিকরাও।
