
শেষ আপডেট: 16 September 2022 15:02
দোগান নিউজ এজেন্সির উনত্রিশ বছরের চিত্র সাংবাদিক নিলুফার ডেমির, প্রতিদিনের মত এসে পৌঁছেছিলেন তুরস্কের বন্দর শহর বোদরামের এক নির্জন সৈকতে। প্রভাতী সূর্যের নরম আলো গায়ে মেখে সোনালি সৈকতে আছড়ে পড়ছিল ভূমধ্য সাগরের সফেন ঢেউ। সৈকত ধরে হাঁটতে হাটতে নিলুফার চলে এসেছিলেন পশ্চিম প্রান্তে। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি আটকে গিয়েছিল সাগরের কিনারায় থাকা একটি লাল বস্তুর ওপর। কৌতুহলের বশে সে দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন নিলুফার।

কিছুটা কাছে যাওয়ার পর, নিলুফারের পায়ে যেন বেড়ি পরিয়ে দিয়েছিল সৈকতের বালি। শিড়দাঁড়া বেয়ে নামতে শুরু করেছিল আতঙ্কের হিমেল স্রোত। বালির ভেতর মুখ গুঁজে, উপুড় হয়ে শুয়েছিল নিথর এক শিশু। পরনে লাল টি শার্ট ও নীল প্যান্ট। পায়ে স্নিকার্স। নিস্ফল আক্রোশে চিৎকার করে উঠেছিলেন নিলুফার। ছবি তুলতে শুরু করেছিলেন। ছবির মাধ্যমে নিথর শিশুটির বোবা কান্না পৃথিবীর কোণে কোণে পৌঁছে দেবেন। খুলে দেবেন সভ্যতার মুখোশ। দুপুরের মধ্যেই সারা বিশ্বকে কাঁদিয়ে দিয়েছিল নিলুফারের তোলা ছবি। বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিল তিন বছরের এক কুর্দ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু। যার নাম ছিল আয়লান কুর্দি (Aylan Kurdi)।

সিরিয়ার রাজধানী দামাস্কাস থেকে সাড়ে আট কিলোমিটার দূরে আছে মাউন্ট কাসিওন (৩৮০০ ফুট)। পাহাড়ের পাদদেশে আছে মফঃস্বল শহর 'রুকিনেদ্দিন। শহরের বস্তি এলাকায় বাস করত, সিরিয়ায় প্রায় একঘরে হয়ে থাকা কুর্দ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। এরকমই এক বস্তিতে মা ও পাঁচ ভাইবোনের পরিবার নিয়ে থাকতেন কুর্দ যুবক আবদুল্লা কুর্দি। রুকিনেদ্দিনে তিনটি ছোট সেলুন চালাত কুর্দি পরিবার। আবদুল্লাদের আদি বাড়ি ছিল, উত্তর সিরিয়ার তুরস্ক সীমান্ত ঘেঁষা মফঃস্বল শহর কোবানিতে। সেখানে তাঁদের ছিল জলপাই ক্ষেত। গরম কালে জলপাই চাষ করার জন্য পরিবারটি চলে যেত কোবানি।
আবদুল্লার দিদি ফতিমা, ১৯৯২ সালে কানাডা চলে গিয়েছিলেন এক ইরাকি কুর্দকে বিয়ে করে। সে বিয়ে অবশ্য টেকেনি। তবে সন্তানদের নিয়ে জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে জিতে গিয়েছিলেন ফতিমা। সেলুন খুলে ফেলেছিলেন কানাডায়। বিপদের সময় অর্থ সাহায্য করতেন, দামাস্কাসে থাকা ভাই বোনদের। কোনও এক অজানা বিপদের আশঙ্কায় বার বার ভাই বোনদের বলতেন, সিরিয়া ছেড়ে ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ার কথা।

সেনা ও পুলিশের নারকীয় অত্যাচারের প্রতিবাদে, ২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন তিউনিসিয়ার ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ বোয়াজিজি। উত্তর আফ্রিকা ও আরব জুড়ে উঠেছিল গণ-বিপ্লবের এক ভয়াবহ ঝড় 'আরব বসন্ত' ( Arab Spring)। তছনছ হয়ে গিয়েছিল তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া, মিশর, মরোক্কো,সোমালিয়া, সুদান, জর্ডন, লিবিয়া, কুয়েত, ওমান, ইরাক, ইরান ও ইয়েমেন।

আরব বসন্ত সিরিয়ায় আঘাত হেনেছিল ২০১১ সালের ২৬শে জানুয়ারি। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হয়েছিল সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী সুন্নি গেরিলাদের মধ্যে। আবদুল্লা তখন তাঁর এক দুঃসম্পর্কের বোন রিহানাকে বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন রুকিনেদ্দিনে। কোবানির পৈত্রিক ভিটেতে জন্ম নিয়েছিল আবদুল্লার বড় ছেলে গালিব।
কুর্দদের ওপর নারকীয় অত্যাচার শুরু করেছিল আসাদের কুখ্যাত সেনাবাহিনী। রাতের অন্ধকারে কুর্দ যুবক ও যুবতীদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যেত সেনারা। পরদিন সকালে যুবতীদের খুঁজে পাওয়া যেত বিবস্ত্র ও অচৈতন্য অবস্থায়। যুবকদের খুঁজেই পাওয়া যেত না। এভাবেই এক রাতে, দুই খুড়তুতো ভাইকে হারিয়ে ফেলেছিলেন আবদুল্লা। রাতের অন্ধকারে কুর্দ বস্তিগুলোর ওপর আঘাত হানতে শুরু করেছিল গেরিলা ও সেনাবাহিনীর মর্টার। কুর্দদের ঘৃণা করত সুন্নি আরব গেরিলারাও। শান্তিপ্রিয় ও উদারপন্থী সুন্নি কুর্দদের তারা বলত 'কাফের'।

এক রাতে রুকিনুদ্দিন ছেড়ে কোবানি পালিয়েছিল কুর্দি পরিবার। কারণ কোবানি শহরে কুর্দরা ছিল সংখ্যাগুরু। আবদুল্লার স্ত্রী রিহানা তখন ছিলেন সন্তানসম্ভবা। কোবানির পৈত্রিক ভিটেতে, ২০১২ সালে জন্ম নিয়েছিল আবদুল্লার ছোট ছেলে 'আয়লান'(Aylan Kurdi)। হাঁটতে শেখার পর কখনও মা রিহানা, কখনও পোষা ভেড়াটির পিছন পিছন ঘুরতে দেখা যেত আয়লানকে। ফুটবল খেলতে দেখা যেত সরু গলিতে। সবাই তাকে খুব ভালোবাসত। কারণ ময়না পাখির মত কলকল করে কথা বলত ছোট্ট মিষ্টি আয়লান।

স্ত্রী রিহানা, চার বছরের গালিব ও দুবছরের আয়লানকে কোবানিতে রেখে, রোজগারের আশায় আবদুল্লা চলে গিয়েছিলেন তুরস্কের ইস্তানবুলে। কোবানির আকাশে জমতে শুরু করেছিল আরও এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধের কালো মেঘ। সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কাল কেউটের মত ফণা তুলেছিল আবু বকর আল-বাগদাদীর নৃশংস সন্ত্রাসবাদী দল 'আইসিস' (ISIS)। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, কোবানিকে লক্ষ্য করে কামান দাগতে শুরু করেছিল সন্ত্রাসবাদী দলটি। গোলার আঘাতে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল কুর্দদের বাড়িঘর। প্রাণ হারিয়েছিলেন শত শত কুর্দ।
কোবানিকে বাঁচাতে তুমুল লড়াই শুরু করেছিল, কুর্দদের বামপন্থী গেরিলা দল 'YPG' (Yekîneyên Parastina Gel)। উত্তরে থাকা তুরস্ক সীমান্তের দিকে পালাতে শুরু করেছিলেন কোবানির কুর্দরা। বেশিরভাগই প্রাণ হারিয়েছিলেন আইসিস জঙ্গীদের হাতে। কেউ প্রাণ হারিয়েছিলেন, সীমান্ত পাহারায় থাকা তুর্কি সেনার গুলিতে। কুর্দি পরিবারের এগারো জনকে প্রকাশ্যে কোতল করেছিল 'আইসিস' জঙ্গীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আয়লানের ৬০ বছরের ঠাকুমাও।

পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে তুরস্ক সীমান্তের দিকে হেঁটে চলেছিলেন রিহানা। আকাশে পথে উড়ে আসছিল আগুনে গোলা। মাংসপিণ্ড হয়ে কয়েক'শ ফুট দূরে ছিটকে পড়ছিলেন আয়লানদের প্রতিবেশীরা। এই মর্মান্তিক পরিস্থিতেও, দাদার সঙ্গে খুনশুটি করছিল ছোট্ট আয়লান। বোমার আওয়াজকে সে আর ভয় পায় না। সে যে যুদ্ধরাতের শিশু।
দিন কয়েক পরে, তুর্কি সেনাদের নজর এড়িয়ে, তুরস্কে ঢুকে পড়েছিল কুর্দি পরিবার। তুরস্ক সীমান্তের ওপারে থাকা এক সহৃদয় কুর্দ মহিলার সাহায্যে। পৌঁছে গিয়েছিল আবদুল্লার কাছে। দশ জনের কুর্দি পরিবার ঠাঁই পেয়েছিল মাটির নিচে থাকা এক গুদাম ঘরে। দুটো ময়দার রুটি ও এক বাটি ডালের জন্য লুকিয়ে চুরিয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলেন কুর্দি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষেরা। তাঁদের খাটিয়ে নেওয়া হত খুব কম টাকায়। প্রতিবাদ করলেই দেওয়া হত ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি।
মাসের পর মাস অন্ধকার গুদামে বন্দি থাকার জন্য, আয়লান ও গালিবের শরীরে দেখা দিয়েছিল জটিল চর্মরোগ। যন্ত্রণায় সারা দিন কাঁদত দুই ভাই। মুটের কাজ করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেন আবদুল্লা। ছেলেদের গায়ে লাগিয়ে দিতেন মলম। বাবাকে পেয়ে সব যন্ত্রণা ভুলে যেত গালিব ও আয়লান।

তুরস্কের খুব কাছেই আছে, ভূমধ্য সাগরে ভাসতে থাকা গ্রিক দ্বীপ কস, চিওস, সামোস, রোডস ও লেসবস। তুরস্কে লুকিয়ে থাকা কুর্দ শরণার্থীরা প্রথমে গ্রিসের দ্বীপগুলিতে পালাবার চেষ্টা করতেন। তারপর সেখান থেকে ম্যাসিডোনিয়া, সার্বিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে ঢোকার চেষ্টা চালাতেন। কেউ সফল হতেন। কেউ ধরা পড়তেন তুরস্ক বা গ্রিক নৌসেনার হাতে। কেউ জীবন খুঁজতে গিয়ে পৌঁছে যেতেন মৃত্যুর দুয়ারে। ভূমধ্যসাগরের ঢেউ তাঁদের নিথর দেহ পৌঁছে দিত বিভিন্ন সৈকতে।
কানাডা থেকে আয়লানের পিসী ফতিমা ফোন করে আবদুল্লাকে বলতেন, "তুরস্কে ক্রীতদাস হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা ভালো।" ফতিমার কথা বেদবাক্যের মত মানা হত কুর্দি পরিবারে। তাই আয়লানের কাকা মহম্মদ ও খুড়তুতো দাদা ইয়াসের, ২০১৫ সালের জুন মাসে, তাঁদের পরিবার নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন গ্রিসে। বিপদসঙ্কুল জলপথ পেরিয়ে।

গ্রিসে পালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আবদুল্লাও। রিহানার গয়নার বিনিময়ে আবদুল্লার পরিবারকে গ্রিক দ্বীপ কসে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল তুরস্কের মানব পাচারকারীরা। ৩১ অগাস্ট রাতে, জানলাহীন এক পিক আপ ভ্যান তুলে নিয়েছিল আবদুল্লা কুর্দির পরিবারকে। ভ্যানের ভেতরের দমবন্ধ করা পরিবেশে কাঁদতে শুরু করেছিল আয়লান। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েও পড়েছিল একসময়।
পরদিন (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে, পাচারকারীদের গাড়ি আয়লানদের পৌঁছে দিয়েছিল, বোদরাম উপদ্বীপের পশ্চিম থাকা আকিয়ারলা এলাকায়। কুর্দি পরিবারকে এক দুর্ভেদ্য অরণ্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল পাচারকারীরা। বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আনন্দে ছোট্ট আয়লান নির্ভয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল অরণ্যের এদিক ওদিক। প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করছিল দাদা গালিবের সঙ্গে। চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছিল আবদুল্লা ও রিহানার মুখে। একসময় কুর্দি পরিবারকে ঘিরে ফেলেছিল ঘন অরণ্যের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার।
প্লাস্টিকের চাদরে বসে রাত জাগছিলেন আবদুল্লা ও রিহানা। মোবাইলের টর্চ জ্বালাতে বারণ করেছিল পাচারকারীরা।মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়্রেছিল আয়লান। বাবার কোলে গালিব। পাচারকারীরা ফিরে এসেছিল রাত একটা নাগাদ। তাদের পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করেছিলেন আবদুল্লা ও রিহানা। আবদুল্লার কোলে গালিব ও রিহানার কোলে ঘুমন্ত আয়লান। দূর থেকে ভেসে আসছিল ঢেউ ভাঙার আওয়াজ। ঘণ্টা খানেক হেঁটে দলটি পৌঁছে গিয়েছিল এক নির্জন সৈকতে। আগে থেকেই সেখানে জড়ো হয়েছিলেন বেশ কিছু শরণার্থী। রাতের ভূমধ্যসাগরের কাজল কালো ঢেউয়ের তালে তালে নাচছিল নোঙর করা দুটি রবারের ভেলা।

টর্চ জ্বালানো বারণ, তাই অন্ধকারেই ভেলায় উঠছিলেন শরণার্থীরা। ভেলাগুলিতে ইঞ্জিন ছিল না। শরণার্থীদেরই দাঁড় টেনে পৌঁছাতে হবে ২৪ কিলোমিটার দূরে থাকা কস দ্বীপে। ছ'জনের ভেলায় প্রায় দ্বিগুণ শরণার্থীকে তুলে দিয়েছিল পাচারকারীরা। দুটি ভেলায় তেইশ জনকে উঠিয়ে, গোপন ডেরায় ফিরে গিয়েছিল তারা। তীরে থেকে গিয়েছিল পাচারকারীদের নেতা। কানে মোবাইল। তার কাছ থেকে সংকেত আসার পর, দাঁড় টানা শুরু করবেন আবদুল্লারা।
রাত দ্রুত এগিয়ে চলেছিল ভোরের দিকে। বাড়তে শুরু করেছিল হাওয়ার গতিবেগ। কনকনে ঠাণ্ডা জলের ছিটে মুখে লাগতেই কেঁদে উঠেছিল মায়ের কোলে বসা আয়লান। দাঁড়ে বসা আবদুল্লার জামা খামচে ধরে আয়লান বলেছিল," ভয় করছে, বাবা আমায় কোলে নাও।" ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করেছিল গালিবও। যাত্রা পণ্ড হওয়ার আশঙ্কায় আবদুল্লা ও রিহানাকে গালি দিতে শুরু করেছিলেন ভেলায় থাকা অন্য শরণার্থীরা। আবদুল্লা ছেলেদের বলেছিলেন "ভয় পেয়ো না, এই তো আমি তোমাদের কাছেই আছি।"
ভোর তখন প্রায় চারটে। শরণার্থীদের কানে এসেছিল পাচারকারীদের নেতার তীক্ষ্ণ শিসের আওয়াজ। সংকেত পেয়ে ভেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন আবদুল্লা। ভূমধ্য সাগরের বুকে 'ছপ' 'ছপ' আওয়াজ তুলেছিল আবদুল্লাদের ভেলার চারটি দাঁড়। দূরে নক্ষত্রের মত চক চক করছিল কস দ্বীপের রাত জাগা বাতিঘর। সে দিকেই এগিয়ে চলেছিল আয়লানদের ভেলা। মিনিট দশেক ভাসার পরেই একদিকে হেলতে শুরু করেছিল ভেলাটি। চিৎকার করে উঠেছিলেন আতঙ্কিত শরণার্থীরা। পুব আকাশ আলো করে আসছিল এক নির্মম এক ভোর।

আতঙ্কিত শরণার্থীদের ধাক্কায় জলে পড়ে গিয়েছিল গালিব ও আয়লান। সন্তানদের বাঁচাতে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রিহানা। দুই মুঠোয় চেপে ধরেছিলেন গালিব ও আয়লানের গেঞ্জি। আবদুল্লা চেঁচিয়ে বলছিলেন, "ওদের মাথা জলের ওপরে ভাসিয়ে রাখো, আমি আসছি।" ঠিক সেই মুহূর্তেই উলটে গিয়েছিল ভেলা। ডুবতে থাকা রিহানাদের ওপর এসে পড়েছিলেন কয়েকজন শরণার্থী। রিহানার হাতের মুঠো থেকে খসে গিয়েছিল গালিবের গেঞ্জি। নিঃশব্দে তলিয়ে গিয়েছিল পাঁচ বছরের গালিব।
পাগলের মত চিৎকার করতে করতে রিহানা এক হাতে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন আয়লানকে। সাঁতার কেটে আবদুল্লা এগিয়ে যাচ্ছিলেন রিহানার দিকে। কানে ভেসে আসছিল আয়লানের আর্ত চিৎকার, "আমায় কোলে নাও মা, দমবন্ধ হয়ে আসছে।" নোনা জল গিলতে গিলতে আয়লান তখন এক মুঠো বাতাস খুঁজছিল। আবদুল্লা সাঁতরে আয়লান ও রিহানার কাছে পৌঁছাবার আগেই, মায়ের হাত থেকে ছোট্ট আয়লানকে ছিনিয়ে নিয়েছিল ভূমধ্য সাগরের ঢেউ। হিমশীতল কালো জলের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল, তখনও বাতাস খুঁজতে থাকা, তিন বছরের আয়লান।
নাড়ি ছেঁড়া ধন গালিব ও আয়লানের সঙ্গে তলিয়ে গিয়েছিলেন মা রিহানাও। তলিয়ে গিয়েছিলেন ভেলার আরও ন'জন শরণার্থী। বেঁচে গিয়েছিলেন একমাত্র আবদুল্লা। সাগর যা নেয়, তা ফিরিয়ে দেয়। তাই বুঝি অনুতপ্ত ভূমধ্যসাগর বোদরামের সৈকতে ফিরিয়ে দিয়েছিল আয়লান কুর্দির নিথর দেহ। নিলুফার তুলেছিলেন বিশ্বকে কাঁদিয়ে দেওয়া ছবি। সোনালি বালির বুকে উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে পড়া আয়লান প্রমাণ করে দিয়ে গিয়েছিল, মানবসভ্যতার চোখে শরণার্থী হওয়াটা এক জঘন্যতম অপরাধ।
