Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সুচিত্রা মিত্রকে না জানিয়েই দহনে তাঁর কণ্ঠ ডাব করান ঋতুপর্ণ, অপমানিত হন গায়িকা-অভিনেত্রী

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় "আমি 'দহন'-এর শ্যুটিং করতে পারলাম আর একদিন গিয়ে ডাবিং করে আসতে পারতাম না! তাতে আমার সময়ের খুব অভাব হয়ে যেত?"--  দহনে অভিনয় করা নিয়ে এমন কথাই বলতে বাধ্য হন কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র। তাঁর অনালোচিত অভিনয় প্রত

সুচিত্রা মিত্রকে না জানিয়েই দহনে তাঁর কণ্ঠ ডাব করান ঋতুপর্ণ, অপমানিত হন গায়িকা-অভিনেত্রী

শেষ আপডেট: 3 January 2021 14:05

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

"আমি 'দহন'-এর শ্যুটিং করতে পারলাম আর একদিন গিয়ে ডাবিং করে আসতে পারতাম না! তাতে আমার সময়ের খুব অভাব হয়ে যেত?"--  দহনে অভিনয় করা নিয়ে এমন কথাই বলতে বাধ্য হন কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র। তাঁর অনালোচিত অভিনয় প্রতিভা নিয়েই এই প্রতিবেদন। অনেকেই হয়তো জানেন না, চলচ্চিত্রে কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষের 'দহন'ই সুচিত্রা মিত্রর প্রথম অভিনয় নয়। অভিনয় প্রতিভা ছোট থেকেই ছিল তাঁর ভিতরে। কিন্তু সঙ্গীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে সকলে চিনলেও, অভিনেত্রী সুচিত্রা মিত্রর কথা প্রায় ব্রাত্যই রয়ে গেছে। 'যে পথ দিয়ে যেতেছিলেম, ভুলিয়ে দিল তারে, আবার কোথা চলতে হবে গভীর অন্ধকারে। বুঝি বা এই বজ্ররবে নূতন পথের বার্তা কবে, কোন্‌ পুরীতে গিয়ে তবে প্রভাত হবে রাতি।' রবীন্দ্রছায়াতলে যিনি রবি কিরণে আলোলিকা তিনিই সুচিত্রা মিত্র। তাঁর নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক ঋজু আপসহীন ব্যক্তিত্ব। তিনি একলা নারী, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সিঙ্গল মাদার। প্রেমিক, স্বামী ও একমাত্র ছেলের পিতা ধ্রুব মিত্রর সঙ্গে সংসার সাত-আট বছরের বেশি টেকেনি সুচিত্রার। ধ্রুব মিত্রর দ্বিতীয় বিবাহ ছিলেন সুচিত্রা। আবার তৃতীয় বিবাহ করেন ধ্রুব। ধ্রুবর প্রথমা স্ত্রী গীতা দেবী আবার বিয়ে করেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে।

একলা থাকার উদযাপন

ছেলের কথা ভেবে সুচিত্রা আর বিয়ের ধার মারাননি। যদিও ধ্রুব ও তাঁর বর্তমান স্ত্রীর সঙ্গে আজীবন যোগাযোগ ছিল সুচিত্রার। স্বামীর মৃত্যুর পরে ছেলেকে বলেছিলেন, 'বন্ধু চলে গেল'। তার আগেই একমাত্র সন্তান কুণাল বিদেশে পাড়ি দেওয়ার পরে দীর্ঘদিন সুচিত্রা একাই সংসার করেছেন। সংসারই বটে। তাই তো সুচিত্রা একবার দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, "আমি রান্না করে, বাসন মেজে, ঘর গুছিয়ে তার পরে গান গাইতে আসি। তোমার মতো ফুলবাবুর জীবন আমার নয়।" জীবনে যত ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে, তাঁর সবটা তিনি ঢেলে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের চরণে। তাই সুচিত্রা মিত্র বলতেন, "রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার আগে গানের ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করো, তখন গান আত্মস্থ হবে। বুঝবে রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি গান আমাদের জীবনের সঙ্গে কতটা মিলে যায়।" সুচিত্রা একাই বেঁচেছেন নিজের শর্তে। এমন জীবন অনেক নারীর স্বপ্ন তখন, কিন্তু সুচিত্রা করে দেখিয়েছেন। সুচিত্রার জীবন বন্ধনহীন গ্রন্থিতে বাঁধা, এসেছে নানা আঘাত তবু নিজের কর্তব্য করে গেছেন, প্রত্যাঘাত করেননি। পথে বাধা এলেও সরেননি নিজের আদর্শ থেকে। হয়ে উঠেছেন নানা রূপে অদ্বিতীয়া। তাই তিনি বাঙালির কাছে শুধু সঙ্গীতশিল্পী হয়েই থাকেননি, হয়ে উঠেছেন বাঙালির তেজস্বিনী ব্যক্তিত্বের প্রতীক, রোলমডেল আইকন। তাঁর স্বতন্ত্র স্টাইল স্টেটমেন্ট, কণ্ঠ, উচ্চারণ, স্বরক্ষেপণ আজও আদর্শ।

রবীন্দ্র-যুগের বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের দুই পুত্র ও তিন কন্যা সন্তান। কনিষ্ঠা কন্যা সুচিত্রা। ১৯২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চলন্ত ট্রেনে জন্মেছিলেন সুচিত্রা, বিহারের গুজন্ডি স্টেশনের কাছে। সেখান থেকেই সুচিত্রার ডাক নাম হয়ে গেল গজু। সুচিত্রা রসিকতা করে বলতেন প্রায়ই "চলন্ত ট্রেনে জন্মেছি তো, তাই সবসময়ই চলছি। পথ চলাতেই আমার আনন্দ।"

অভিনয়ের ঝোঁক ছোট থেকেই

অভিনয়ের প্রতিভা ও আগ্রহ সুচিত্রার ছোট থেকেই ছিল। দাদা-দিদিদের সঙ্গে বাড়িতেই মঞ্চ বানিয়ে ছোট ছোট নাটকে অভিনয় করতেন। ওঁদের ছোটদের নাটকের দলের নাম ছিল 'ডাস্ট হাসলার্স'। এর পরে একটু বড় হতে বাড়ির আঙিনাতেই রবীন্দ্রনাথের চণ্ডালিকা, চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্য নিজেরা করতেন। সুচিত্রা গানও করতেন আবার চিত্রাঙ্গদা সেজে নাচ এবং অভিনয়ও করতেন। এই অভিনয় প্রতিভা আরও বিকশিত হল যখন শান্তিনিকতনে গেলেন সুচিত্রা। তিনি শান্তিনিকেতনে যাওয়ার কিছুদিন আগেই বিশ্বকবির মহাপ্রয়াণ ঘটে। গুরুদেবকে ঠাকুরবাড়িতে যখন দেখেছিলেন সুচিত্রা, তখন তিনি নেহাতই শিশু। আলাপ হয়নি কখনও। সুচিত্রা শান্তিনিকেতনে শিক্ষক রূপে পেয়েছিলেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, শান্তিদেব ঘোষ, শৈলজারঞ্জন মজুমদারকে। বিভিন্ন উৎসবে রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য,নৃত্যনাট্য হতই। শান্তিদেব ঘোষ সুচিত্রা মিত্রকে দিয়ে যেমন গান গাইয়েছেন, আবার অভিনয়ও করিয়েছেন। 'বাল্মিকী প্রতিভা'য় সুচিত্রা সরস্বতী সেজে অভিনয় করেছেন আবার বালিকার গানও গেয়েছেন। 'মায়ার খেলা'য় শান্তা বা 'চিরকুমার সভা'য় নৃপবালার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। শান্তিনিকেতনেই আশ্রম কন্যা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুচিত্রার পরিচয়। পরবর্তীকালে সুচিত্রা কণিকা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে বহু গসিপ তৈরি হলেও, আদতে ওঁরা ছিলেন একে অপরের প্রতি গুণমুগ্ধ ও শ্রদ্ধাশীলা।

'ও অভিনয়ে এলেও বিশ্বজয় করতে পারে'

তার পর যখন সুচিত্রা শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় ফিরলেন তখন তিনি গণনাট্য সঙ্ঘ ও 'ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন'-এর সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। আই.পি.টি.এ-র বহু নাটকেই সুচিত্রা অভিনয় করেছেন। উৎপল দত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলছেন "তপতী নাটকে সুচিত্রার বিপাশা চরিত্রে অভিনয় অসাধারণ। সুচিত্রা শুধু গানে আছে কেন? ও অভিনয়ে এলেও বিশ্বজয় করতে পারে।" অভিনয় করেছেন 'নীল দর্পণ' নাটকেও।

আবার নিজের প্রযোজনায় নিজের স্বপ্নের শিক্ষাকেন্দ্র 'রবি তীর্থ'-তে 'নটীর পূজা'য় শ্রীমতির ভূমিকায় নাচ ও গান দুইই করেছিলেন সুচিত্রা। সুচিত্রা মিত্র বলতেন "আমার অভিনয় করতে খুব ভালো লাগত। আমি যা সেটায় নয়, আমার অন্য একটি চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেই চরিত্রটিতে অবতীর্ণ হতে খুব ভাল লাগত।" ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে নির্মিত উমাপ্রসাদ মৈত্রের পরিচালিত ছবি 'জয় বাংলা' ছবিতে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের বিখ্যাত জননেত্রী বেগম সুফিয়া কামালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুচিত্রা। এছাড়াও মৃণাল সেনের কলকাতা ট্রিলজি 'পদাতিক' ছবিতেও একটি সাক্ষাৎকারধর্মী চরিত্রে অভিনয় করেন সুচিত্রা। আবার বিষ্ণু পালচৌধুরীর 'আমার নাম বকুল' ধারাবাহিকের একটি পর্বেও সুচিত্রা মিত্র অভিনয় করেন।

দহনে প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তিও

ওঁর বড় পর্দায় তৃতীয় ও শেষ ছবি ঋতুপর্ণ ঘোষের 'দহন'। ঋতুপর্ণ ঘোষ বলেছেন, "যখন সুচিত্রা ভট্টাচার্যর 'দহন'-এর আধুনিকমনস্কা ঠাকুমার চরিত্র ভাবতে বসলাম, তখন এক ঝলকে ভেসে উঠল সুচিত্রা মিত্রর মুখ।" দহনে তাঁর নাতনি চরিত্রে ইন্দ্রাণী হালদার ও পুত্রবধূর চরিত্রে শকুন্তলা বড়ুয়া দুজনেই মনে করেন সুচিত্রা মিত্রর সঙ্গে কাজ করতে পারা ওঁদের জীবনে বড় প্রাপ্তি। কিন্তু এই 'দহন' ঘিরে রয়ে গেছিল সুচিত্রা মিত্রর অনেক প্রাপ্তি, আবার অনেক অপ্রাপ্তিও। যেসব কথা মিডিয়ায় কখনও প্রকাশ্যে আনেননি সুচিত্রা মিত্র। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে ও 'রবি তীর্থ'র ছাত্রছাত্রীদের বলে গেছিলেন সেসব অপ্রাপ্তির কথা। যদিও যার জীবনের ক্যানভাস এত বড় সেই আকাশে কোথাও একটু কালো মেঘে তাঁর কিছু এসে যায়নি। কিন্তু তিনি যে প্রবঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন তা সত্য। এ প্রসঙ্গে 'রবি তীর্থ' প্রতিষ্ঠান কীভাবে সৃষ্টি হল তা বলা প্রয়োজন। 'রবি তীর্থ' তৈরী করেছিলেন বিখ্যাত প্রশিক্ষক দ্বিজেন চৌধুরী। দ্বিজেন চৌধুরী, শুভ গুহঠাকুরতা-- এঁরা সবাই রবীন্দ্রশিক্ষার প্রতিষ্ঠান 'গীতবিতান' তৈরি করেন প্রথমে। তখনও সুচিত্রা মিত্র শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা আসেননি। শুভ গুহঠাকুরতার সঙ্গে দ্বিজেন চৌধুরীদের মতান্তর হয় ও তাঁরা ভাগ হয়ে যান দুই দলে। শুভ গুহঠাকুরতা তৈরি করলেন রবীন্দ্রশিক্ষার প্রতিষ্ঠান 'দক্ষিণী' এবং দ্বিজেন চৌধুরী তৈরি করলেন 'রবি তীর্থ'। এক বাইশে শ্রাবণে কালীদাস নাগ নামকরণ করলেন 'রবি তীর্থ'। যা ছিল শুধু ছেলেদের গানের স্কুল। এরপর সুচিত্রা মিত্র এলেন কলকাতায়। এসময় তাঁকে হারমোনিয়ামে বহু অনুষ্ঠানে সঙ্গত করতেন দ্বিজেন বাবু। বিয়ের পর সুচিত্রা গান শেখানো শুরু করলেন সাদার্ন অ্যাভিনিউ-এর 'মিত্র ম্যানসন' বাড়িতে। শুধু মেয়েদের শেখাতেন তিনি তখন, প্রতিষ্ঠানের নাম 'গীতাঞ্জলি'। মঞ্জু গুপ্ত, সুমিত্রা রায় প্রমুখেরা শিখতেন তাঁর কাছেই। কিন্তু কোনও কোনও অনুষ্ঠানে শুধু মেয়েদের দিয়ে তো হয় না, পুরুষ মহিলা দুই কণ্ঠই লাগে। তাই 'রবি তীর্থ' ও 'গীতাঞ্জলি' একসঙ্গেই বার্ষিক অনুষ্ঠান করত। [caption id="attachment_292773" align="aligncenter" width="804"] মৃণাল সেনের পদাতিক ছবিতে।[/caption] এরপর ১৯৫০ সালে সুচিত্রার একমাত্র ছেলে কুণাল হয় এবং ১৯৫৫ সালে সুচিত্রার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তাই ওই শ্বশুরবাড়িতে আর 'গীতাঞ্জলি' স্কুল সম্ভবপর হল না। তখন দ্বিজেন চৌধুরী বললেন সুচিত্রা মিত্রকে, "আসুন আমরা একসঙ্গে স্কুল করি।" সেই থেকেই সুচিত্রা মিত্রর নিজের স্কুল হল আর নামটা 'রবি তীর্থ'ই রয়ে গেল। যদিও তাঁর প্রয়াণের পর অনেক হাতবদল হয়েছে ও নানা প্রভাব খাটানো হয়েছে তাঁর প্রাণের প্রতিষ্ঠানে। সুচিত্রা মিত্র এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেই গানের মাঝে ভাগ করে নিতেন নানা সুখ-দুঃখের কথা। নিজের ছেলে তো বিদেশে সেটলড, তাই এই ছাত্রছাত্রীরাই গুরুমার দৈনন্দিন কথার সঙ্গী ছিলেন। ঋতুপর্ণকে নিয়ে ঠিক কী বলেছিলেন সুচিত্রা মিত্র, তা জানা যায় 'রবি তীর্থ'র কৃতী ছাত্র ও সুচিত্রা মিত্রর শিষ্য, গায়ক-গবেষক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের থেকে।

সাক্ষাৎ শুভ্রবসনা সুরসরস্বতী

"সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচয় 'দহন'-এর অনেক আগে। এমনিতে তো ঋতুপর্ণ সুচিত্রা মিত্রর গান শুনে, রেকর্ডে ছবি দেখে ভক্ত ছিলেনই। সুচিত্রাদির সঙ্গে ঋতুপর্ণর প্রথম যোগাযোগ ঘটে প্রয়াত আলো কুণ্ডুর  'সাউন্ড উইং' স্টুডিওতে। সুচিত্রা মিত্র কোনও গানের রেকর্ডিং করতে গেছিলেন আর ঋতুপর্ণ তখন বিজ্ঞাপনে কাজ করেন, তার জিঙ্গেল রেকর্ডিংয়ের জন্য স্টুডিও বুক করতে গেছিলেন। সুচিত্রাদি তখন রিসেপশনে বসে একটা বই পড়ছিলেন। সাদা তাঁতের শাড়ি, গায়ে একটা হালকা তসরের চাদর। ঋতুপর্ণর তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল একেবারে সাক্ষাৎ শুভ্রবসনা সুরসরস্বতী। এর কিছু বছর পর 'দহন' ছবির জন্য ঋতুপর্ণ যখন সুচিত্রা মিত্রর কাছে প্রস্তাব নিয়ে গেলেন তখন এককথায় রাজি হয়ে যান সুচিত্রাদি। কারণ অভিনয় ওঁর পছন্দের বিষয় ছিলই। সেই সঙ্গে 'দহন'-এর ঐ আধুনিকা ঠাকুমা চরিত্রের সঙ্গে ওঁর নিজের একটা সাদৃশ্য ছিল। একক অথচ ব্যক্তিত্বময় জীবন। ক্যামেরা ফেস করার অভিজ্ঞতা যেহেতু আগেই ছিল সুচিত্রাদির, তাই শেষমেশ তাই পেশাদার অভিনেত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওঁর টাইমিং 'দহন'-এ খুবই নিখুঁত ছিল। কোনও মেকআপও লাগেনি ওঁর। যেভাবে সাধারণ বাড়িতে থাকতেন, সেই লুকেই ওঁকে ঋতুপর্ণ ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি তিনি নিজের শাড়িই পরেছিলেন ছবিতে। উপরি হিসেবে শ্যুটিংয়ের শেষে সহ-অভিনেতা অভিনেত্রীদের আবদারে সবাইকে গানও শুনিয়েছিলেন তিনি। দহনের প্রযোজক ছিলেন বিজয় আগরওয়াল। তিনিও দু-তিনদিনের কাজে সুচিত্রা মিত্রের সঙ্গে শ্যুটিং অভিজ্ঞতায় মুগ্ধ ছিলেন। সুচিত্রা মিত্রর মতো খ্যাতিমান মানুষ কিন্তু ইউনিটের সবার সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার করতেন এবং সময়ানুবর্তিতা মেনে চলতেন। ঠিক সময়ে শ্যুটিংয়ে আসা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যর মধ্যেই ছিল। কোমরে কাপড় গুঁজে উনি অভিনয়টা করতেন দাপিয়ে। ঋতুপর্ণকে দেখাতেও হয়নি। উনি বলেছিলেন, "আরে আমি জানি কীভাবে মা ঠাকুমারা করেন।"

ডাক মেলেনি প্রিমিয়ারেও

কিন্তু ঋতুপর্ণ ওঁর ছবিতে সুচিত্রা মিত্রর কণ্ঠস্বরটা রাখলেন না এবং এই কাজটা করলেন সুচিত্রা মিত্রকে না জানিয়েই। তাঁর বেশির ভাগ ছবিতেই তিনি নায়ক-নায়িকার কণ্ঠস্বর বদলেছেন এভাবেই। দহনেও তাই হল। এমনকি জানা যায়, ছবির প্রিমিয়ারেও নাকি সুচিত্রা মিত্রকে বলেননি ঋতুপর্ণ। সুচিত্রার পরিচিত, ছাত্রছাত্রীরা তখনকার সবথেকে আলোচিত ছবি 'দহন' দেখে এসে ওঁকে বলেন 'আপনার গলা তো নেই ছবিতে, কণ্ঠ ডাব করেছেন মঞ্চাভিনেত্রী কেতকী দত্ত।' এ কথা শুনে আকাশ থেকে পড়েন সুচিত্রা মিত্র। এ প্রসঙ্গে পরে সুচিত্রা মিত্র ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা করেছিলেন। এ বিষয়ে সুচিত্রা-শিষ্য সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, "ওই চরিত্রের সঙ্গে সুচিত্রাদির গলাটা ঠিকঠাক যেত বলেই আমাদের মনে হয়। 'দহন' ছবিতে যে সুচিত্রা মিত্র কাজ করেছিলেন তার জন্য ঋতুপর্ণ ঘোষ ওঁকে কোনও পারিশ্রমিক অফার করেননি এবং উনিও ঋতুপর্ণর কাছে কোন পারিশ্রমিক দাবি করেননি। অভিনয় করে উনি চলে এসেছেন। পারিশ্রমিকের ব্যাপার দুতরফেই উহ্য ছিল।

কিন্তু সুচিত্রাদিকে ঋতুপর্ণ একবারও বলেননি যে ওঁর কণ্ঠস্বর রাখবেন না ছবিতে। সুচিত্রাদি বারেবারেই জানতে চাইতেন যে ডাবিং কবে হবে। ঋতুপর্ণ এড়িয়ে যান। ছবির মুক্তি হয়ে গেল, সুচিত্রাদি জানতে পারলেন না। লোকমুখে শুনলেন তাঁর কণ্ঠ তো তাঁর মতো লাগছে না ছবিতে। পরে একদিন ঋতুপর্ণ সুচিত্রাদির বাড়িতে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন 'সুচিত্রাদি তুমি আমায় মারো বকো যাই করো তোমার গলাটা আমি রাখিনি, রাখতে পারিনি। আসলে তুমি এত ব্যস্ত শুট্যিংয়ের জন্য তিন দিন এসেছো, ডাবিংয়ের জন্য হয়তো পেরে উঠবে না। তাই ডাবিংয়ে তোমাকে ডাকিনি।'

আমার সময়ের খুব অভাব হয়ে যেত?

সুচিত্রাদি এটাতে ভীষণ অপমানিত বোধ করেছিলেন। উনি কিছু বলেননি ঋতুপর্ণকে, উঠে ভিতরের ঘরে চলে গিয়েছিলেন। পরে সুচিত্রা মিত্র বলেছিলেন, "আমি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করে এলাম। তার এইটে প্রতিদান। আমি ব্যস্ত ঠিকই, কিন্তু শ্যুটিং করতে পারলাম আর একদিন গিয়ে ডাবিং করে আসতে পারতাম না! তাতে আমার সময়ের খুব অভাব হয়ে যেত? ঋতুপর্ণ তো আমায় না জানিয়েই কেতকী দত্তকে দিয়ে আমার গলা ডাব করিয়েছেন।"

আসলে আপত্তিটা এই জায়গায়। পরিচালক হিসেবে ঋতুপর্ণর সে স্বাধীনতা আছে, কার কণ্ঠ রাখবেন বা রাখবেন না কিন্তু সৌজন্যের খাতিরে একবার সুচিত্রাদিকে বলে তাঁর কণ্ঠ বাদ দিতে পারতেন। তা উনি করেননি। এবং সুচিত্রার ব্যস্ততাই যে এর একমাত্র কারণ ছিল না, তা প্রমাণিত হয়ে যায় পরে। ঋতুপর্ণ নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "সুচিত্রা মিত্রর এত ঋজু উচ্চারণ যা চরিত্রের আটপৌরে ব্যাপারটাকে নষ্ট করে দিত।"

শিল্পীর উদারতায় ত্রুটি হয়নি

এ সময়ে স্বাভাবিক ভাবেই সুচিত্রার সঙ্গে ঋতুপর্ণর সম্পর্ক খানিক শীতল হয়ে যায়। কিন্তু সুচিত্রা মিত্রর শিল্পী-সুলভ মহত্ব এখানেই, আরও পরে যখন ঋতুপর্ণর 'উৎসব' ছবিতে দেবজ্যোতি মিশ্রর সঙ্গীত আয়োজনে শ্রাবণী সেনকে দিয়ে গাওয়ানো হল 'অমল ধবল পালে' তখন সে গান বিশ্বভারতী আটকে দেয়। তখন রবীন্দ্রসঙ্গীত প্লেব্যাক করতে হলে বিশ্বভারতীর ট্রেনার লাগত। এই গানে ট্রেনার ছিলেন অর্ঘ্য সেন। ছবির রিলিজ আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন অর্ঘ্য সেন, দেবজ্যোতি মিশ্র ও ঋতুপর্ণ-- এঁরা তিনজনই সুচিত্রার গড়িয়াহাটের ফ্ল্যাটে এসে বলেন, 'আপনি আমাদের উদ্ধার করুন।' তখন অর্ঘ্য সেনের সঙ্গে সুচিত্রা মিত্রর খুবই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। সুচিত্রা মিত্র পুরনো কথা মনে না রেখে, উৎসবের গানটা একবার শুনে বিশ্বভারতীকে চিঠি লিখলেন 'আমি গানটা শুনেই বলছি যা গেয়েছেন শিল্পী, তা যথাযথ হয়েছে।এই গানটা যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।' সেই চিঠির ভিত্তিতেই শ্রাবণী সেনের গানটি ছাড় পেয়ে গেছিল। তখন বিশ্বভারতীতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় বা সুচিত্রা মিত্র একটা সার্টিফিকেট লিখে দিলে সেটা আর আটকাত না। শ্রাবণী সেনের সেটাই প্রথম বড় ব্রেক, যেটা সুচিত্রা মিত্রর জন্যই সম্ভব হয়েছিল। এমনকি সুচিত্রা মিত্র দেবজ্যোতি মিশ্রকে বলেও ছিলেন, "আমার যদি বয়স থাকত তাহলে তোমার সঙ্গে কাজ করতে পারলে আমার ভাল লাগত।" https://youtu.be/mvbwPLKmYks দহনের আক্ষেপ সেদিন পুষে রাখেননি সুচিত্রা। কিন্তু দুঃখের কথা হল, সুচিত্রা মিত্র ২০১১ সালের ৩ জানুয়ারি  মারা যাওয়ার পরে ওঁর বাড়িতে হোক বা রবীন্দ্রসদনে হোক-- কোথাও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি ঋতুপর্ণ। পরে ২৩ জানুয়ারি সংবাদ প্রতিদিনের 'রোববার' ক্রোড়পত্রে সুচিত্রা মিত্র সম্বন্ধে কয়েকটি কথা লিখেই শেষ শ্রদ্ধা সারেন ঋতুপর্ণ। কখনওই কোথাও লেখেননি যে সুচিত্রা মিত্রর সৌজন্যেই তাঁর 'উৎসব' ছবির গানটি ছাড়পত্র পায় যে গান ছিল অর্পিতা পাল চট্টোপাধ্যায়ের লিপে। এটা ওঁর কাছ থেকে আশা করা যায় না। তবে সুচিত্রাদি এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কখনও করেননি, ওঁর আভিজাত্যই ওঁকে তা করতে দেয়নি।" 'ক্ষত যত ক্ষতি যত মিছে হতে মিছে, নিমেষের কুশাঙ্কুর পড়ে রবে নীচে। কী হল না, কী পেলে না,  কে তব শোধেনি দেনা, সে সকলই মরীচিকা মিলাইবে পিছে।'

প্রতিবাদের উত্তরাধিকার বইবে কে?

'দহন' ছবিতে সুচিত্রা মিত্র নাতনি ঝিনুককে বলেছিলেন 'তাতে কী প্রমান হয় রে দিদি, চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখলে প্রতিবাদ না করা... মেরুদণ্ড না থাকাটাই স্বাভাবিক? নাকি অন্যায় হওয়াটাই স্বাভাবিক?" কতভাবে যে মিলে যায় এ আইকনিক ডায়লগ! দশ বছর পেরিয়ে গেল সুচিত্রা মিত্র নেই। তাঁর জন্মদিন বা মৃত্যুদিন পালন করা আনুষ্ঠানিক উদযাপনের চেয়েও আসল উদযাপন ওঁর লড়াইকে বাঁচিয়ে রাখা। তিনি অন্যায় বিরুদ্ধে যে সবসময় প্রতিবাদ করেছেন সেই প্রতিবাদের উত্তরাধিকার যেন বয়ে চলে শিল্পজগতে! তাঁর মতো চুল ছেঁটে, গলা নকল করে, ঘাড় ঝাঁকিয়ে গান করলেই সেই উত্তরাধিকার নেওয়া হয় না। আয়ু ফুরোলে মানুষের দেহাবসান হবেই, কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে তাঁর শিক্ষা ও রবিগান সংরক্ষণের জন্য তাঁর প্রচেষ্টাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেটাই আসল সুচিত্রা মিত্রকে সম্মান জানানো হবে।

```