শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
একান্নবর্তী পরিবারের গৃহবধূর সংসার সামলে স্বাধীন উদ্যোগের স্রষ্টা হওয়ার রূপকথা আমরা সিনেমা বা সিরিয়ালে দেখি। কিন্তু ঠিক এমনটাই বাস্তবে ঘটিয়েছিলেন নব্বই দশকের গোড়ায়, এক বনেদী পরিবারের সাদামাঠা গৃহবধূ। শর্বরী দত্ত। যাঁর নামের আগে জুড়েছিল ফ্যাশন জিজাইনার ও কস্টিউম ডিজাইনার উপাধি। আর এই পথে তাঁর অস্ত্র ছিল পুরুষদের সাজপোশাক।
ছেলেরা আবার সাজে নাকি? তাদের আবার ফ্যাশন কী? এসব প্রশ্ন কখনও কখনও আজও ওঠে। কিন্তু সেই হরোপ্পা-মহেঞ্জদারো বা সিন্ধু সভ্যতা হয়ে মুঘল আমলের পুরুষদের স্টাইল স্টেটমেন্ট—তার সাক্ষী তো রয়েছে ইতিহাস বইয়ের পাতায় পাতায়। তাহলে একালের পুরুষরা কেন একই পোশাকে বন্দি হয়ে থাকবে? কোনও পুরুষ সাজতে ভালোবাসলেই তাকে কেন সমাজ মেয়েলি বলবে?
সমাজের এই বিভাজনে যেন পুরুষরাও পুরুষতন্ত্রেরই শিকার। সেই পুরুষতন্ত্রকে স্বতন্ত্র ছকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন শর্বরী দত্ত। পুরুষ ফ্যাশনের সম্রাজ্ঞী হয়ে উঠেছিলেন ডিজাইনার শর্বরী দত্ত।

১৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে খবর এল রহস্যজনক ভাবে মারা গিয়েছেন ৬৩ বছরের শর্বরী। রয়ে গেল তাঁর কাজ।
কবি কন্যার মেয়েবেলা
রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের কবি অজিত দত্তের কন্যা শর্বরী দত্ত। তাঁর বাড়ি ছিল এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের আঙিনা। সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, কবি, সঙ্গীতশিল্পী সবাই আসতেন তাঁর বাবার কাছে। বাড়িটি ছিল বইয়ে ঠাসা এবং নন্দনবোধে জারিত। শর্বরীর মেয়েবেলা কেটেছিল শিক্ষিত, শৌখিন, রুচিবোধসম্পন্ন পরিবেশে। তাঁদের পরিবারে অবশ্য ফ্যাশন ডিজাইনিং কী তা কেউ জানতেন না। কিন্তু সব বাঙালি পরিবারে যেমন মেয়েদের হাতের কাজে জোর দেওয়া হত, সেটা হয়েছিল শর্বরীর ক্ষেত্রেও। তাঁর নিজেরও ভালবাসা ছিল সেলাই-ফোঁড়াই থেকে ছবির আঁকার সৃজনশীলতায়। পাশাপাশি শর্বরী দর্শন নিয়ে পড়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ও তার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

অল্প বয়সেই বিয়ে, যৌথ পরিবারের 'পরমা' শর্বরী
বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়াকালীন শর্বরীর বিয়ে হয়ে যায় বনেদী পরিবারে। বড়, যৌথ পরিবারের বউ হয়ে শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ। শুরু থেকেই অনেক দায়িত্ব ছিল। শ্বশুর, শাশুড়ি, দেওর, ননদ এবং স্বামীর প্রতি ছিল কর্তব্যের পাহাড়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এক পুত্র সন্তানের মা হন শর্বরী। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরই গল্প যেন শুরু হয়েছিল। কিন্তু শর্বরী সাহসে ভর করে আত্মপরিচয় তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তাঁর স্বামী সে সময়ে বার্নিশ ওয়ার্ক, শাড়ির প্রিন্ট, মাটির আর্টের পুতুল ইত্যাদি বানানোয় স্বল্প খ্যাতি পান। শর্বরীও পাশে ছিলেন স্বামীর। কিন্তু শর্বরী দেখতেন স্বামী যখনই কোথাও কাজ নিয়ে কোনও আলোচনা করেন, সব কৃতিত্ব একাই নেন, স্ত্রীকে অন্দরমহলেই রাখতে চান। শর্বরী যেন যৌথ পরিবারে সবার প্রয়োজন মেটানোরই কল ছিলেন শুধু, তাঁর কাজের কোন স্বীকৃতি ছিলনা। শর্বরীর কোনও আর্ট কলেজের ডিগ্রি বা ট্রেনিং ছিল না। কিন্তু আর্ট ওয়ার্ক ছিল শর্বরীর হৃদয়ে। শৈল্পিক কাজ বলতে তখন শর্বরী করতেন শ্বশুরবাড়ির শুভ অনুষ্ঠানে আলপনা দেওয়া কিংবা কোনও আত্মীয়-বন্ধুর পাঞ্জাবি ডিজাইন করে দেওয়া।
সত্যজিতের ছবিতে নায়িকা হওয়ার অফার
শর্বরী ছিলেন কৃষ্ণকলি। টানা টানা চোখে মিশরীয় আদলের মুখ ছিল তাঁর। যাকে কালিদাসের ভাষায় বলা যায় 'তন্বী শ্যামা শিখরি-দশনা, পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী মধ্যেক্ষামা চকিত-হরিণী প্রেক্ষণা নিম্ন-নাভি।' সেই সঙ্গে মডেলিংয়ের জন্য আদর্শ ছিল শর্বরীর একহারা দীর্ঘ চেহারা। কিন্তু বাঙালি পরিবারের বউ মডেলিং করবে, এটা তখন প্রায় ভাবা যেত না!
১৯৬৯ সালে শর্বরীর সংসারে বন্দি জীবনে এল নতুন দিশা। ফ্যাশন ডিজাইনিং নয় কিন্তু, নায়িকা হওয়ার সুযোগ।

সত্যজিৎ রায়ের ছবি 'প্রতিদ্বন্দ্বী'তে নায়িকা হিসেবে সিলেক্টেড হন শর্বরী দত্ত। সত্যজিৎ রায় নিজে তাঁকে পছন্দ করেন অডিশনে। সেই মুহূর্তে ফাইনাল কিছু হয়নি। কিন্তু পরে তিনি শর্বরীকে ডেকে পাঠান। দুর্ভাগ্যবশত, সে খবর পৌঁছয়নি শর্বরীর কাছে। কারণ শর্বরী তখন স্বামীর সঙ্গে নেপালে গিয়ে ভূমিধ্বসে আটকে পড়েছিলেন। সত্যজিতেরও তাড়া ছিল শ্যুটিং শুরু করার, তাই লিডরোলের নায়িকা শর্বরীকে পাল্টে 'প্রতিদ্বন্দ্বী'তে অন্য নায়িকা নিয়েই শুট্যিং করেন সত্যজিৎ রায়।
আমি নারী, আমি পারি
একটা সময় পরে সংসারে অশান্তি শুরু হল। শর্বরী চাইতেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারে সাহায্য করতে। অথচ স্বামী তাঁর জন্য অন্দরমহল নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। শেষমেশ সংসারের জাঁতাকল থেকে নিজেকে মুক্ত করে একটি কোম্পানিতে কপিরাইটার হিসেবে যোগ দিলেন শর্বরী। সেই চাকরি বেশি দিন চলল না। কিন্তু শর্বরীর ডিজাইন দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁর এক বন্ধু বললেন, "শর্বরী তোমার কারও অধীনে কাজ করার দরকার নেই, তুমি নিজেই তোমার অধীনে অনেককে চাকরি দিতে পারো।”

পোশাক প্রদর্শনী থেকে শর্বরী দত্ত ব্র্যান্ড
চিরাচরিত থেকে অন্যকিছু যিনি করেন, তাঁকেই লোকে মনে রাখে। শর্বরী অনেক পরে জীবনকে নতুন ভাবে ভাবেন। রক্ষণশীল পরিবারের গৃহবধূ থেকে একার জোরে ফ্যাশন স্টোর খুলে ফেলার লড়াইটা কম ছিল না। যখন শর্বরীর ছেলে টিনএজার তখন অনেকটাই কমে যায় ব্যস্ততা। শর্বরী শুরু করেন নিজের পরিচয়ের খোঁজ এবং তার পরে নতুন ফ্যাশন ভাবনা।
আশি-নব্বই দশকে যখন ফ্যাশন বলতে সবাই বুঝত মেয়েদের সাজগোজ, সেখানেই মিথ ভাঙা কাজ করেন শর্বরী তাঁর ভাবনায়। পুরুষের পোশাক পুরুষের সাজ। শর্বরী শুধু ফ্যাশনে বিশ্বাসী ছিলেন না, স্টাইলেও বিশ্বাসী ছিলেন। তাই সকলে পুরুষ মানেই শুধু প্যান্ট-শার্ট বুঝলেও, শর্বরী মনে করালেন, একসময় ময়ূরপুচ্ছ ধুতি পাঞ্জাবি পুরুষের আদি পোশাক ছিল। শর্বরীর মনে প্রশ্ন জাগল, ধুতি কেন শুধু সাদার শেডে হবে। পুরুষরা যদি রঙিন প্যান্ট পরতে পারেন তাহলে রঙিন ধুতি পরতে বাধা কোথায়? বাধা ছিল সামাজিক নিয়মের বহমানতায়।

তাই ১৯৯১ সালে শর্বরী যখন প্রথম প্রদর্শনী করলেন 'পুরনো কলকাতা ও সাহেব, বাবু, বাঈজি কালচার' নামে, সেখানে অনেক পোশাক নজর কাড়লেও, অনেক পোশার বিক্রি হলেও একটিও রঙিন ধুতি বিক্রি হল না। হাল ছাড়লেন না শর্বরী। ১৯৯২ সালে প্রেসকে ডেকে করলেন দ্বিতীয় প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করলেন চিত্রনায়িকা অপর্ণা সেন। তখন 'শ্বেত পাথরের থালা' রিলিজ করেছে। সেই ছবির অভিনেতা দীপঙ্কর দে হলেন শর্বরীর পোশাকের প্রথম মডেল। বিশাল সাফল্য পেল শো। সব পত্রিকায় শর্বরীর পুরুষ পোশাক কথা এবং রঙিন ধুতি আলোচিত ও প্রশংসিত হল।
এভাবে তৃতীয় প্রদর্শনী হল মুম্বইয়ে। বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ল শর্বরীর ব্র্যান্ড। বাঙালির বিয়ে বা পুজোয় বিভিন্ন দোকানে যে রঙিন ধুতি পাওয়া যায়, সেই ট্রেন্ড শুরু করেছিলেন শর্বরী দত্তও। যে ধুতি দেখে একদিন সবাই শাড়ি বলে হেসেছিল, সেই লাল-কালো ধুতি দাপিয়ে পরতে শুরু করলেন পুরুষ সেলিব্রিটিরা।
শর্বরীর পোশাকে মকবুল থেকে বিল ক্লিন্টন
শর্বরী দত্ত চিরকাল সরাসরি ফ্যাব্রিকের উপর এঁকেছেন। কোনও দিনও কিছু মুছতে হয়নি তাঁকে। ভুল হলেও সেই ভুল থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি করেছেন। কাপড়ে কী আঁকবেন ভাবেননি কখনও, সরাসরি হাতে এসে গেছেন মা সরস্বতী। তার পরে সেই আঁকার উপর রঙ করা হয়েছে। তাঁর প্রতিটি পোশাকের ডিজাইন স্বতন্ত্র। শর্বরী কখনও রিপিট করতে চাননি তাঁর ডিজাইন।
সেলিব্রিটি হিসেবে তাঁর থেকে প্রথম পোশাক কেনেন চিত্রকর মকবুল ফিদা হুসেনের মেয়ে। বাবার জন্যই কেনেন। সেই পোশাকে ফিদা হয়ে মকবুল ফিদা আবার নিজে পোশাক কেনেন শর্বরীর থেকে।
[caption id="attachment_260717" align="aligncenter" width="1050"]

লেডি রাণু মুখার্জীর সঙ্গে।[/caption]
ক্রিকেট ময়দানের খেলোয়াড়রা কেউ বাদ নেই তাঁর পোশাক পরতে। কপিল দেব শচীন, সৌরভ, রাহুল, ধোনি, এমনকি বিদেশের প্লেয়াররাও পরেছেন শর্বরীর পোশাক। অমিতাভ বচ্চন থেকে প্রসেনজিৎ হয়ে সৃজিত-মিথিলার রিসেপশনেও সৃজিতের পোশাক করেন শর্বরী। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনও পরেন শর্বরী কালেকশন।
ঐশ্বর্যর মা এলেন জামাই বরণের পোশাক কিনতে
'চোখের বালি'র শ্যুটিংয়ের সময়ে ঐশ্বর্য রাইয়ের সঙ্গে তাঁর মা বৃন্দা রাই এসেছিলেন কলকাতায়। কলকাতায় পৌঁছে তাঁর গন্তব্য ছিল শর্বরী দত্তের ব্রড স্ট্রিটের বাড়ি। শর্বরী বাঙালি মতে আপ্যায়ন করেন ঐশ্বর্য মাতাকে। শুধু তাই নয়, তিনি শর্বরীর সঙ্গেই বাঙালি পদ পাত পেড়ে খেয়েছিলেন। তিনি সেবার কিনে নিয়ে গেলেন তাঁর স্বামীর জন্য ডিজাইনার পাঞ্জাবি। পাঁ-ছ’বছর পরে যখন বচ্চন পরিবারে ঐশ্বর্যর বিয়ে ঠিক হল, তখন বৃন্দা রাই মেয়েকে নিয়ে আবার এলেন শর্বরীর ঠিকানায়। এবারের আবদার জামাই অভিষেক বচ্চনের বিয়ের পোশাক করে দিতে হবে, সঙ্গে বেয়াই অমিতাভ বচ্চনের পোশাকও। কথা রাখলেন শর্বরী। অভিষেক বচ্চন বিয়ে করলেন শর্বরী দত্তর পোশাক পরেই।
ঋতুপর্ণর 'অন্তরমহল'-এর পোশাক পরিকল্পনা
ঋতুপর্ণ ঘোষের ফিল্ম 'অন্তরমহল'-এ জ্যাকি শ্রফ এবং অভিষেক বচ্চনের পোশাকের দায়িত্ব শর্বরীকে দেন ঋতু। জ্যাকির পোশাক ছিল রায়বাহাদুরের এবং অভিষেকের সরল পোশাক পোটোর বেশে মৃৎশিল্পী। অনবদ্য পোশাক করেছিলেন শর্বরী, কস্টিউম ডিজাইনার রূপে।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব যতবার হয়েছে সম্প্রতি সময়ে ততবার অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, ইরফান খান, অভিষেক বচ্চনদের পোশাক করার দায়িত্বে মুখ্যমন্ত্রী ভরসা করেছেন শর্বরীকেই। এছাড়াও প্রতিবার পুজোয় আনন্দলোক, আনন্দবাজার, সানন্দা, প্রথমা, বর্তমান বিভিন্ন পত্রিকায় মডেলরা সেজেছেন শর্বরীর পোশাকে।
ফের শূন্য থেকে শুরু
শর্বরী মূলত পোশাক ডিজাইনের দায়িত্বটা দেখতেন এবং পরের দিকে ছেলে-বৌমা দেখত আর্থিক বেচাকেনার দিকটা। এভাবেই চলত ব্রড স্ট্রিটে শর্বরীর ঠিকানা। কিন্তু সংঘাত বাধল পুত্রের সঙ্গে। তাই প্রৌঢ়ত্বে এসেও আবার স্বাধীন করলেন নিজেকে। অন্য এক অংশীদারের সঙ্গে 'শূন্য' ফ্যাশন স্টোর খুললেন।

শর্বরী বারবার দেখিয়ে দিলেন, মেয়েদেরও স্বামী-পুত্রের ঠিকানার বাইরেও নিজের বাড়ি, নিজের ব্যবসা হয়। নারীদের প্রেরণা হয়ে ওঠেন তিনি। শর্বরীর নিজের তাঁর কাজ নিয়ে কোনও আফশোস ছিল না। কিন্তু আফশোস ছিল, তাঁর বাবা কবি অজিত দত্তর কবিতা আর কেউ পড়ে না বলে। কবি বাবাকে নিয়ে করতে চেয়েছিলেন আর্কাইভ ওয়ার্ক, শর্বরীর সেই ইচ্ছে আর পূরণ হল না।
চিরকাল যে পুরুষদের পোশাক গড়তে ভালোবেসে গেছেন শর্বরী, কিন্তু কোনও পুরুষকে কখনও তাঁর পায়ে বেড়ি পরাতে দেননি।
“যদি পার্শ্বে রাখ মোরে
সঙ্কটে সম্পদে,
সম্মতি দাও যদি কঠিন ব্রতে
সহায় হতে,
পাবে তবে তুমি চিনিতে মোরে।”