শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
বাঙালি যেমন দু'দলে বিভক্ত হয়ে যায় নানা কিছুতে, যেমন ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, উত্তম-সৌমিত্র, ইলিশ-চিংড়ি কিংবা সুচিত্রা-সাবিত্রী, তেমনই রবীন্দ্রসঙ্গীতে দুই পুরুষ কণ্ঠ নিয়েও আজ বহু বাঙালি তর্ক জুড়ে দেয়। তাঁরা হলেন দেবব্রত বিশ্বাস এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কে বড় গায়ক, কে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আসল লেজেন্ড এই নিয়ে বাঙালি আজও দু'দলে বিভক্ত।
কিন্তু দেবব্রত বিশ্বাস আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-- এই দু'জনের নিজেদের ভিতরে সম্পর্ক কেমন ছিল? হৃদ্যতা ছিল, না প্রতিযোগিতা? অনেক সময়ে শিল্পীরা সামনাসামনি পরস্পরের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করলেও তাঁদের জীবনের গোপন গল্পের পাতা ওল্টালে দেখা মেলে অনেক বিরোধ, বিবাদ, অভিমানের। এই দুই সঙ্গীত সাধকের ক্ষেত্রেও কি তেমনই কিছু ছিল?

দেবব্রত বিশ্বাস জন্মগ্রহণ করেন ১৯১১ সালের ২২ অগস্ট। দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মের বছরে পঞ্চম জর্জ ভারতে আসেন। সেই কারণে তাঁর ডাক নাম রাখা হয় জর্জ। পরবর্তী কালে তিনি সঙ্গীত মহলে জর্জ বিশ্বাস নামেও খ্যাত হন এবং বন্ধু, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, ছাত্রছাত্রীদের কাছেও তিনি জর্জদা নামেই পরিচিত ছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিন্তু দেবব্রত বিশ্বাসকে সকলের মতো জর্জদা বলে ডাকতেন না। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় জর্জ বিশ্বাসকে কাকা বলে ডাকতেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় হোক বা প্রকাশ্যে, সবসময়ই দেবব্রত ছিলেন হেমন্তর 'কাকা'।
পারিবারিক সম্পর্ক ছিল না তাঁদের। বয়সের ফারাকও মাত্র ৯ বছর। তাহলে এই কাকা সম্বোধনের কারণ কী? এর পেছনে আছে একটা দারুণ গল্প। যাতে স্পষ্ট হয়, দুই কিংবদন্তীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিল।

অনেককাল আগে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁর গানের সঙ্গীসাথীদের নিয়ে দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়িতে প্রায় আসতেন। এরকমই একদিন হেমন্তরা সবাই দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়ি আসছেন দল বেঁধে। হেমন্ত-বন্ধু ও সঙ্গীত সহকারী সমরেশ রায় আগে আগে চলেছেন এবং গলি থেকেই একটু জোর গলাতেই বলছেন চেঁচিয়ে 'জর্জ আছো নাকি? জর্জ?' দোর খুলে তখন দেবব্রত বিশ্বাস ঠাট্টা করে সমরেশ রায়কে বললেন, "জর্জ জর্জ করে কও কেন? কাকা কইতে পারো না?"

সেই দিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসকে কাকা ডাকা শুরু করলেন। ওই যে কাকা বলা শুরু করলেন হেমন্ত, আজীবন জর্জ বিশ্বাসকে কাকা ডেকেই এসেছেন তিনি। আবার সুচিত্রা মিত্র কখনও জর্জ বিশ্বাসকে জর্জদা বলেননি, দেবব্রত বিশ্বাসের থেকে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও। তিনি সরাসরি জর্জ বলেই ডাকতেন। সুচিত্রার এ জর্জ সম্বোধনের উত্তরে জর্জ বিশ্বাস বলেছিলেন ঘনিষ্ঠ মহলে "ও আমারে নাম ধইরা ডাকে, তা আমি কি ওরে কমু যে তুমি আমারে দাদা কও!"

তর্ক যতই থাক, এক সময়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বাঁধা গতের বাইরে বের করে সকলের মাঝে পৌঁছে দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ই, সে বাংলা ছবিতেই হোক কিংবা রেকর্ড করা ক্যাসেটে। রবি গানের সর্বজনীন জনপ্রিয়তা হেমন্ত কণ্ঠেই। কিন্তু মন বা বয়স পরিণত হলে অনেকেরই আবার জর্জ বিশ্বাসের রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া গতি নেই। জর্জ বিশ্বাসের স্পষ্ট উচ্চারণ মনের ভিতরে ধাক্কা দিয়ে যায়। তাঁর গানে রবিগানের প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ যেন মূর্ত হয়ে ওঠে অন্তরের অন্তস্থলে।
আবার হেমন্তর গান পৌঁছে গেছে সমাজের প্রান্তিক মানুষটার কাছেও, অনেক সহজে। সেখানে জর্জ অনেক বেশি রুক্ষ ও কঠিন। কিন্তু সেই কঠিনের ভিতর টলটলে রস যে পাবেন, তিনিই বুঝবেন কতটা আবেগ ও কতটা পুণ্যতা রয়েছে জর্জ বিশ্বাসের গানে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজে বলেছেন "আমার চেয়ে, আমাদের সবার চেয়ে অনেক বেশি দেবব্রত বিশ্বাসের গানের রেকর্ড বিক্রি হয়।" আবার দেবব্রত বিশ্বাসও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে বলেছিলেন "হেমন্ত যদি চিনা খবরের কাগজও সুর করে পড়ে, লোকে শুনবে।"

দু'জনের সম্পর্ক নিয়ে বলতে গেলে আরও কিছু গল্প বলতে হয়। ১৯৭১ সালে দেবব্রত বিশ্বাস জীবনবিমার অফিস থেকে অবসর নিয়েছেন। সেসময় তিনি অসুস্থ, রামকৃষ্ণ মিশন হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছিল, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফেলে রেখেছেন, কোনও চিকিৎসাই শুরু করেননি দু'দিন ধরে। তখন খবর পেয়ে ছুটে যান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হসপিটালের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের বলেন "যাঁকে ফেলে রেখেছেন বিনা চিকিৎসায় সেই মানুষটা চলে গেলে কী হবে জানেন?"
হেমন্ত ধমকে নড়েচড়ে বসে হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। রোজ খবর নিতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজে। এভাবেই তাঁর 'কাকা'কে সারিয়ে তুলেছিলেন হেমন্ত। আবার দেবব্রত বিশ্বাস যখন তাঁর গানের রয়্যালটি ঠিকঠাক পাচ্ছিলেন না, হেমন্তই এগিয়ে এসে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সব বাকি রয়্যালটি পাইয়ে দেন দেবব্রত বিশ্বাসকে। ফলে দেবব্রত-হেমন্ত নিয়ে কিছু অবোধ ভক্ত যতই কাদা খুঁজতে থাকুক, এ কথা অস্বীকার করা যায় না, শেষ পর্যন্ত দেবব্রত বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধার অন্ত ছিল না হেমন্তর। দেবব্রত বিশ্বাসের শেষ পাবলিক অনুষ্ঠানে সম্বর্ধনাও মেলে হেমন্তর উদ্যোগেই।

সেদিনটা ছিল ১৯৮০ সালের ২১ শে মার্চ। হেমন্ত অনুষ্ঠানের কথা বলে বলে রাজি করান তাঁর কাকাকে। দেবব্রত বিশ্বাস নিমরাজি থেকে হঠাৎ একদিন হ্যাঁ বলে দেন। হাতে চাঁদ পেয়ে যান হেমন্ত। জর্জ বিশ্বাস পরে এই 'হ্যাঁ' বলা নিয়ে হেমন্তকে বলতেন কী ঝামেলায় হেমন্ত ফেললেন তাঁকে। তবে একমাত্র হেমন্ত মুখোপাধ্যায় না এগিয়ে এলে জর্জ বিশ্বাসের আর সেই প্রাপ্তিও দেখে যাওয়া হত না।
তথ্য ঋণ: আলো কুণ্ডু