শেষ আপডেট: 25 May 2020 11:57
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। আজ কবি নজরুলের জন্মদিনে তাই দুই অসমবয়সী কবির সখ্য ও বিচ্ছেদের কথা অবধারিতভাবে এসে পড়বে।
১৯৪১-এর ৭ আগস্ট, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়। কবির মৃত্যুদিনে তৎকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিও কবির শেষযাত্রার ধারাবিবরণী সম্প্রচার করেছিল। ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁকে টেলিফোনে তথ্য সরবরাহ করেছিলেন নলিনীকান্ত সরকার।
কবির শেষযাত্রা ঘিরে কলকাতা জুড়ে ব্যাপক কাণ্ড ঘটেছিল সেদিন। অল ইন্ডিয়া রেডিও অফিসে ছিল সাজোসাজো রব। কবি নজরুলও সেদিন ছিলেন রেডিও স্টেশনেই। রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে তিনটি কবিতা লিখেছিলেন তিনি। একটিতে লেখেন ‘‘দুপুরের রবি ঢলে পড়েছে অস্তপারের কোলে’’। অপরটিতে লেখেন― "ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে, জাগায়ো না জাগায়ো না। সারা জীবন যে আলো দিল, ডেকে তাঁর ঘুম ভাঙায়ো না।"
রেডিওতে রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রার ধারাবিবরণী ছাড়াও এদিন রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত নজরুলের কবিতা আবৃত্তি ছিল। তিনি তাঁর রচিত প্রথম কবিতা আবৃত্তি শুরু করছিলেন। কিন্তু আবৃত্তি করতে করতেই তাঁর দেহে রোগাক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয়, তিনি আবৃত্তি সম্পূর্ণ করতে পারেননি, তাঁর জিহবা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। একবছরের মধ্যেই তিনি দুরারোগ্য শিরঃপীড়ায় আক্রান্ত হন। তখন থেকেই তিনি ছিলেন বাকহারা।
নজরুল প্রয়াত হয়েছেন ১৯৭৬-এর ২৯ আগস্ট। রবীন্দ্র প্রয়াণের পর প্রায় সাড়ে তিন দশক তিনি বেঁচেছিলেন, কিন্তু নির্বাক। তাঁর কলম চলেনি। রবীন্দ্রনাথ বেঁচেছিলেন আশি বছর। জীবনের শেষপ্রান্তেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কর্মমুখর। নজরুল কিন্তু স্তব্ধ। তাঁর হাতে সৃষ্টি হল না আর কিছুই। অথচ মধ্যবয়সে কী পরিণত লেখাই না লিখেছেন তিনি।
নজরুল হয়তো বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানের পাশে তাঁর গানকেও টিকে থাকতে হবে। সেই জন্যই গান নিয়ে তাঁর পরীক্ষানিরীক্ষার অন্ত ছিল না। রবীন্দ্রনাথের থেকে অনেক বেশ গান রচনা করেছেন নজরুল। লিখেছেন ৩,০০০-এরও বেশি গান। পৃথিবীর আর কোনও ভাষায় একক হাতে এত বেশি সংখ্যক গান আছে কি না জানি না। আমরা এখনও তাঁর গান গাই, তাঁর সেই স্বপ্ন মিথ্যা হয়নি।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর শোক ও ব্যাধিতে ভয়ঙ্করভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন নজরুল। মনে হয় তাঁর বাকহারা হবার সেটা একটা মস্ত কারণ। প্রায় দশ বছরেরও বেশি আগে অত্যন্ত আদরের সন্তান বুলবুলকে হারিয়েছিলেন। তবু তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল। কিন্তু রবীন্দ্রপ্রয়াণের পরই তাঁর শিরঃপীড়া আর তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
নজরুলের লেখা পাঠ করলে দেখা যায় তিনি বাঙালিকে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে দেখেছেন। ভারতীয় পরিচয়কেও অস্বীকার করেননি। এজন্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র তাঁকে খুব পছন্দ করতেন, পছন্দ করতেন তাঁর গান। আইএনএ সেনারা তাঁর গানের সঙ্গে মার্চ করতেন।
নজরুল “বাঙালি বাঙলা" নামে একটি ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লেখেন― “বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে বাঙালির বাংলা সেদিন তারা অসাধ্যসাধন করবে।"
তিরিশ বছর আগে বাঙালির জীবনের ভবিষ্যৎকে নজরুল যে বিশেষ এক দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, বিষয়টি বুঝেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান।
সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ভারত-বাংলাদেশ, উভয় দেশের মৈত্রীদূত হিসেবে ১৯৭২ সালের মে মাসে তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর ১৯৭৪ সালের ২৩ মে কবিকে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয় পাকাপাকিভাবে। ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ‘ডি-লিট’ উপাধি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান কবিকে বাঙালির 'জাতীয় কবি' হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
রবীন্দ্র প্রয়াণের পর দেশভাগ হয়েছে, স্বাধীনতা এসেছে, সীমাহীন উদ্বাস্তু সমস্যা, পশ্চিমবঙ্গ হয়েছে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য। পূর্ববঙ্গ চলে গিয়েছে পাকিস্তানের কব্জায়। শ্বশুরবাড়ি যেতে গেলেও তৈরি হয়েছে পাসপোর্টের লালফিতের ফাঁস। অসুস্থ কবি সেসময়ে একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন। তারপর স্ত্রী প্রথমে বাতে আক্রান্ত হন, পরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। জীবনসঙ্গিনী সেই প্রমীলাদেবীর মৃত্যু হয় ৩০ জুন, ১৯৬২ সালে। তারপর কবির ফ্রেন্ড, ফিলোজফার কাম গাইড কাকাবাবু! তিনিও চলে গেলেন ৮৪ বছর বয়সে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৩।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ! বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের গান। সেই সঙ্গীতের উন্মাদনায়
একটার পর একটা রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা পেয়েছেন বিজয়ীর সম্মান। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি অবধারিতভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল নজরুলের ভবিষ্যৎ পরিণতি।
কবি ১৯৭৬-এর ২৯ আগস্ট ঢাকায় প্রয়াত হন। রেডিও-তে কবির মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হয়। তাঁর মরদেহ কলকাতায় আসবে কি আসবে না এই নিয়ে একটা দোলাচলতা সৃষ্টি হয়। শেষপর্যন্ত জানা যায় তাঁর মরদেহ ঢাকাতেই সমাহিত করা হবে।
“আর সবই ভাগ হয়ে গেছে শুধু, ভাগ হয়নিকো নজরুল”, কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের অমর পঙক্তি। ২৫ মে, ১৮৯৯, এই দিনে সাবেক বর্ধমান জেলার চুরুলিয়াতে জন্মেছিলেন নজরুল। এখন চুরুলিয়া পশ্চিম বর্ধমান জেলায়। সিয়ারশোল হাইস্কুলে পড়তেন। সেখানে রায়সাহেব মৃত্যুঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের ভাগিনেয় সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় তাঁর বাল্যবন্ধু ছিলেন। নজরুল থাকতেন ষষ্ঠীগড়িয়ার মেসবাড়িতে। সেখানেই রায়সাহেবের বাড়ি। এখন সেটি রানিগঞ্জে বঙ্গভবন নামে পরিচিত।
রানিগঞ্জ কর্মস্থল হওয়ায় ১৯৭৯ সাল থেকে সেখানেই ছিলাম। দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে পরিচয় হয়েছে কবির ভ্রাতুষ্পুত্র চুরুলিয়ার কাজী মোজাহার হোসেন এবং কাজী রেজাউল করিমের সঙ্গে। চুরুলিয়ার নজরুল আকাডেমিতে কবির হাতেলেখা পাণ্ডুলিপি, কবির পাওয়া স্বর্ণপদক, ব্যবহৃত জিনিসপত্র সহ পোশাক-পরিচ্ছদ সযত্নে রক্ষিত আছে। কবিপত্নী প্রমীলাদেবীর সমাধি আছে চুরুলিয়ায়। পরে সেখানে কবির প্রতীকী সমাধি তৈরি হয়। রয়েছে কবির স্মৃতিবিজড়িত ছেলেবেলার জায়গাগুলো। গুলমোহর গাছ, পুকুরঘাট। আজ জন্মদিনে সেখানে বসেই সম্ভবত বাঁশি বাজিয়েছেন একলা নজরুল। বাতাসে ধ্বনিত হয়েছে সেই আবাহনী। হোক না লকডাউন!
লেখক প্রাক্তন গ্রন্থাগারিক, প্রাবন্ধিক।