
শেষ আপডেট: 30 December 2018 22:28
প্রবুদ্ধ বাগচী
ঠিক কবে সেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছিল, আজ তা মনে পড়ে না। তবে স্টেটসম্যান পত্রিকায় রবিবার যে মিসসেলানি ক্রোড়পত্র বেরোত, লেখাটা বেরিয়েছিল সেখানেই। সেটা আশির দশকের গোড়ার দিক অথবা আর একটু পরে মাঝামাঝিও হতে পারে। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই রাজ্যের বৌদ্ধিক মানুষেরা ঠিক সেই সময়ে একটা দার্শনিক সংকটের মুখোমুখি। সংকট তাঁদের একদা চোখের মণি বামফ্রন্টের সরকার নিয়ে। মার্ক্সবাদের ধার ধারেন না এমন সব মানুষ তখন ক্রমশ জড়ো হচ্ছেন সেই দল ও সরকারের আশপাশে। আর যাঁরা মার্ক্সবাদের চর্চায় নিজেদের ঋদ্ধ করেছেন বলে একটু আধটু গর্বিত ছিলেন, তাঁরা ঠিক কল্কে পাচ্ছিলেন না সেই আবহে। অথচ হুট বলতে বিপরীত শিবিরে নাম লেখানোর হিড়িক তখনও তেমন স্বচ্ছন্দ ছিল না। তা ছাড়া তখন খোদ ইন্দিরা গান্ধী জীবিত, তাঁর পশ্চিমবঙ্গীয় এজেন্টটিও একদম নিস্তেজ নন। অন্তত কমিউনিস্টদের সরকারকে কী ভাবে বিরক্ত করা যায়, সে নিয়ে কলকাঠি নাড়ায় তার কোনও ক্লান্তি ছিল না। যদিও রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারকে সেই অর্থে শ্রমিক কৃষকের সরকার বলা যাবে কি না, এটা নিয়ে সচেতন মেধাজীবিদের মধ্যে একটা চাপা বিতর্কের আঁচ ছিলই। ফলে মার্ক্সবাদের আস্থাশীল অংশটি কিছু বিভ্রান্তিতে যখন এলোমেলো. তখনই মৃণাল সেন স্টেটসম্যান পত্রিকাকে সাক্ষাৎকারে জানান “আই অ্যাম এ প্রাইভেট মার্ক্সিস্ট”। সমকালে ওই কথা নিয়ে বিতর্ক বেঁধেছিল ঠিকই, কিন্তু তাতে তাঁর কিছু এসে যায়নি। প্রাইভেট মার্ক্সিস্ট এর ব্যঞ্জনা ঠিক কী, অথবা এর মধ্যে কোনও স্ববিরোধ আছে কি না, এই সব নিয়ে চর্চা হয়েছিল খুব। আজকের অনেকেরই সেই সব কথা হয়তো মনে নেই। কিন্তু কথাটা এই যে, একটা সময়ের দার্শনিক সংকটে তিনি নিজস্ব একটা অবস্থান নিতে পেরেছিলেন। এটা তাঁর না করলেও চলত। কিন্তু তিনি এটা প্রকাশ্যে করেছিলেন। কারণ, আমার অনুমান তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা আর মেধা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, একটা অবস্থানের দিশা দেখানো দরকার। মার্ক্সবাদের সংকট তিনি বুঝতেন। অনেক পরে সোভিয়েত ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার পরে তিনি যখন 'মহাপৃথিবী' ছবি করেন, তখন এই ভাবনার একটা আঁচ লেগেছিল তার ছবির শরীরেও। আসলে সিনেমার সমস্ত ব্যাকরণ শিখে ও মেনে সেগুলোকে অস্বীকার করার একটা স্পর্ধা বরাবরই ছিল তাঁর। একদম গোড়ার দিকের ছবি বাদ দিলে মৃণাল সেনকে আমরা চিনে রেখেছি মূলত দু'টো কারণে । প্রথমটা হলো, সম-সময়ের অসম্ভব ভাবে প্রামাণ্য এক ডকুমেন্টেশন করে রাখার জন্য। অগ্নিগর্ভ সত্তর দশক শুধু একটা রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারক ছিল এমন ভাবা ভুল, সেই দশক মুক্তির দশক হতে চেয়েছে সমস্ত সাবেকী চিন্তাচেতনার দিক থেকেও। এই মুক্তির পথ সেই অর্থে বোমা বন্দুকের পথ নয়। আর তা নয় বলেই 'পদাতিক'-এর নায়ক যখন শেষ অবধি বশ্যতার প্রান্তেই হেলে যেতে থাকে, পাশে পাশে তাঁর বাবা কিন্তু আপস থেকে সরে আসেন বেপরোয়া ঝুঁকির দিকে। কী জানি, সময়টা সত্তর দশক না হলে বোধ হয় এই সমস্ত সিদ্ধান্তের পেছনে পরিচালককে অনেক ভেবেচিন্তে যুক্তি সাজাতে হত। সময়ের এই স্বাক্ষর চিনতে ভুল করেননি মৃণাল সেন। যিনি ছবির বাস্তবতাকে দর্শকের সঙ্গে একই তলে মিলিয়ে দিতে, আর কিছুই না, অভিনেতার প্রকৃত নাম আর চরিত্রের নাম এক করে দিয়ে ধাক্কা দিয়ে দেন দর্শককে। দর্শক ভাবতে থাকেন, পর্দায় নয় এ তো ঘটছে তাঁরই একদিনে-প্রতিদিনে। ‘প্রাইভেট মার্ক্সিস্ট’ মৃণাল কিন্তু তাঁর চেতনার ফোকাসকে অবিচল রেখেও পরের পর্বে খানিক বদলে নিয়েছেন তাঁর চলা ও বলার ধরন। অনেকের অনুযোগ, বাঙালি মধ্যবিত্তের চেনা বৃত্তের বাইরে তাঁর ক্যামেরা বেরোতে পারেনি। কিন্তু নিজের শ্রেণির চরিত্র তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখা কেন এক জন পরিচালকের অন্বিষ্ট হবে না, এই প্রশ্নের জবাব আমি অনেক হাতড়েও খুঁজে পাইনি। সরাসরি পলিটিক্যাল ফিল্মে তিনি মধ্যবিত্তের দোলাচল ও হিপোক্রিসি নিয়ে যে ছবি তুলেছেন, তার কোনও ঐতিহাসিক মূল্য নেই এটা বিশ্বাস করা শক্ত। আর তা ছাড়া শুধু এমন ভাবেই বা ভাবব কেন ? 'কলকাতা ৭১', 'ইন্টারভিউ' বা 'পদাতিক'-এর ট্রিলজিতে কি এক রক্তাক্ত সময়ের পায়ের ছাপ নেই? নেই এক দানবীয় সময়ে রাষ্ট্রশক্তির নির্লজ্জ দাপট, যা কোথাও যেমন চিনিয়ে দেয় এমনটাই হয় ও হতে বাধ্য! অন্যদিকে মার্ক্সবাদের প্রাসঙ্গিকতাও তো তির্যক ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় ওইসব আখ্যানের ভিতর-বাইরে। আর মধ্যবিত্তের মননেই যে মার্ক্সবাদের নানা দ্বন্দ্বের ওঠাপড়া প্রবল এই তথ্য ও সত্য তাঁর মতো আর কে-ই বা জেনেছিল? তাঁর পরের ছবিগুলোয় যখন তিনি নতুন নতুন কিছু ভাবনায় নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে চাইছেন, অন্তত 'খণ্ডহর' বা 'জেনেসিস'-এর মতো ছবিতে সেখানে কাহিনির তলায় তলায় বোনা হয়ে থাকে বিভিন্ন স্তরের সব প্রশ্ন, যার থেকে খুব অনায়াসে মার্ক্সবাদী জীবন জিজ্ঞাসাকে খোসা ছাড়িয়ে আলাদা করে ফেলা যায়, ব্যাপারটা এমন সোজা-সাপটা নয় মোটেও । 'অন্তহীন' বা 'এক দিন অচানক'-এর বুননে যে বিচ্ছিন্নতা যে নিরাশ্রয়তার আল্পনা, সে তো এই বৈরি সমাজে একক মানুষের সংকট এবং তাকে মার্কসবাদ দিয়ে বিচার ও ব্যাখ্যা করা যায়। মার্ক্সবাদী মৃণাল এটুকু জেনে বুঝে এবং নিজের মতো করে তাকে বর্ণিল করেই তৈরি করেছেন। ওই নিজস্ব রঙটুকুই আসলে তাঁর ‘প্রাইভেট’, তাঁর একান্ত সৃজনশীল নির্মাণ, যার সঙ্গে মার্ক্সিস্ট শব্দটিকে সংস্কারহীনভাবে জুড়ে দেওয়া যায়। হয়তো এই নক্ষত্র পতনের সঙ্গে আমাদের আরও এক বার ভেবে দেখা দরকার, তাঁর নিজের শেষ ছবিটির শিরোনাম 'আমার ভুবন'-এর কথা । এখানে ‘আমার’ শব্দটা কি ব্যক্তি মৃণালের নাকি একটি সময়ের প্রতিনিধি মৃণাল সেনের কথা বলে? এই ভাবনাগুলো এখন আমাদের আগামী কাজের তালিকায় ঢুকে গেলই বলা যায়। তবে তাঁর বিষয়ে শেষ যে দু'টি কথা না বললে অবিচার হবে, তা হল, একটা বিশেষ কাল পর্বে নিজেকে একটি অভিধায় ঘোষিত করে তিনি শুধু নিজের ঠিকানা চিহ্নিত করেননি। একটা বার্তা দিয়েছিলেন সেই প্রজন্মকে, যে মানুষগুলো ক্রমশ সময়ের চাপে আরও বিবিক্ত হয়ে পড়বেন এক দিন, যাঁদের আশ্রয় খুঁজতে হবে নিজেদের মতো এক এক ঠিকানায়। যত সাবেকি মার্ক্সবাদীরা হারিয়ে ফেলবেন তাঁদের আলোকবর্তিকা। বাস্তবিক ঘটলোও তো তাই। আর উত্তর-নন্দীগ্রাম পর্বে কলকাতায় যে দুটি প্রতিস্প্রর্ধী মিছিলের আয়োজন যার দু'টিতেই তাঁর উপস্থিতি ঘিরে একদা সমালোচনার ঝড়, সেই প্রেক্ষিতেই বলা দরকার, এই মৃণাল সেনই গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি বামফ্রন্ট আর বাবা তারকনাথের যুগলবন্দি নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও নিরাশা ব্যক্ত করেছিলেন। আজ যখন লাঠিবাজদের উপদ্রব রথ থেকে রাম হয়ে আরও আরও বিষাক্ত পথের দিকে আমাদের টেনে আনছে, তখন মনে পড়ল, মার্ক্সবাদী চিত্রপরিচালক হিসেবে এই সময়ের লিখন তিনি তা হলে আগেই পড়তে পেরেছিলেন। এই প্রাইভেট মার্ক্সিস্টের মৃত্যু কি আমাদের কোথাও একটু গা ছমছম ভয় দেখিয়ে গেল না ? সেই ভয় একা থাকার, একা হয়ে যাওয়ায়। একা হতে হতে কাউকে খুঁজে না পাওয়ারও ভয়।