
শেষ আপডেট: 18 September 2021 10:53
রাম তৈরির কারখানায় ক্রীতদাসেরা[/caption]
'রাম্বুলিয়ন' থেকে 'রাম'
সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিভিন্ন দ্বীপ দখল করে নিয়েছিল আমেরিকান, ইংরেজ, ফরাসি, ফ্রেঞ্চ, ডাচ ও স্প্যানিশ হানাদারেরা। জঙ্গল সাফ করে আখ চাষ করার জন্য, জাহাজ ভর্তি করে ক্রীতদাস নিয়ে আসা হয়েছিল আফ্রিকা থেকে। আখের রস থেকে উৎপাদিত হতো চিনি ও কড়া পানীয় 'রাম্বুলিয়ন'। ১৬৬৭ সালে ছোট হয়ে গিয়েছিল 'রাম্বুলিয়ন' শব্দটি। বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল 'রাম' নামটি। বার্বাডোজেই ১৭০৩ সালে তৈরি হয়েছিল বিশ্বের প্রথম ব্র্যান্ডেড রাম 'মাউন্ট গে'। আজও বিক্রি হয় সেই রাম।
[caption id="attachment_2353099" align="aligncenter" width="600"]
'মাউন্ট গে' রাম[/caption]
ওয়েস্ট ইন্ডিজে আসা বিদেশি হানাদার, সৈনিক, বন্দরগুলিতে নোঙর করা জাহাজের নাবিক, এমনকি জলদস্যুদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল রাম। তাই রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ১৮৮৩ সালে লেখা ট্রেজার আইল্যান্ড (Treasure Island) উপন্যাসে, দলদস্যু লং জন সিলভারেরও প্রিয় পানীয় ছিল রাম। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই রেশনের সঙ্গে রাম দেওয়ার প্রথাও শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ সেনাবিহিনীতে। পরবর্তীকালে যে প্রথা ছড়িয়ে পড়েছিল বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যেও।
প্রথম দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজ, জ্যামাইকা ও গায়েনার ডিমেরারাতে রামের উৎপাদন শুরু হলেও, নাবিকদের হাত ধরেই রাম চলে গিয়েছিল কিউবা ও পুয়ের্তো রিকোতে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে দেশদুটি উৎপাদন করতে শুরু করেছিল, অপেক্ষাকৃত হালকা ধরণের রাম। যা আজ ড্রাই রাম নামে পরিচিত। এভাবেই নাবিক ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির সেনাবাহিনীর হাত ধরে রাম ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে।
[caption id="attachment_2353108" align="aligncenter" width="600"]
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বন্দর থেকে জাহাজে ওঠানো হচ্ছে রামের পিপে[/caption]
আজ সারা পৃথিবী জুড়ে কয়েক হাজার কোম্পানি কয়েক হাজার ব্র্যান্ডের রাম তৈরি করে। বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে আছে রন জাকাপা, মাউন্ট গে, ফাকুন্ডো, ডন পাপা, হাভানা ক্লাব, সান্তা তেরেসা, ব্যাকার্ডি, ক্যাপ্টেন মরগ্যান, বার্সেলো, ওল্ড পোর্ট, বোজকভ, কেনিয়া কেন ইত্যাদি। কিন্তু ভারতীয় সুরাপ্রেমীরা সাত দশক ধরে মজে আছেন একটি ব্র্যান্ড নিয়ে। সেটি হল 'ওল্ড মঙ্ক'।
হিমাচলের কসৌলি
হিমাচল প্রদেশের ছবির মত সুন্দর উপত্যকা কসৌলিতে, ১৮৫০ সালে কসৌলিতে এসেছিলেন স্কটিশ শিল্পপতি স্যার এডোয়ার্ড ডায়ার। সম্পর্কে ইনি ছিলেন জালিওয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মূল চক্রী কর্নেল ডায়ারের বাবা। এডোয়ার্ড ডায়ার ভারতে এসেছিলেন গরমে কাহিল ব্রিটিশ সেনাদের জন্য বিয়ার তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে। ১৮৫৫ সালে কসৌলিতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এশিয়ার প্রথম সুরা তৈরির কারখানা 'ডায়ার ব্রুয়ারিজ'। যেখান থেকে উৎপাদিত হতো 'লায়ন' বিয়ার। এশিয়ায় উৎপাদিত প্রথম বিয়ার।
[caption id="attachment_2353114" align="aligncenter" width="600"]
কসৌলির পাহাড়ে ডায়ারের সেই ডিস্টিলারি[/caption]
পরবর্তীকালে এডোয়ার্ড ডায়ার কসৌলি থেকে বিয়ার কারখানাটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন সিমলার কাছে থাকা সোলানে। কসৌলির কারখানায় উৎপাদিত হতে থাকে রাম ও হুইস্কি। সুরা ব্যবসায় অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়ে, এডোয়ার্ড ডায়ার এরপর দক্ষিণ ভারতের উটি, পাকিস্তানের মুরে, রাওয়ালপিন্ডি, কোয়েটা ও বার্মাতেও সুরা উৎপাদন শুরু করেছিলেন।
ভারতে এসেছিলেন মিকিন সাহেব
স্যার এডোয়ার্ড ডায়ারের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ইংল্যান্ড ভারতে থেকে চলে এসেছিলেন শিল্পপতি এইচ জি মিকিন। তিনি এডোয়ার্ড ডায়ারের কাছ থেকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিনে নিয়েছিলেন সোলান ও সিমলার কারখানা। যাত্রা শুরু হয়েছিল মিকিন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের। রানিক্ষেত, ডালাহৌসি, চক্রাতা, দার্জিলিং এমনকি শ্রীলঙ্কাতেও সুরা তৈরির কারখানা বানিয়েছিলেন মিকিন।
এডোয়ার্ড ডায়ার ও এইচ জি মিকিন আলাদা ও সফলভাবে সুরা ব্যবসা করলেও, ১৯৩৭ সালে তাঁদের কোম্পানি দু'টি মিশে গিয়েছিল। নতুন কোম্পানিটির নাম হয়েছিল 'ডায়ার মিকিং ব্রুয়ারিজ'। অত্যন্ত ভালো চলছিল ব্যবসা। বিশ্বজুড়ে রপ্তানি শুরু হয়েছিল ভারতে প্রস্তুত বিদেশি সুরা। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এক সময় চরমে উঠেছিল। যার প্রভাব পড়েছিল ডায়ার মিকিং ব্রুয়ারিজের ওপরও।
[caption id="attachment_2353120" align="alignnone" width="445"]
ডায়ারের ডিস্টিলারির ভ্যাট[/caption]
সুরা ব্যবসায় পা রেখেছিলেন নরেন্দ্র নাথ মোহন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গাজিয়াবাদের ব্যবসায়ী নরেন্দ্র নাথ মোহন চলে গিয়েছিলেন লন্ডনে। শেয়ার বাজার থেকে কিনে নিয়েছিলেন ডায়ার মিকিং ব্রুয়ারিজের সিংহভাগ শেয়ার। অবশিষ্ট শেয়ারগুলিও ধীরে ধীরে কিনতে শুরু করেছিলেন। এভাবেই ১৯৪৯ সালে ডায়ার মিকিং ব্রুয়ারিজের মালিকানা চলে এসেছিল নরেন্দ্র নাথ মোহনের হাতে। নরেন্দ্র নাথ মোহন, তাঁর বড় ছেলে বেদ রতন মোহনকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ইউরোপে। সুরা তৈরির কৌশল শেখার জন্য। ইউরোপের গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রতিভাবান যুবক বেদ রতন মোহন সংগ্রহ করতেন সুরা তৈরির রেসিপি। লিখে রাখতেন খাতায়।
[caption id="attachment_2353126" align="aligncenter" width="600"]
বেদ রতন মোহন[/caption]
সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী
ইউরোপের এক গ্রামে বেদ রতন মোহনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ক্যাথলিক চার্চের বেনেডিক্টাইন শাখার কয়েকজন সন্ন্যাসীর। মধ্য যুগ থেকেই সেন্ট বেনেডিক্টের অনুসারীরা এক গোপন রেসিপি দিয়ে সুরা প্রস্তুত করে আসছিলেন। খ্রিস্টান ধর্মে সুরা তৈরি ও সুরা পান অপরাধ নয়। বিশেষ করে ক্যাথলিক শাখার বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল সুরা। চার্চে প্রার্থনার পর সুরায় ডোবানো রুটির টুকরো দেওয়া হয় উপস্থিত ভক্তদের। রুটিকে মনে করা হয় প্রভু যিশুর দেহ ও সুরাকে মনে করা হয় প্রভু যিশুর রক্ত। এভাবেই নিজেদের শরীরে প্রভু যিশুকে সমাহিত করেন ক্যাথলিকেরা।
সন্ন্যাসীদের সুরা তৈরির পদ্ধতি দেখার জন্য উৎসাহ প্রকাশ করেছিলেন বেদ রতন মোহন। কিন্তু সন্ন্যাসীরা রাজি ছিলেন না। বহু সাধ্যসাধনার পর মিলেছিল অনুমতি। সন্ন্যাসীরা বেদ রতন মোহনকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে। তিনি বেদ রতন মোহনকে হাতেকলমে দেখিয়েছিলেন বাকফাস্ট টনিক ওয়াইন প্রস্তুত করার সুপ্রাচীন পদ্ধতি। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বেশ কিছু জড়িবুটি ও মসলা ব্যবহার করেছিলেন সুরা উৎপাদনের একটি বিশেষ ধাপে। যেটি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন বেদ রতন মোহন। দিনের পর দিন বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে গোপন পদ্ধতিটি শিখে নিয়েছিলেন বেদ রতন মোহন।
[caption id="attachment_2353131" align="aligncenter" width="300"]
সুরা প্রস্তুত করছেন বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসী[/caption]
সুরা শিল্পে বিপ্লব এনেছিল কসৌলি
ভারতে ফিরে বাবা নরেন্দ্র মোহনের অনুমতি নিয়ে বেদ রতন মোহন নেমে পড়েছিলেন কর্মযজ্ঞে। বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর গোপন রেসিপি দিয়ে কসৌলির ডিস্টিলারিতে তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ নতুন স্বাদের সুগন্ধী রাম। উৎপাদন পদ্ধতিতে যুক্ত হয়েছিল হিমালয়ের ঝরনার জল, হিমালয়ের ওক গাছের ভ্যাট ও কাঠকয়লা। বেদ রতন মোহন ও হাতে গোনা কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মচারী ছাড়া কেউ জানতেন না এই গোপন রেসিপি। ১৯৫৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর, ডায়ার ও মিকিন কোম্পানি, ভারতের বাজারে এনেছিল ভারতে তৈরি প্রথম ব্র্যান্ডেড রাম। বেদ রতন মোহন পানীয়টি উৎসর্গ করেছিলেন ইউরোপের সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে। ব্র্যান্ডটির নাম দিয়েছিলেন ওল্ড মঙ্ক'।
শোনা যায় অন্য একটি কাহিনিও
এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়ায় বর্তমানে 'ওল্ড মঙ্ক' আমদানি করে হোভি ট্রেডিং। সংস্থাটি দাবি করে ব্রিটিশদের হাতেই তৈরি হয়েছিল ওল্ড মঙ্ক। কসৌলিতে ধর্ম প্রচারে এসেছিলেন এক বৃদ্ধ বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসী। যেহেতু দেশে তিনি সুরা উৎপাদন করতেন। তাই তিনি একদিন কৌতুহলবশত গিয়েছিলেন ডায়ার ব্রুয়ারিজে। বিভিন্ন ভ্যাট খুলে রামের গন্ধ নিয়েছিলেন সন্ন্যাসী। গন্ধ শুঁকেই বলে দিচ্ছিলেন কোন ভ্যাটের রাম এখনই বোতলবন্দী করে বাজারে পাঠানো উচিত। কোনটা ভ্যাটের রাম বাজারে পাঠাতে কত বছর সময় লাগবে।
একজন সন্ন্যাসীর এই দক্ষতা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ডিস্টিলারির কর্মচারীরা। এই সন্ন্যাসীই নাকি দেশে ফেরার আগে দিয়ে গিয়েছিলেন এক গোপন রেসিপি। সেই রেসিপি দিয়েই নাকি তৈরি করা শুরু হয়েছিল সুগন্ধী রাম। পরবর্তীকালে বেদ রতন মোহন ব্র্যান্ডটির নাম রেখেছিলেন 'ওল্ড মঙ্ক'। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী কোথাকার তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ওল্ড মঙ্কের অতুলনীয় স্বাদ ও গন্ধের পিছনে যে একজন বাস্তবের বেনেডিক্টটাইন সন্ন্যাসীর অবদান আছে তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই।
কোম্পানির নাম পাল্টাতে বলেছিলেন নেহেরু
প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ১৯৬৩ সালে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য কিছুদিন সিমলায় ছিলেন। একদিন তিনি সোলানে অবস্থিত ডায়ার মিকিন ডিস্টিলারি পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন। কোম্পানির ইতিহাস শুনে তিনি কোম্পানির নাম থেকে ডায়ার শব্দটি বাদ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কারণ ডায়ার শব্দটির প্রতি সকল ভারতবাসীর মত তাঁরও ছিল অসীম ঘৃণা। প্রধানমন্ত্রীর আবেগ বুঝতে পেরেছিলেন নরেন্দ্র নাথ মোহন। ডায়ার মিকিন ডিস্টিলারির নতুন নাম হয়েছিল মোহন মিকিন লিমিটেড।
[caption id="attachment_2353145" align="aligncenter" width="600"]
মোহন মিকিন লিমিটেড[/caption]
নরেন্দ্র নাথ মোহন প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৬৯ সালে। বাবার মৃত্যুর চার বছর পর, মাত্র ৪৫ বছর বয়েসে প্রয়াত হয়েছিলেন বেদ রতন মোহন। দাদার মৃত্যুর পর কোম্পানির হাল ধরেছিলেন ভাই, ব্রিগেডিয়ার কপিল মোহন। আজ 'মোহন মিকিন' দেখভাল করছে মোহন পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম।
আরও পড়ুন: গোদাবরী অরণ্যের সন্ন্যাসীরাজা, গেরিলা যুদ্ধে কাঁপন ধরিয়েছিলেন ব্রিটিশদের বুকে
সময় বদলেছে, বদলায়নি ওল্ড মঙ্ক
সাত দশক কেটে গেলেও পুরোনো রেসিপি দিয়ে আজও তৈরি হয় ওল্ড মঙ্ক। তাই স্বাদ আজও অপরিবর্তিত। সুরাপ্রেমীরা ওল্ড মঙ্কে খুঁজে পান কাঠ কয়লা, ক্যারামেল, পাকা পিচ ফল, কফি বিন, কিশমিশ, ভ্যানিলা, দারুচিনির গন্ধ। আজ অবধি কেউ জানতে পারেনি কী মশলা মেশানো হয় ওল্ড মঙ্কে। কোকাকোলার ফর্ম্যুলার মতোই গোপন রাখা হয়েছে রেসিপি।
প্রথম লম্বা বোতলে বাজারে আসত ওল্ড মঙ্ক। তারপর 'ওল্ড পার' নামে একটি স্কচ হুইস্কির বোতলের আদলে বেদ রতন মোহন ওল্ড মঙ্কের বোতলের নকশা বানিয়েছিলেন। 'ওল্ড পার' কোম্পানি গিয়েছিল আদালতে। পরে দুই কোম্পানি সন্ধিতে রাজি হয়েছিল। 'ওল্ড পার' বাজারে এসেছিল কালো কাঁচের বোতলে, ওল্ড মঙ্ক সচ্ছ কাচের বোতলে। সেই থেকে আজ অবধি, অনান্য আকৃতির বোতল এলেও, ওল্ড মঙ্কের পেটমোটা পুরোনো বোতলের কোনও পরিবর্তন হয়নি।
ওল্ড মঙ্কের বিভিন্ন বোতলের গায়ে লেপটে থাকা লেবেল পালটানো হয়নি। লেবেলের গায়ে এক হাসিখুশি মানুষের মুখ দেখা যায়। অনেকে অনুমান করেন এটি এইচ জি মিকিনের মুখ। এই তথ্যও গোপন রেখেছে 'মোহন মিকিন'।
ওল্ড মঙ্ক মানেই নস্টালজিয়া
ভারতের বিভিন্ন সুরা প্রস্তুতকারক কোম্পানি সুকৌশলে তাঁদের কোম্পানি উৎপাদিত সুরার প্রচার চালান ম্যাগাজিন ও টেলিভিশনে। মিনারেল ওয়াটার, সোডা ও সিডির ছদ্মবেশে পাঠক বা দর্শকের সামনে উপস্থিত হয় সুরাগুলির নাম। কিন্তু ওল্ড মঙ্ককে এই অসৎ পথের আশ্রয় নিতে হয়নি কোনও দিন। ওল্ড মঙ্কের প্রচারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন সুরাপ্রেমীরাই। কারণ গত সাত দশক ধরে ভারতের বেশিরভাগ সুরাপ্রেমীর সুরাপানের হাতেখড়ি ওল্ড মঙ্ক দিয়ে।
অনেকের যৌবনের বল্গাহীন দিনগুলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওল্ড মঙ্ক। পরবর্তীকালে সুরাপ্রেম হয়ত অনেককে নিয়ে গেছে সিঙ্গল মল্ট হুইস্কির উচ্চতায়। তবুও তাঁরা ভুলতে পারেননি ওল্ড মঙ্ককে। কারণ ওল্ড মঙ্ক মানেই অতীতের সোনালি পথে ফিরে যাওয়া। ওল্ড মঙ্ক ফিরিয়ে দেয় প্রথম বারে যাওয়ার দিনটিকে। কলেজ জীবনের লাগামছাড়া সন্ধ্যাগুলিকে। যে সন্ধ্যাগুলিতে সঙ্গ দিতো ওল্ড মঙ্ক, সস্তা সিগারেট ও গিটার। ওল্ড মঙ্ক নিয়ে মাতামাতি চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন চিত্রগ্রাহক ইয়ান পেরেরা। ২৭ বছর ধরে তিনি ওল্ড মঙ্কের একনিষ্ঠ ভক্ত। মুম্বাইতে পেরেরা গড়ে তুলেছেন ওল্ড মঙ্কের ফ্যান ক্লাব। নাম 'কমরেড' (Council of Old Monk Rum Addicted Drinkers and Eccentrics)।
হারুন ইন্ডিয়ান লাস্কারি কঞ্জিউমার সার্ভের মতে, ওল্ড মঙ্ক হলো ভারতের বিত্তশালী মানুষদের সব থেকে পছন্দের সুরা। সেই সমস্ত বিত্তশালী, যাঁরা ইচ্ছে করলেই প্রতি সন্ধ্যায় কিনতে পারেন লক্ষ টাকা দামের বিদেশি হুইস্কি। পার্টিতে পছন্দের সুরা না দেখলে যাঁদের ভুরু কুঁচকে যায়। তাঁরাও কিন্তু এক পেগ ওল্ড মঙ্কের অফার আজও ফিরিয়ে দেন না। ওল্ড মঙ্কের গ্লাস হাতে নিয়ে ভিড় থেকে সরে যান। স্মৃতির সরণি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একাই ফিরে যান, ওল্ড মঙ্কের বোতলের ছিপি দিয়ে পেগ মাপার দিনগুলিতে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'