
শেষ আপডেট: 24 December 2018 16:26
নিরুপমের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলনের পর। আমি জেল থেকে বেরনোর পর বর্ধমানে একটি কর্মসূচিতেই ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। আমার সঙ্গে একই সেলে ছিলেন অধ্যাপক সলিল ভট্টাচার্য। সলিলই আমায় প্রথম নিরুপমের কথা বলেছিলেন। উথালপাথাল সেই সময়ে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে বর্ধমানে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন নিরুপম।
৭০ সালে কেরলের তিরুবনন্তপুরমে এসএফআই গঠনের সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন নিরুপম। সম্মেলনের শেষপর্বে এসএফআই-এর পতাকার রঙ কী হবে তা নিয়ে সম্মেলনে প্রতিনিধিদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়। আমরা প্রস্তাব করি সাদা পতাকার উপর লাল তারা থাকবে। কেরল সহ একাধিক দক্ষিণের রাজ্যের প্রতিনিধিরা বলেন, পতাকার রঙ লাল করতে হবে। ফের আলোচনা শুরু হয় সম্মেলনে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিরুপমের সেদিনের বক্তৃতা শুনে অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, এ ছেলে তাত্ত্বিক ভাবে অনেক শক্তিশালী। তারপর ভোটাভুটি হয়। আমার এখনও মনে আছে, পশ্চিমবঙ্গের ২৭৭ জন প্রতিনিধির ১০০ শতাংশ ভোট সাদা পতাকার পক্ষে পড়েছিল। নিরুপমের বক্তৃতায় প্রভাবিত হয়েছিলেন অনেকেই। সাদা পতাকা করার যে যুক্তি নিরুপম তুলে ধরেছিলেন তা একটা ইতিহাস।
তিরুবনন্তপুরম সম্মেলনেই এসএফআই-এর প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নিরুপম। এরপরেই ৭১ সালে ওঁর নামে জারি হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। শ্যামনগরে কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং হচ্ছিল। আমরা দেখলাম নিরুপম এসেছেন। কিন্তু সবার সামনে তো ওঁর নাম বলা যাবে না। তাই আমরা তখন বললাম, “কমরেড হরিদাস” এসেছেন। এরপর থেকে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নামেই পরিচিত ছিলেন নিরুপম।
সিদ্ধার্থ রায়ের জমানায় একটা বড় সময় আত্মগোপন করেছিলেন নিরুপম। কলকাতায় ওঁর থাকার জায়গার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব পড়েছিল আমার উপরেই। নিরুপম যেদিন চন্দ্রাবলীকে বিয়ে করবে, তার আগের দিন এসে আমার বাড়িতেই উঠেছিল। আমার তখন মেয়ে হয়নি। আমি, আমার স্ত্রী, নিরুপম আর চন্দ্রাবলী এক বিছানায় কোনওরকমে রাত কাটিয়েছিলাম। পরের দিন রেজিস্ট্রারের কাছে নিয়ে যেতে হবে ওঁদের। মদন ঘোষ এবং চন্দ্রাবলীর দাদাই সব ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু চিন্তা ছিল একটাই, নিরুপমের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তাহলে কী বলা হবে ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে! অবশেষে একটা উপায় বের করে আমরা অনেকে মিলে নিরুপম আর চন্দ্রাবলীকে নিয়ে গেলাম ওয়েলিংটনের কাছে এক ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিসে। তারপর সইসাবুদ সেরে আমরা সবাই মিলে সাবিরে খেতে গিয়েছিলাম।
নিরুপমের সঙ্গে আমার, সুভাষের (চক্রবর্তী) এবং বিমানদার (বসু) চরিত্রগত একটা পার্থক্য ছিল। আমরা যেকোনও আন্দোলনেই সামনের সারিতে থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। কিন্তু নিরুপম সবটা করতেন গুছিয়ে। ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন প্রচারপত্রে আমাদের বক্তব্য লেখার কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিতেন নিরুপমই।
পরবর্তীকালে পার্টির জেলা সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়া এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারে মন্ত্রী হয়ে যে ভূমিকা নিয়েছিলেন নিরুপম তা অবশ্যই আমাদের রাজ্যের বাম আন্দোলনে একটা উল্লেখযোগ্য পর্যায়। ওঁর মৃত্যু সামগ্রিক ভাবে বাম গণ আন্দোলনের কাছে একটা বড় ধাক্কা।
লেখক সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য