
শেষ আপডেট: 29 December 2023 13:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মৃত্যুতেই সব শেষ নয়। এর পরেও এক অপার্থিব জগতের ব্যাখ্যা দেন অনেকে। মৃত্যুর পরবর্তী পর্যায় নিয়ে কৌতূহল সীমাহীন। নানারকম গবেষণা আছে একে ঘিরে। বিশিষ্ট জনেরা বিভিন্ন সময়ে মৃত্যু পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে লেখালিখি করে গেছেন। আধ্যাত্মিক বিশ্বাসও আছে, প্রাচীন বিভিন্ন গ্রন্থে তার প্রমাণ মেলে। তবে সেসব পরের কথা। মৃত্যুপথযাত্রী যখন শেষ নিঃশ্বাস ফেলছেন ঠিক সেই সময়টা থেকে মৃত্যুর পরের কিছুটা সময় ধরে ঠিক কী কী ঘটে, সেই ‘নিয়ার ডেথ এক্সপেরিএন্স’-এর কথা শুনিয়েছেন অনেকেই। ব্রিটেনের এক তরুণীর ৪০ মিনিটের জন্য ‘ক্লিনিকাল ডেথ’ হয়েছিল। তারপর ফের বেঁচে উঠে সেই অভিজ্ঞতার কথাই শুনিয়েছেন তিনি।
নর্থ ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা ক্রিস্টি বরটফ্টের সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তিন সন্তানের মা ক্রিস্টি নানারকম শারীরিক সমস্যায় ভুগতেন। হার্টের অসুখ আগে থেকেই ছিল। ক্রিস্টি জানাচ্ছেন, তিন সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে পার্টনারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাবেন ভেবেছিলেন। রাতে যখন তাঁরা দুজনে একসঙ্গে ডিনার করতে করতে টিভি দেখছেন তখন হঠাৎই বুকে ব্যথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে সোফায় এলিয়ে পড়েন ক্রিস্টি। তারপর আর কিছু মনে নেই তাঁর।
ক্রিস্টি বলছেন যখন তিনি জেগে ওঠেন তখন দেখেন তাঁর দেহ পড়ে রয়েছে হাসপাতালের বিছানায়। তাঁর পরিবারের লোকজনেরা সকলে কাঁদছে। তাঁর বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকা তাঁর দেহের ভেতর ঢুকতে। কিন্তু পারেননি। তারপর কী হয়েছিল মনে নেই ক্রিস্টির। আরও কিছুক্ষণ পরে দেখেন যে তিনি তাঁর বোনের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে।
ক্রিস্টি বেঁচে ওঠার পরে তাঁর বোন তাঁকে বলেন যে মৃত্যু ও বেঁচে ওঠার মাঝের সময়টা ক্রিস্টি তাঁর বাড়িতে নাকি গিয়েছিলেন। ক্রিস্টির শরীর ছিল ধোঁয়ার মতো। তিনি তাঁকে বলছিলেন যে, তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছে। তাঁর দেহটা কেমন ভেঙেচুরে গেছে। তিনি আর ওই দেহে ঢুকতে পারছেন না। নিজের সন্তানদের কথা ও বাবার কথাও বোনকে বলেন ক্রিস্টি। তাঁদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লিস্ট লিখে রাখতে বলেন।
ক্রিস্টির কথায়, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার আত্মা শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে। আমার দেহ এতটাই বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল যে আমি তার মধ্যে ঢুকতে পারছিলাম না। চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তারপর কীভাবে যেন আমি আবার আমার অসাড় দেহটার ভেতর ঢুকে গেলাম। দেখলাম আমার হার্ট চলতে শুরু করেছে, আমি শ্বাস নিতে পারছি।”
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হার্ট অ্যাটাকের পরে কোমায় চলে গিয়েছিলেন ক্রিস্টি। ৪০ মিনিট তাঁর ক্লিনিকাল ডেথ হয়েছিল। বাড়ির সকলকে বলা হয়েছিল মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে। ক্রিস্টি যে বেঁচে উঠবে তা সত্যিই অবিশ্বাস্য ঘটনা। এমন গভীর কোমা থেকে ফেরাটা কঠিন। তবে এক্ষেত্রে অলৌকিক কাণ্ড ঘটেছে বলেই দাবি করেছেন চিকিৎসকরা।
মৃত্যুর পরে মানব শরীরে কী হয় সে নিয়ে যত গবেষণা, লেখালিখি হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি মনে রাখার মতো। মনে পড়ে, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে-র কথা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রণক্ষেত্রে গুলি লেগে মৃত্যু হয় আর্নেস্টের। বেশ কিছুদিন ভুগেছিলেন তিনি। সেই সময় ডায়রি লিখতেন আর্নেস্ট। মৃত্যুর ঠিক আগে কিছু কথা ডায়রিতে লিখে গিয়েছিলেন তিনি। আর্নেস্ট তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে লিখেছিলেন, “আমি মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখেছি। মৃত্যু খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। আমি অনুভব করেছি মৃত্যুকে। নিজের চোখে নিজের মৃত্যু দেখেছি।” নিজের শরীর থেকে আত্মাকে বেরিয়ে যেতে দেখেন অনেকে। মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে এসে এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন অনেকেই। ‘দ্য স্নো অব কিলিমাঞ্জারো’ ছোট গল্পে আর্নেস্টের অভিজ্ঞতার সেই কথা লেখা আছে।
হার্ট অ্যাটাকে হৃদযন্ত্র থেমে যাওয়ার পরেও বেঁচে ফিরেছেন অনেকে। তেমনই একজন বলেছিলেন, কিছুক্ষণের জন্য তিনি আলোর তরঙ্গ দেখতে পান। উজ্জ্বল আলোর বিন্দু ঘোরাফেরা করছিল তাঁর চারপাশে। মৃত্যুর মুখে থেকে ফিরে আসার পরেও সেই ক্ষণটুকুর স্মৃতি টাটকা থাকে অনেকেরই। কেউ দেখতে পান আলোর জ্যোতি, কেউ বলেন অন্ধকার সুড়ঙ্গে নিজেকে হাঁটতে দেখেছেন, সেই সুড়ঙ্গের শেষে ছিল উজ্জ্বল আলো। কেউ আবার নিজের মৃত আত্মীয়-পরিজনকে দেখতে পান, নিজের মৃতদেহও দেখতে পান অনেকে।
মৃত্যুর পরেও সজাগ থাকে মস্তিষ্ক। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্ত থেকে মৃত্যুর পর অবধি ৯০০ সেকেন্ড সময় ধরে তাঁরা মস্তিষ্কের হালচাল লক্ষ্য করেছেন। দেখা গেছে মৃত্যুর ৩০ সেকেন্ড পর অবধিও মস্তিষ্ক সজাগ ও সক্রিয় থাকে। তাতে স্নায়বিক ক্রিয়াগুলো চলতে থাকে। কোষ ও স্নায়ুর ক্রিয়া সচল থাকায় তরঙ্গের মতো প্রবাহ দেখা যায় মস্তিষ্কের ভেতরে। একে বলে ‘গামা অসিলেশন’। তাছাড়া আলফা, বিটা, ডেল্টা ও থিটা অসিলেশনও হয়। এমন স্নায়বিক আলোড়ন যা ব্রেনকে বাঁচিয়ে রাখে মৃত্যুর পরেও। এই সময়টাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্নায়বিক আলোড়নের কারণে মৃত ব্যক্তি তখন চোখের সামনে আলোর তরঙ্গ দেখতে পায়। অতীতের নানা স্মৃতি ভেসে ওঠে। হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুই ভেসে ওঠে চোখের সামনে।