Mysterious Death of Marilyn Monroe
মাত্র ৩৬ বছর বয়েসে মেরিলিন মনরো-এর আকস্মিক মৃত্যুর খবর পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। হলিউড চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরী ও গ্ল্যামারাস নায়িকা ছিলেন মেরিলিন মনরো ওরফে নর্মা জীন বেকার। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ বলেছিল এটা একটা দূর্ঘটনা। কিন্তু মৃতদেহ পরীক্ষকরা (coroner) বলেছিলেন এটা আত্মহত্যা। কিন্তু আদৌ কি কোনও দূর্ঘটনা ঘটেছিল, আদৌ কি মেরিলিন মনরো আত্মহত্যা করেছিলেন!
[caption id="attachment_209566" align="aligncenter" width="928"]

মেরিলিন মনরো[/caption]
১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট
বিশ্ববিখ্যাত চিত্রতারকা মেরিলিন মনরোর লস অ্যাঞ্জেলসের বাড়িতে শুয়েছিলেন মেরিলিন মনরোর হাউসকিপার মিস ইউনিস মুরে। রাত তিনটের সময় হাউসকিপার মুরে দেখেছিলেন মেরিলিনের ঘরে আলো জ্বলছে। ঘরটির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। মেরিলিনের নাম ধরে ডেকেছিলেন মিস মুরে। দরজায় আঘাত করেছিলেন। কিন্তু কোনও সাড়া না পেয়ে মুরে ফোন করেছিলেন মনরোর সাইক্রিয়াটিস্ট ডঃ র্যালফ গ্রিনসনকে।
ডঃ গ্রিনসন ছুটে এসেছিলেন মনরোর বাড়িতে। ঘরের জানলা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দুজনে দেখেছিলেন নগ্ন অবস্থায় চাদরের তলায় শুয়ে আছেন হলিউডের সর্বকালের সেরা গ্ল্যামারাস নায়িকা। হাতের মুঠোয় ধরা ছিল টেলিফোন। পাশের টেবিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ওষুধের বোতল। ডঃ র্যালফ গ্রিনসন শান্ত গলায় মুরেকে বলেছিলেন, “মনে হচ্ছে, মেরিলিন আর নেই"। ডঃ গ্রিনসন ফোন করেছিলেন অভিনেত্রীর চিকিৎসক ডঃ হেম্যান এঙ্গেলবার্গকে। তিনি এসে মেরিলিনকে মৃত বলে ঘোষণা করেছিলেন। খবর দিয়েছিলেন পুলিশকে। ভোর সাড়ে চারটের সময় পুলিশ এসেছিল। ইতিমধ্যে বাড়ির বাইরে ভিড় জমিয়েছিলেন শয়ে শয়ে সাংবাদিক আর মেরিলিনের ফ্যান।
[caption id="attachment_209568" align="aligncenter" width="800"]

শেষশয্যায় নিথর মেরিলিন।[/caption]
আত্মহত্যা করেছিলেন মেরিলিন!
মেরিলিন মনরোর দেহ আনা হয়েছিল লস অ্যাঞ্জেলস কাউন্টির করোনারের অফিসে। ওই দিনই মৃতদেহের পোস্টমর্টেম হয়েছিল। রাতে এসেছিল টক্সিকোলজির রিপোর্ট। জানা গিয়েছিল অভিনেত্রীর রক্তে অস্বাভাবিক পরিমাণে 'ক্লোরাল হাইড্রেট' নামে একটি যৌগ পাওয়া গিয়েছে, যেটি ঘুমের ওষুধ হিসাবে প্রচলিত। একই সঙ্গে মিলেছিল আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। মেরিলিনের যকৃতে পাওয়া গিয়েছিল বার্বিচুরেট নেম্বুটাল বা পেন্টোবার্বিটল, যে উপাদানটিও চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রচলিত ঘুমের ওষুধ হিসেবে। কিন্তু ততোধিক প্রচলিত নেশা করার ড্রাগ হিসেবেও।
পেন্টোবার্বিটলকে জড়িয়ে থাকা ভয়াবহ তথ্যটি হল, আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপরাধীদের কড়া ডোজের বার্বিচুরেট নেম্বুটাল বা পেন্টোবার্বিটল ইঞ্জেকশন দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো। এই ড্রাগটি অপরাধীর শ্বাসক্রিয়া কয়েক মিনিটের মধ্যেই বন্ধ করে দিত। মৃতদেহ পরীক্ষা করে করোনাররা বলেছিলেন, এটা সম্ভবত আত্মহত্যার ঘটনা। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ বলেছিল মেরিলিনের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনায়। পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট পাওয়ার পর পুলিশ বলেছিল, আত্মহত্যাই করেছেন মেরিলিন।
[caption id="attachment_209569" align="aligncenter" width="1024"]

মর্গের টেবিলে হলিউডি চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরী নায়িকা।[/caption]
কেন আত্মহত্যা করবেন মেরিলিন!
যাঁর ছবি আজকের মূল্যে দুই বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছিল। সেই মেরিলিন মনরোর গগনচুম্বী গ্ল্যামারের আড়ালে দুর্ভাগ্যজনকভাবে লুকিয়েছিল একটি ভাঙা মন। মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের গর্ভে পিতৃপরিচয়হীন অবস্থায় জন্ম নিয়েছিলেন মেরিলিন। কাটিয়েছিলেন আদরহীন ছেলেবেলা। বিখ্যাত হওয়ার পরও তাঁর দেহকে ইচ্ছেমত ব্যবহার করেছিল আমেরিকার রুপোলি ও রাজনৈতিক জগত। হাজার হাজার কিলোওয়াটের আলোর সামনে থেকেও একাকীত্ব কুরে কুরে খেত মেরিলিনকে। প্রচুর সাফল্য প্রচুর অর্থ আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ঘিরে উড়তে শুরু করেছিল হলিউডের মৌমাছিরা।
সরল আবেগের বসে একটার পর একটা সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন মেরিলিন। জেমস ডগার্থি, জো ডিমাজ্জিও এবং আর্থার মিলার, এই তিন বিখ্যাত ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিলেন মেরিলিন। টেকেনি একটা বিয়েও। সবাই তাঁর খ্যাতি আর অর্থকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। মনকে আপন করেননি কেউই। একবার সন্তানসম্ভবা হলেও শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি মা হতে পারেননি। একাকীত্ব আর হতাশায় ঘুম আসত না রাতে। সঙ্গী হয়েছিল ঘুমের ওষুধ, বেড়ে গিয়েছিল মদ্যপানের পরিমাণ।
[caption id="attachment_209570" align="aligncenter" width="748"]

একাকীত্ব কুরে কুরে খেত মেরিলিনকে।[/caption]
ক্যারিয়ারের মধ্য গগনে ঘুমের পিল আর মদের নেশা আঘাত করেছিল মেরিলিনের স্মৃতিশক্তিতে। সংলাপ মনে রাখতে পারতেন না। পরিচালকদের কাছেও দ্রুত অপ্রিয় হতে শুরু করেছিলেন মেরিলিন মনরো। যাঁর বাড়ির সামনে প্রডিউসার পরিচালকেরা সারাদিন বসে থাকতেন তাঁদের ছবিতে মেরিলিনকে সই করানোর জন্য, সেই বাড়ির সামনেটা হঠাৎই হয়ে গিয়েছিল শুনশান। আরও গভীর হতাশার সাগরে ডুবে যেতে শুরু করেছিলেন মেরিলিন মনরো।
মেরিলিন মনরোর ঘনিষ্ঠ বন্ধু জেমস বেকন একদিন মেরিলিনকে দেখেছিলেন চূড়ান্ত মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায়। সেদিনের ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন জেমস।
“মেরিলিন শ্যাম্পেন আর ভদকা পান করছিলেন। একই সঙ্গে স্লিপিং পিলও গিলে নিচ্ছিলেন। আমি মেরিলিনকে বলেছিলাম, পিল আর অ্যালকোহলের কম্বিনেশন কিন্তু তোমাকে শেষ করে দেবে মেরিলিন। জড়ানো গলায় মেরিলিন বলেছিলেন, এটা আমাকে এখনও মারেনি। বলেই আবার একটা ড্রিঙ্ক নিয়েছিলেন, সঙ্গে আরেকটা পিল।"
মেরিলিনের আকাশছোঁয়া একাকীত্ব আর হতাশা দেখে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলেই মনে করেছিলেন সবাই। একই সিদ্ধান্ত ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু জেমস বেকনেরও।
[caption id="attachment_209571" align="alignnone" width="768"]

তিন স্বামীর সঙ্গে মেরিলিন। ওপরে জেমস ডগার্থি, মাঝে জো ডিমাজ্জিও, নীচে আর্থার মিলার।[/caption]
তবে আজও কেন উঠে আসে খুনের তত্ব!
এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বিশ্বাস করেন মেরিলিনকে হত্যা করা হয়েছে এবং সরকারি পোস্টমর্টেম রিপোর্টটি ছিল অসত্য। প্রথমে মনে করা হয়েছিল তিনি প্রচুর পিল খেয়ে মারা গেছেন। কিন্তু তাঁর পাকস্থলীতে একটিও পিল পাওয়া যায়নি। মেরিলিনের নিম্নাঙ্গে কিছু রহস্যময় ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। যার সম্পর্কে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট নীরব ছিল। জুনিয়র মেডিকেল এক্সামিনার টমাস নোগুচি, যিনি নিজে মেরিলিনের পোস্টমর্টেম করেছিলেন, তিনিই মেরিলিন মৃত্যুর কারণ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তাই তিনি আবার মৃত্যুর তদন্ত শুরু করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ডেপুটি করোনার, যিনি মেরিলিন মনরোর ডেথ সার্টিফিকেটে সই করেছিলেন, তিনিও পরবর্তীকালে বলেছিলেন, তাঁকে সই করতে বাধ্য করা হয়েছিল। কারা বাধ্য করেছিল, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। এছাড়া মেরিলিনের ঘরে কোনও কোনও সুইসাইড নোট পাওয়া যায়নি। ক্রমশ মানুষের মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল। আমেরিকার মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, দূর্ঘটনা নয়, আত্মহত্যা নয়, খুনই হয়েছেন মেরিলিন মনরো।
[caption id="attachment_209572" align="aligncenter" width="768"]

অ্যাপার্ট্মেন্ট থেকে মেরিলিনের মর্মান্তিক প্রস্থান।[/caption]
সন্দেহের তির গিয়েছিল হোয়াইট হাউসের দিকে!
সাংবাদিকেরা একে একে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করতে লাগলেন। জীবনের শেষ লগ্নে মেরিলিন মনরো নাকি একই সাথে প্রেম করছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ও তাঁর ভাই রবার্ট কেনেডির সাথে। দু’জনের সঙ্গেই নাকি মেরিলিন মনরোর দৈহিক সম্পর্ক ছিল। মনরো এই কথাটি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মনস্তত্ববিদদের জানিয়ে ছিলেন। মনরোর হাউসকিপার জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর ঘন্টা খানেক আগেও নাকি প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি ও তাঁর ভাই রবার্ট কেনেডির সাথে মেরিলিনের কথা কাটাকাটি হয়েছিল।
কল রেকর্ড বলছে, মেরিলিন মনরো জীবনের শেষ ফোনটি করেছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডিকেই। তাঁদের সম্পর্ক জনসমক্ষে আনার হুমকি দিয়েছিলেন মরিয়া ও বেপরোয়া মনরো। খুনের তত্ত্বে যাঁরা বিশ্বাস করতেন, তাঁরা বলেছিলেন, কেনেডি ভাইরা সরিয়ে দিয়েছিলেন মেরিলিন মনরোকে। মেরিলিনকে খুন করা হয়েছিল 'বার্বিচুরেট নেম্বুটাল' ইনজেকশন দিয়ে।
[caption id="attachment_209576" align="aligncenter" width="600"]

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডির সঙ্গে মেরিলিন মনরো।[/caption]
শুরু হয়েছিল নতুন করে তদন্ত
মেরিলিনের মৃত্যু নিয়ে কয়েক দশক ধরে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে চলেছিল আমেরিকার আকাশে। মেরিলিনের মৃত্যুর ২০ বছর পর, ১৯৮২ সালে লস অ্যাঞ্জেলসের 'কাউন্টি অ্যাটর্নি অফিস' মেরিলিনের মৃত্যু নিয়ে নতুন করে তদন্তের আদেশ দিয়েছিল। তদন্ত শেষে জানিয়েছিল, খুন হননি মেরিলিন মনরো। কিন্তু সেই তদন্ত রিপোর্টে লেখাছিল ভয়ংকর কিছু শব্দ। রিপোর্টটির শেষ লাইনটি শেষ হয়েছিল
“factual discrepancies and unanswered questions.” শব্দবন্ধটি দিয়ে। এই লাইনটা কিন্তু বলতে চাইছে, মেরিলিনের মৃত্যু আত্মহত্যা নাও হতে পারে। তাই কি গডফাদার ছবির অভিনেতা জিয়ান্নি রুশো (৭৬) এখনও অনড় তাঁর দাবিতে, “হ্যাঁ, খুনই হয়েছিলেন মেরিলিন মনরো"!