
শেষ আপডেট: 9 September 2023 11:58
ইউরোপের সবচেয়ে ছোট দেশগুলির একটি হলো অস্ট্রিয়া। দেশটির ৬০ ভাগ জুড়ে আছে আল্পস পর্বতমালা। এবং দক্ষিণ থেকে পূর্বে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার পথে বয়ে চলছে ঐতিহাসিক দানিউব নদী। সারা বছর পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে দেশটিতে। কেউ আসেন আল্পস পর্বতমালার সৌন্দর্য উপভোগ করত, কেউ আসেন এই দেশে স্কি করতে বা বরফ নিয়ে মেতে উঠতে। কেউ আসেন ভিয়েনা আর সালসবার্গের অপরূপ নিসর্গ উপভোগ করতে (Most Beautiful Village)।
শীতকালে প্রবল তুষারপাত অস্ট্রিয়াকে সাদা চাদরে মুড়ে দেয়। গ্রীষ্মে বরফ গলে গেলে, শ্বাসরোধকারী সৌন্দর্য নিয়ে জেগে ওঠে ইউরোপের সবচেয়ে পুরনো গ্রাম। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জনপদ। যেখানে সময় থেমে গেছে অতিপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে।

১৮৪৬ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় খনন চালিয়েছিলেন একদল প্রত্নতাত্বিক। আবিষ্কৃত হয়েছিল এক অজানা সভ্যতা ও সংস্কৃতি। জানা গিয়েছিল আল্পসের প্রত্যন্তে লুকিয়ে থাকা এই এলাকাটিতেই ব্রোঞ্জ যুগের সমাপ্তি ও লৌহ যুগের সূত্রপাত ঘটেছিল। তাই, ব্রোঞ্জ ও প্রাথমিক লৌহ যুগের সংস্কৃতির নাম হলস্ট্যাট সংস্কৃতি (Hallstatt)। মধ্য ইউরোপে বিস্তার করা এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ হয়েছিল এই এলাকাটি থেকেই।
চাষের উপর ভিত্তি করে সভ্যতাটি গড়ে উঠলেও, ধাতু শিল্পে যথেষ্ট উন্নত ছিল এলাকাটি। ইউরোপের সেল্টিক এবং প্রোটো-সেল্টিক মানুষেরা এখানে বাস করতেন। দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বাণিজ্য চালাতেন তাঁরা। ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যোগাযোগ ছিল হলস্ট্যাট সংস্কৃতির (Hallstatt Culture) মানুষদের।

এলাকাটিতে আছে এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাকৃতিক লবণ খনি। যা বিশ্বের প্রথম লবণ খনি হিসেবে পরিচিত। তখনকার দিনে লবণ ছিল একটি মূল্যবান সম্পদ। তাই সেই খনি থেকে লবণ সংগ্রহর অর্থনীতি, হাজার হাজার বছর আগে জন্ম দিয়েছিল এক জনপদের। তার নাম ছিল হলস্ট্যাট। তার নামেই এখানকার সংস্কৃতির (Hallstatt Culture) নাম।

প্রত্নতাত্বিকরা এলাকাটির বিভিন্ন জায়গায় খনন করে ব্রোঞ্জ এবং লোহার তৈরি প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পেয়েছিলেন। লবণের খনির পাশেই তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন প্রায় ২০০০ মানুষের সমাধি। সমাধিগুলিকে সময়ের বিচারে দুটি স্তরে ভাগ করেছিলেন। প্রথম স্তরটি খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৮০০ সাল এবং দ্বিতীয় স্তরের সমাধিগুলি খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৪৫০ সাল জুড়ে বিস্তৃত ছিল।

লবণ একটি প্রাকৃতিক সংরক্ষক। তাই কয়েক হাজার বছর সমাধিতে শুয়ে থাকা খনি শ্রমিকদের দেহ এবং জামা কাপড় আবিষ্কারের সময়ও নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত ছিল।
ভিয়েনা-সালসবার্গ লাইনের ট্রেনে উঠে নামতে হবে Attnang-Puchheim স্টেশন। সেখান থেকে Bad Ischl -Obertraun লাইনের ট্রেন ধরে হলস্ট্যাট স্টেশনে নামুন। Hallstättersee হ্রদের পূর্ব তীরে এই স্টেশন। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ঢালু রাস্তা দিয়ে নেমে দাঁড়ান গিয়ে হ্রদের ধারে। এখান থেকে হলস্ট্যাট যাওয়ার বোট ছাড়ছে।
দু দিকে পাহাড়, তাদের মধ্যে দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে ৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের হ্রদটি। লেকের ওপারে আশ্চর্য গ্রাম হলস্ট্যাট। এক ঝলক দেখেই গ্রামটিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে মাতামাতির কারণটা অনুভব করতে পারবেন আপনি (Most Beautiful Village)।

কেউ বলেন, বিশ্বের সুন্দরতম গ্রাম। কেউ বলেন 'হিমবাহের বাগান শহর'। কেউ বলেন 'অস্ট্রিয়ার মুক্তো', কেউ বলেন ছবি তোলার শ্রেষ্ঠ গ্রাম -এর নাম হলস্ট্যাট।
Hallstättersee হ্রদের চারিদিক জুড়ে সবুজ পাহাড়। পাহাড়দের বলা হয় guardian of the Hallstättersee বা হ্রদের অভিভাবক। পাহাড়ের ধাপে ধাপে 'বারোক' শৈলীর আঙ্গিকে গড়ে তোলা হয়েছে গ্রামের বাড়িগুলি। টিম্বার-ফ্রেমিং শৈলীর গির্জা, ক্যাফে ও হোম-স্টে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
এখানকার প্রতিটি বাড়ি, দোকান, ক্যাফে, রেস্তোরাঁগুলি সবুজ অর্কিড আর নানা রঙের মরশুমি ফুলে মুড়ে রাখা হয়। দেখলে মনে হবে সেগুলি যেন ফুলেরই দোকান।

হ্রদের পাড় থেকে আঁকাবাঁকা গলি পথ উঠে গেছে পাহাড়ের ওপর দিকে। রাস্তার দুপাশে শত শত বছরের পুরোনো বাড়ি। কিন্তু এতটাই সুন্দর অবস্থায় সাজিয়ে রাখা, যেন কয়েক মিনিট আগে বাড়িগুলিতে গৃহপ্রবেশ হয়েছে।
শুধুমাত্র অর্থ থাকলেই আস্ত একটা পাহাড়ি গ্রামকে ছবির মত সাজিয়ে যায় না। এখানকার বাসিন্দাদের উন্নতমানের নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গীই হল হলস্ট্যাটের সৌন্দর্যের গোপন রহস্য। তাই, পাহাড়ের যত উঁচুতে উঠবেন তত রূপসী হয়ে উঠবে হলস্ট্যাট।
হলস্ট্যাট গ্রাম ছাড়াও আপনি এখানে দেখবেন Cultural Heritage Museum এবং the Beinhaus (Bone House) স্থানটির ইতিহাস জানতে। এখান থেকেই দেখতে যেতে পারেন বিখ্যাত Mammut Cave। ইউরোপের অন্যতম সুন্দর এই গুহাটি ১,১৭৪ মিটার গভীর।

এ ছাড়াও এখানে আছে অসামান্য সুন্দর কিছু লবণ গুহা এবং হোর্নারওয়ের্ক গুহা। দেখতে পারেন বরফে জমে যাওয়া জলপ্রপাত, লবণের খনি। হ্রদের জলে বোটিং, পাহাড়ের পাকদন্ডী পথে ট্রেকিং করতে পারেন। চিরস্মরণীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘরে ফিরবেন।
শীতকালে বরফে সাদা হয়ে যায় চারদিক। হ্রদ,পাহাড়, গ্রামের রাস্তা ঘাট, বাড়ির ছাদ, পুরু বরফের চাদরে মোড়া থাকে। দেখলে মনে হবে পৃথিবীর বাইরের কোন জায়গায় এসেছেন।

পৃথিবীতে নকল করতে চিনাদের জুড়ি মেলা ভার। ২০১২ সালে, চিনের গোয়াংডং প্রদেশে হলস্ট্যাটের অনুকরণে আরেকটি হলস্ট্যাট তৈরি করেছে চিন। নকল হলস্ট্যাট গ্রামটি বানিয়েছে মিনমেটালস নামে চিনের এক নির্মাণকারী সংস্থা।
নকল হলস্ট্যাট তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার। অস্ট্রিয়ার হলস্ট্যাটের নিঁখুত অনুকরণে বাড়ি ঘর, চার্চ, রাস্তা, সব কিছুই ছবির মতো সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছে চিন। এবং সবই হয়েছে আসল হলস্ট্যাটের বাসিন্দাদের ও প্রশাসনকে না জানিয়ে।

খবর পেয়ে আসল হলস্ট্যাটের মেয়র ও কিছু বাসিন্দা আসেন চিনের নকল হলস্ট্যাট গ্রামে। চিনাদের নকল করার কেরামতি দেখে বিস্মিত হয়ে হয়ে যান তাঁরা। প্রথম দিকে তাঁরা ক্ষুব্ধ হলেও পরে নাকি গর্বিত এবং খুশি হয়েছিলেন। তবে কিছু স্থাপত্যের অনুমতি না নেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছিলেন আসল হলস্ট্যাটের মেয়র।
২০০১ সালের জনগণনার হিসাবে হলস্ট্যাটে থাকেন ৮৫৯ জন গ্রামবাসী। আধুনিক জীবনের সব উপকরণ নিয়ে। বাসিন্দারা সবাই অবস্থাপন্ন। তাই এখানে থাকার খরচও বেশ চড়া। সাধারণত বিত্তবান পর্যটকরাই রাত কাটাবার সামর্থ রাখেন। বাকিরা সালসবার্গ থেকে এসে দিনে দিনে ঘুরে নেন হলস্ট্যাট।

১৯৯৭ সালে হলস্ট্যাট এবং ডাশ্চটেইন সালসকামার্গাট অঞ্চলকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বলে ঘোষণা করে UNESCO। তারপর থেকে যেন পর্যটকদের ঢল নেমেছে এই কয়েকশো লোকের গ্রামটিতে। অস্ট্রিয়ার অন্যতম ট্যুরিস্ট আকর্ষণ আজ হলস্ট্যাট।
সারা পৃথিবী থেকে পর্যটক আসেন হলস্ট্যাট দেখতে। বিশেষ করে চিনা পর্যটকের সংখ্যা এত বেড়েছে, আপনার মনে হবে ইউরোপে নয়, বেড়াতে এসেছেন চিনে।

স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকাতে পর্যটন সাহায্য করলেও, পর্যটকদের প্রবল ঢেউ নিয়ে আশঙ্কাতেও আছে আদিম গ্রাম হলস্ট্যাট। কারণ, বেশিরভাগ পর্যটক মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য এসে, দ্রুত হলস্ট্যাটকে নোংরা করে চলে যান। এই ৮৫৯ জন মানুষকে প্রতিনিয়ত পরিশ্রম করতে হয় ১০ লক্ষ মানুষের উশৃঙ্খলতার চিহ্ন পৃথিবী থেকে মুছে দেওয়ার জন্য।