
শেষ আপডেট: 29 August 2022 16:08
সমাজতত্ত্বের ছাত্রী ছিলেন তিনি। ইতিহাস ঘেরা প্রখর বাস্তবের সেই বাঁধাধরা কক্ষপথ থেকে কীভাবে যেন ছিটকে চলে এসেছিলেন কবিতার মহাবিশ্বে! সেই 'আসা' আর যাই হোক দুর্ঘটনা ছিল না৷ ২০১১ সালে তাঁকে হারিয়েছে বাংলা কবিতা। মধ্যে অনেকগুলো বছর, কবিতাগঙ্গায় বয়ে গেছে অনেক ঘাটের জল। তবু আজও তিনি সমান প্রাসঙ্গিক। আজও তাঁর লেখার সামনে দাঁড়ালেই বোঝা যায়, নিছক আত্মখননের জন্য নয়, নিজের কথাটুকু বলে যাওয়ার অনর্গল তাগিদে নয়, এক গভীর অন্তরবীক্ষা নিয়ে, অনুশীলন নিয়ে, সর্বোপরি বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে তিনি এসেছিলেন বাংলা কবিতার আঙিনায়। তিনি, বাংলা কবিতার 'কথামানবী' কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত। (Mallika Sengupta)

মল্লিকা সেনগুপ্ত'র অনেক পরিচয়। তিনি অধ্যাপিকা, তিনি উপন্যাসকার, তিনি ইতিহাস-সচেতন এক যুগমানবী। তবু সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর কবিসত্তা আজও বড় প্রকট। এই যুগসন্ধিতে, যখন দেশের নানা প্রান্তে পাশব লালসার শিকার হচ্ছে মেয়েরা, প্রতিমুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে তাদের পোশাক নিয়ে, চরিত্র নিয়ে, যাপন নিয়ে, এমনকি রাষ্ট্রশক্তিও নারী-সুরক্ষার নামে আঙুল তুলছে নারী-স্বাধীনতার দিকে… অন্ধকার এই সময়ে দাঁড়িয়ে যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত, প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে তাঁর কবিতা। (Mallika Sengupta)
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার ছাত্রী ছিলেন মল্লিকা। সিলেবাস আর সিলেবাসের বাইরের বইয়ের বিপুল জগৎ টানতো তাঁকে। বইয়ের ভিতর মুখ গুঁজে থাকা বেতসলতার মতো ঋজু সতেজ এক মেয়ে, সেসব ছেড়ে আচমকা কি না ঝুঁকে এলেন কবিতায়! কেন? কোথা থেকে পেলেন লিখে যাওয়ার এ তাগিদ? ২০০৪ সাল নাগাদ দে'জ থেকে প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ কবিতা'র ভূমিকায় সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন কবি নিজেই। অতিসংক্ষিপ্ত সেই ভূমিকা অংশে কবি লিখেছিলেন, "একটি মেয়ে খানাখন্দ গ্রামপথে লণ্ঠন হাতে নিয়ে বয়স্ক ইস্কুলে অ আ ক খ শিখতে চলেছে, পালিয়ে যাওয়া বরকে চিঠি লিখবে বলে। এক মহীয়সী বছরের পর বছর নর্মদার তীরে দাঁড়িয়ে মহাবাঁধ প্রকল্পে উৎখাত হতে থাকা মানষদের জন্য লড়াই করছে। একজন মহাকাব্যের নায়িকা আড়াই হাজার বছর আগে দণ্ডকারণ্যের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলেছিল। এরাই আমাকে কবিতা লিখতে শিখিয়েছে; আমার কবিতা ভুলে যাওয়া, উপেক্ষিত, ইতিহাস বিলুপ্ত এইসব মেয়েদের সুখদুঃখ আশা-আকাঙ্ক্ষা বিশ্বাসভঙ্গ নিগ্রহ যন্ত্রণার অভিব্যক্তি" (Mallika Sengupta)

পুরুষের বকলমে নয়, মেয়েদের কথা মেয়েরাই বলুক- বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক পৃথিবীতে নারীদের এই দাবি প্রথম সোচ্চার হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে কবিতা সিংহের কলমে। প্রায় ৩০ বছর পর সেই মন্দাকিনীর গতিপথ এঁকে দিলেন মল্লিকা স্বয়ং। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত প্রথম বই 'চল্লিশ চাঁদের আয়ু'তে শরীরে-মনে নারীত্বের যে অনুসন্ধান ছিল, 'সোহাগ শর্বরী' পেরিয়ে 'আমি সিন্ধুর মেয়ে' সময়কার কবিতাগুলোতে তাই যেন হয়ে উঠল নারীচেতনার জ্বলন্ত দলিল। ইতিহাস আর সময়ের নিরিখে তাঁর কবিতায় ভেসে উঠতে লাগল নারীর অবদমিত কামনা-বাসনা, আনন্দ, ব্যর্থতার কথারূপ। পুরুষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই প্রথম শোনা গেল কোমলে-কঠিনে মেশা এক দৃপ্ত নারীর সংলাপ-
"পুরুষ, আমি তো কখনও তোমার বিরুদ্ধে হাত তুলিনি
প্রথম যে দিন সীমন্ত চিরে রক্তচিহ্ন দিয়েছ
আমার সে দিন ব্যথা লেগেছিল, বলিনি, তোমাকে বলিনি
রুক্ষ মাটিতে ফোটে না গোলাপ, ময়ূর পেখম তোলে না
তবু চিরদিন বালুচর খুঁড়ে পানীয় তুলেছি আমরা
ছেলে কোলে নিয়ে জোনাকি দেখেছি, চিনিয়েছি কালপুরুষ
আমরা তো জানি পৃথিবী রমণী আকাশ আদিম পুরুষ
তবে কেন তুমি আমার দুহাতে শেকল পরিয়ে রেখেছ?
হাজার বছর ধরে কেন তুমি সূর্য দেখতে দাওনি?" ( রক্তচিহ্ন, 'সিন্ধুর মেয়ে' কাব্যগ্রন্থ)
মজার কথা, এই লেখা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৮৮ সালে, কবিতা সিংহের 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' সংকলন প্রকাশের ঠিক একছর পর। ঠিক পাঁচ বছর পর ১৯৯৩-এ প্রকাশিত 'অর্ধেক পৃথিবী' কাব্যগ্রন্থে নারীচেতনার এই সুরই যেন ফিরে এল আরও তীক্ষ্ণ, আরও মেধাবী অথচ বহিরঙ্গে আরও সহজ হয়ে। অর্ধেক পৃথিবীর কবিতাগুলো লেখা হচ্ছে যখন, সেই একই সময়কালে কবি লিখে চলেছেন একের পর এক নারী বিষয়ক প্রবন্ধ, যেগুলো পরে একসূত্রে বাঁধা পড়বে 'স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ' বইটিতে। (Mallika Sengupta)
মূলত এই প্রবন্ধগুলো লেখার জন্যই এসময় মল্লিকা সেনগুপ্ত'কে পড়তে হয়েছিল বিদেশি সাহিত্যের নারী স্বাধীনতা, নারী-অধিকার বিষয়ক নানা লেখা। এই বিস্তারিত পড়াশোনার মধ্যে দিয়েই পাশ্চাত্য সভ্যতার যুক্তি, চিন্তা, লিঙ্গ-রাজনীতির ভাবনার সঙ্গে মিশে গেছিল কবির নিজস্ব বোধ, অভিজ্ঞতা, অনুভব। যার সার্থক ফসল 'অর্ধেক পৃথিবী'।

বিষয়গত স্পষ্টতার পাশাপাশি কবিতার ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রেও কবি যেন সরে আসতে চাইছিলেন রূপকধর্মী কবিতার মিথ্যে আবরণ থেকে। উপমা-রূপকের খোলস ছাড়িয়ে আরও দগদগে, আরও সহজ, মুখের কথার কাছাকাছি নেমে এসেছিল তাঁর কবিতা। এই সময়কার প্রায় প্রতিটি কবিতাই জন্মেছিল আগুন বুকে নিয়ে। সমাজের দিকে, সমাজ-প্রণেতাদের দিকে একের পর এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন যেন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন কবি। বাদ যাননি কার্ল মার্কস, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো ব্যক্তিত্বরাও...
"পেনিস-এনভি" বলে একটি শব্দ
পৃথিবীতে এনেছেন ফ্রয়েড সাহেব
ওই যে বাড়তি শুধু পুরুষের থাকে
ওই নাকি মেয়েদের কমতি বানায়
তাই তারা শিশুকালে টলমল করে
বালিকা বয়সে তাই শিবলিঙ্গ আকন্দে সাজায়
খেলাঘর ভরে ওঠে পুতুলে ও বাসনকোসনে
কারণ সে নাকি তার মায়ের প্রতিভূ।
( ফ্রয়েডকে খোলা চিঠি, অর্ধেক পৃথিবী)
পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বে নারী পুরুষের 'পাওয়ার প্লে' তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে ধরা দিয়েছে বারবার। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’ (১৯৮৩ ) থেকে শেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বৃষ্টিমিছিল বারুদমিছিল’ (২০০৯ ) পর্যন্ত এক দীর্ঘ পথ তিনি হেঁটেছেন মানুষের হাত ধরে, মেয়েদের হাত ধরে। কখনও কথা যুগিয়েছেন সীতা কুন্তীদের মুখে, তো কখনও বিনির্মাণ করেছেন দ্রুপদনন্দিনী কৃষ্ণার। সুজাতা থেকে খনা; রিজিয়া, শাহবানু থেকে উইনি ম্যান্ডেলা- কে আসেননি তাঁর কলমে!
তবে একথাও ঠিক, কবিতার শরীরে শুধু মিথ আর ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ করেই ক্ষান্ত থাকেননি তিনি, বরং কবিতাকে করে তুলেছিলেন রোজকার জীবনের হাতিয়ার। আর তাই অক্ষরশিক্ষা করতে গিয়ে ইস্কুলঘরে পুরুষ শিক্ষকের হাতে লাঞ্ছিতা আদিবাসী মেয়েটিও সঙ্গী হয়েছে তাঁর এই কবিতা-পথে৷ (Mallika Sengupta)
যেরকম কবিতাকে এতকাল মেয়েদের কবিতা বলে দাগিয়ে দেওয়া হত, তার থেকে বহু যোজন দূরে দাঁড়িয়ে আছে মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতাভাষা৷ ঋজু, নিটোল সরাসরি কথা বলার প্রবণতাই নয়, তাঁর কবিতার শরীর জুড়ে আছে সংলাপ, উক্তি- প্রত্যুক্তি, তত্ত্ব ও তর্ক। সমকালীন কবিতার থেকে বহু পথ এগিয়ে ছিল তাঁর কবিতা। আর সেইজন্যই, পরবর্তী দশকের কবিদের কাছে তো বটেই, এমনকি শূন্য পরবর্তী যাঁরা নতুন লিখতে এসেছে বাংলায়, তাঁদের কাছেও মল্লিকা সেনগুপ্ত এক অপরিহার্য নাম, এক অবশ্যপাঠ্য ধর্মগ্রন্থের মতো বিপুল অথচ আধুনিক তাঁর কবিতা।
(তথ্যঋণ - কবি যশোধরা রায়চৌধুরী ও 'কবিসম্মেলন' পত্রিকা)