মহেন্দ্রলালকে দেখতে হলে, প্রথমেই বোঝা দরকার—তিনি ‘শুধু’ কোনও চিকিৎসা-পদ্ধতির মুখপাত্র নন… আদ্যন্ত, স্বাধীন মনের মানুষ। মত পালটাতে তাঁর ভয় ছিল না। যুক্তিতে যার জিত হবে, তিনি তার দলে।

মহেন্দ্রলাল সরকার
শেষ আপডেট: 2 November 2025 12:28
প্রথম জীবনে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ঘোর বিরোধী। কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থান বদল। অ্যালোপ্যাথি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ। হোমিওপ্যাথিতেই আত্মনিয়োগ৷ নেপথ্যে মরগ্যানের লেখা বই 'ফিলসফি অব হোমিওপ্যাথি'। তারপর চিকিৎসক রাজেন্দ্রলাল দত্তের সংস্পর্শে আসা৷ ডা. মিত্রের দেখাদেখি নিজেও কয়েকটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুত। বিজ্ঞানসম্মতভাবে রোগ নির্মূলে যে এই চিকিৎসাপদ্ধতি কাজে আসতে পারে, সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হন। যা এতটাই তীব্র, যে মৃত্যুর ১২ ঘণ্টা আগেও পুত্র অমৃতলালকে জোর গলায় জানিয়ে দেন, তাঁকে কেন কোনও অ্যালোপ্যাথি ওষুধ খাওয়ানো না হয়!
শুধু এটুকু বললেই কি মহেন্দ্রলাল সরকারের জীবনকে ধরে রাখা সম্ভব? তিনি একাধারে সমাজসেবক, জাতীয়তাবাদী ও মুক্তবুদ্ধির অন্যতম পথিকৃৎ। শুধু বাংলা কেন, সারা দেশে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চার পুরোধা। ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সে’র প্রতিষ্ঠাতা। পেশায় চিকিৎসক হলেও সমাজবিচ্ছিন্ন নন৷ তাঁরই পরামর্শে সরকারিভাবে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর নির্ধারিত হয়৷ ১৮৮৮ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে যিনি সভাপতিত্ব করছেন, সেই তিনিই মঞ্চে দাঁড়িয়ে অসমের চা শ্রমিকদের দুরবস্থা নিয়ে প্রস্তাব দেন। শ্রমিকদের অপমানসূচক 'কুলি' শব্দ ব্যবহারে আপত্তি জানান। একাধারে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো, অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট, কলকাতার শেরিফ ও বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য মহেন্দ্রলাল সরকার৷ এই অধিকার, দায়িত্ব ও সম্মাননার পরিসরই বুঝিয়ে দেয়, তাঁর জীবন কতখানি ব্যাপ্তিময়!
মহেন্দ্রলালকে দেখতে হলে, প্রথমেই বোঝা দরকার—তিনি ‘শুধু’ কোনও চিকিৎসা-পদ্ধতির মুখপাত্র নন… আদ্যন্ত, স্বাধীন মনের মানুষ। মত পালটাতে তাঁর ভয় ছিল না। যুক্তিতে যার জিত হবে, তিনি তার দলে। এই ‘বৌদ্ধিক সততা’-ই মহেন্দ্রলালকে আলাদা করে তুলেছে—অ্যালোপ্যাথির প্রতিষ্ঠিত সিংহাসনে বসে থাকলেও, সার্জারি-ডিপ্লোমা, এমডি ডিগ্রির স্বস্তি ছাড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন: রোগীর ভালটা কোথায়? এই সাহসের কারণেই একদিকে তিনি তীব্র বিরাগের লক্ষ্য, অন্যদিকে জুটেছে বিরল বিশ্বাসযোগ্যতা। তর্কের উত্তাপে মানুষ যত ক্ষণে ব্যক্তিগত আক্রমণে ঝাঁপায়, তিনি ততক্ষণে পরের প্রশ্নে চলে গিয়েছেন। মতের বিরোধ আছে, অপমান নেই—এই ছিল মহেন্দ্রলালের দর্শন।
এই স্বাধীনতা স্রেফ চিকিৎসাবিদ্যায় নয়, নাগরিক জীবনের মাঠেও। মেয়েদের বিয়ের বয়স নিয়ে যে অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন, সেটা উনিশ শতকের ভারতবর্ষে নিছক ‘ডেটা পয়েন্ট’ছিল না—ছিল স্পষ্ট সামাজিক অবস্থান। মহেন্দ্রলাল বুঝেছিলেন, শিক্ষা–স্বাস্থ্য–বিবাহপ্রথা—সবই এক জালের দড়ি। এক জায়গায় বোধের বদল ঘটলে, অন্য জট খুলতে শুরু করে। তাই চিকিৎসক হয়েও তিনি নীতিনির্ধারণের টেবিলে কথা বলেছেন—নম্র কিন্তু অনড় গলায়। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ‘কুলি’ শব্দ বাতিলের দাবি—এটাও স্রেফ শব্দ বদল নয়; মানুষের মর্যাদা উদ্ধার। শব্দ বদল মানে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন—এই ছিল তাঁর পাঠ।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় নির্মাণ ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অব সায়েন্স’(IACS)। এক কথায়—‘জনবিজ্ঞানে’র প্রথম বড় প্ল্যাটফর্ম। চিনে-জাপানে যেমন ‘পাবলিক সায়েন্স’ঘরানা পরেও ফুলে-ফেঁপে ওঠে, মহেন্দ্রলাল তার বীজ রোপণ করেছিলেন উনিশ শতকের কলকাতায়। সরকারি অনুদানের অপেক্ষা না করে, স্বদেশি দাতাদের টাকায়, স্বদেশি অধ্যাপকদের দিয়ে, দেশীয় ছাত্রদের সামনে ‘হাতেকলমে বিজ্ঞান’—এই ছিল তাঁর মডেল। কেবল বই নয়; পরীক্ষার টেবিল, বয়ামের রাসায়নিক দ্রব্য, গ্যাস বার্নারের আগুন—সব চোখের সামনে। সায়েন্সকে মঞ্চে তুলে এনে ‘ভয়’ কাটিয়েছিলেন তিনি। বিজ্ঞান কেবল ‘জানার’ নয়, ‘করার’ বিষয়—এই বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় এমন প্রতিষ্ঠান। এখানেই মহেন্দ্রলালের দূরদৃষ্টি—ভারতে স্বনির্ভর গবেষণা ইকোসিস্টেমের স্বপ্ন।
এই স্বপ্নই পরে বড় হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞান শুধু কলেজের দেওয়ালে আটকে থাকবে না—শহরের মানুষ, স্কুলের ছাত্র, কৌতূহলী মধ্যবিত্ত—সবার কাছে যাবে। তাই বক্তৃতা ছিল নিয়মিত, ভাষা ছিল সহজ, বিষয় জটিল হলেও ব্যাখ্যা ছিল বোধগম্য। তিনি জানতেন—বিজ্ঞান যদি কেবল ‘ইংরেজি বইয়ের জ্ঞানে’ আটকে থাকে, তবে সেটা কখনও ‘সমাজের জ্ঞান’ হবে না। এই জন্যই বক্তৃতা ছিল শানিত, সরল, সাজানো। পরে জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্রেরা যে জনসম্মুখে বিজ্ঞান-চর্চার ঐতিহ্য গড়লেন, তার শেকড় এখানেই। আর গবেষণার পরিণতি যে বিশ্বমঞ্চেও পৌঁছতে পারে—সে পথও উন্মুক্ত হয়েছিল এই ছাদের তলায়।
শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, জীবনের আচরণেও মহেন্দ্রলাল ‘জনবিজ্ঞান’-এর রোল মডেল। রোগীর কাছে গেলে পেশার গৌরব নয়, মানুষের কষ্ট দেখেছেন আগে। অ্যালোপ্যাথি বনাম হোমিওপ্যাথি—এই তর্ক তাঁর কাছে ছিল রোগীর সুস্থতার তুলনায় গৌণ। বিতর্ক ছিল, থাকবে—মহেন্দ্রলাল তাতে ভয় পাননি। যেখানে ফল দেখেছেন, তাকেই বেছে নিয়েছেন। এই ‘নমনীয়তা’-ই আধুনিক বিজ্ঞানের প্রাণ—আজকের RCT, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, গাইডলাইন—সবই এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়: অভিমত নয়, ফলাফল কথা বলুক! তাঁর সময়ে এই মানসিকতা ছিল ব্যতিক্রম, বলেই তিনি পথিকৃৎ।
শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই ‘ফলাফল–আশ্রিত বিতর্ক’-কেই নতুন আলো দেয়। যুক্তিবাদী হয়েও মহেন্দ্রলাল আধ্যাত্মিক আলাপের মর্যাদা দিয়েছেন—কারণ তিনি বুঝতেন, মানুষের চিকিৎসা শরীরেরও, মনেরও। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবোদ্রেক তিনি যন্ত্রে মেপে বুঝতে চেয়েছেন; না-পেরে বিনয়ের সঙ্গে মেনে নিয়েছেন—সমস্ত সত্য মাপা যায় না। বিশ্বাস আর বিজ্ঞানের টেবিলে এই সহাবস্থান ২০২৫ সালেও প্রাসঙ্গিক। চিকিৎসাবিদ্যায় ‘হোলিস্টিক কেয়ারে’র কথা আমরা আজ উচ্চারণ করি। মহেন্দ্রলাল তা করেছিলেন—শ্রদ্ধার সঙ্গে, বিচারবুদ্ধি বজায় রেখে। কোনও এক শিবিরে গা না-ভাসিয়ে, দু’দিকে সেতু রেখে চলাই ছিল তাঁর ভঙ্গি।
জাতীয়তাবাদ মহেন্দ্রলালের কাছে ‘স্বনির্ভরতার অভিধান’। ইউরোপীয়দের তুলনায় ভারতীয় ডাক্তারদের কম বেতন, কম পদমর্যাদা—এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপত্তি ছিল স্পষ্ট। কিন্তু তা ভাঙার পথ বলপূর্বক নয়—দক্ষতাপূর্বক। তাই তিনি ফি রেখেছিলেন বেশ চড়া; কারণ দক্ষতার দাম দিতে শিখতে হবে সমাজকে। একই সঙ্গে, সেই দক্ষতা জনসমক্ষে ভাগ করে নিয়ে ‘বিজ্ঞানের মর্যাদা’ বাড়াতে হবে—এই দ্বিমুখী কৌশল। অর্থাৎ, মর্যাদা আদায়ের লড়াই আর জনসেবার দায়—দুটোকে একসঙ্গে ধরে হাঁটা।
তাহলে আজকের ভারতবর্ষে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? এক, বিজ্ঞান-যোগাযোগ। ভুল তথ্যের বন্যায় যখন জনমন বিপর্যস্ত, তখন মহেন্দ্রলালের মতো ‘সহজ ভাষায় কঠিন কথা’ বলার কারিগরি দরকার। স্কুল–কলেজ–মিউজিয়াম–মিডিয়া—সব জায়গায় হাতেকলমে বিজ্ঞান চাই। দুই, স্বনির্ভর গবেষণা। টেক-স্টার্টআপ, বুনিয়াদি বিজ্ঞান, মেডিক্যাল ইনোভেশন—সব ক্ষেত্রেই ‘আইএসিএস’ মডেল শেখায়—শুরুতে অনুদান কম হলেও, লক্ষ্য পরিষ্কার থাকলে পথ বেরোয়। তিন, নীতিনির্ধারণে বিজ্ঞান। মেয়েদের বিয়ের বয়স, শ্রমিক মর্যাদা—তিনি দেখিয়েছেন, স্বাস্থ্য–শিক্ষা–নীতিতে বিজ্ঞানীর কণ্ঠ থাকতে হবে। চার, মত পালটানোর সাহস। বৈজ্ঞানিক জীবনে মত বদল মানে ‘পরাজয়’ নয়; সেটাই ‘উন্নতি’। এই সংস্কৃতি না থাকলে গবেষণা থেমে যায়। পাঁচ, নাগরিক শুচি। শব্দ বাছাই থেকে আচরণ—সবখানেই মর্যাদা চাই। ‘কুলি’ শব্দ বাতিলের দাবি আজও ভাষার রাজনীতিতে দিশা দিচ্ছে!
এ সবের বাইরে রয়েছে তাঁর কাজের গতি। তিনি দৌড়ে চলতেন—লেকচার, চিকিৎসা, সম্পাদনা, সংগঠন, অনুদান-সংগ্রহ—সব একসঙ্গে। ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, সময় ব্যবস্থাপনা, দল গড়া—এই তিন স্তম্ভের উপরে দাঁড়িয়েই ‘আইএসিএস’চালিয়েছেন আমৃত্যু। কোনও সরকারি চেয়ারে বসে নয়; স্বেচ্ছাশ্রম আর আস্থায়। এই প্রশাসনিক দক্ষতা না থাকলে, বড় প্রতিষ্ঠান দীর্ঘজীবী হয় না।
আরও একটা বোধ—মহেন্দ্রলাল সরকার পথপ্রদর্শক। চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি—সবেতেই স্বচ্ছন্দ বিচরণ। আজকের ভাষায়, ‘ইন্টারডিসিপ্লিনারি’। কারণ তিনি জানতেন—বিজ্ঞান একা হাতে সফল হয় না। ভাষা দরকার, অর্থনীতি দরকার, নীতি দরকার, নৈতিকতা দরকার। তাই মহেন্দ্রলাল লেখেন, বলেন, সংগঠিত করেন—ত্রিবেণী স্রোতে। এ-ই তাঁর আধুনিকতা!
হোমিওপ্যাথি–অ্যালোপ্যাথি নিয়ে আজও অনেক তর্ক চলবে। কিন্তু মহেন্দ্রলালকে কেবল সেখানে আটকে রাখলে, বৃহত্তর উত্তরাধিকার হারাব। স্বাধীন বুদ্ধি, প্রমাণ–ভিত্তিক নমনীয়তা, জনবিজ্ঞান, মর্যাদার রাজনীতি আর নীতিনির্ধারণে বিজ্ঞানের সক্রিয় কণ্ঠ মহেন্দ্রলাল সরকারকে কালজয়ী করে তুলেছে।
শেষে ফিরে আসা যাক মানুষের গল্পে। দারিদ্র, অধ্যবসায়, বিস্মিত অধ্যাপকদের সামনে কিশোর ছাত্রের ধারাবাহিক উত্তর—সব মিলিয়ে যে ‘চরিত্র’ গড়ে উঠেছিল, তাতে ছিল কৌতূহল, কঠোরতা, মমতা—এক অদ্ভুত মিশ্রণ। শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে গিয়ে তিনি ‘বিজ্ঞান’ হারাননি; আবার হাসপাতালে ফিরে এসে ‘বিশ্বাস’-কেও ফেলে রাখেননি। মানুষকে সম্পূর্ণ ভাবে দেখার এই চোখই মহেন্দ্রলালের সম্পদ। কাজটাই থাকে সামনে—মানুষকে জাগানো, জানানো, শেখানো, সম্মান দেওয়া।
এই জন্যই মহেন্দ্রলাল সরকার আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা এখনও শিখতে চাই—কঠিন কথাকে কীভাবে বিচূর্ণ করে সহজ বানাতে হয়, মতকে কীভাবে প্রমাণের সামনে আনত হতে হয়, প্রতিষ্ঠানের ভিত কীভাবে জন-আস্থায় গাঁথতে হয়। বিজ্ঞানকে কীভাবে ‘মঞ্চে’ তোলা যায়—প্রদর্শনী নয়… অনুশীলন হিসেবে, অভ্যাস হিসেবে, ভরসা হিসেবে। মহেন্দ্রলালের জীবনের সারবত্তা ঠিক এটুকুই: জ্ঞানকে নাগরিক জীবনের কেন্দ্রে বসানো। বাকিটা ইতিহাস নিজেই লিখে দিয়েছে।