
শেষ আপডেট: 22 February 2019 10:26
অর্পিতা চা নিয়ে যাওয়ার সময় বলল, ‘রাজীবকে একটু পরে পাঠাব। আমাদের দু’জনের টিফিন ওর হাতে দিয়ে দিস। মেয়েদের টিফিন থেকে কিছু আছে তো।’
এবার প্রীতি চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। ‘আমিও তো সেই খোঁজই করছিলাম। বেঁচেছে, দাঁড়াও নিয়ে আসি।’ বলেই সে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকল। একটু পরে পাঁউরুটিতে মাখন লাগিয়ে তার ওপর চিনি ছড়িয়ে নিয়ে চলেও এল। অর্পিতা দুটো নিয়ে চলে যাচ্ছিল গেটে। বাকিগুলো উর্মিলা আর প্রীতি চায়ের সঙ্গে খেতে শুরু করেছে। পরমা খাবে না, ওরা জানে। বেঁচে যাওয়া খাবার বাকি মেয়েদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে বলে সে, তবে তার কথা কেউ কানে তোলে না।
প্রথম যখন সে হোমে আসে তখন এইসব দেখেশুনে হোম-ইনচার্জ সর্বাণী মিত্রকেই গিয়ে জানিয়েছিল। হোম-মাদারদের ডাক পড়েছিল অফিসঘরে। কিন্তু সকলে একজোট হয়ে পরমার কথা মিথ্যে বলে প্রমাণ করে দেয়। সর্বাণীদিও কোনও খোঁজ না নিয়েই তাকে বললেন, ‘তুমি নতুন, না জেনে বুঝে ওদের বদনাম কোরো না।’
সেদিন অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে প্রীতি পরমার গায়ে একটা চিমটি কেটে বলেছিল, ‘সবে সবে এসেছিস, বয়সেও ছোট, তাই বলছি। যা শুনবি আর যা দেখবি, সব কিছুতে মাথা ঘামাবি না। আমাদের কথা যাদের কাছে বলেছিস, তাদের সব কথা জানিস? থাকতে শুরু কর, আস্তে আস্তে জেনে যাবি।’
এই ক’দিনে সত্যিই পরমা কিছু কিছু জেনেছে। এও বুঝে গিয়েছে, সব ব্যাপার হোম-মাদারদের মাথা ঘামাতে নেই। তবু সে নিজেকে সামলাতে পারে না কেন? পারে না বলেই বোধহয় জটিল হয়ে যায় কত কিছু।
অর্পিতা সর্বাণী মিত্রর কাছের লোক। তিনিই ওকে এনেছিলেন এই হোমে। পুরনো স্টাফ বলে গুরুত্বও দেন বেশি। তাই অর্পিতাকে সবাই সমঝে চলে। কারও কথা যদি সর্বাণীদির কানে লাগায়— সেই ভয়ে তার মন রাখার চেষ্টা করে। মেয়েদের খাবার তো রোজই কিছু না কিছু বেঁচে যায়। কী করে যে বাঁচে তা বুঝতে পারে না পরমা। অর্পিতার যেদিন খেতে ইচ্ছে হয় সেদিন প্রীতি আর উর্মিলা তার সঙ্গে ভাগ করে খায়। আর তা না হলে তাকে লুকিয়ে যতটা পারে খেয়ে নেয়। বাকিটা ফেলা যায় তবু মেয়েরা পায় না।
ওরা দু’জনে কথা বলে চলেছে। পাশে বসে থাকলেও পরমার কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে মিলিয়ে যাচ্ছে সেসব। সকালবেলার এই সময়টা খুব ভাল লাগে তার। এবার পুজো অনেক আগে এসে আগেই বিদায় নিয়েছে। তার পরে পরেই পরমা এসেছে এখানে। কার্তিক মাস শুরু হয়ে গিয়েছে অক্টোবরের শেষের দিকে। তারও কয়েক দিন চলে গেল। এখন রাতের হিমেল হাওয়ায় গাছপালাগুলো নরম হয়ে থাকে। ঘুম থেকে উঠে আদুরে সকালটাকে পাখির মতো ডানা মেলে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পারে না। অতবড় ডানা নেই তার। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন রোদের তাপ এসে সব পুড়িয়ে নিয়ে চলে যায়।
গ্রামের কথা মনে পড়ে যায় পরমার। গাছপালা, মাঠঘাট, বাড়িঘর, স্কুল, বন্ধুদের কথা। সবই ছিল তার। তখন সে ভাবত তার চেয়ে সুখী বুঝি কেউ নেই। কিন্তু কোন ছোটবেলায় সব ছেড়ে লোকের বাড়ি কাজ করতে চলে আসতে হয়েছিল।
এই হোমেও পুকুর, গাছগাছালি আছে। তবে সবই বিরাট পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তারাও যেন পণ করেছে হোমের নিয়ম ভাঙবে না।
সে যখন কাজে এসেছিল তখন জানত এটা মেয়েদের থাকার হোম। তাদের দেখাশোনা করতে হবে। তার কাজের লিস্টে লেখা ছিল— হোমের অন্য হোম-মাদারদের সঙ্গে হাতে হাতে কাজ করতে হবে, মেয়েদের মেডিসিন দিতে হবে, আউটডোর করতে হবে। এসে এদের দেখে মনে হল, এত মেয়ে আসে কোথা থেকে? তাদের কথাবার্তা, চালচলনই বা এমন কেন? কিছু দিন পরে সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিল এক স্টাফ মেম্বার ঈশিতা বসুর কাছ থেকে।
ঈশিতাদি প্রথমেই বলেছিলেন, ‘মেয়ে পাচার হয় জান?’
পরমা তাকিয়ে ছিল। তিনি বলে যাচ্ছিলেন, ‘বিয়ে দেওয়ার নাম করে, কাজ জোগাড় করে দেওয়ার কথা বলে, প্রেমের টোপে ফেলে বহু মেয়েকে পাচার করে দেওয়া হয়। নেপাল আর বাংলাদেশ থেকে তো রোজ হয়ে চলেছে। এ দেশেও কিছু কম নয়। বিহার, অসম, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা— কোথা থেকে না হয়! আমাদের এখানেও নানা গ্রামেগঞ্জে, মফস্সলে, শহরে তক্কে তক্কে ঘুরে বেড়ায় দালালরা। সে দলে পুরুষ আছে, মহিলারাও।’
‘কোথায় পাচার হয় মেয়েরা?’
‘এখান থেকে বাইরের রাজ্যে। সেখান থেকে এখানেও। বিদেশেও চালান করে দেওয়া হয়। তাইল্যান্ড, দুবাই, ওমেন, ব্রিটেন, ফিলিপিন্স, রাশিয়া— আরও আছে। তুমি সোনাগাছির নাম শুনেছ?’
হঠাৎ করে এই কথাটায় ধক করে লেগেছিল পরমার বুকে। ঈশিতা থামেননি। বলেছিলেন, ‘কলকাতায় ওটা ছাড়াও আছে রামবাগান, শেঠবাগান, ওয়াটগঞ্জ, হাড়কাটা গলি। দিল্লিতে আছে জি বি রোড, মুম্বইয়ে কামাথিপুরা, পিলা হাউস। গোটা দেশ জুড়ে অনেক রয়েছে। সেখানে কখনও কোনও কোনও মেয়ে সংসারের অভাবে পড়ে রোজগার করতে যেতে বাধ্য হয়। আমি তাদের কথা বলছি না। সে আরেক যন্ত্রণা। তবে অনেকেই পৌঁছে যায় পাচার হয়ে। সেই মেয়েদের উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। এন জি ও আছে যারা এই কাজ করে। পুলিশেরও হেল্প লাগে।’
‘তাদেরই আনা হয় এখানে?’
‘সবাই তেমন নয়। পুলিশ রেইডে যারা উদ্ধার হয় তাদের পাঠানো হয় শর্ট স্টে হোমে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো বাড়ি ফিরে যেতে পারে। অনেকেই পারে না। আবার দেখা যায় কোথাও কোনও মেয়ে পাচার হতে হতে রেহাই পেয়েছে, কোথাও পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েকে ফিরিয়ে আনা গেছে, কোথাও বা কেউ রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেছে বাচ্চা মেয়ে। এদের অনেকের ঠিকানা এই আশ্রয় হোম।’
শুনতে শুনতে দমবন্ধ লাগছিল পরমার। মনে হয়েছিল, এই মেয়েদের জীবন তাহলে কতবার কতরকম ভাবে বদলেছে। আশ্রয় হোম সেই জীবনের একটা টুকরো মাত্র। বা হয়তো তাও নয়। এদের আসল বাড়িঘর মনের ওপারে আবছা। কিংবা মুছেই গিয়েছে হয়তো। আর এই হোম যেন একটা পাখিঘর। কিচিরমিচির, ফুড়ুত ফাড়ুত, ডানা ঝাপটানো, বাটিতে রাখা জলে ঠোঁট ডুবিয়ে নেওয়া। যাদের আকাশ নেই, গাছ নেই, তাদের এছাড়া আর কী জুটবে!
বসে থাকতে থাকতে পরমার চোখ চলে গেল ছোটবাড়ির দিকে। মেয়েগুলো দু’হাতে লোহার গ্রিল ধরে তার ওপর কপাল চেপে রেখেছে। মুখ শুকনো। কেউ চোখ ভাসিয়ে দিয়েছে কোথায়, কে জানে। কেউ আবার তাদেরই দিকে তাকিয়ে আছে। পাঁচ থেকে পঁয়ত্রিশ— সব বয়েসের মেয়ে থাকে এখানে। কী ভাবে ওরা? এই যে মনিটর, হোম-মাদাররা বাইরে ঘোরাঘুরি করছে— তা দেখে কষ্ট হয় নিশ্চয়ই। এটা জেলখানা নয়। পাগলাগারদ নয়। চিড়িয়াখানাও নয়। তবু এইভাবেই রয়েছে ওরা। ওঃ, ওদের এই তাকিয়ে থাকা সহ্য হয় না পরমার। কখনও কখনও মনে হয় ওরা বোধহয় তাকেই দেখছে। সেও হয়তো ওদেরই মতো দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে। না, তা কী করে হবে। এই তেইশ বছরের জীবনে তার বুকের ভেতরের কষ্ট কি ওদের চেয়ে বেশি?
যে জীবন এই মেয়েদের পাওয়ার কথা ছিল সেখান থেকে ওরা এখন বহুদূরে। তবে পরমা তো বাড়িতেই ছিল। তার জীবনেই বা কী ঘটেছে? এগারো বছর বয়েসে পাড়ি দিতে হয়েছিল কলকাতায়। মা থাকলে কি ঘর ছাড়তে হত তাকে?
বাবা মাঝে মাঝেই বলত— ‘মা থাকলে তোর জীবন সুখের হত রে।’ চার বছরেই ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় মা নিয়ে গিয়েছে তার সব সুখ। যা নেই, হবেও না কখনও, তা নিয়ে আর দুঃখ হয় না পরমার। হয়েছিল। যখন বাসে উঠেছিল বাবাকে ছেড়ে।
পরমার মা করুণা মারা যাওয়ার পর মোহিতের আর সংসার বলে কিছু ছিল না। ছেলে যা বলবে তাই। এমনিতেই সে ভয়ে ভয়ে থাকে। দুই মেয়ের বিয়ের সময় ছেলে বাবলা ঘরে যা তাণ্ডব করেছিল! ‘এতগুলো মেয়ের জন্ম দিয়েছ, এবার তাদের পার করো। আমি কোনও খরচ করতে পারব না। তোমার মেয়েদের ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে।’
মোহিত চুপ করে থেকে ছেলের ভাষণ সহ্য করেছে। তার তখন বয়সও নেই। কিছু ধানি জমি রয়েছে কিন্তু বিক্রি করতে গেলেই বাবলা রে রে করে তেড়ে আসে। ‘জমি বেচলে আমি ছেলে-বউ নিয়ে কোথায় যাব শুনি?’ তবে এরপরেও তাকে ততটা খারাপ ছেলে বলা যাবে না। গ্রামের লোকের কথা থেকে বাঁচতে হোক, কি বোনদের ঘাড় থেকে নামাতেই হোক— দুজনের বিয়ে সে-ই দিয়েছে।
পরমা তখন সেসবের কিছুই বোঝেনি। পরে বুঝল, তার ভার দাদা আর বইতে পারবে না। সারাদিন ঘরে সেই নিয়েই ঝগড়া। বাবাকে রোজই বলত, ‘তুমি আর তোমার মেয়ে রাস্তা দ্যাখো।’
বাবা চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। বড়দি, মেজদি বিয়ের পর প্রথম প্রথম আসত। এখন তাদেরকে ডাকাডাকি হয় না। তারাও জানতে আসে না বুড়ো বাপ, ছোট বোনটার কী হল।
বউদিকে খুশি করতে পরমা ঘরের সব কাজ করে দিত। তিন বছরের ভাইপোকে কোলে করে ঘুরেছে। মাঠে গিয়েছে গোরু চরাতে। নদীর জল যখন খালে-ডোবায় ছোট ছোট মাছ বয়ে নিয়ে আসে তখন পরমা গুড়িজাল টেনে সেখানে থেকে মাছও ধরে এনে দিয়েছে। চাষের সময় পরের জমিতে জল বয়ে, ধানের ব্যান তুলে যা পয়সা পেয়েছে তাও জমা করেছে দাদার হাতে। কিছুতেই কিছু হয়নি।
সে স্কুলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হলেই ভীমরুল হয়ে হুল ফোটাতে শুরু করত বউদি। ‘উনি ইস্কুল গিয়ে দিদিমণি হবেন আর আমি রাবণের গুষ্টির সেদ্ধ করব! গিলে সবাই আমাকে উদ্ধার করবে!’
খাওয়া নিয়ে খোঁটা তবু সহ্য করে নিত পরমা কিন্তু লেখাপড়া নিয়ে মুখনাড়া ভেঙে দিত মন। মনে হত বইগুলো যেন কেউ দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে তার সামনে। স্কুলে গিয়েই তার সবচেয়ে ভাল লাগে যে! ওয়ান থেকে ফোর— সবাই হাতজোড় হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে। প্রার্থনার গান— তুমি নির্মল করো, মঙ্গল করে, মলিন মর্ম মুছায়ে। পড়া, খেলা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, সারাদিন কত আনন্দ।
শুধু তাকে নয়। বাবাকেও কথা শোনাত বউদি। বাবার কোলে উঠে বসে থাকতে খুব ভাল লাগত পরমার। যেন ধানখেতের গন্ধ পেত সে। কোনও কোনও দিন সেরকমই বসে এক হাতে গলা জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে কাঁচাপাকা ভুরুতে হাত বুলিয়ে পরমা বলেছে, ‘আমাদের এত কষ্ট কেন বাবা?’
বাবার চোখে জল টলটল করত। ‘কী বলি রে মা। আমি যে কিছু করতে পারি না।’
চোখে জল আসত পরমারও। তবে তা সে চোখেই ধরে রেখেছিল। মনে মনে ভাবত, এখানে আর থাকব না, চলে যাব কোথাও। সেখানে কাজ করে টাকা পেলে বাবার আর কষ্ট থাকবে না। তারপর অনেক বই কিনব। পড়ে ফেলব সব। কিন্তু বাবাকে ছেড়ে সে থাকবে কী করে! মাকে তার মনেই পড়ে না। জ্ঞান হয়ে অবধি বাবাকেই পেয়েছে। এখনও রাতে বাবার গলা জড়িয়ে শোয়। চলে গেলে কার কাছে শোবে? খাওয়ার সময় নিজের পাত থেকে তুলে শেষ গরসটা কে খাইয়ে দেবে?
পরমা তখন গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফোরে। হাইস্কুলে যেতে হলে ইউনিফর্ম, জুতো-মোজা, ব্যাগ দরকার। দাদা সেসব কিছু কিনে দেবে না। তাকে বললেই সে বলে, ‘ওসব দিয়ে হবেটা কী? ইস্কুলে যাওয়ারই দরকার নেই। যে যার খাওয়ার ব্যবস্থা করো। আমি আর কাউকে খাওয়াতে পারব না।’
গ্রামের কনককাকির সঙ্গে কথা বলে কলকাতায় যাওয়া ঠিক করে ফেলেছিল পরমা। কাকি সেখানে কোনও বাড়িতে চবিবশ ঘণ্টার কাজের লোক। তার ছোটমেয়ে বুলুকেও নিয়ে গিয়েছে। গ্রামে থাকে কাকা। তাদের বড়মেয়ে টুলুকে বর ছেড়ে দিয়েছে। সে বাবার দেখাশোনা করে। তাছাড়া তার ছেলেটাও ছোট। কাকার পেটে কী অসুখ আছে। যে ক’দিন সুস্থ থাকে, অন্যের জমিতে চাষের কাজ করে যা পায়। তাছাড়াও ছোটখাটো কাজের চেষ্টা করে। শরীর খারাপ হলে ঘরে বসে যায়। দুর্গাপুজো, দোল, গ্রামের শীতলাপুজোয় বাড়ি আসে কনককাকি আর বুলু। গ্রামের বেশ কয়েকটা পরিবার তাদের ছোট ছোট মেয়েকে চালান করে দিয়েছে শহরে। লোকের বাড়ি কাজ করতে। যখন তারা ফেরে তখন ব্যাগবোঝাই পুরনো জামাকাপড় কি শাড়ি। সঙ্গে মাইনের টাকা। সে বড় দরকারি জিনিস।
দেখতে দেখতে এসে গিয়েছিল সময়। সকালবেলা বোগার মোড়ে বাসে তুলতে এসেছিল বাবা। পরমা কখনও ভুলতে পারবে না সেই দিনটা। ধানখেত, বুড়ো বট, জিঞ্জোকুলের গাছ, যুগীপুকুর, শীতলামন্দির, পিরের মাজার, খোলা হাওয়া, খেলার মাঠ, ফুলবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধুদের ছেড়ে সে চলেছে কলকাতায়।
বাসের চাকা গড়াতে শুরু করেছে। জানলার কাচ নামানো। বড় বড় ভুরুর নীচে ঘোলাটে দুটো চোখ স্থির হয়ে আছে পরমার দিকে। চোখের কোনায় জল। পরমা বাসের জানলায় থুতনি রেখে বাবাকে দেখছে। খালি পায়ে হেঁটে এসেছে বলে ধুলোয় মাখামাখি। পরনে ধুতি, ওপরে একটা ময়লা ফতুয়া চাপানো। মাথায় কয়েক গোছা কোঁকড়ানো চুল। পরমার মনে হল সে আর সহ্য করতে পারবে না। চিৎকার করে বলবে— বাবা আমি যাব না তোমায় ছেড়ে। তবে তা করল না সে। কলকাতায় যাবেই। অনেক টাকা রোজগার করে আনবে। তাহলে আর কখনও বাবাকে ছেড়ে যেতে হবে না। চোখ ভরে এসেছে জলে। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি দু’হাতে মুছে ফেলল। গাড়ি হুহু করে এগিয়ে যাচ্ছিল সামনের দিকে। ঘাড় বেঁকিয়ে পিছনে তাকাল সে— বাবাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
‘কী ভাবছিস পরমা? অফিসের সময় হয়ে এল, রেডি হবি না?’
উর্মিলার কথায় খানিক চমকেই উঠল সে। ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল সেইসব দিন। এখন আর কুড়িয়ে জড়ো করাও যাবে না। শ্বাস ফেলে বলল, ‘হ্যাঁ, উঠব এবার।’
আড়মোড়া ভাঙার মতো শরীরটাকে বাঁকিয়ে নিচ্ছিল প্রীতি। ‘আজকের আড্ডাটা ঠিক জমল না।’
পরমা জানে প্রীতির আড্ডা কেন জমছে না। সঞ্চিতা নেই। দু’দিন হল বাড়ি গিয়েছে, বর্ধমানে। এখানে একজন হোম-মাদার ছুটি কাটিয়ে এলে তবেই আর একজন পায়। সবাই একসঙ্গে ছুটি নিলে হোমের কাজ চলবে না। যার বাড়ি আছে সে যায়। অর্পিতার কোথাও যাওয়ার নেই। পরমারও নয়। তাদের ছুটিও হয় না। ওই একদিনই যা নিতে হয়েছিল পরমাকে। সঞ্চিতা চলে যাওয়ায় প্রীতির খুব অসুবিধে হয়েছে। কথা বলার লোক পাচ্ছে না। সঞ্চিতাকে ধরে ধরে সে নিজের কথা শোনায়। পরমাকে কয়েকবার বলতে চেয়েছে। তবে প্রীতির ধারণা পরমা আধা শোনে, আধা বাদ যায়। কথায় যোগও দেয় না। উর্মিলার কাছে কয়েকবার ঢুঁ দিয়েছে প্রীতি কিন্তু সে বোধহয় নিজের জীবন নিয়েই নাজেহাল। অন্যের কথা শোনার সময় তার নেই। আর অর্পিতার ধার মাড়ায় না প্রীতি। বলে, ‘ওর ভেতরে কোনও রস নেই। ও আমার কথার রস পাবেও না।’ অবশ্য এই ক’দিনে পরমা আর একটা ব্যাপারও বুঝতে পারছে। সে আসার পর থেকে সঞ্চিতা প্রীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বরং পরমার সঙ্গে কথা বলতেই পছন্দ করে সঞ্চিতা।
উঠে পড়ল পরমা। এখানে আর বসে থাকতে ভাল লাগছে না তার।
এই উপন্যাসের যে কোনও চরিত্র এবং যে কোনও ঘটনার সঙ্গে বাস্তবের কোনও চরিত্র এবং কোনও ঘটনার মিল থাকলে তা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, আকস্মিক ও কাকতালীয় বলে গণ্য করতে হবে।
অলঙ্করণ - দেবাশিস সাহা