
শেষ আপডেট: 28 April 2020 05:25
রূপাঞ্জন গোস্বামী
সেদিন জালিয়ানওয়ালাবাগে উপস্থিত থাকা পাঁচ হাজার ভারতবাসীর মধ্যে ছিলেন চিকিৎসক ষষ্ঠী চরণ মুখোপাধ্যায়। আদি নিবাস হুগলি। কিন্তু চিকিৎসা করতেন এলাহাবাদে। শিক্ষাবিদ ও ভারতের কংগ্রেস সভাপতি মদন মোহন মালব্যের প্রিয়পাত্র ছিলেন চিকিৎসক ষষ্ঠী চরণ। ১৯১০ সালে মদন মোহন মালব্য পার্টির কাজে ষষ্ঠী চরণকে অমৃতসর পাঠিয়েছিলেন। সেই যে অমৃতসর গিয়েছিলেন ষষ্ঠী চরণ,আর কোনওদিন এলাহাবাদে ফেরেননি।
১৯১৯ সালের অভিশপ্ত ১৩ এপ্রিল, ডঃ ষষ্ঠী চরণ মুখোপাধ্যায় ঘটনাস্থলে ছিলেন। মঞ্চ থেকে পরিচালনা করছিলেন সভা। বুলেট বৃষ্টির সময় মঞ্চের নীচে ঢুকে পড়ায় কিছু মানুষের সঙ্গে তাঁর প্রাণও বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু চোখের সামনে দেড় হাজার নিরপরাধ নারী পুরুষ এবং শিশুর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
[caption id="attachment_213484" align="aligncenter" width="600"]
এই সরু গলিটি দিয়েই ঢুকতে হয় জালিয়ানওয়ালাবাগে।[/caption]
শোকাহত ডঃ মুখোপাধ্যায় শপথ নিয়েছিলেন, জালিয়ানওয়ালাবাগে শহিদ হওয়া ভারতবাসীর স্মৃতিতে গড়ে তুলবেন একটি স্মৃতিসৌধ। শহিদ হওয়া দেড় হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামীর বলিদান ভারত যাতে কোনও দিন না ভোলে। জালিয়ানওয়ালাবাগের জমিটি জাতীয় কংগ্রেসকে কিনে নিতে অনুরোধ করেছিলেন ডঃ মুখোপাধ্যায়। অন্যদিকে নৃশংস গণহত্যার প্রমাণ লোপ করার জন্য ব্রিটিশরাও নেমে পড়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ দখল করতে। জালিয়ানওয়ালাবাগ দখল করে, বীর শহিদদের রক্তে রাঙানো পূণ্যভূমিতে ব্রিটিশরা কাপড়ের বাজার করতে চেয়েছিল।
১৯২০ সালে কংগ্রেসের বৈঠকে জালিয়ানওয়ালাবাগের জমিটি কেনার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সাড়ে ছয় একর জমিটির মালিক ছিলেন হিম্মত সিং। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন ডঃ মুখোপাধ্যায়। জমিটির দাম ঠিক হয়েছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু অত টাকা কীভাবে আসবে! জমিটি কেনার জন্য, গান্ধীজি ভারতবাসীকে অর্থ দান করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। ডঃ ষষ্ঠী চরণ মুখোপাধ্যায় নিজে পাঞ্জাবের দরজায় দরজায় ঘুরে অর্থ ভিক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। দরকার ছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ভারতবাসীরা দান করেছিলেন প্রায় ৯ লাখ টাকা উঠল। ১৯২০ সালের ১ আগষ্ট, ডঃ মুখোপাধ্যায় নিলামে কিনে নিয়েছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের পবিত্র ভূমি।
[caption id="attachment_213481" align="aligncenter" width="550"]
এই সেই জালিয়ানওয়ালাবাগ, যেখানে শহিদ হয়েছিলেন দেড় হাজার ভারতবাসী।[/caption]
জমি হাতছাড়া হওয়ার আক্রোশে বিনা অপরাধে ডঃ মুখোপাধ্যায়কে জেলে পাঠিয়ে ছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। জেল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ডঃ মুখোপাধ্যায়। কিন্তু ইতিমধ্যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছিল। দেশনেতাদের নজর ঘুরে গিয়েছিল দিল্লির দিকে। কেটে যেতে লাগল দশকের পর দশক। কিছুটা উপেক্ষিত হয়ে পড়ে থাকল রক্তরাঙা জালিয়ানওয়ালাবাগ। স্মৃতিসৌধ তৈরির স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করেছিল শহিদ পরিবারগুলির মন থেকে। কিন্তু নিজের শপথে অনড় ছিলেন ষষ্ঠী চরণ মুখোপাধ্যায়। একদিনের জন্যেও নিশ্চিন্ত হয়ে বসেননি। লাগাতার দেশনেতাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন তাঁদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা।
[caption id="attachment_213489" align="aligncenter" width="640"]
ডঃ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় তৈরি হয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মৃতিসৌধ।[/caption]
ডঃ মুখোপাধ্যায়ের অসীম ধৈর্য্য ও নিষ্ঠার জয় হয়েছিল। ১৯৫১ সালের ১ মে, গঠিত হয়েছিল 'জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট'। যার প্রথম সম্পাদক মনোনীত হয়েছিল ডঃ ষষ্ঠী চরণ মুখোপাধ্যায়। ঠিক হয়েছিল পদাধিকার বলে ট্রাস্টটির চেয়ারম্যান হবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা। ডঃ মুখোপাধ্যায়ের চেষ্টায় তৈরি করা হয়েছিল স্মৃতিসৌধটির নকশা। সেই নকশা বানিয়েছিলেন আমেরিকার স্থপতি বেঞ্জামিন পোলক। ১৯৬১ সালের ১৩ এপ্রিল, সেই বৈশাখীর দিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর উপস্থিতিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ উদ্বোধন করেছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগ শহিদ স্মৃতিসৌধ।
আজও জালিয়ানওয়ালা বাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও স্মৃতিসৌধটির দায়িত্বে আছেন ষষ্ঠী চরণ মুখোপাধ্যায়ের পরিবার। ডঃ মুখার্জির পরে জালিয়ানওয়ালাবাগ ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্ট-এর সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছিলেন তাঁর পুত্র উত্তম চরণ মুখোপাধ্যায়। ষষ্ঠী চরণ মুখার্জির পুত্র উত্তম চরণ মুখোপাধ্যায়, তাঁর বাবার মতই বুকে আগলে রেখেছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগকে।
[caption id="attachment_213490" align="aligncenter" width="960"]
আজ জালিওয়ানওয়ালাবাগ বুকে আগলে রাখেন সুকুমার মুখার্জি।[/caption]
আশির দশক, পাঞ্জাবে তখন খলিস্তানি উগ্রপন্থীদের দাপট চলছিল। খলিস্তানি উগ্রপন্থীরা একবার কৃপাণ নিয়ে হত্যা করতে এসেছিল উত্তম চরণ মুখোপাধ্যায়কে। দখল করতে চেয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ। বুক চিতিয়ে খালি হাতে উন্মুক্ত কৃপাণগুলির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন উত্তম চরণ মুখোপাধ্যায়। তাঁর রুদ্রমূর্তি দেখে জালিয়ানওয়ালাবাগে আরেকবার রক্ত ঝরাতে সাহস পায়নি উগ্রপন্থীরা।
বর্তমানে ট্রাস্টের সম্পাদক ডঃ মুখার্জির নাতি সুকুমার মুখার্জি। যাঁকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। তাই প্রায় ১০১ বছর ধরে জালিওয়ানওয়ালা বাগকে জড়িয়ে বেঁচে আছে মুখোপাধ্যায় পরিবার। পরিবারের মানুষগুলির আশা, ভালোবাসা সবই আবর্তিত হয় জালিওয়ানওয়ালা বাগের পবিত্র মাটিকে ঘিরে। যে মাটিতে মিশে আছে দেড় হাজার শহিদের রক্ত, সমগ্র ভারতবাসীর চোখের জল ও ডঃ ষষ্ঠী চরণ মুখোপাধ্যায়ের ঘাম।