
শেষ আপডেট: 25 April 2020 04:45
সোনার খনিতে শ্রমিকেরা।[/caption]
১৮৫১ সালে জার্মানি থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন লিভাই স্ট্রস নামের এক জার্মান ব্যাক্তি। জার্মানিতে রঙ এবং কাপড়ের পারিবারিক ব্যবসা ছিল। ১৮৫৩ সেই ব্যবসারই শাখা খুলেছিলেন সানফ্রান্সিসকোতে। সেই দোকানেই কাপড় কিনতে আসতেন দর্জি জ্যাকব ডেভিস। একদিন লিভাই স্ট্রসকে জ্যাকব ডেভিস বলেছিলেন, খনি শ্রমিকদের প্যান্ট তৈরির জন্য বহুদিন ধরে একটা শক্তপোক্ত কাপড়ের সন্ধানে আছেন তিনি। এ ব্যাপারে লিভাই স্ট্রসের সাহায্য চেয়েছিলেন জ্যাকব। দুজনে মিলে সারা দিন ধরে দোকানের বিশাল গোডাউনে টেকসই কাপড় খুঁজে ছিলেন।
[caption id="attachment_213049" align="aligncenter" width="600"]
জিনসের প্যান্টের আবিষ্কর্তা জ্যাকব ডেভিস[/caption]
অবশেষে সন্ধ্যা নাগাদ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল জ্যাকব ডেভিসের পছন্দসই কাপড়। ১৭ শতাব্দী থেকে মালবাহী জাহাজের ডেকের ও ডকের জিনিসপত্র ঢাকতে ও তাঁবু তৈরির কাজে সেই মোটা কাপড় ব্যবহার করা হত। কাপড়টি বেশ পুরু ও নীল রঙের। লিভাই স্ট্রস জ্যাকব ডেভিসকে আগেভাগেই জানিয়েছিলেন কাপড়টি শ্রমিকদের প্যান্ট তৈরির জন্য উপযুক্ত নয়। কিন্তু লিভাই স্ট্রসকে বিস্মিত করে প্যান্ট তৈরির পক্ষে অনুপযুক্ত কাপড়টিকেই পছন্দ করেছিলেন পোড় খাওয়া দর্জি জ্যাকব।
নীলরঙা কাপড়টি যে সুতো দিয়ে বোনা হত, সেটিকে বলা হত 'ডেনিম'। ফ্রান্সের নিমেস শহরে এই সুতো তৈরি হত বলে 'ডি নিমেস' শব্দটি থেকে 'ডেনিম' শব্দটা এসেছিল। ফ্রান্সের তাঁতিদের তৈরি করা এই ডেনিমের সুতো দিয়ে ইতালির জেনোয়া শহরের তাঁতিরা এই শক্তপোক্ত কাপড়টি বানাতেন। ইতালিতে এই কাপড়টির নাম ছিল 'জিন ফুস্তিয়ান'। জেনোয়া শহরে তৈরি হত বলে। পরে 'জিন ফুস্তিয়ান' নামটি থেকে ফুস্তিয়ান শব্দটি ছেঁটে ফেলে নাম দেওয়া হয়েছিল জিনস।
[caption id="attachment_213058" align="aligncenter" width="416"]
বিভিন্ন ধরনের জিন ফুস্তিয়ান কাপড়।[/caption]
লিভাই স্ট্রস বার বার বারণ করেছিলেন ডেভিসকে। বলেছিলেন একটাও প্যান্ট বিক্রি হবে না। আর্থিক ক্ষতি হবে ডেভিসের। শ্রমিকেরা এত মোটা কাপড়ের প্যান্ট পরে হাঁসফাঁস করবেন। তা সত্বেও নাছোড়বান্দা ছিলেন ডেভিস। সেই মোটা নীল কাপড় দিয়েই বানিয়ে ফেলেছিলে শ্রমিকদের প্যান্ট। লিভাই স্ট্রসকে চমকে দিয়ে, শক্ত কাপড়, মোটা সুতোর সেলাই আর পকেটের কোনে কোনে তামার রিভেট মারা প্যান্ট খনি শ্রমিকদের দারুণ পছন্দ হয়েছিল।
কারণ জ্যাকব ডেভিসের তৈরি করা নতুন প্যান্টগুলি, দেখতে আধুনিক ও অত্যন্ত টেকসই ছিল। প্যান্টের রঙ গাঢ় নীল হওয়ায় তা ময়লা হলেও বোঝা যেত না। তাই তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গে প্যান্টগুলি বিক্রি হয়ে যেত। জ্যাকব আবার ছুটতেন লিভাই স্ট্রসের দোকান থেকে কাপড় কিনতে। জ্যাকব ডেভিস বুঝতেই পারেননি, এক অসামান্য ইতিহাস সৃষ্টি করে গেলেন তিনি। অপ্রচলিত কাপড় দিয়ে প্যান্ট বানিয়ে। কিন্তু তা বুঝতে পেরেছিলেন ধুরন্ধর ব্যবসায়ী লিভাই স্ট্রস।
[caption id="attachment_213059" align="aligncenter" width="600"]
শ্রমিকদের পরনে জ্যাকব ডেভিসের তৈরি জিনস।[/caption]
প্রথম দিকে জিনসের কাপড়ে তৈরি জ্যাকব ডেভিসের দোকানের প্যান্ট পরতেন শ্রমিক ও পশুপালকেরা। ধীরে ধীরে গরীব শ্রেণীর কিশোর ও যুবকদের মধ্যেও জিনসের প্যান্টের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়ে চলেছিল। কারণ প্যান্টগুলি ছিল বেশ সস্তা। জ্যাকব ডেভিসের তৈরি করা প্যান্টের, সব পরিস্থিতি সহ্য করার ক্ষমতা দেখে আকর্ষিত হচ্ছিলেন সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষজনেরাও। সানফ্রান্সিসকোর বাজারে জ্যাকব ডেভিসের জিনসের বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে লিভাই স্ট্রস নেমে পড়েছিলেন জিনসের ব্যবসায়।
সঙ্গে নিয়েছিলেন জ্যাকব ডেভিসকেও। কারণ জ্যাকব ও তাঁর কর্মীরা ছাড়া এই প্যান্ট বানাবে কে? রাজি হয়েছিলেন জ্যাকব ডেভিস। জ্যাকব ডেভিসের কাছে লিভাই স্ট্রসের মতো অগাধ অর্থ ছিল না। তাই নিজের কোম্পানি বানাবার সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না। কিছুদিনের মধ্যে জ্যাকব ডেভিসকে নিয়ে জিনসের প্যান্ট তৈরির একটি কোম্পানি খুলে ফেলেছিলেন লিভাই স্ট্রস। যেটির নাম দিয়েছিলেন নিজের নামেই, ‘লিভাই স্ট্রস অ্যান্ড কোং’।
[caption id="attachment_213060" align="aligncenter" width="600"]
লিভাই স্ট্রস।[/caption]
যিনি বিশ্বকে জিনসের প্যান্ট উপহার দিয়েছিলেন, সেই জ্যাকব ডেভিসকে পিছনের সারিতে পাঠিয়ে দিয়ে জিনসের প্যান্টের ময়দান দখল করে নিয়েছিলেন লিভাই স্ট্রস। ১৮৭৩ সালের ২০ মে, জিনসের প্যান্ট তৈরির পেটেন্ট পেয়ে গিয়েছিল ‘লিভাই স্ট্রস অ্যান্ড কোং’। তারপর লিভাই স্ট্রস অর্থ দিয়ে বশ করে নিয়েছিলেন জ্যাকব ডেভিসের দোকানের কিছু কর্মীকে। তাঁদেরকে দিয়ে ধীরে ধীরে আরও কিছু নতুন দর্জিকে জিনসের প্যান্ট তৈরি করা শিখিয়ে নিয়েছিলেন। জ্যাকব ডেভিসকে জিনসের জগত থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত এভাবেই সম্পূর্ণ করেছিলেন লিভাই স্ট্রস।
‘লিভাই স্ট্রস অ্যান্ড কোং’ ভেঙে লিভাই স্ট্রস ১৮৮০ সালে তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা সংস্থা ‘লিভাইস’। দশ বছরের মধ্যে ‘লিভাইস’ সংস্থার তৈরি ‘জিনস’ সারা আমেরিকায় বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে গিয়েছিল। ১৯২০ সালের মধ্যে সারা আমেরিকা ছেয়ে ফেলেছিল লিভাইস কোম্পানির তৈরি করা ‘ডেনিম ওয়েস্ট’ জিন্স। বন্ধু ভেবে ফেলা লিভাই স্ট্রসের বিশ্বাসঘাতকতায়, জিনসের জগত থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন জিনসের প্যান্টের অমর স্রষ্টা জ্যাকব ডেভিস।