রূপাঞ্জন গোস্বামী
জুলেভার্ন তাঁর "টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি' নামের বিশ্ব কাঁপানো বইটির ২৩ তম অধ্যায়ে সাগর জলের নীলদ্যুতির কথা লিখেছিলেন। কয়েক শতাব্দী ধরে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাহাজের ক্যাপ্টেনরা রাতের সাগরের জল থেকে ঠিকরে বার হওয়া নীল, সবুজ, সাদা আলোর কথা বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তখন কেউ তা বিশ্বাস করেননি। কারণ তাঁরা জানতেন না, ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থিত জামাইকার ফেলমন্ট শহর থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে সত্যিই আছে এক অবিশ্বাস্য উপহ্রদ 'দ্য ব্ল্যাক লেগুন'। যে উপহ্রদের জল আজও রাতের আঁধারে ছড়ায় উজ্বল নীল দ্যুতি।
রাতে সেই উপহ্রদের জলে নামার সঙ্গে সঙ্গে আপনার শরীরের চারপাশের জলে অদৃশ্য নীল নিয়ন বাতি জ্বলে উঠবে। সাঁতার কেটে উঠে আসার পরও আপনার শরীর থেকে ঠিকরে বের হবে নীল রশ্মি। নিজেকে মনে হবে গ্রহান্তরের মানুষ। আপনার চোখের সামনেই উপহ্রদের তীরে আছড়ে পড়বে আলোকিত নীল ঢেউ। হ্রদের জলে ভাসতে থাকা নৌকাকে ঘিরে রাখবে নীল আলো। নেশা ধরানো মায়াবী নীলে, উপহ্রদের পরিবেশ হয়ে উঠবে স্বর্গীয়। যা নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে আপনার।
[caption id="attachment_214252" align="aligncenter" width="600"]

দ্য ব্ল্যাক লেগুন।[/caption]
রহস্যটি কী!
না, ভূতুড়ে বা কোনও অলৌকিক কারণ নেই ঘটনাটির পিছনে। বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক আগেই উপহ্রদের জলের নীল দ্যুতির রহস্য রহস্য ভেদ করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন হ্রদের জলের নীল আলোর জন্য দায়ী হ্রদের জলে বাস করা কোটি কোটি আণুবীক্ষণিক জীব (
microorganisms)। যাদের বলা হয় ডাইনোফ্ল্যাজেলেট (
dinoflagellates)।
হ্রদের জলের সামান্য কম্পন হলেই এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবগুলি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তখন তাদের শরীর থেকে উজ্বল নীল আলো বিকিরিত হয়। যাকে বলা হয় জীবদ্যুতি বা বায়োলুমিনিসেন্স (
Bioluminescence)। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এই জীবগুলি নিজেদের দেহে আলো তৈরি করতে পারে। তবে এই আলোর কোনও উত্তাপ নেই এবং জীবদ্যুতি কেবলমাত্র রাতেই দেখা যায়। স্থলজ ও জলজ উভয় প্রকার প্রাণীতেই এই রকমের দ্যুতি বা আলো দেখতে পাওয়া যায়। হাতের কাছেই আছে উদাহরণ, জোনাকি পোকা।
[caption id="attachment_214253" align="aligncenter" width="600"]

জলে নামলেই ঘিরে ধরে নাচতে থাকে নীল আলো।[/caption]
দিনের বেলা হ্রদের জলে থাকা ডাইনোফ্ল্যাজেলেটরা সূর্যালোকের সাহায্যে নিজেদের রিচার্জ করে নেয়। রাতে আলো ছড়ায়। দিনের সূর্যালোক যত প্রখর হবে রাতে হ্রদের জলে ততটাই বেশি উজ্বল আলো ছড়াবে আণুবীক্ষণিক জীবগুলি। তাই মেঘলা দিনের পরে আসা রাতে, হ্রদের জলে নীল আলোর দ্যুতির তেজ কমে যায় অনেকটাই। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন লুসিফেরিন নামের একটি রাসায়নিকের পদার্থের কারণে এই আণুবীক্ষণিক জীবগুলি নীল আলো ছড়িয়ে থাকে। লুসিফারেজ নামে এক এনজাইমের সাহায্যে লুসিফেরিন জারিত হয়ে যখন অক্সি-লুসিফেরিনে পরিণত হয়, তখন ডাইনোফ্ল্যাজেলেটদের শরীর থেকে এই নীলচে আলো নির্গত হতে থাকে।

শুধু এই উপহ্রদেই নয় পৃথিবীর কয়েকটি জায়গায় সাগরের জলে একই রকম নীল দ্যুতি দেখতে পাওয়া যায়। সোমালিয়ার পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি ভারত মহাসাগরে 'মিল্কি ওয়ে' নামে ১৬০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের একটা অঞ্চল আছে যা রাতে আলো ছড়ায়। মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের কেরালার উপকূলের কয়েকটি জায়গায়, রাতে এ রকম নীল আলো দেখতে পাওয়া যায়।
তবে উজ্বলতার দিক থেকে সেরা কিন্তু জামাইকার উপহ্রদটি। কারণ আলো ছিটানো আণুবীক্ষণিক জীবদের ঘনত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। আসলে এই উপহ্রদকে ঘিরে আছে রেড ম্যানগ্রোভ ট্রি। এই গাছগুলি উপহ্রদের জলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-টুয়েলভ যোগান দেয়। যা এই আনুবীক্ষনিক জীবদের দ্রুত বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
[caption id="attachment_214254" align="aligncenter" width="491"]

আলো ছড়ায় এই ডাইনোফ্ল্যাজেলেটেরা।[/caption]
'দ্য ব্ল্যাক লেগুন' হ্রদটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অসামান্য উপকথা
পৃথিবীর বুকে সে দিন নেমেছিল মিশকালো রাত। আকাশে ফুটে উঠেছিল কোটি কোটি নক্ষত্র। সমুদ্রের ধারে বালিয়াড়ি ঘেরা লবণাক্ত জলের হ্রদেরতীরে এসে দাঁড়িয়েছিল এক বিষণ্ণ মানব। তার প্রেয়সীকে নিয়ে। গ্রামের সবাই তাদের রাক্ষস ভাবত। কারণ তাদের দেখতে ছিল ভয়ঙ্কর। সমাজ ওদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘদিন দুজনে একসঙ্গে থেকেও তাদের সন্তান ছিল না। এ নিয়ে বড় দুঃখ ছিল তাদের মনে। কিন্তু তবুও তারা একে অপরকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসত। ওরা ঠিক করেছিল, সে দিন তারা একসঙ্গে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। মরণের পারে গিয়ে আবার দু’জনে নতুন করে সংসার বাঁধবে। যন্ত্রণাহীন সংসার। সন্তান হবে তাদের। তাকে বুকে জড়িয়ে বাঁচবে দু’জনে।
তাই বিদায় চুম্বন দিয়ে বড় একটি পাথরে উঠে পড়েছিল দু’জন। তারপর রাতের আকাশকে সাক্ষী রেখে দু’জনে ঝাঁপ দিয়েছিল হ্রদের জলে। কিন্তু জলে ঝাঁপ দেওয়ার পরেই জলের নিচে জ্বলে উঠেছিল হাজার হাজার কোটি নক্ষত্র। দু’জনকে ঘিরে নাচতে শুরু করেছিল রহস্যময় নীল আলো। ভয়ে দু’জনে চোখ বুজে ফেলেছিল। হ্রদের কালো জলে ফণা তোলা নীল ঢেউ তখনও তাদের ঘিরে নাচছিল। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা হয়নি দম্পতির, নীল রঙের আলো ছেটানো ঢেউ তাদের ধাক্কা মেরে তীরের কাছে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল।

যখন তারা চোখ খুলেছিল, তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল চরম বিস্ময়। অজানা কোনও মন্ত্রবলে তারা হয়ে উঠেছিল অসামান্য রূপবান আর রূপবতী। পাগলের মত দু’জনে দু’জনকে জড়িয়ে ধরেছিল। হ্রদের জলে মুখ ডুবিয়ে হ্রদকে চুম্বন করে দম্পতি ছুটতে শুরু করেছিল গ্রামের দিকে। গ্রামের মানুষ তাদের দেখে চিনতেই পারেনি। গ্রামবাসিদের ঘটনাটি বলার পর, গ্রামবাসীরা নতুন করে তাদের বরণ করে নিয়েছিল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই, আদিম মানবীর কোলে এসেছিল ফুটফুটে একটি সন্তান।
সন্তানকে নিয়ে তারা একবার এসেছিল উপহ্রদের সেই তীরে। এক বছর আগে, যেখানে তারা তাদের জীবন শেষ করতে চেয়েছিল। হ্রদের জলে সদ্যোজাত শিশুটিকে একবার ছুঁইয়েছিল দম্পতি। তারা মনে করত, এই হ্রদ তাদের উপহার দিয়েছিল নতুন জীবন, উপহার দিয়েছিল শিশুটিকেও। তাই হ্রদটিই শিশুটির আসল মা। তারপর থেকে জামাইকার উপকথায় ‘যৌবনের হ্রদ' নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল হ্রদটি। জামাইকার কিছু মানুষ আজও বিশ্বাস করেন, হ্রদটির জলে একবার ডুব দিলে নাকি মানুষ সুন্দর হয়ে যায় এবং মানুষের প্রজনন শক্তি বৃদ্ধি পায়। উপকথাটির অবশ্য কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এটি নিছকই একটি গল্প। কারণ বিজ্ঞানীরা তো প্রমাণই করে দিয়েছেন রাতে হ্রদের জল থেকে নীল আলো বিচ্ছুরিত হওয়ার কারণ।
রাতের আঁধারে আলো জ্বালাবার দরকার পড়ে কেন!
সত্যিই তো, হ্রদের জলে বাস করা কোটি কোটি আণুবীক্ষণিক জীব বা ডাইনোফ্ল্যাজেলেটদের শরীরে আলো জ্বালাবার দরকার পড়ে কেন! আসলে স্থলজ ও জলজ জীবদের এই ঠাণ্ডা আলো বা বায়োলুমিনিসেন্স কাজে লাগে রাতে খাবার খোঁজার জন্য, আত্মরক্ষার জন্য ও শিকারি প্রাণীকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। তবে, এসব ছাড়াও নিজেদের অজান্তেই রাতের পৃথিবীকে সুন্দর করার দায়িত্ব নিয়েছে তারা। রাতের পৃথিবীর সৌন্দর্য্যের সব কৃতিত্ব নক্ষত্ররাই বা নেবে কেন! তাই ডাইনোফ্ল্যাজেলেটরা নিজেরাই নক্ষত্র হয়ে নিজেদের আকাশকে স্বপ্নের মত ঝলমলে করে তুলেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে।