
শেষ আপডেট: 30 November 2020 20:28
জোসেফ অ্যালেন স্টেইন।[/caption]
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উনিশশো পঞ্চাশের দশকের সূচনালগ্নে ছড়িয়ে পড়ল ম্যাকার্থিজিম। ভয় পেয়ে গেলেন জোসেফ স্টেইন। তিনি যে গরীব মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে বাড়ির নকশা করেন। আর ম্যাকার্থিজিম গরীবের জন্য ভাল কাজের মধ্যে থেকেই খুঁজে বের করে কমিউনিজম। ভয় পেয়ে স্টেইন প্ৰথমে গেলেন মেক্সিকো। তারপর ইয়োরোপ। মনের মতো কাজ পাচ্ছেন না। হঠাৎ করে ১৯৫২-য় পেলেন শিক্ষকতার আমন্ত্রণ।
হাওড়ার শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ এস আর সেনগুপ্ত স্টেইনের হাতে তুলে দিলেন দুটি বিভাগের দায়িত্ব। স্থাপত্য এবং নগর পরিকল্পনা। সবার আগে স্টেইন সদ্য স্থাপিত দুটি বিভাগ জুড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন। ১৯৪৯-এ স্থাপিত স্থাপত্য বা আর্কিটেকচার বিভাগ ছিল স্নাতক পর্যায়ের। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নগর পরিকল্পনা বা টাউন প্ল্যানিং বিভাগ। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৫ কলেজের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত এস আর সেনগুপ্ত এই প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জোসেফ স্টেইন হলেও আরও এক উজ্জ্বল উদাহরণ শঙ্কর সেন। কৃতি ছাত্র শঙ্কর সেন অন্যত্র মহার্ঘ চাকরি পেলেও তাঁকে বি ই কলেজের পরিসরে জড়িয়ে ফেলেন এস আর সেনগুপ্ত। অনেকদিন পর উপাচার্য হয়ে শঙ্কর সেন যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন এবং তারও পরে পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎ বিভাগের মন্ত্রী হয়ে রাজ্যের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মানোন্নয়নে খ্যাতি অর্জন করলেন তখনই প্রমাণিত হয় যে অধ্যক্ষ এস আর সেনগুপ্ত একজন দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। তখনকার বি ই কলেজ বা এখনকার আইআইইএসটি-র শুধুমাত্র একটি হস্টেল তাঁর নামে নামাঙ্কিত। ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতিদের অবদান অবিশ্য কোনও সভ্যতাই মনে রাখে না। স্টেইন তো তবুও পরবর্তী প্রজন্মের স্থপতিদের কাছে স্টেইনাবাদের স্রষ্টা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
কী আশ্চর্য সমাপতন। ১৯৫৫-য় অধ্যক্ষ এস আর সেনগুপ্তকে আইআইটি-র দায়িত্ব পালনের জন্য খড়্গপুরে চলে যেতে হয়। আর ওই বছরই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে জোসেফ স্টেইনের কাঁধে চাপল দুর্গাপুরের ইস্পাত কারখানা এবং লাগোয়া শিল্পনগরীর নীলনকশা প্রণয়নের দায়িত্ব। অর্থাৎ গঙ্গাপাড়ের শিবপুর ছেড়ে দুই কৃতি শিক্ষক পশ্চিম দিকে রওনা দিলেন। সাফল্যের সঙ্গে দুর্গাপুরের বাস্তবায়ন শেষ করার আগেই এসে গেল রৌরকেল্লা ইস্পাতনগরীর নীলনকশা প্রণয়নের কাজ। দুর্গাপুর এবং রৌরকেল্লার কাজে মুগ্ধ হয়ে টাটা কোম্পানি জোসেফ স্টেইনকে আমন্ত্রণ জানালেন। অনুরোধ স্বীকার করে জামশেদপুর শহরের নীলনকশা ছকে দিলেন জোসেফ স্টেইন।
এতদিন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর অনুরোধে দুর্গাপুর, রৌরকেল্লার কাজ করেছেন জোসেফ স্টেইন। এবার আমন্ত্রণ জানালেন দেশের উপ-রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। দিল্লির লোদী গার্ডেন এলাকায় একটি পরিবেশবান্ধব সাংস্কৃতিক ও আবাসিক প্রাঙ্গণ বা কালচারাল কমপ্লেক্সের নির্মাণ পরিকল্পনা করে দেওয়ার প্রস্তাব। ১৯৫৯-১৯৬২ সময়সীমায় জোসেফ স্টেইনের নীলনকশা ধরে এবং তাঁর প্রত্যক্ষ নজরদারিতে গড়ে উঠল ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার সংক্ষেপে আইআইসি। লোদী গার্ডেনের পাশে ম্যাকসমুল্যার মার্গের ঠিকানায় স্থাপিত এই কালচারাল কমপ্লেক্সের সঙ্গে তুলনীয় আর কোনও সংস্থা দেশে আর আছে কি? লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম, অতিথিনিবাস ইত্যাদি সমৃদ্ধ এমন অভিজাত ব্যবস্থা সকলের পছন্দ। দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট অতিথিরা পাঁচতারা হোটেলের বদলে আইআইসি-তে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন।
[caption id="attachment_281660" align="aligncenter" width="600"]
ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার সংক্ষেপে আইআইসি।[/caption]
স্টেইন ঘরানার স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে গৃহনির্মাণ। কৃত্রিমতা বর্জন করে প্রাকৃতিক আলো হাওয়ার ওপর স্টেইন অনেক বেশি নির্ভরশীল। একইসঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্যকে মিশিয়ে নিতে তিনি উৎসাহী। পাশাপাশি তিনি খেয়াল রাখতে ভুলতেন না বাড়িটি কোন কাজে ব্যবহার করা হবে।
এইসব ধারণা-ভাবনার আদর্শ দৃষ্টান্ত আইআইসি কমপ্লেক্স। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এ যেন লোদী গার্ডেনেরই সম্প্রসারিত অংশ। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গাছপালা, ফুলের কেয়ারী, ঘাসের সবুজ আঙিনার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে দোতলা অতিথিনিবাস। এই অতিথিনিবাসের যে কোনও ঘরের জানালা খুলে দিলেই দেখা যায় লোদী গার্ডেনের অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। করিডরে জালির ব্যবহারের জন্য দিনের বেলায় বাতি জ্বালানোর দরকার হয় না। আলোবাতাস নিশ্চিন্তে খেলা করে। স্পেন এবং ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে এই ধরনের জালি ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন মরক্কোর ইমারতে এই ধরনের জালি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল বলে পরিভাষায় একে বলে মুরিস জালি। ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের প্রাসাদ-দুর্গগুলিতেও মুরিস জালি ব্যবহৃত হয়েছে। সবমিলিয়ে আইআইসি-র মুরিস জালি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এক বিশিষ্ট বন্ধন।
আইআইসি-র স্থাপত্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আসতে থাকে নতুন নতুন কাজের আমন্ত্রণ। ১৯৬২-তে আইআইসি-র নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পাশের জমিতে শুরু করতে হল রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিভিন্ন সংগঠনের ভারতীয় দপ্তরের নকশা প্রণয়নের কাজ। হাতে এল ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার, ফোর্ড ফাউন্ডেশন ইত্যাদির দপ্তর নির্মাণের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব। অনেকদিন পর এখানেই স্টেইনের নকশায় তৈরি হয়েছে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের ভারতীয় দপ্তরগৃহ। এবং ফরাসি সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র আলিয়াস ফ্রানজে। সবগুলো বাড়িই পাশাপাশি অবস্থিত। অথচ কোনওটার সঙ্গে অন্যটার মিল নেই। দপ্তরের কাজের ধরনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বাড়ির নকশা। নির্মাণের পর মনে হয়েছে যে এই দপ্তরের কাজকর্মের জন্য এর থেকে মানানসই বাড়ি আর হতে পারে না। অথচ সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন যে একই মহল্লার প্রতিটি বাড়ির নকশা আদতে একজনের কীর্তি। তবে খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে প্রতিটি বাড়িই পরিবেশবান্ধব, গাছপালা ঘেরা সবুজ ঘাসের ওপর গড়ে উঠেছে। এবং রয়েছে মুরিস জালির ব্যবহার। অহেতুক কংক্রিটের প্রাচুর্য অনুপস্থিত। স্থানীয় ইমারতি উপকরণ দিয়ে গড়ে উঠেছে প্রতিটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। একই মহল্লায় এতগুলো স্থাপত্যের নকশা একজন মানুষের হাতে রচিত হয়েছে এমনটা খুব একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে প্রতিটি কীর্তিই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন। স্থপতিদের কাছে সেই সুবাদে এলাকার নাম স্টেইনাবাদ। নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল অর্থাৎ স্থানীয় পুর কর্তৃপক্ষও জোসেফ স্টেইনের অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে। এখানকার একটি রাস্তার নাম জোসেফ স্টেইন লেন।
কয়েক পা দূরে লোদী রোডের ওপারে অবস্থিত ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টারও (আইএইচসি) জোসেফ স্টেইনের নকশার ভিত্তিতে নির্মিত। ১৯৯৩-এ আইএইচসি-র নির্মাণ শেষ হওয়ার পর বোঝা যায় যে শহরের কেন্দ্রস্থলে বহুতল নির্মাণের জন্যও ন্যূনতম কংক্রিট ব্যবহার করে সুদৃশ্য কালচারাল কমপ্লেক্স তৈরি করা যায়। আইএইচসি আধুনিক স্থাপত্যের এক অনবদ্য নিদর্শন। বহুতল অট্টালিকার সমাহার হওয়া সত্ত্বেও মনে হয় না কংক্রিটের জঙ্গল। অ্যারোব্রিজ দিয়ে সবক’টি বাড়ি সংযুক্ত। চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে সবুজ ঘাসের কার্পেট। রয়েছে অনেক গাছ। খোলামেলা প্রাঙ্গণে অবস্থিত প্রতিটি বাড়িতেই আলো-হাওয়া খেলা করে। ছোটবড় মাঝারি অনেক অডিটোরিয়াম রয়েছে। অনুষ্ঠানে দর্শকের উপস্থিতি অনুমান করে অডিটোরিয়াম বেছে নিলেই হল। লাইব্রেরি, আর্টগ্যালারি, কনফারেন্স রুম, লাউঞ্জ, ক্যাফেটেরিয়া, রেস্তোরাঁ, অতিথিনিবাস ইত্যাদি নিয়ে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক অঙ্গন বা কালচারাল কমপ্লেক্স। আইএইচসি-র সবচেয়ে বেশি দর্শকাসন বিশিষ্ট মঞ্চের নাম, স্টেইন অডিটোরিয়াম। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই বহুতল কালচারাল কমপ্লেক্সের ভেতরে বিরাজ করে এক অদ্ভুত শান্ততা। দিল্লির পরিচিত ব্যস্ততা আইএইচসি-র ভেতরে একেবারেই অনুপস্থিত। স্টেইনের স্থাপত্যের এটাই বৈশিষ্ট্য।
[caption id="attachment_281661" align="aligncenter" width="600"]
ইন্ডিয়া হ্যাবিট্যাট সেন্টার (আইএইচসি)।[/caption]
স্টেইনাবাদের থেকে একটু দূরে মান্ডি হাউস এলাকায় রয়েছে স্টেইনের আরেকটি অনন্য স্থাপত্য কীর্তি। ত্রিবেণী কলাসঙ্গম। একটি আর্টগ্যালারি। আরেকটু দূরের আই টি ও মোড়ের কাছে পিয়ারীলাল গান্ধি ভবন। তাঁর পরিকল্পনায় নির্মিত হয়েছে চাণক্যপুরীর অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাস, ইথিওপিয়ার দূতাবাস, আমেরিকান এমব্যাসি স্কুল।
দিল্লির বাইরেও স্টেইনের কাজের নিদর্শন আছে। দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান ইনস্টিটিউট, আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ভেতরে অবস্থিত কেনেডি জেনারেল এডুকেশন সেন্টার, শ্রীনগরের কাশ্মীর কনফারেন্স সেন্টার, কোঝিকোড়ের আইআইএম, আহমেদাবাদের গুজরাট স্টিল টিউবস্ ফ্যাক্টরি, লুধিয়ানার হোম সায়েন্স কলেজ, মুম্বাইয়ের মেরিন ড্রাইভে অবস্থিত এক্সপ্রেস টাওয়ারস্ স্টেইনের পরিকল্পনা ও নকশায় নির্মিত। অর্থাৎ শুধু দিল্লি নয় ভারতের উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে স্টেইনের স্থাপত্য কীর্তি। তবে স্টেইনাবাদ কেবলমাত্র দিল্লির নিজস্ব সম্পদ।
পরিশিষ্ট : জোসেফ অ্যালেন স্টেইন চল্লিশ বছর বয়সে ১৯৫২-য় ভারতে আসেন। ভারতবর্ষে অনেক অনবদ্য স্থাপত্যকীর্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। তেতাল্লিশ বছর ভারতে কাটিয়ে ১৯৯৫-এ তিনি নিজের দেশে ফিরে যান। এবং সেখানেই ২০০১-এ ৮৯ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
(অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)
চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে