
শেষ আপডেট: 1 September 2020 13:46
১৩০৩ সালে মঙ্গোল আক্রমণের সময় তাদের সেনাপতি তারগি সিরি দুর্গটি অবরোধ করে। আলাউদ্দিন তখন দুর্গ ছেড়ে দূরে চলে গেছেন। তারগি সিরি দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি। অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত মধ্য এশিয়ায় নিজের দেশে ফিরে যেতে হয়। এরপরেই আলাউদ্দিনের বাহিনী আমরোহা-য় (এখন উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত) মঙ্গোলদের পরাজিত করে। কিংবদন্তি অনুসারে, দুর্গের ভিত প্রায় ৮,০০০ নিহত মঙ্গোল সৈন্যের কাটা মাথার (হিন্দিতে 'শির') ওপর নির্মিত হয়েছিল বলে দুর্গটির নাম সিরি দেওয়া হয়।
সূচনালগ্নে সিরি ফোর্টের দারুণ রমরমা। তখন 'দারুল খিলাফত' বা 'ক্যালিফেটের আসন' নামেও পরিচিত ছিল সিরি ফোর্ট। কুতুব মিনারের ৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিরি ফোর্ট নির্মিত হয়েছিল। খলজি রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক আলাউদ্দিন ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিরি ফোর্টের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সিরিতে নির্মিত কাঠামোগুলি খলজি রাজবংশের শাসকদের স্থাপত্যের প্রতি গভীর আগ্রহের পরিচয়। পশ্চিম এশিয়ায় ঘন ঘন মঙ্গোল আগ্রাসনের কারণে তুরস্কের সেলজাকরা দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছিল। তুরস্কের সেলজাক সম্প্রদায় ভারতে রাজনৈতিক কারণে অভিবাসী হিসেবে বসবাসের সুযোগ পায়। স্থাপত্যের বিষয়ে সেলজাক সম্প্রদায়ের মানুষ বরাবরই পারদর্শী। আলাউদ্দিন সেলজাকদের দক্ষতার স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সিরি ফোর্ট ও সংলগ্ন এলাকার নকশা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নির্মাণ, সমস্ত দায়িত্ব সেলজাক স্থপতি, শিল্পী এবং শ্রমিকরা সামলে নিয়েছিলেন। জনশ্রুতি, ৭০ হাজার সেলজাক শ্রমিকের শ্রমের ফসল সিরি ফোর্ট। শহরটি প্রাসাদ এবং অন্যান্য কাঠামো সহ একটি ডিম্বাকৃতির পরিকল্পনা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। প্রবেশ ও প্রস্থানের জন্য সাতটি গেট ছিল তবে বর্তমানে কেবল দক্ষিণ-পূর্ব গেট বিরাজমান।
দুর্গটিতে এক হাজার স্তম্ভ ছিল বলে একসময় সিরি ফোর্ট 'হাজার সুতান' নামে বিবেচিত হত। বসবাসের প্রাসাদটি দুর্গের সীমার বাইরে নির্মিত হয়েছিল। লোকশ্রুতি, প্রাসাদের মেঝেতে মার্বেল বসানো হয়েছিল। অন্যান্য দেওয়ালও নাকি পাথরের কারুকার্যে সজ্জিত ছিল। প্রাসাদের দরজাও নাকি দারুশিল্পের সার্থক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হত।
আশপাশের শাহপুর জাট গ্রামে জরাজীর্ণ কাঠামো এখনও দেখা যায়। তোহফওয়ালা গুম্বাদ মসজিদ এমন একটি কাঠামো যার ধ্বংসাবশেষটি গম্বুজযুক্ত খালজিস স্থাপত্যের প্রাচীরের বৈশিষ্ট্য দেখায়।
সিরি ফোর্ট নির্মাণ ছাড়াও দুর্গ এবং প্রাসাদে জল সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য হাউজ খাস নামের (বর্তমান হাউজ খাস এলাকা) জলাশয় প্রকল্পও নির্মিত হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরবর্তী সময়ের শাসকরা সিরি ফোর্ট এবং সংলগ্ন প্রাসাদের পাথর, ইট, মার্বেল, কারুকার্য করা দরজা-জানালা, এবং অন্যান্য মহার্ঘ নিদর্শনগুলি তাদের নিজস্ব ভবনের জন্য সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সিরি ফোর্টের বাকি কাঠামোটি প্রত্নতাত্ত্বিকদের দ্বারা অপরিবর্তিত এবং সংরক্ষিত ছিল। তবে এশিয়াড ভিলেজ নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর হারিয়ে যায় সিরি ফোর্টের বেশিরভাগ ধ্বংসাবশেষ। আশার কথা ২০০৮-এর ডিসেম্বর থেকে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া নতুন করে সিরি ফোর্ট এবং সংলগ্ন এলাকায় খননের কাজ শুরু করে প্রায় সাত শতাব্দী আগে নির্মিত করা প্রাচীরের কিছু গোপন অংশ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। হয়তো এর ফলেই জানা যাবে সিরি ফোর্টের অজানা অনেক তথ্য।
(অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)
চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে