
শেষ আপডেট: 10 October 2020 05:19
ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে গেলে সামনের রাস্তাটা ফতেপুরী হয়ে চাঁদনী চকের দিকে চলে গেছে। আর ডান দিকেরটা খাড়ি বাউলির পাইকারি বাজারের পাশ দিয়ে নতুন দিল্লি রেল স্টেশন অভিমুখে রওনা দিয়েছে।
সদর বাজার মোড় থেকে যে রাস্তাটি সামনের দিকে যাচ্ছে সেটা ধরে খানিকটা এগোলেই আজাদ মার্কেট হয়ে মেট্রোর তিশহাজারি স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। আর বাঁ দিকে রয়েছে সদর বাজার। সবমিলিয়ে তিশহাজারি, চাঁদনী চক, নতুন দিল্লি স্টেশন থেকে সরাসরি সদর বাজারে যাওয়া যায়।
এখানেই শেষ নয়। পাহাড়গঞ্জ তো নতুন দিল্লির পরিচিত জায়গা। এখানেই অবস্থিত রামকৃষ্ণ মিশন। সকলের পরিচিত। পাশেই রয়েছে মেট্রো স্টেশন। রামকৃষ্ণ মিশনের পাশের চিত্রগুপ্ত রোড ধরে মেরেকেটে এক কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই এসে যাবে দিল্লির অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা দেশ বন্ধু গুপ্তা রোড। সাবধানে রাস্তা পেরিয়ে ওপারে গেলেই কানে আসবে, --বরা টুটি চক, এক সওয়ারি। টোটো বা রিকশা থেকে সারাদিন ভেসে আসছে এমন আমন্ত্রণ। এই পথে নিজের বাহন নিয়ে না আসাই ভাল। পার্কিং সমস্যা। তাকত থাকলে হেঁটেও যাওয়া যায়। দেড় কিলোমিটার বা একটু বেশি।
এই রাস্তার পোশাকি নাম সদর থানা রোড। রাস্তার বাঁ পাশে মোতিয়া খান নামের আবাসন পেরোলেই এসে যায় সদর থানা। তারপরই বাজার। এই বাজারের বৈশিষ্ট্য অবশ্যই আপনার নজর কাড়বে। একের পর এক তিনতলা বাড়ির সমাহার। প্রতিটি বাড়িই অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরি। নকশা ভিন্ন হলেও স্থাপত্যশৈলী একইরকম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে এই ধরনের স্থাপত্যের নির্মাণ শুরু হয়েছিল। একতলায় দোকান। দোতলা এবং তিনতলায় বসবাস। প্রতিটি তলের উচ্চতা দেখার মতো। এখনকার নকশায় তৈরি হলে নিদেনপক্ষে পাঁচতলা হয়ে যেত। একতলাগুলো বোধ হয় আরও একটু বেশি উঁচু। আসলে একতলায় দোকান তো বটেই গুদামও রয়েছে। তার ওপরে এইসব দোকানের পণ্য হল তামা, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ইত্যাদির পাত, তার, বার, রড ইত্যাদি। ফলে এই বাজারে কোনও হৈচৈ নেই। অথচ প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য হয়ে চলেছে। পুরসভার নথিতে অবিশ্যি সদর থানা রোডের ধাতুর বাজার সদর বাজারের অংশ নয়।
বরা টুটি চকও চার রাস্তার মোড়। সকাল সকাল এখানে পৌঁছে গেলে দেখতে পাবেন সার দিয়ে বসে আছেন শাগরেদ সহ রাজমিস্ত্রি, বাড়িঘর রঙের মিস্ত্রি, অদক্ষ শ্রমিক প্রমুখ। কতজন? একশো দুশো অথবা আরও বেশি। নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছোট ঠিকাদার ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের সঙ্গে চুক্তি করে পাঠিয়ে দেন দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে। বেলা একটু বাড়তে না বাড়তেই এইসব কারিগররা উধাও। কতজন চুক্তিনির্ধারিত কর্মক্ষেত্র রওনা দিলেন আর কতজন কাজ না পেয়ে নিজের বাড়ি/ঝুপড়িতে ফিরে গেলেন তার খবর অবিশ্যি কেউ রাখেন না।
বরা টুটি চক থেকে সামনের দিকে এগিয়ে গেলে ডেপুটিগঞ্জ পৌঁছে যাবেন। পাশেই রয়েছে বস্তি হরফুল সিং। এইসব এলাকার চরিত্র বড়ই বিচিত্র। বসবাসের মহল্লায় দিব্বি চলছে বাসনকোসনের বাজার। স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, পিতল, কাচ, সিরামিক এমনকি কাঁসার বাসনকোসনও এখানে পাওয়া যায়। দাম এবং মান দেখলে চমকে উঠবেন। পাড়ার দোকান তো বটেই এমনকি এখনকার শপিং মলে থালা-বাটি যে দামে বিকোয় সেই একই ব্র্যান্ড একই মান এখানে এত কম দামে কীভাবে বিক্রি হয় তা ব্যাখ্যা করার জন্য বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন না হয়ে উপায় নেই।
বরা টুটি চক একটু উঁচু জায়গায় অবস্থিত। কাজের দিনে এখানে দাঁড়িয়ে ডান দিকে তাকালে দেখতে পাবেন মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এটাও সদর বাজারের একটা প্রবেশ অথবা প্রস্থানপথ। বরা টুটি চক থেকে সদর বাজার রেল সেতুর দূরত্ব এক কিলোমিটার হবে কিনা মেপে দেখতে হবে। তবে এই ভিড়ে ভিড়াক্কার রাস্তার দু'পাশে এবং ডাইনে বামে চলে যাওয়া অসংখ্য গলির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে ৪০ হাজারেরও বেশি দোকান। গলিগুলি কত চওড়া? গায়ের ছোঁয়া না লাগিয়ে দু'জনের পক্ষে যাতায়াত করা সম্ভব নয়। এখানে একটা অদ্ভুত বিষয় আপনার চোখে পড়বে। প্রতিটি গলিতে কিন্তু ভিন্ন পণ্যের বাজার। যেখানে কাচের বাসন বিক্রি হচ্ছে সেখানে হয়তো সার দেওয়া দোকানে শুধু কাচের বাসনই বিক্রি হচ্ছে। অন্য কিছু পাওয়া যায় না। তবে আপনার চাহিদা শুনে যেকোনও দোকানদার বলে দেবেন ঠিক কোন গলিতে আপনাকে যেতে হবে।
সদর বাজারে কী কী পাওয়া যায়? তার থেকে বলা সহজ কী কী পাওয়া যায় না। কোনও গলিতে রকমারি হাতঘড়ির সম্ভার। কাচের চুড়ি, লিপস্টিক থেকে শুরু করে রূপসজ্জার যাবতীয় উপকরণ, পুরুষ মহিলাদের ব্যবহার্য দামি, সস্তা সব ধরনের সুগন্ধী, আসল এবং নকল, এখানে প্যাকেট ভর্তি হয়ে বিকোয়। ফ্যাশনের রোদচশমা, ঝলমলে পোশাক পরা টকিং ডল রান্নার ভিন স্বাদের মশলা, সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর সবই এখানে পাওয়া যায়। ঘরকন্নার সমস্ত উপকরণ তো বটেই এমনকি আপনার অজানা বহু বিচিত্র পণ্য সদর বাজারের বিভিন্ন দোকানে থরে থরে সাজানো আছে।
প্রতিটি গলিতে যেমন রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের দোকান তেমনি প্রত্যেক গলির আছে আলাদা নাম। প্রকাশ গলি, মাতাওয়ালি গলি, প্রতাপ মার্কেট, খিলওয়ানা মার্কেট, স্বদেশি মার্কেট, বর্তন মার্কেট এইরকম আরও অসংখ্য নাম। দোকানগুলোর উপরের তলায় বা তারও উপরে তিনতলায় দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের বাসস্থান। অন্তত ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত এমনই বন্দোবস্ত ছিল। দোকানের মালপত্র রাখার প্রয়োজনে উপরের তলার বসবাস উঠিয়ে মালিকরা ধীরে ধীরে অন্যত্র আস্তানা খুঁজে নেন।
সদর বাজারে সওদা করতে এসে কখনও ভুল করেও আকাশের দিকে তাকাবেন না। আকাশ দেখতে পাবেন না। বিদ্যুৎয়ের তার, টিভির কেবল, টেলিফোনের তার এলোমেলো ভাবে এমনভাবে জট পাকিয়ে রয়েছে যে দেখে ভয় লাগবে। যেকোনও মুহূর্তে যেন মাথার উপর ছিঁড়ে পড়তে পারে। সত্যি সত্যিই এমন দুর্ঘটনা ইদানীং মাঝেমধ্যেই হচ্ছে। ফলে দোকান বাজারে আগুন লাগছে। তারপর দমকল, পুলিশ ইত্যাদি।
হোলি আর দিওয়ালির আগে সদর বাজারের অন্য চেহারা। নিত্যকার পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় রং অথবা বাজি। বছরের অন্য সময় দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা ব্যাগ বা বস্তায় ভরে প্রয়োজনের সামগ্রী কিনলেও এই দুই উৎসবের আগে কিন্তু রং অথবা বাজি কিনতে ভুল করেন না। উৎসবের সুবাদে ঘরে দুটো বাড়তি পয়সা এলে মন্দ কী!
সদর বাজার সফরে আসুন অথবা এখানে সওদা করুন, প্রতিমুহূর্তে কিন্তু সতর্ক থাকা অবশ্য কর্তব্য। রিকশা, ঝাঁকা মাথায় মুটে, স্কুটার, কাঁধে ব্যাগ মাথায় বস্তা নিয়ে কোনও দিকে না তাকিয়ে ছুটতে থাকা ক্রেতা যেকোনও মুহূর্তে ধাক্কা দিলে কোনও প্রতিবাদের সুযোগ নেই। আশপাশের লোকজন একটু তাচ্ছিল্য মেশানো সহানুভূতি দেখিয়ে পরামর্শ দেবেন, --সদর বাজারে একটু সামলিয়ে চলতে হয়। আর আছে পকেটমার। অসতর্ক মানুষের ওপর সবসময় তাদের সজাগ দৃষ্টি। সামান্যতম সুযোগ তারা অপচয় করতে রাজি নয়। অতএব সাবধানে চলাফেরা করা জরুরি।
দিল্লির দু'কোটি মানুষ তো আছেই তার ওপরে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর ঘরকন্নার যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য সদর বাজারের এত খ্যাতি। ব্যক্তিগত কেনাকাটার জন্য অনেকেই আসেন। একটু কষ্ট হলেও দামে অনেকটাই সাশ্রয়। তার ওপরে পছন্দের জিনিস বাছাই-যাচাই করে কেনাকাটার মধ্যে জড়িয়ে থাকে একধরনের মানসিক সন্তুষ্টি। সর্বোপরি এখানে খুচরো বিক্রিবাট্টাও পাইকারি দরে হয়। ৪০ হাজারেরও বেশি দোকান। নির্দিষ্ট পণ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন বিক্রেতা গড়ে তুলেছেন প্রায় শতখানেক অ্যাসোসিয়েশন। না করে উপায় কী! ৪০ হাজারেরও বেশি দোকানমালিক। প্রতি দোকানে তিন-চারজন কর্মচারী। রয়েছেন অজস্র ঝাঁকামুটে, ঠেলাওয়ালা, কুলি ইত্যাদি। সবমিলিয়ে প্রতিদিন আড়াই তিন লাখ মানুষের রুটিরুজি সদর বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নিত্যদিনের ঝামেলাঝক্কি তো প্রাথমিক স্তরে অ্যাসোসিয়েশনই সামলিয়ে নেয়। আবার পাড়ায় পাড়ায় গাঁয়েগঞ্জে নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত সামগ্রীর যোগানদাতা সদর বাজার। চূড়ান্ত পর্যায়ে মনে পড়ে যায় ১৯৮০-র দশকের সেই বিখ্যাত নাটকের নাম, --জিস লাহোর নেই দেখা, উও জন্মাই নেই। সেই অনুরণনে বলা যায়, --সদর বাজারে হাজির না হলে দিল্লি সফর সম্পূর্ণ হয় না।
(অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)
চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে