
শেষ আপডেট: 1 June 2020 05:41
মসনদে বসতে না বসতেই বাংলা, গুজরাত এবং অন্যান্য অনেক এলাকায় শুরু হল বিদ্রোহ। বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের কোনও চেষ্টাই নেই। কারণ সমস্ত বিদ্রোহীই সম্পর্কে সুলতান ফিরোজ শাহের জ্ঞাতি। বিদ্রোহ দমন না করে বা রাজত্বের হারানো অংশগুলো ফিরিয়ে আনার কোনও চেষ্টা না করে যতটুকু ভৌগোলিক এলাকা নিজের অধীনে ছিল ততটুকুই ভালভাবে শাসন করতে উদ্যোগী হলেন ফিরোজ শাহ। দেশের সেচব্যবস্থা, পরিকাঠামো উন্নয়নে তাঁর প্রবল আগ্রহ। রাজকীয় সড়কের পাশে বিশ্রামাগার গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তিনিই প্রথম উপলব্ধি করলেন। পানীয়জলের চাহিদা মেটানোর জন্য দেশের বিভিন্ন গ্রাম এবং শহরে প্রচুর কুয়ো খননের কাজ শুরু করলেন। ফিরোজাবাদ ছাড়াও উত্তর ভারতের অনেকগুলি শহরের গোড়াপত্তন তাঁর হাতেই হয়েছিল। ১৩৬৮ নাগাদ ফিরোজ শাহ তুঘলকের উদ্যোগেই কুতুব মিনারের সংস্কার হল।
দেশে শিক্ষার প্রসারেও তাঁর যথেষ্ট অবদান অনস্বীকার্য। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তোলা হল। এই প্রথম প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য বানানো হল সরকারি ইমারত। রাজধানী ফিরোজাবাদের আশপাশে প্রায় তিনশো গ্রামের পত্তন হল। গ্রামগুলোতে সেচের জল পৌঁছে দেওয়ার জন্য কাটা হল বেশ কয়েকটি খাল। এখনকার দিল্লিতে সেইসব খাল সংস্কারের অভাবে বিভিন্ন নামের নালা হিসেবে পরিচিত। সেচের সুবিধা হওয়ায় কৃষিজমির পরিমাণ বেড়ে গেল। জনসংখ্যা বাড়তে থাকলেও খাদ্যচাহিদা মেটাতে অসুবিধা হয়নি। অতিদরিদ্রের হাতে সরাসরি নগদ পৌঁছে দেওয়ার যে প্রস্তাব নিয়ে এখনকার অর্থনীতিতে নানারকম বিতর্ক-বিবেচনা চলছে, সেই ব্যবস্থা কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতেই ফিরোজ শাহ তুঘলক প্রবর্তন করেন। কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবার রাজকোষ থেকে সরাসরি আর্থিক সাহায্য পেত। সমস্ত সরকারি কর্মচারীর একসঙ্গে বেতন বৃদ্ধি সেযুগের নিরিখে একটি অনবদ্য ঘটনা। হাত কেটে ফেলা, গর্দান নেওয়া গোছের সমস্ত কঠোর শাস্তি দেশ থেকে বিদায় নিল। এছাড়াও মহম্মদ বিন তুঘলকের আমলে আরোপিত ভূমির ওপর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার করা হল। এতকিছুর পরেও বলা হয়, সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আমল ছিল ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। কথিত আছে যে, সেনাপ্রধান ইমাদুল-মুলক বাশির, যিনি প্রথম জীবনে ছিলেন সুলতানের ক্রীতদাস, তিনি অবৈধভাবে প্রায় তেরো কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছিলেন। অথচ সেইসময় দেশের রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা।
[caption id="attachment_225780" align="aligncenter" width="600"]
জামি মসজিদ।[/caption]
লাল কেল্লা দেখতে যাওয়ার জন্য সারাবছরই ভিড় উপছে পড়ে। আর লাল কেল্লার দুই কিলোমিটার দক্ষিণের ফিরোজ শাহ কোটলায় দর্শকের হাহাকার। লাল কেল্লার (১৬৪৮) থেকে প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো ফিরোজ শাহ কোটলায় (১৩৫৪) দর্শক কোথায়? প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকলেও এই ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ দেখতে ইচ্ছুক মানুষের বড়ই অভাব। হঠাৎ করে হয়তো একঝাঁক বিদেশি পর্যটক এসে পড়ল। অন্যথায় সারাদিনই ধু-ধু করে ফিরোজ শাহ কোটলার চত্বর। তারপর অন্যান্য ভাঙা বাড়ির মতো এই দুর্গ-প্রাসাদকে নিয়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভূতের গল্প। সন্ধে হলেই নাকি এই চৌহদ্দির দখল নিয়ে নেয় জিন নামের অশরীরী। সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কারও কোনও চিন্তাভাবনা নেই। অথচ যেটুকু রয়েছে তার থেকেও মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার দুপুরে নামাজের সময় অবিশ্যি ফিরোজ শাহ কোটলার প্রাঙ্গণে অবস্থিত জামি মসজিদে অনেকে আসেন। এবং নামাজের পরই ফিরে যান। তাঁদের তো সেই অর্থে দর্শনার্থী বলা চলে না। আর মসজিদের অবস্থান একেবারে সদর দরজার লাগোয়া বলে তাঁদেরও প্রাঙ্গণ পরিক্রমার প্রয়োজন হয় না। প্রাচীর ঘেরা এই দুর্গ-প্রাসাদের একদিকে জামি মসজিদের ছাদবিহীন ধ্বংসস্তূপ বর্তমান। অথচ ফিরোজাবাদ যখন দেশের রাজধানী তখন এটিই ছিল দিল্লির সবচেয়ে বড় মসজিদ। ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি আক্রমণকারী তৈমুর লং-ও এই মসজিদে প্রতি শুক্রবার নামাজ পড়তে আসতেন।
ভাঙাচোরা জামি মসজিদের অন্য পাশে ১৩.১ মিটার উঁচু বেলেপাথরের তৈরি একটি স্তম্ভ বর্তমান। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের উদ্যোগে নির্মিত স্তম্ভটি ফিরোজ শাহ তুঘলক তখনকার পঞ্জাবের আম্বালা এলাকা বা এখনকার হরিয়ানার যমুনানগর জেলার টোপরা কালান থেকে আনিয়ে এখানে ১৩৫৬ খ্রিস্টাব্দে নতুন করে স্থাপনের ব্যবস্থা করেন।
[caption id="attachment_225781" align="aligncenter" width="600"]
টোপরা অশোকস্তম্ভ।[/caption]
গৌতম বুদ্ধের স্মৃতিজড়িত বিভিন্ন স্থান, বৌদ্ধ তীর্থস্থান ও বৌদ্ধবিহারগুলিতে সম্রাট অশোক অনেকগুলি স্তম্ভ স্থাপন করিয়েছিলেন। সম্রাট অশোক কোনও জায়গার উদ্দেশে যাত্রা করলে তার স্মারক হিসেবেও বেশ কয়েকটি স্তম্ভ স্থাপিত হয়। পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ছ’টি ও হিউয়েন সাঙ পাঁচটি অশোকস্তম্ভের উল্লেখ করেছেন। সেগুলির মধ্যে মাত্র পাঁচটি এখন ভারতে রয়েছে। ফিরোজ শাহ কোটলার অশোকস্তম্ভটি টোপরা কালান বা টোপরা গ্রাম থেকে আনা হয়েছিল বলে ইতিহাসের পাতায় এর পরিচয় টোপরা অশোকস্তম্ভ। এই স্তম্ভের উৎকীর্ণ লিপি থেকে বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ তথা এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের মুখপত্রর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক জেমস প্রিন্সেপ ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মী অক্ষরের পাঠোদ্ধার করেন।
এখনকার দিল্লির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কর্মব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত হলেও ফিরোজ শাহ কোটলার সদর দরজায় পৌঁছনোর কাজটি মোটেও সহজ নয়। দিল্লির অন্যতম ব্যস্ত এলাকা আইটিও মোড় থেকে বাহাদুর শাহ জাফর মার্গ ধরে উত্তরে দিল্লি গেট, দরিয়াগঞ্জ, লাল কেল্লার দিকে রওনা দিলে রাস্তার বাঁ-হাতে একের পর এক দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর। আর ডান পাশের বাড়িগুলো থেকে প্রকাশিত হয় বিভিন্ন সংবাদপত্র। মেরেকেটে এক কিলোমিটারও নয়। তারপর রাস্তার বাঁ-পাশে শুরু হয়েছে মৌলানা আজাদ মেডিক্যাল কলেজ। একেবারে দিল্লি গেটের মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে রয়েছে এর চৌহদ্দি। ডান পাশে ততক্ষণে হাজির হয়েছে কিছুটা ফাঁকা জায়গা, একটা পেট্রোল পাম্প আর তারপরেই ফিরোজ শাহ কোটলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম। অবশ্যি ১৮৮৩-তে প্রতিষ্ঠিত এই ক্রিকেট স্টেডিয়ামের এখন নাম হয়েছে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামের ফটকে পৌঁছনোর একটু আগে ডান দিকে ঢুকে গেছে একফালি নির্জন রাস্তা। নিশ্চিন্তে এই পূর্বমুখী রাস্তা ধরে দু-চার পা এগোলেই পৌঁছে যাবেন ফিরোজ শাহ কোটলার সদরে। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলে বাঁ-দিকে তাকালে নজরে আসে কাঁটাতার ঘেরা একটি বাওলি। কাঁটাতারের বেড়ায় লটকে থাকা নীল রঙের সরকারি বোর্ডে বাওলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় লেখা আছে। তার পাশেই অন্য একটি বোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে, আপাতত প্রবেশ নিষেধ। টোপরা অশোকস্তম্ভ এবং গোলাপ বাগও একই রকমভাবে কাঁটাতারে ঘিরে রাখা হয়েছে। এবং আপাতত প্রবেশ নিষেধ। তবে উচ্চতার জন্য অশোকস্তম্ভ দূর থেকেই দেখা যায়। সদরের ডানদিকে রয়েছে জামি মসজিদ। তারপরই দাঁড়িয়ে আছে এক খণ্ডহার। ইতিহাসের পাতায় এবং সরকারি নথিতে যার পরিচয় ফিরোজ শাহ কোটলা। আর ভারতীয় ডাক বিভাগের খাতায় যার ঠিকানা, বাল্মীকি বস্তি, বিক্রম নগর, নতুন দিল্লি- ১১০০০২।
(অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)
চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে