
শেষ আপডেট: 1 May 2020 06:12
আসলে, ভুলটা তো গোড়াতেই রয়ে গেছে। না এ মহল্লায় কোনওকালে বাঙালির বসত ছিল, না কোনও বাঙালির হাতে এই বাজারের গোড়াপত্তন হয়েছিল। বেঙ্গলি মার্কেটের সঙ্গে বাঙালিয়ানার কোনও সম্পর্ক কোনওদিনই ছিল না। পুরোনো দিল্লির ব্যবসায়ী বেঙ্গলি মল লোহিয়া ১৯৩০-এ নিলামের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে এই এলাকাটি কিনে নেন। নির্মীয়মাণ নতুন দিল্লির উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত রেললাইনের ধারের এই ভূখণ্ড তখন মোটেও আকর্ষণীয় ছিল না। তবে বেঙ্গলি মল লোহিয়া নিঃসন্দেহে দূরদর্শী ছিলেন। নবনির্মিত ভাইসরয় হাউসকে ঘিরে তখন দিনরাত এক করে চলছে নতুন দিল্লির অন্যান্য এলাকা গড়ে তোলার কাজ। এক কিলোমিটার দূরের কনট প্লেস তৈরির কাজ পুরোদমে চলছে। বিভিন্ন ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণে থাকা অসংখ্য শ্রমিক সেই কাজে নিযুক্ত। অস্থায়ী তাঁবুতে তাদের অবস্থান। হোটেল-রেস্তোরাঁ তো বহু দূরের কথা, সাদামাটা খাবারের দোকানও সেযুগে প্রায় স্বপ্নের মতো। আশপাশে নেই এমন কোনও দোকান বাজার যেখান থেকে দু’বেলা ডাল-রুটি বানানোর কাঁচা রসদ যোগাড় করা যায়। ঠিকাদারদের অধিকাংশই সাবেক দিল্লির স্থায়ী বাসিন্দা হলেও রাতবিরেতে বাড়ি ফেরা মুশকিল। এই পটভূমিতে বেঙ্গলি মল লোহিয়া তাঁর সদ্য কেনা জমি ছোট ছোট প্লট করে বিক্রি করতে শুরু করলেন। ঠিকাদাররা কিনে নিয়ে তৈরি করলেন নিজেদের বসতবাড়ি। হঠাৎ করে এত মানুষ একজায়গায় বসবাস শুরু করায় গড়ে উঠল দোকানপাট। এলোমেলোভাবে নয়, রীতিমতো পরিকল্পনা করে একটা গোল চককে ঘিরে দোকানগুলো স্থাপিত হওয়ায় এখনও এলাকাটা আর পাঁচটা বাজারের মতো ঘিঞ্জি নয়, রীতিমতো সাজানো-গোছানো। এইভাবে ১৯৩৪-এ গড়ে উঠেছিল তখনকার বেঙ্গলি মল মার্কেট। সময়ের ধারাবাহিকতায় মল শব্দটি লোকের মুখে মুখে হারিয়ে গেছে। অন্যভাবে বললে বলতে হয়, চতুর্দিকে এত মল গজিয়ে ওঠায় বোধ হয় বেঙ্গলি মার্কেট মল শব্দটি বর্জন করেছে। তবে এখনকার বাঙালি বেঙ্গলি মার্কেটে গেলে বাংলায় দু-চার কথা বলার সুযোগ পায়। মেদিনীপুর থেকে এসে বছর দশ-পনেরো আগে ফুটপাতের ওপর ফুলের ব্যবসা শুরু করেন দুই ভাই। ফুল তো দিল্লিতে অনেকেই বিক্রি করেন। তবে ফুল নিয়ে শিল্প গড়ে তোলার কাজ তো সকলের আসে না। তাই ওঁদের দোকানের অত কদর। বেশিরভাগ ক্রেতা অবাঙালি হওয়ায় মাতৃভাষায় কথা বলতে শুরু করলে ওঁরা এখন বেশ অস্বস্তিতে পড়ে যান।
বেঙ্গলি মার্কেটের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে দুটো দোকান। বেঙ্গলি সুইটস আর নাথু'স সুইটস। অত বড় বড় দোকান দুটোয় সারাদিনই ভিড় উপচে পড়ছে। উত্তর ভারতের যাবতীয় চটজলদি মুখরোচক খাবার সে পাঁপড়ি চাট হোক অথবা দহি ভাল্লা এদের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া রয়েছে নানান রকমের নিমকি, সামোসা বা সিঙাড়া, হালুয়া, খাজা, চানাচুর প্রভৃতি। মিষ্টির হাজারো পদ। এক শোনপাপড়ির যে কত রকমের চেহারা হতে পারে, তা দেখার বা খাওয়ার জন্য এখানে আসতেই হবে।
[caption id="attachment_216291" align="aligncenter" width="349"]
লালা বেঙ্গলি মল লোহিয়া।[/caption]
দোকান দু’টির সূচনা কিন্তু একদম অন্যরকমভাবে হয়েছিল। নতুন দিল্লি থেকে সারা দেশের অর্থাৎ অবিভক্ত ভারতের প্রশাসন পরিচালিত হওয়ার দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়ে গেছে। পাশেই রেলস্টেশন হওয়ায় সদ্য স্থাপিত বেঙ্গলি মল মার্কেট এলাকায় তখন শ্রমিকদের নিত্য আনাগোনা। আশপাশের রাজ্য থেকে কাজের খোঁজে নিয়মিত লোক আসছে। কোনওরকমে একটা ছাউনি বানিয়ে বসবাস করে। বেঙ্গলি মল মার্কেট তখন সারাদিনই সরগরম। এইরকম কর্মব্যস্ত পরিস্থিতিতে এখনকার হরিয়ানার (তখন তো পঞ্জাব) নারওয়ানা গ্রাম থেকে কাজ খুঁজতে দিল্লি আসছিলেন জনৈক নাথুরাম গুপ্তা। বেঙ্গলি মার্কেট লাগোয়া স্টেশনে কী কারণে যেন ট্রেনটা অনেকক্ষণের জন্য থেমে গেল। যুবক নাথুরাম ট্রেন থেকে নেমে পায়চারি করতে করতেই বেঙ্গলি মার্কেটের শ্রমিক মহল্লা দেখতে পেলেন। সকলেই দেখে তবে সত্যি সত্যিই দেখার চোখ ক'জনের থাকে। নাথুরাম দেখলেন আশপাশে কোনও চা-নিমকির দোকান নেই। আর ট্রেনে চড়া নয়, তিনি বেঙ্গলি মার্কেটেই থেকে গেলেন। শুরু হল অস্থায়ী চায়ের দোকান। তারপর ১৯৩৯-এ স্থাপিত হল নাথু'স সুইটস। বাকিটা তো ইতিহাস।
প্রায় একই পথের অনুসারী লালা ভীম সেইন। নতুন দিল্লি থেকে পুরোদমে দেশের প্রশাসন পরিচালনার কাজ শুরু হওয়ার পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৭ নাগাদ আম্বালা (মতান্তরে বিকানের) থেকে তিনি দিল্লি আসেন। এখনকার পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় তখন স্থাপিত হয়েছিল সেশনস কোর্ট। এই আদালত চত্বরে একটি অস্থায়ী চায়ের দোকান খুললেন ভীম সেইন। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বেছে নিলেন বেঙ্গলি মার্কেট মহল্লা। চায়ের দোকানের লাভকে পুঁজি করে ১৯৪০-এ বেঙ্গলি মার্কেটে প্রতিষ্ঠা করলেন বেঙ্গলি সুইটস। নাথুর মিষ্টির সঙ্গে শুরু হল অলিখিত প্রতিযোগিতা। দু’টি দোকানেই চোখে পড়ার মতো ভিড় হলেও নিজের উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে বিশেষত্ব এনে বিপণনের প্ৰচেষ্টা সব ব্যবসায়ীই করে থাকেন। নাথুরাম এবং ভীম সেইনও তেমন কিছু করতে চাইছিলেন। জিতে গেলেন ভীম সেইন। হঠাৎ একদিন রাম দাস নামের এক বাঙালি যুবক বেঙ্গলি সুইটস-এ হাজির হয়ে ভীম সেইনকে জানালেন যে, তিনি স্পঞ্জ রসগোল্লা বানাতে পারেন। রেললাইনের ওপারে মীরদার্দ রোডে রাম দাসের বসবাস। ১৯৩১-এ রেললাইনের উত্তর দিকে মিন্টো রোডে ভারত সরকারের প্রেস স্থাপিত হওয়ায় সন্নিহিত এলাকায় তখন কর্মসূত্রে প্রচুর বাঙালিকে সরকারি আবাসনে থাকতে হচ্ছে। এলাকায় তাঁদের এতই দাপট যে, নিজেদের সরকারি আবাসনের পাঁচিলের পাশের রাস্তার নাম রবীন্দ্রনাথের নামে রাখা হল টেগোর রোড। রাম দাস হয়তো কোনও সূত্রে বাংলা থেকে এপাড়ায় পৌঁছে গেছিলেন। স্পঞ্জ রসগোল্লা বানানোর প্রস্তাবটা সাহস করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেঙ্গলি সুইটসের মালিক ভীম সেইন লুফে নিলেন।
১৯২৯-এ চাঁদনী চক এলাকায় বিশুদ্ধ বাঙালি ঘরানার মিষ্টির দোকান অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভীম সেইন ততদিনে বুঝে গেছেন রসগোল্লার স্বাদ এবং জনপ্রিয়তা। উত্তর ভারতীয় নোনতা, মিঠাই ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হল বাংলার নিজস্ব মিষ্টান্ন। ধীরে ধীরে সংযুক্ত হতে থাকল সন্দেশ, চমচম, পান্তুয়া প্রভৃতি। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার পুরোনো দিল্লির সাবেকী বাঙালি এবং চাঁদনী চক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের চাহিদা মেটাতে এতই ব্যস্ত, নতুন দিল্লিতে গড়ে ওঠা নতুন বাজারে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পায়নি। ফলে বেঙ্গলি সুইটস এবং কিছুদিন বাদে নাথু'স সুইটস বাঙালি ঘরানার মিষ্টির সম্ভারে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকল। রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার সুবাদে কলকাতা থেকে আসা ব্রিটিশ রাজপুরুষ ফিরে পেল তাঁদের পরিচিত বাঙালি স্বাদের সুইট ডিশ। নিয়মিত সাহেবসুবোর আগমনে ক্রমশ বেঙ্গলি মার্কেট হয়ে গেল সম্পন্ন সম্প্রদায়ের অভিজাত বাজার। আজও সেই আভিজাত্যে ছন্দপতন ঘটেনি।
।।দুই।।
খান মার্কেট স্বনামখ্যাত। দেশে তো বটেই, বিদেশেও এই বাজার অভিজাত মহলে পরিচিত। বিশ্বের মহার্ঘ বাজারের তালিকায় প্রথম পঁচিশের মধ্যে এর অবস্থান। এই বাজারে কোনও কিছুই নাকি সুলভ নয়। দিল্লির বিত্তশালী ও অভিজাত বাড়ির লোকজনের এখানে নিয়মিত যাতায়াত।
ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পিত নতুন দিল্লির একপ্রান্তে খান মার্কেটের অবস্থান। ইন্ডিয়া গেট, গল্ফ কোর্স, লোদি গার্ডেন, সাজানো-গোছানো বাংলো, পদস্থ আমলাদের আবাসন ইত্যাদি পরিবৃত খান মার্কেট থেকে আমজনতা বরাবরই একটু দূরত্ব বজায় রাখতে অভ্যস্ত। দিল্লি মেট্রোয় খান মার্কেট বলে একটা স্টেশন থাকলেও দিনের কোনও সময়ই এই স্টেশনে ভিড়ভাট্টা নেই। আশপাশের সরকারি দপ্তরে যাঁরা চাকরি করেন তাঁদের অনেকে নিতান্ত বাধ্য হয়েই খান মার্কেট স্টেশন ব্যবহার করেন। অন্যথায় সারাদিন সুনসান। খান মার্কেটে বাজার করতে বা আড্ডা দিতে যাঁরা আসেন তাঁরা সাধারণত গণপরিবহণ পরিহার করে চলেন।
বিত্তশালীদের কথা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা হয়েছিল খান মার্কেট। নতুন দিল্লি নির্মাণের সময় যে ঠিকাদারদের নিয়োগ করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ছিলেন সর্দার শোভা সিং। এখনকার পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের শাহপুর জেলার এক গ্রাম তাঁর জন্মভূমি। সেখানেই তাঁর পূর্বপুরুষদের ভিটেমাটি। পিতা সুজন সিং রাস্তাঘাট-বাড়িঘর নির্মাণের ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। ১৯১১-র ১২ ডিসেম্বর, দিল্লি দরবার নামক রাজকীয় অনুষ্ঠানে রাজা পঞ্চম জর্জ ঘোষণা করলেন, কলকাতার বদলে দেশের রাজধানী হবে দিল্লি। সুজন সিং পুত্র শোভা সিংকে নিয়ে দিল্লি দরবার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বাইশ বছরের যুবক শোভা সিং বুঝতে পারলেন অচিরেই নতুন দিল্লি নির্মাণের কাজ শুরু হতে চলেছে। বাবার অভিজ্ঞতা আর নিজের উদ্যোগে সব বড় বড় কাজের বরাত যোগাড় করে ফেললেন শোভা সিং। বিশ বছর পর, ১৯৩১-র ১৩ ফেব্রুয়ারি, ভারতের গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড আরউইন নতুন রাজধানী হিসেবে যখন নতুন দিল্লির উদ্বোধন ঘোষণা করলেন, তখন আর্থিক সমৃদ্ধি এবং ক্ষমতার অলিন্দের আশীর্বাদের সুবাদে শোভা সিং দিল্লিতে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত। শোভা সিংয়ের ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য কোনও গোপন বিষয় নয়। তাঁর স্বনামধন্য পুত্র খুশবন্ত সিং প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধা করেননি যে, তাঁর পিতা শোভা সিং শহীদ ভগৎ সিংয়ের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। (আউটলুক পত্রিকা, ১৩ অক্টোবর, ১৯৯৭)। অকৃত্রিম রাজভক্তির জন্যেই হয়তো শোভা সিং ১৯৪৪-এ নাইট উপাধি পান। আর ১৯৪৫-এ পেলেন খান মার্কেট এলাকার জমি। নতুন দিল্লি প্রশাসন লিজ সত্ত্বে শোভা সিংয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয় খান মার্কেট ও সংলগ্ন সুজন সিং পার্কের মহার্ঘ জমি।
সুজন সিং পার্ক দিল্লির প্রথম বহুতল আবাসন। সবমিলিয়ে সাতটি বাড়ি। প্রতিটি বাড়িতে বারোটি করে ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন এতই বড় যে এখনকার ফোর বা ফাইভ বিএইচকে ফ্ল্যাট লজ্জা পেয়ে যাবে। পাশেই রয়েছে পরিচারক আর গাড়ির চালকদের কোয়ার্টার। সেগুলি অবিশ্যি এককামরার ফ্ল্যাট। প্রখ্যাত স্থপতি ওয়ালটার জর্জ বানিয়েছিলেন এই অনবদ্য আবাসনের নকশা। বাবার নামে শোভা সিং আবাসনের নামকরণ করলেন সুজন সিং পার্ক। এখন এই আবাসনে চারশো বাসিন্দার বসবাস। আর সংলগ্ন কোয়ার্টারে থাকেন সতেরোশো জন। ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের এখনও মাসে তিনশো টাকা ভাড়া দিতে হয়। আর কোয়ার্টারের ভাড়া সাতচল্লিশ টাকা। আবাসনের মালিক স্যার শোভা সিং অ্যান্ড সনস প্রাইভেট লিমিটেড।
দেশভাগের পর সুজন সিং পার্কের পাশেই শুরু হয় খান মার্কেট গড়ে তোলার কাজ। বাজারের নকশা প্রণয়ন করেন একই স্থপতি ওয়ালটার জর্জ। ইংরেজি ইউ অক্ষরের আদলে নির্মিত হল ১৫৪টি দোকান। প্রতিটি দোকানের আয়তন কমবেশি সোয়া চারশো বর্গফুট। একতলা বাজারের ওপর দোতলায় দোকানদারদের বসবাসের জন্য তৈরি হয়েছিল ৭৪টি ফ্ল্যাট। পাশের একটি বাড়ির একতলায় গাড়ির গ্যারেজ আর দোতলায় গাড়ির চালকদের থাকার বন্দোবস্ত হয়। এই বাড়িটিও বাজারের মূল নকশার অংশ।
১৯৫১-য় চালু হওয়া খান মার্কেট বরাবরই মহার্ঘ। তখন প্রতিটি দোকানের ভাড়া ছিল মাসে পাঁচ টাকা। এখন দিতে হয় মাসে ছয় লক্ষ টাকা। তবে দোতলায় এখন আর বাসস্থান নেই। সময়ের প্রয়োজনে সেগুলিও বিপণি হয়ে গেছে।
শোভা সিং হঠাৎ করে বাজারের নাম খান মার্কেট রাখলেন কেন? অবিভক্ত পঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকার বিখ্যাত চিকিৎসক ছিলেন খান আব্দুল জব্বার খান। এছাড়া তিনি ছিলেন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। পাকিস্তানে পঞ্জাব প্রদেশ গঠিত হওয়ার পর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন খান আব্দুল জব্বার খান। বহুকাল দিল্লিতে বসবাস করলেও শোভা সিং নিজের আদি বসতভূমিকে ভোলেননি। নিজের তৈরি নতুন বাজারের বেশিরভাগ দোকানের মালিকানা পেলেন পাকিস্তান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা মানুষ। খান আব্দুল জব্বার খান তাঁদেরও অবিসংবাদিত নেতা। ফলে জীবিতাবস্থায় তাঁর নামেই নামাঙ্কিত হয়ে গেল খান মার্কেট। খান আব্দুল জব্বার খান সম্পর্কে আমার-আপনার জ্ঞান সীমিত হলেও তাঁর ভাই খান আব্দুল গফফার খান, যাঁকে সীমান্ত গান্ধি বলা হয় তিনি কিন্তু অতিপরিচিত। সীমান্ত গান্ধির নামেও দিল্লির করোলবাগ এলাকায় গফফার মার্কেট হয়েছে।
।।তিন।।
প্রায় সমসাময়িক সময়ে খান মার্কেট থেকে একটু দূরে এখনকার সফদরজং বিমানবন্দরের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় তৈরি হয় আইএনএ মার্কেট। আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে এই বাজারের কোনও সম্পর্ক নেই।
বিমানবন্দরে তখন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল এয়ারওয়েজের বা আইএনএ-র রমরমা। আন্তর্দেশীয় বিমান পরিবহণ ব্যবস্থা আইএনএ পরিচালনা করে। বিমানবন্দরের কাছেই গড়ে ওঠে আইএনএ-র কর্মীদের আবাসন। তাঁদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটার জন্য স্থাপিত হয় আইএনএ মার্কেট। ফলে শুরুর সময় থেকেই বাজারটিতে আটপৌরে মানুষের আনাগোনা নিয়ন্ত্রিত। পরে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ইন্ডিয়ান এয়ারওয়েজ প্রতিষ্ঠিত হলে এই বেসরকারি বিমান সংস্থাটি ইন্ডিয়ান এয়ারওয়েজের সঙ্গে মিশে যায়। আরও পরে মূল বিমানবন্দর দিল্লির দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে হরিয়ানার সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় স্থানান্তরিত হওয়ায় আইএনএ মার্কেটের জৌলুস কমতে থাকে। পরে অবলুপ্ত বিমান সংস্থার কর্মীদের ছেড়ে যাওয়া আবাসনকে কেন্দ্র করে আশপাশে প্রচুর সরকারি আবাসন গড়ে ওঠায় আইএনএ মার্কেট অস্তিত্ব হারায়নি।
।।চার।।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির ব্যাপ্তি বেড়েছে। বেড়েছে জনসংখ্যা। স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজনের তাগিদে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাজার। আর বিংশ শতাব্দীর শেষলগ্নে মল এবং সুপারমার্কেট সংস্কৃতি দেশ-বিশ্বের অন্যান্য জায়গার মতো দিল্লিতেও ছড়িয়ে পড়ল। সেসব তো এক ছাঁচে গড়া। তাদের না আছে কোনও বৈশিষ্ট্য না রয়েছে কোনও ঐতিহ্য। ফলাফল দূরের বাজারে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে গেছে।
সময়ের ধারাবাহিকতায় এবং প্রয়োজনের তাগিদে প্রচলিত প্রথায় পরিবর্তন আসা ঐতিহাসিক সত্য। আবার ইতিহাস বাদ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হতে পারে না বলেই চূড়ান্ত বিচারে বেঙ্গলি মার্কেট এবং খান মার্কেট এখনও বিপন্ন হয়ে পড়েনি।
(অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)
চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে