Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনের

সরকারি খাতায় ভারতের এই গ্রামের নাম আজও ‘পাকিস্তান’

রূপাঞ্জন গোস্বামী চল্লিশ বছর আগে কথা। বিহারের পূর্ণিয়া সদর থেকে এক সরকারি আধিকারিক গিয়েছিলেন শ্রীনগর ব্লক সংলগ্ন গ্রামগুলির অবস্থা জানতে। তখন ছিল বর্ষাকাল। কয়েক দিন ধরে সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে ফিরছিলে

সরকারি খাতায় ভারতের এই গ্রামের নাম আজও ‘পাকিস্তান’

শেষ আপডেট: 5 May 2020 04:14

রূপাঞ্জন গোস্বামী
চল্লিশ বছর আগে কথা। বিহারের পূর্ণিয়া সদর থেকে এক সরকারি আধিকারিক গিয়েছিলেন শ্রীনগর ব্লক সংলগ্ন গ্রামগুলির অবস্থা জানতে। তখন ছিল বর্ষাকাল। কয়েক দিন ধরে সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে ফিরছিলেন তিনি। অ্যাম্বাসাডরের ভেতর থেকে আধিকারিকের নজরে পড়েছিল নদীর ওপারে থাকা একটি গ্রাম। হাঁটুজলে ডুবে থাকা দিগন্ত বিস্তৃত ধান জমির মাঝে, গ্রামটি দাঁড়িয়ে ছিল বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। বেশ কয়েকটি খড়ে ছাওয়া বাড়ি দেখা যাচ্ছিল ঝোপ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে। সরকারি আধিকারিকের হুঙ্কারে থেমেছিল অ্যাম্বাসাডর আধিকারিক ফরমান দিয়েছিলেন ওই গ্রামে যেতে হবে। সঙ্গে থাকা অফিসারেরা অবাক হয়েছিলেন। প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছিল, এই অবস্থায় নদী পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছনো কীভাবে সম্ভব! সেই সময় নদীর ওপর কোনও ব্রিজ ছিল না। নদী পার হলেও, গ্রামে পৌঁছাতে হবে জমির আল ধরে ধরে। তিনফুট উঁচু আলগুলিও জলে প্রায় ডুবুডুবু। কারও ওজর আপত্তি না শুনে, গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলেন স্থুলকায় আধিকারিক। রাগত স্বরে বলেছিলেন, কাউকে যেতে হবে না। নদী পেরিয়ে হেঁটে তিনি একাই ওই গ্রামে যাবেন। গাড়িতে জুতো মোজা খুলে, নদীর জলে ভাসা নৌকার মাঝিকে ঘুম থেকে তুলে, নৌকায় নদী পেরিয়ে, গ্রামে যাওয়ার রাস্তা অর্থাৎ আল ধরেছিলেন নাছোড়বান্দা রাশভারী আধিকারিক। বেজার মুখে তাঁর সঙ্গ নিয়েছিলেন অফিসারেরা। ঘেমে, নেয়ে, পা পিছলে, কাদা মেখে, দলটি দেড় ঘন্টার চেষ্টায় গ্রামটিতে পৌঁছাতে পেরেছিলো। [caption id="attachment_217286" align="aligncenter" width="749"] এই সেই গ্রাম যার নাম 'পাকিস্তান '।[/caption] গ্রামটির মানুষদের দেখে অভিজ্ঞ আধিকারিক বুঝেছিলেন, গ্রামটি সাঁওতাল অধ্যুষিত। এক প্রৌঢ় গ্রামবাসীকে গ্রামটির নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন আধিকারিক। প্রৌঢ় গ্রামবাসীটি বলেছিলেন,‘পাকিস্তান‘। ‘অ্যাঁ’ বলে চমকে উঠেছিলেন আধিকারিক। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর সঙ্গে মস্করা করছেন প্রৌঢ়। আবার জিজ্ঞেস করেছিলেন গ্রামের নাম। উত্তর এসেছিল, ‘পাকিস্তান টোলা“। কপালে চোখ তুলে আধিকারিক জিজ্ঞেস করেছিলেন,“আপনাদের গ্রামের নাম পাকিস্তান কেন”? গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, তাঁরা জানেন না গ্রামটির নাম কীভাবে 'পাকিস্তান টোলা' হয়েছিল। তবে বহু বছর ধরে আশেপাশের গ্রামগুলির সবাই এই গ্রামটিকে চেনেন 'পাকিস্তান' নামে। 'টোলা' শব্দটা বলেন না, শুধু বলেন ‘পাকিস্তান’। একটি দরমা ঘেরা বাড়ির মাটির বারান্দায় ধপাস করে বসে পড়েছিলেন আধিকারিক। সরল গ্রামবাসীদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে তো মনে হচ্ছে না তাঁরা মিথ্যে বলছেন। কিন্তু ভারতের চিরশত্রুর নামে ভারতেরই গ্রামের নাম! না এ চলবে না। কোনও মতেই না। এ নাম পাল্টাতেই হবে। হুঙ্কার ছেড়েছিলেন আধিকারিক। মাটির দাওয়ায় বসে তিনি ভেবে ফেলেছিলেন গ্রামের নতুন নাম। চেঁচিয়ে সে নাম ঘোষণা করেও দিয়েছিলেন। সেই দিন সেই নামটি ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সবাইকে। সঙ্গে থাকা সরকারি অফিসারদের বলেছিলেন সরকারি খাতায় গ্রামের নতুন নামটি তুলে দিতে। গ্রামটির কী নাম দিয়েছিলেন ওই আধিকারিক, সেটা আজ আর কারও মনে নেই। কারণ নতুন নামটি সরকারি খাতায় ওঠেনি, আধিকারিক কয়েকদিনের মধ্যে বদলি হয়ে যাওয়ায়। ফলে বিহারের পূর্ণিয়া জেলার সাঁওতালদের গ্রাম ‘পাকিস্তান টোলা’ আজও আছে 'পাকিস্তান' নামটি নিয়েই। এমনকি সরকারি খাতাতেও। [caption id="attachment_217287" align="aligncenter" width="768"] পাকিস্তাব গ্রামের এক সাঁওতাল পরিবার।[/caption] কেন গ্রামটির নাম পাকিস্তান! বিহারের পূর্ণিয়া জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে আছে শ্রীনগর ব্লক। সেই ব্লকের সিঙ্ঘিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে আছে এই গ্রাম ‘পাকিস্তান টোলা”। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে এই গ্রামে বাস করত বহু মুসলিম পরিবার। গ্রামটির আশেপাশের জমিগুলিও ছিল তাদের। কিন্তু দেশভাগের পর পূর্ণিয়া জেলাটি পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশের সীমানায় কাছে চলে যাওয়ায়, এই গ্রামটিতে থাকা সবকটি মুসলিম পরিবার ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। মুসলিম পরিবারগুলির সঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তানে থাকা কিছু সাঁওতাল পরিবারের সম্পত্তি বদলাবদলি হয়েছিল। কিছুদিন পর, পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতের পূর্ণিয়ার এই গ্রামটিতে এসে উঠেছিল সেই সাঁওতাল পরিবারগুলি। যেহেতু এই গ্রামের আদি বাসিন্দারা পাকিস্তান (পূর্ব) চলে গিয়েছিলেন এবং বর্তমান বাসিন্দাদের পুর্বপুরুষেরা পূর্ব-পাকিস্তান থেকে এই গ্রামে এসেছিলেন, সেই জন্য  গ্রামটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘পাকিস্তান টোলা’। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই গ্রামে একঘর মুসলিমও বাস করেননি। গ্রামের সবাই হিন্দু এবং সাঁওতাল। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটা সত্যি,সরকারি খাতাতেও গ্রামটির নামের পরিবর্তনের কোনও চেষ্টা করাই হয়নি। [caption id="attachment_217290" align="aligncenter" width="768"] সংবাদমাধ্যমকে দেখলেই মুখে ফুটে ওঠে বিরক্তির চিনহ।[/caption]
উন্নয়নের অভাবে ধুঁকছে বিহারের 'পাকিস্তান'
আধিকারিক সাহেব ছোট যে নদীটি নৌকাতে পেরিয়েছিলেন, তার ওপর একটি ব্রিজ হয়েছে আজ। কিন্তু বিহার সরকারের উন্নয়নের রথ পাকা রাস্তা দিয়ে সিঙ্ঘিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে ঢুকেও থমকে গিয়েছে 'পাকিস্তান টোলা'র কাছে এসে। আজও একটি সংকীর্ণ কাঁচা রাস্তা এঁকেবেঁকে এগিয়েছে পাকিস্তান টোলার দিকে। যে রাস্তায় সামান্য অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনা অনিবার্য। আজ গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ৩০০। অত্যন্ত গরিব গ্রামটিতে জীবন কাটানো আজও দূর্বিষহ। ন্যূনতম সরকারি পরিষেবা পায়না গ্রামটি। বিদ্যুৎ, পানীয় জল, রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল তো দূরের কথা, আজও এই গ্রামে একটিও টেলিভিশন সেট নেই। গ্রামের কারও হাতে মোবাইল নেই। বর্ষার সময় আজও গ্রামটি সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। পাকিস্তান টোলার বাসিন্দা গুরু বেসরা, ঘুটের মর্মু, দুল্লা টুডু, সুফল হাঁসদা, জাড্ডু টুডু, সীতা দেবীরা গ্রামে উপস্থিত হওয়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের জানিয়েছিলেন, তাঁদের ছেলে মেয়েরা পড়তে চায়, কিন্তু উপায় নেই। কারণ কাছাকাছি কোনও স্কুল নেই। আড়াই কিলোমিটার দূরে সিঙ্ঘিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে আছে একটি স্কুল। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা হয় সেই স্কুলে। স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটি রীতিমতো বিপজ্জনক। সেই পথে সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না বাবা মায়েরা। এছাড়া, ক্লাস এইটের পর পড়াশুনো করলে গ্রামের ছেলে মেয়েদের যেতে হবে ১২ কিমি দূরে, শ্রীনগর টাউনে। তাই পাকিস্তান টোলার ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা ছেড়ে দিতে হয় মাঝপথেই। [caption id="attachment_217292" align="alignnone" width="768"] রাস্তার প্রকল্প উদ্বোধন হয়ে থমকে আছে গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে।[/caption] গ্রামবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পড়াশুনা করেছে পনেরো বছরের এক কিশোরী দেসিকা হাঁসদা। পঞ্চম শ্রেণীতেই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। সে হিন্দি লিখতে ও বলতে পারে। যখন দেশে বড় কিছু ঘটনা ঘটলে, গ্রামবাসীদের কেউ শহরে গিয়ে হিন্দি কাগজ কিনে আনেন। দেসিকা কাগজটি পড়ে, বিষয়টা তার কল্পনা মতো ব্যাখ্যা করে দেয় গ্রামবাসীদের কাছে। কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল বা প্রাইমারি হেলথ সেন্টার না থাকাও পাকিস্তান টোলার আরেকটি বড় সমস্যা। যদি কেউ মাঝরাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন, সকাল পর্যন্ত গ্রামবাসীদের অপেক্ষা করতে হয় শহরে পাঠানোর জন্য। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে খারাপ রাস্তার জন্য অটোওয়ালারাও গ্রামে আসতে চান না। কৃষিই পাকিস্তান টোলার উপার্জনের একমাত্র পথ হওয়া সত্ত্বেও কৃষিতে সরকারি সাহায্য মেলে না। বীজ, সার, বাজার দরে কিনতে হয়। গ্রামের পাশে থাকা দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে ধান, গম, ভুট্টা ফলান পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা। নিজেদের খাওয়ার জন্য রেখে বাকিটা বিক্রি করে দেন। রক্তজল করে তৈরি করা ফসল গায়ের জোরে জলের দরে কিনে নিয়ে যায় শহরের ব্যবসায়ীদের। তাই আজও পাকিস্তান টোলার ছিটেবেড়ার বাড়িগুলিতে রাতে টিম টিম করে জ্বলে কেরোসিনের বাতি। আজও পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা কাঠ পাতা কুড়িয়ে তা দিয়ে রান্না করেন মাটির উনুনে। বিহারের ভয়ঙ্কর গ্রীষ্ম কাটান এক চিলতে দখিনা বাতাসের আশায়। দেশে পাল্টায় সরকার। বিহারে পাল্টায় সরকার। যুগের পর যুগ অন্ধকারে ডুবে থাকে ’পাকিস্তান টোলা’। প্রত্যেক বছর গ্রামটির নাম পাল্টাবার খবর ভেসে ওঠে রাজনীতির অলিগলিতে। কিন্তু নাম আর পালটায় না। হয়তো পাকিস্তান নামটিতেই আছে অভিশাপ। যার খেসারত দিচ্ছেন তিনশো উপেক্ষিত ভারতীয়!

```