
শেষ আপডেট: 5 May 2020 04:14
এই সেই গ্রাম যার নাম 'পাকিস্তান '।[/caption]
গ্রামটির মানুষদের দেখে অভিজ্ঞ আধিকারিক বুঝেছিলেন, গ্রামটি সাঁওতাল অধ্যুষিত। এক প্রৌঢ় গ্রামবাসীকে গ্রামটির নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন আধিকারিক। প্রৌঢ় গ্রামবাসীটি বলেছিলেন,‘পাকিস্তান‘। ‘অ্যাঁ’ বলে চমকে উঠেছিলেন আধিকারিক। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর সঙ্গে মস্করা করছেন প্রৌঢ়। আবার জিজ্ঞেস করেছিলেন গ্রামের নাম। উত্তর এসেছিল, ‘পাকিস্তান টোলা“। কপালে চোখ তুলে আধিকারিক জিজ্ঞেস করেছিলেন,“আপনাদের গ্রামের নাম পাকিস্তান কেন”? গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, তাঁরা জানেন না গ্রামটির নাম কীভাবে 'পাকিস্তান টোলা' হয়েছিল। তবে বহু বছর ধরে আশেপাশের গ্রামগুলির সবাই এই গ্রামটিকে চেনেন 'পাকিস্তান' নামে। 'টোলা' শব্দটা বলেন না, শুধু বলেন ‘পাকিস্তান’।
একটি দরমা ঘেরা বাড়ির মাটির বারান্দায় ধপাস করে বসে পড়েছিলেন আধিকারিক। সরল গ্রামবাসীদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে তো মনে হচ্ছে না তাঁরা মিথ্যে বলছেন। কিন্তু ভারতের চিরশত্রুর নামে ভারতেরই গ্রামের নাম! না এ চলবে না। কোনও মতেই না। এ নাম পাল্টাতেই হবে। হুঙ্কার ছেড়েছিলেন আধিকারিক। মাটির দাওয়ায় বসে তিনি ভেবে ফেলেছিলেন গ্রামের নতুন নাম। চেঁচিয়ে সে নাম ঘোষণা করেও দিয়েছিলেন। সেই দিন সেই নামটি ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সবাইকে। সঙ্গে থাকা সরকারি অফিসারদের বলেছিলেন সরকারি খাতায় গ্রামের নতুন নামটি তুলে দিতে।
গ্রামটির কী নাম দিয়েছিলেন ওই আধিকারিক, সেটা আজ আর কারও মনে নেই। কারণ নতুন নামটি সরকারি খাতায় ওঠেনি, আধিকারিক কয়েকদিনের মধ্যে বদলি হয়ে যাওয়ায়। ফলে বিহারের পূর্ণিয়া জেলার সাঁওতালদের গ্রাম ‘পাকিস্তান টোলা’ আজও আছে 'পাকিস্তান' নামটি নিয়েই। এমনকি সরকারি খাতাতেও।
[caption id="attachment_217287" align="aligncenter" width="768"]
পাকিস্তাব গ্রামের এক সাঁওতাল পরিবার।[/caption]
কেন গ্রামটির নাম পাকিস্তান!
বিহারের পূর্ণিয়া জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে আছে শ্রীনগর ব্লক। সেই ব্লকের সিঙ্ঘিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে আছে এই গ্রাম ‘পাকিস্তান টোলা”। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে এই গ্রামে বাস করত বহু মুসলিম পরিবার। গ্রামটির আশেপাশের জমিগুলিও ছিল তাদের। কিন্তু দেশভাগের পর পূর্ণিয়া জেলাটি পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশের সীমানায় কাছে চলে যাওয়ায়, এই গ্রামটিতে থাকা সবকটি মুসলিম পরিবার ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। মুসলিম পরিবারগুলির সঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তানে থাকা কিছু সাঁওতাল পরিবারের সম্পত্তি বদলাবদলি হয়েছিল।
কিছুদিন পর, পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতের পূর্ণিয়ার এই গ্রামটিতে এসে উঠেছিল সেই সাঁওতাল পরিবারগুলি। যেহেতু এই গ্রামের আদি বাসিন্দারা পাকিস্তান (পূর্ব) চলে গিয়েছিলেন এবং বর্তমান বাসিন্দাদের পুর্বপুরুষেরা পূর্ব-পাকিস্তান থেকে এই গ্রামে এসেছিলেন, সেই জন্য গ্রামটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘পাকিস্তান টোলা’। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই গ্রামে একঘর মুসলিমও বাস করেননি। গ্রামের সবাই হিন্দু এবং সাঁওতাল। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটা সত্যি,সরকারি খাতাতেও গ্রামটির নামের পরিবর্তনের কোনও চেষ্টা করাই হয়নি।
[caption id="attachment_217290" align="aligncenter" width="768"]
সংবাদমাধ্যমকে দেখলেই মুখে ফুটে ওঠে বিরক্তির চিনহ।[/caption]
রাস্তার প্রকল্প উদ্বোধন হয়ে থমকে আছে গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে।[/caption]
গ্রামবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পড়াশুনা করেছে পনেরো বছরের এক কিশোরী দেসিকা হাঁসদা। পঞ্চম শ্রেণীতেই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। সে হিন্দি লিখতে ও বলতে পারে। যখন দেশে বড় কিছু ঘটনা ঘটলে, গ্রামবাসীদের কেউ শহরে গিয়ে হিন্দি কাগজ কিনে আনেন। দেসিকা কাগজটি পড়ে, বিষয়টা তার কল্পনা মতো ব্যাখ্যা করে দেয় গ্রামবাসীদের কাছে। কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল বা প্রাইমারি হেলথ সেন্টার না থাকাও পাকিস্তান টোলার আরেকটি বড় সমস্যা। যদি কেউ মাঝরাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন, সকাল পর্যন্ত গ্রামবাসীদের অপেক্ষা করতে হয় শহরে পাঠানোর জন্য। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে খারাপ রাস্তার জন্য অটোওয়ালারাও গ্রামে আসতে চান না।
কৃষিই পাকিস্তান টোলার উপার্জনের একমাত্র পথ হওয়া সত্ত্বেও কৃষিতে সরকারি সাহায্য মেলে না। বীজ, সার, বাজার দরে কিনতে হয়। গ্রামের পাশে থাকা দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে ধান, গম, ভুট্টা ফলান পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা। নিজেদের খাওয়ার জন্য রেখে বাকিটা বিক্রি করে দেন। রক্তজল করে তৈরি করা ফসল গায়ের জোরে জলের দরে কিনে নিয়ে যায় শহরের ব্যবসায়ীদের।
তাই আজও পাকিস্তান টোলার ছিটেবেড়ার বাড়িগুলিতে রাতে টিম টিম করে জ্বলে কেরোসিনের বাতি। আজও পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা কাঠ পাতা কুড়িয়ে তা দিয়ে রান্না করেন মাটির উনুনে। বিহারের ভয়ঙ্কর গ্রীষ্ম কাটান এক চিলতে দখিনা বাতাসের আশায়। দেশে পাল্টায় সরকার। বিহারে পাল্টায় সরকার। যুগের পর যুগ অন্ধকারে ডুবে থাকে ’পাকিস্তান টোলা’। প্রত্যেক বছর গ্রামটির নাম পাল্টাবার খবর ভেসে ওঠে রাজনীতির অলিগলিতে। কিন্তু নাম আর পালটায় না। হয়তো পাকিস্তান নামটিতেই আছে অভিশাপ। যার খেসারত দিচ্ছেন তিনশো উপেক্ষিত ভারতীয়!