Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সাগরের বুকে নিঁখোজ হয়েছিল তাঁর ডিঙি নৌকা, বেঁচে ফিরেছিলেন ৪৩৮ দিন পর

রূপাঞ্জন গোস্বামী হোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা, মধ্য আমেরিকার এল সালভাদোরের এক মৎস্যজীবী। স্ত্রী এবং ১৩ বছর বয়সী মেয়ে নিয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট সংসার। গুণ ছিল অনেক। বদ্গুণ একটাই, মাঝে মাঝে বেহেড মাতাল হয়ে যেতেন, টিনটিনের বন্ধু ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মত।

সাগরের বুকে নিঁখোজ হয়েছিল তাঁর ডিঙি নৌকা, বেঁচে ফিরেছিলেন ৪৩৮ দিন পর

শেষ আপডেট: 18 April 2020 04:07

রূপাঞ্জন গোস্বামী
হোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা, মধ্য আমেরিকার এল সালভাদোরের এক মৎস্যজীবী। স্ত্রী এবং ১৩ বছর বয়সী মেয়ে নিয়ে ছিল তাঁর ছোট্ট সংসার। গুণ ছিল অনেক। বদ্গুণ একটাই, মাঝে মাঝে বেহেড মাতাল হয়ে যেতেন, টিনটিনের বন্ধু ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মত। এল-সালভাদরে জন্মালেও পেশার তাগিদে বাস করতেন মেক্সিকোতে। ২০১২ সালের ১৭ই নভেম্বর, বন্দরের একটি বারে মদ্যপান করতে করতে ৩৭ বছর বয়সী আলভারেঙ্গা, এক অদ্ভুত প্ল্যান করেছিলেন। পরের দিন, অর্থাৎ ১৮ নভেম্বর ঠিক সকাল ১০টায় তিনি প্রশান্ত মহাসাগরে নৌকা ভাসাবেন। সমুদ্রে থাকবেন ১৯ তারিখ বিকেল ৪টে পর্যন্ত। টানা ৩০ ঘন্টা সমুদ্রে মাছ ধরবেন। টানা ৩০ ঘন্টা কষ্ট করবেন, সারা সপ্তাহ আরামে কাটাবেন। [caption id="attachment_209971" align="aligncenter" width="600"] হোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা।[/caption]
যেমন ভাবা তেমন কাজ
পরের দিনই, মেক্সিকোর 'কোস্টা আজুল' বন্দর থেকে, ২৫ ফুট লম্বা ইঞ্জিনচালিত ডিঙি নৌকায় রওনা দিয়েছিলেন আলভারেঙ্গা। সঙ্গী হিসেবে নিয়েছিলেন তাঁদের মাছ ধরার কোম্পানিতে সদ্য আসা বছর বাইশের এজেকুয়েল কর্ডোবা'কে। যুবক কর্ডোবা আলভারেঙ্গার সঙ্গে সমুদ্রে ভাসতে চাননি। কারণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস সুবিধের ছিল না। কিন্তু সিনিয়র সহকর্মী আলভারেঙ্গা, কিছুটা জোর করেই কর্ডোবাকে নিয়ে সাগরে ভেসেছিলেন। তীর থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে চলে এসে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন আলভারেঙ্গা। নৌকায় ছিল ৪ ফুট লম্বা একটি আইস-বক্স এবং প্রায় ৫০০ কেজি ওজনের জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম। পূর্বাভাস মিলিয়ে দিয়ে আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করেছিল। দুপুর একটা নাগাদ প্রশান্ত মহাসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছিল। এসে গিয়েছিল ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়। নৌকার ওপর আছড়ে পড়া বিশাল ঢেউগুলো দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন অনভিজ্ঞ কর্ডোবা। আলভারেঙ্গাকে ফিরে যাওয়ার জন্য বার বার অনুরোধ করেছিলেন। [caption id="attachment_209972" align="alignleft" width="200"] এজেকুয়েল কর্ডোবা।[/caption]
কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল
কিছুক্ষনের মধ্যেই নৌকায় জল উঠতে শুরু করেছিল। নৌকাকে হালকা করতে নৌকায় থাকা মাছ ধরার সমস্ত সরঞ্জাম এবং তখনও পর্যন্ত ধরা সমস্ত মাছ সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিলেন আলভারেঙ্গা। তীরের দিকে নৌকা নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তীর থেকে তখন নৌকাটি ছিল প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে। যে পথ যেতে সময় লাগে ৬ ঘন্টা। যা প্রায় অসম্ভব ছিল ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে। নৌকায় থাকা রেডিও মারফত আলভারেঙ্গা তাঁদের অবস্থা জানিয়েছিলেন তাঁদের কোম্পানির বসকে। –আমরা ভীষণ বিপদে, দয়া করে এখনই আমাদের উদ্ধার করতে এসো। -চিন্তা করো না। আমরা এখনই আসছি। তোমাদের অবস্থান জানাও। এখন তোমরা কোথায়? আলভারেঙ্গা তাঁর বস উইলিকে নৌকাটির অবস্থান জানানোর আগেই রেডিওটির ব্যাটারি শেষ হয়ে গিয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় আর উত্তাল ঢেউ আলভারেঙ্গার ডিঙি নৌকাকে ক্রমশ মাঝ সমুদ্রের দিকে ঠেলতে শুরু করেছিল। সন্ধ্যা নাগাদ আলভারেঙ্গা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁরা ঝড়ের মধ্যে পথ হারিয়েছেন। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে নেমেছিল তোলপাড় করা রাত। ঝড়ের দাপট ক্রমশ বেড়েই চলে ছিল। ঠিক সেই সময় বিকল হয়ে গিয়েছিল তাঁদের নৌকার মোটরটিও।
প্রলাপ বকতে শুরু করেছিলেন কর্ডোবা
পাঁচ দিন পর ঝড়ের প্রকোপ কমে এসেছিল। তখন আলভারেঙ্গার নৌকা ছিল তীর থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে। সদ্য যুবক কর্ডোবা আতঙ্কিত হয়ে বারবার বলছিলেন, “এভাবেই আমরা মারা যাব“। আলভারেঙ্গা কর্ডোবাকে বলতেন, “নিশ্চিন্তে থাকো, খুব তাড়াতাড়ি আমাদের উদ্ধার করতে জাহাজ বা বিমান আসবে”। না, কেউ আসেনি তাঁদের উদ্ধার করতে। নৌকায় খাবার নেই, জল নেই, আলো নেই। দিনের কড়া রোদ আর রাতের হিমশীতল পরিবেশ দুজনের অবস্থা শোচনীয় করে তুলেছিল। কয়েকদিন পর ঈশ্বরের আশীর্বাদ হয়ে নেমেছিল বৃষ্টি। পাঁচ গ্যালন বৃষ্টির জল তাঁরা ধরে রেখেছিলেন, আরও কিছুদিন বাঁচার আশায়। দীর্ঘ ১১ দিন পর, দুজনের ভাগ্যে খাবার জুটেছিল। আলভারেঙ্গা একটা কচ্ছপ আর একটা টাইগার মাছ ধরতে পেরেছিলেন। মাছ আর কচ্ছপের মাংস কাঁচাই খেয়ে নিচ্ছিলেন আলভারেঙ্গা। কিন্তু কর্ডোবা খেতে পারছিলেন না। আলভারেঙ্গা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন এভাবেই বাঁচতে হবে তাদের, এছাড়া আর কোন উপায় নেই। কিন্তু তবুও কর্ডোবা কাঁচা মাছ খাচ্ছিলেন না। না খেয়ে খেয়ে ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন কর্ডোবা। জ্বর এসেছিল, বিকারে ভুল বকতে শুরু করেছিলেন কর্ডোবা। তাঁর জন্য কমলা লেবু কিনে আনতে বলছিলেন আলভারেঙ্গাকে। কর্ডোবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মাঝ সমুদ্রে আলভারেঙ্গা বলেছিলেন,“এখন বাজার বন্ধ, বাজার খুললেই কমলালেবু কিনে আনব"। কয়েক মাস কেটেছিল এভাবেই। একদিন আলভারেঙ্গা একটি পাখি ধরেছিলেন। পালক ছাড়িয়ে নিজেও খেয়েছিলেন আর কর্ডোবাকেও খাইয়েছিলেন। পাখীটি কাঁচা খাবার পর থেকেই আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন কর্ডোবা।
চলে গিয়েছিলেন কর্ডোবা
আরও এক মাস কেটে গিয়েছিল। কর্ডোবা তখন জীবন্ত কঙ্কাল। আলভারেঙ্গার নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। তাঁর জন্যেই আজ কর্ডোবা মৃত্যুপথযাত্রী। একদিন ভোরে কর্ডোবা অস্ফুটে বলেছিলেন, “বিদায় হোসে"। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঝ সমুদ্রে আলভারেঙ্গাকে একা ফেলে, পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন কর্ডোবা। সঙ্গী কর্ডোবাকে হারিয়ে আলভারেঙ্গা প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। নিজেকে রাতদিন গালাগালি করতেন। নিজেকে কর্ডোবার খুনি বলে চিৎকার করতেন। কর্ডোবার নিথর দেহটিকে বুকে আগলে রাখতেন। কর্ডোবার মৃতদেহের সাথে দিন রাত কথা বলতেন। একদিন বিকেলে একটি জাহাজ দেখতে পেয়েছিলেন আলভারেঙ্গা। চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছিলেন। শেষে প্যান্ট খুলে মাথার ওপর উড়িয়ে ছিলেন। জাহাজের লোকেরা তাঁকে দেখতেও পেয়েছিলেন। কিন্তু উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে আসেননি।একজন প্রায় উন্মাদ জীবন্ত মানুষ ও একটি পচতে থাকা মৃতদেহ নিয়ে ভেসে চলেছিল নৌকা। প্রায় একসপ্তাহ পর,কর্ডোবার মৃতদেহ সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন আলভারেঙ্গা। চোখ খোলা রেখেই সাগরের অতলে তলিয়ে গিয়েছিলেন বছর বাইশের কর্ডোবা। 
৩০শে জানুয়ারি, ২০১৪ 
সমুদ্রে ৪৩৮ দিন কাটিয়ে ফেলেছিলেন আলভারেঙ্গা। তিনি তখন খুব অসুস্থ, চোখের সামনে নিশ্চিত মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি। মেক্সিকো থেকে প্রায় ১১৮০০ কিলোমিটার দূরে ভাসছিল তাঁর ডিঙি নৌকাটি। সকালবেলা সমুদ্রে কিছু নারকেল ভাসতে দেখেছিলেন আলভারেঙ্গা। লাফিয়ে উঠে বসেছিলেন, অভিজ্ঞ মৎস্যজীবী আলভারেঙ্গা। বুঝতে পেরেছিলেন কাছাকাছি কোনও দ্বীপ আছে। ঘোলাটে চোখে ধরাও পড়েছিল সেই সবুজ দ্বীপ। [caption id="attachment_209977" align="alignnone" width="768"] এই ডিঙিতেই ৪৩৮ দিন প্রশান্ত মহাসাগরে কাটিয়েছেন আলভারেঙ্গা।[/caption] সেই মুহূর্তে তাঁর নৌকার চারদিকে গিজগিজ করছিল হাঙ্গরের দল। জলে হাত নামিয়ে হাতকে নৌকার দাঁড়ের মত ব্যবহার করার উপায় ছিল না। কিন্তু বাতাস ছিল আলভারেঙ্গার প্রতি সহৃদয়। বাতাসের ঝাপটায় নৌকাটি ক্রমশ দ্বীপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অর্ধেক দিন লেগে গিয়েছিল দ্বীপটির কাছে পৌঁছাতে। তীর থেকে যখন নৌকাটি মাত্র দশ ফুট দূরে, নৌকা থেকে আলভারেঙ্গা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জলে। মহাসাগরের ঢেউ আলভারেঙ্গাকে নিয়ে গিয়েছিল তীরে। দ্বীপে পৌঁছানোর পর বালুচরেই বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিলেন আলভারেঙ্গা। দ্বীপটি ছিল দক্ষিণ মার্শাল আইল্যান্ড-এর অন্তর্গত ইবন এটোলে দ্বীপ। নির্জন এই দ্বীপে বাস করতে থাকা এক দম্পতি অচেতন আলভারেঙ্গাকে উদ্ধার করেছিলেন। তাঁরা খবর পাঠিয়েছিলেন মার্শাল আইল্যান্ড-এর রাজধানী মাজুরোতে। মাজুরোতে কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন আলভারেঙ্গা। রওনা দিয়েছিলেন নিজের দেশ এল সালভাদোরের উদ্দেশ্যে। [caption id="attachment_209979" align="aligncenter" width="968"] উদ্ধারের পর আলভারেঙ্গা।[/caption] এল সালভাদোরে ছিল তাঁর পরিবার। যাঁরা ভেবেছিলেন, তাঁদের প্রিয়জন চিরতরে হারিয়ে গিয়েছেন প্রশান্ত মহাসাগরে। কিন্তু আলভারেঙ্গার পরিবার জানতেন না, ইতিহাসকে স্তম্ভিত করে, ৪৩৮ দিনে প্রায় ১১৮০০ কিলোমিটার সমুদ্রপথে, জীবনের লড়াই লড়তে লড়তে, জিতেই ফিরছেন তাঁদের প্রিয়জন। কিন্তু ডাঙাতেও অপেক্ষা করছিল নতুন বিপদ। মৃত কর্ডোবার পরিবার এনেছিল মারাত্মক অভিযোগ, প্রাণে বাঁচতে আলভারেঙ্গা নাকি কর্ডোবাকে হত্যা করে খেয়ে ফেলেছিলেন। অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। জলের মত, ডাঙার লড়াইও জিতেছিলেন হার না মানা নাবিক  hহোসে সালভাদোর আলভারেঙ্গা।

```