রূপাঞ্জন গোস্বামী
আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন যাঁদের মাংস খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু প্রাণীহত্যা চোখে দেখতে পারেন না। অনেকে আছেন রাস্তা নিয়ে যাওয়ার সময় মাংসের দোকানে সারি সারি ঝুলন্ত প্রাণীর শবদেহ দেখবেন না বলে অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যান, কিন্তু মাংস খেতে ভালোবাসেন। আবার অনেকে আছেন পালক ছাড়ানোর পর মুরগিগুলিকে দেখতে সদ্যোজাত মানব শিশুর মতো লাগে বলে মুরগির মাংস কিনে খান না, কিন্তু হোটেলে বা অনুষ্ঠানে মুরগির মাংস খান।
এঁরা সবাই মাংস খেতে ভালোবাসেন, কিন্তু প্রাণীহত্যা চান না। কিন্তু হত্যা ছাড়া কোনও প্রাণীর মাংস খাওয়া কি সম্ভব! হ্যাঁ সম্ভব, অতিমাত্রায় সম্ভব। মাংস খাবেন কিন্তু প্রাণী হত্যা করতে হবে না। সে পথও এবার দেখিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞান। ফর্মুলা দিয়ে নয়, একেবারে হাতেনাতে খাবার উপযোগী মাংস ল্যাবরেটরিতে তৈরি করে দেখিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞান।
[caption id="attachment_213145" align="aligncenter" width="800"]

এসবের দিন শেষ হয়ে আসছে![/caption]
নিরামিষ খান পৃথিবীর দশভাগেরও কম মানুষ
২০১৪ সালে 'দ্য ফ্রেন্ড অফ দ্য আর্থ' এবং 'দ্য হেনরিক বল ফাউন্ডেশন' নামে দুটি সংস্থা জানিয়েছিল পৃথিবীতে নিরামিষ খান মাত্র ৫০ কোটি মানুষ। বাদ বাকি ৬০০ কোটিরও বেশি মানুষ আমিষাশী। এঁরা যে কোনও ধরনের রেড মিট, টার্কি, এমু, মুরগি, বিভিন্ন পাখি, মাছ, শামুক, ঝিনুক, গেঁড়ি, গুগলি ও অনান্য সামুদ্রিক জীবজন্তু অম্লানবদনে ভক্ষণ করে থাকেন। তবে সবাই যে সব প্রাণীর মাংস খান তা নয়। নিজেদের মনপসন্দ মাংস তাঁরা নিজেরাই বেছে ও খুঁজে নেন। ২০১৯ সালের এপ্রিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭৭০ কোটি। সুতরাং যত জনসংখ্যা বেড়েছে, ততই বেড়েছে আমিষাশী মানুষের সংখ্যা।
আমিষাশী মানুষদের জন্য পৃথিবীর পশুপাখিদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করতে করতে গিয়ে বিভিন্ন পশুপাখি ঝাড়েবংশে নির্মূল হয়ে গিয়েছে। তাই বিজ্ঞানীদের মাথার মধ্যে অনেকদিন ধরেই ঘোরা ফেরা করছিল একটা চিন্তা। সেটা হল মাংসাশী মানুষদের হাত থেকে পশুপাখিদের কীভাবে বাঁচানো যায়। কিন্ত মাংস খাওয়া বন্ধ করতে বললে দেশে দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাবে। ফলে একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে মাংস উৎপাদন করার চেষ্টা করবেন। যেটি করা সম্ভব হলে পশুপাখীরাও বাঁচবে, মানুষও কবজি ডুবিয়ে মাংস খাবে।
[caption id="attachment_213146" align="aligncenter" width="934"]

বন্ধ হবে নির্বিচারে প্রাণীহত্যা![/caption]
মহাকাশে সফলভাবে তৈরি হয়েছিল মাংস
ইজরায়েলে আলেভ ফার্ম নামে একটি সংস্থা আছে, যেটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে 'বিকল্প খাদ্য' নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ও উৎপাদন করে। সংস্থাটি ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর ঘোষণা করেছিল, একটি বিফ-স্টেকে যত পরিমাণ মাংস থাকে ততটা পরিমাণ মাংস তারা বিজ্ঞানীদের সাহায্যে কৃত্রিম পদ্ধতিতে তৈরি করেছে।
ফার্মটি জানিয়েছল, এই মাংসখণ্ডটি পৃথিবীতে তৈরি করা হয়নি, তৈরি করা হয়েছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৪৮ কিলোমিটার ওপরে ভাসমান আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে। এবং এই মাংসখণ্ডটি কোনও প্রাণীকে হত্যা না করে অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এই গবেষণায় ইজরায়েলের কোম্পানিটিকে সাহায্য করেছিল রাশিয়া এবং আমেরিকার তিনটি 'বিকল্প খাদ্য' উৎপাদনকারী সংস্থা।
[caption id="attachment_213148" align="aligncenter" width="1280"]

আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র[/caption]
প্রাণী হত্যা ছাড়া কীভাবে পাওয়া গিয়েছিল মাংস!
জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কোনও জীবদেহ থেকে নেওয়া কলা বা টিস্যুকে কৃত্রিমভাবে পুষ্টি দিয়ে আয়তনে বাড়ানোর পদ্ধতির নাম টিস্যু কালচার। যেটি নতুন কোনও পদ্ধতি নয়। বহু লুপ্তপ্রায় উদ্ভিদকে সংরক্ষণ করা, প্রাণীর দেহের কোনও ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যুকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া, এমনকি ডিম্বাশয়ের টিস্যু থেকে ডিম্বানু তৈরির মতো ঘটনা, এই টিস্যু কালচারের সাহায্যে এর আগেই ঘটিয়েছিল বিজ্ঞান। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভলিন টেলফার ও তাঁর টিম এই অসাধ্যসাধন করেছিলেন ২০১৮ সালে। এই টিস্যু কালচার পদ্ধতিরই আরেকটা রুপ হলো 'বায়োপ্রিন্টিং'। এই পদ্ধতিতে একটি 'থ্রি ডি বায়ো-প্রিন্টার' মেশিনে থাকা 'বায়ো-ইঙ্ক' নামে তরলের মধ্যে প্রাণীকোশ বা কলার কৃত্রিম বৃদ্ধি ঘটানো হয়। 'বায়ো-ইঙ্ক'-এর মধ্যে কোষের বৃদ্ধিতে সাহায্যকারী বিভিন্ন উপাদান মেশানো থাকে।
[caption id="attachment_213151" align="aligncenter" width="510"]

থ্রি ডি বায়োপ্রিন্টার মেশিন[/caption]
কৃত্রিমভাবে খাওয়ার উপযুক্ত মাংস উৎপাদনের প্রথম ধাপ হিসেবে, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৬ তারিখে 'কাল্টিভেটেড বিফ স্টেক' নামের ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি করা হয়েছিল। মহাকাশে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের রাশিয়ার অংশে পরীক্ষাটি করেছিলেন রাশিয়ান মহাকাশচারী ও জীববিজ্ঞানী ওলেগ স্ক্রিপোচকা। জীবিত ষাঁড়ের দেহ থেকে একটি ছোট্ট টিস্যুকে বের করে নেওয়া হয়েছিল। তারপর, সেই টিসুকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুস্থ ও জীবন্ত রেখে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহাকাশে। মহাকাশেই সেই জীবন্ত টিস্যুটির বায়োপ্রিন্টিং করেছিলেন বিজ্ঞানী ওলেগ স্ক্রিপোচকা।
মহাকাশের পরীক্ষাগারে ষাঁড়ের জীবন্ত টিস্যুটিতে থাকা কোষগুলি অনবরত বিভজিত হতে শুরু করেছিল থাকে 'থ্রি ডি বায়ো-প্রিন্টার' মেশিনে। ক্রমশ আকারে বাড়তে শুরু করেছিল টিস্যুটি। মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল বড়সড় একটি মাংসখণ্ড এবং এই মাংসখণ্ডটি পেতে কোনও প্রাণীকে হত্যা করতে হয়নি।
[caption id="attachment_213153" align="aligncenter" width="1600"]

বিজ্ঞানী ওলেগ স্ক্রিপোচকা[/caption]
এই মাংসের স্বাদ কি আলাদা!
বিজ্ঞানী ওলেগ স্ক্রিপোচকা মহাকাশ থেকে জানিয়েছিলেন, মাংসের টুকরোটি দিয়ে বানানো স্টেকের স্বাদ একেবারেই স্বাভাবিক। পরীক্ষাটি ষাঁড়ের মাংস নিয়ে হয়েছিল বলে ষাঁড়ের মাংসের টুকরো তৈরি হয়েছে। শুয়োরের টিস্যু নিলে শুয়োরের মাংস তৈরি হতো, ছাগলের টিস্যু নিলে ছাগলের, মুরগির টিস্যু নিলে মুরগির মাংস তৈরি হতো। বিজ্ঞানী জানিয়েছিলেন, বায়োপ্রিন্টিং পদ্ধতিতে তৈরি মাংসের বৈশিষ্ট্য হলো, এই মাংস সবসময়ই জীবাণুমুক্ত হবে।
আলেফ ফার্মের ম্যানেজার ইয়ভ রেইসলার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, পৃথিবীতেও তাঁরা এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তবে পৃথিবীর চেয়ে মহাকাশে মাংসখণ্ডটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর কারণ হিসেবে তিনি মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের অনুপস্থিতির কথা বলেছিলেন। রেইসলার বলেছিলেন, মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে পৃথিবীতে টিস্যুটির নিচের দিকের কোশগুলি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মহাকাশে টিস্যুর সব দিকের কোষ একসাথে বিভাজিত হয় বলে মাংসখণ্ডটি সব দিকে একসঙ্গে ও দ্রুত বাড়তে থাকে।
[caption id="attachment_213155" align="aligncenter" width="650"]

মহাকাশ কেন্দ্রের ল্যাবে এইভাবেই জীবন্ত টিস্যুটি রূপান্তরিত হচ্ছিল একটি জীবন্ত মাংসখণ্ডে।[/caption]
পরিবেশ দূষণ কমাবে এই মাংস!
২০১৯ সালে, বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গড়া একটি প্যানেল পরিবেশ দূষণ নিয়ে একটি স্পেশাল রিপোর্ট দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল আবহাওয়া পরিবর্তনের বড় কারণ হল পরিবেশ দূষণ। এবং এই পরিবেশ দূষণের অন্যতম কিছু কারণ হলো পশুপালন, পশুর মাংস পক্রিয়াকরণ, চামড়া, হাড় ও লোম সংক্রান্ত বিভিন্ন শিল্প। প্রচুর পরিমাণে গ্রিন হাউস গ্যাস সৃষ্টি করে এই সমস্ত কারখানাগুলি। তাছাড়া কারখানাগুলির জন্য বিপুল পরিমানে শক্তি ও জল খরচ হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন ফার্মে পশুপাখি পালন, জবাই ও প্রক্রিয়াকরণের পর প্রতি কেজি মাংস তৈরি করতে গড়পড়তা কয়েক হাজার লিটার জল লাগে। বায়োপ্রিন্টিং পদ্ধতিতে জলের খরচ নেই, গ্রিন হাউস গ্যাস সৃষ্টির সম্ভাবনাও নেই।
আলেফ ফার্ম ও তাদের 'আর্টিফিসিয়াল মিট' প্রজেক্টে যুক্ত বিজ্ঞানীদের বক্তব্য কিন্তু পরিস্কার। তাঁরা বলছেন,পৃথিবী এই মুহূর্তে আগুনের ওপর আছে, অন্য গ্রহে পালাবার সুযোগ নেই। তাই তাঁরা চান পৃথিবীর আকাশ ও সাগর যেন নীল থাকে। ভূপৃষ্ঠ যেন সবুজ রঙেরই হয়। যাতে আগামী প্রজন্ম নির্মল পৃথিবীকেই দেখতে পায়। তাঁদের দ্বিতীয় লক্ষ্য মাংসাশী মানুষদের বোঝানো, এই পৃথিবীটা পশুপাখিদেরও। তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। খাদ্যের জন্য নিরীহ প্রাণীদের জীবন কেড়ে নেওয়া মানুষের মতো উন্নত জীবের মানায় না। পশুপাখি না বাঁচলে মানুষও বাঁচবে না।
[caption id="attachment_213157" align="aligncenter" width="759"]

মহাকাশে বায়োপ্রিন্টিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাংসের টুকরোটি।[/caption]
তাই বাজারে আসতে চলেছে ল্যাবে তৈরি মাংস
২০০৬ সালে রাশিয়ার বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির মিরোনভ ল্যাবরেটরিতে মাংস উৎপাদনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ২০১৩ সালে ডাচ বিজ্ঞানী মার্কাস জোহানেস পোস্ট সর্বপ্রথম ল্যাবরেটরিতে বার্গার আকৃতির মাংস তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেই সাফল্যকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে দেখেননি। এই সব প্রচেষ্টাকে হাতিয়ার করে, ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত মাংস নিয়ে, বিশ্ব জুড়ে ব্যবসার স্বপ্ন দেখছে ইজরায়েলের আলেফ ফার্ম।
আলেফ ফার্মের সহ প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ এক্সিকিউটিভ দিদিয়ের তৌবিয়া বলেছিলেন,“ সমস্যা তিনটি। মাংসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, পশুপাখি হত্যা এবং পরিবেশ দূষণ। আমরা সঠিক সময়ে তিনটি সমস্যারই স্থায়ী সমাধান করে দিয়েছি। আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি, মাংসও চাষ করা যায়। যেকোনও সময়ে, যেকোনও জায়গায়, যেকোনও পরিবেশে।”
গতবছর এক সাংবাদিক সম্মেলনে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘জাস্ট’ কোম্পানির সিইও জোস টিটরিক বলেছিলেন, খুব তাড়াতাড়িই সুপার মার্কেটগুলির ফ্রিজে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত মাংস চলে আসবে। এই মাংস শুধু চার হাজার ওয়ালমার্ট বা সব ম্যাকডোনাল্ডেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্র সরবরাহ ও উৎপাদন করা হবে।
[caption id="attachment_213158" align="aligncenter" width="744"]

আলেফ ফার্ম শুরু করে দিয়েছে মাংস চাষ।[/caption]
সেদিন আর দেরি নেই
রবিবার সকালে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাজারে গিয়ে দেখবেন পাঁঠার মাংসের দোকান আর পাঁঠা ঝুলছে না। কচি পাঁঠার ঝোল আর দেহরাদূন রাইসের স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে খান খান। মুরগির মাংসের দোকানের খাঁচায় মুরগী নেই। আপনি এবার হতভম্ব। কিন্তু ঘোর কাটার আগেই দুই দোকানির কেউ একগাল হেসে বলবেন, ” সেদিন আর নেই দাদা, নিন ‘ল্যাব’ মাংস নিয়ে যান।” “নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো” কথাটা মাথায় রেখে ল্যাবে তৈরি পাঁঠার বা মুরগির মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। দুর থেকে হয়তো একটা মুরগি ‘কঁক কঁক’ করে ডেকে উঠবে। হয়তো ‘ব্যা ব্যা’ করে ডেকে উঠবে একটা ছাগল। বুঝবেন ওরা ওদের ভাষায় আপনাকেই বলছে, “রাখে হরি মারে কে।”