
শেষ আপডেট: 6 August 2020 15:28
রূপাঞ্জন গোস্বামী
উত্তর চিলিতে আছে 'আটাকামা' মরুভূমি। পৃথিবীর অনান্য মরুভূমির মতো দিনের তাপমাত্রা সেখানে ৪৫-৫০ ডিগ্রি ছোঁয় না। গড় তাপমাত্রা দিনে ২৭ ডিগ্রি ও রাতে ১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের আশেপাশে থেকে। তবুও ভয়ঙ্কর এই মরুভূমি। কারণ আটাকামা হলো,বিশ্বের শুষ্কতম মরুভূমি। প্রতি একশো বছরে বৃষ্টিপাত হয় গড়ে তিন থেকে চার বার। তাই জীবের বসবাসের পক্ষে একেবারেই উপযুক্ত নয় রুক্ষ আটাকামা। এহেন আটাকামার সবচেয়ে রুক্ষ এলাকাটি, একশো বছর আগে আশ্চর্যজনকভাবে হয়ে উঠেছিল প্রাণচঞ্চল। রাতারাতি গড়ে উঠেছিল এক জনপদ। হারিয়েও গিয়েছিল একশো বছরের মধ্যে। আজও সেই চাঞ্চল্যকর ইতিহাস, নিজের শবদেহে বহন করে চলেছে আটাকামার ভুতুড়ে নগরী 'লা নোরিয়া'। [caption id="attachment_247477" align="aligncenter" width="600"]
'আটাকামা' মরুভূমি[/caption]
এলাকায় মিলেছিল পটাশিয়াম নাইট্রেট
আটাকামা মরুভূমির উত্তর অংশে আছে কর্ডিলেরা পর্বতশ্রেণী। সেই পর্বতশ্রেণীর পাদদেশে ঘুমিয়ে আছে মৃতনগরী 'লা 'নোরিয়া'। একসময় জায়গাটির কোনও নামই ছিল না। পেরু দখল করে থাকা স্প্যানিশরা, ১৫৫৬ সালে জানতে পেরেছিল, এই এলাকায় আছে পটাশিয়াম নাইট্রেটের বিশাল ভাণ্ডার। কিন্তু হুয়ান্তাজায়ার কাছেই রুপোর খনি মিলে যাওয়ায়, স্প্যানিশরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রুপোর খনির তৈরি করার কাজে। ফিরেও তাকায়নি পটাশিয়াম নাইট্রেটের বিশাল ভাণ্ডারটির দিকে।
২৭০ বছর পর, ১৮২৬ সালে, ফরাসি ব্যবসায়ী হেক্টর ব্যাকুয়ে সেখানে তৈরি করেছিলেন 'ডে লা নোরিয়া' সল্টপিটার প্ল্যান্ট। প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম নাইট্রেট উৎপাদন করতে শুরু করেছিলেন। পটাশিয়াম নাইট্রেট বারুদ তৈরিতে কাজে লাগে। ইউরোপীয় বাজারে তাই ছিল ব্যাপক চাহিদা। কিছুদিনের মধ্যেই ফুলে ফেঁপে উঠেছিলেন হেক্টর ব্যাকুয়ে। লাভজনক ব্যবসার সন্ধান পেয়ে এলাকাটির ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিলেন পেরু, বলিভিয়া ও চিলির ব্যবসায়ীরা। একে একে তৈরি হয়েছিল একুশটি পটাশিয়াম নাইট্রেটের খনি ও শোধনাগার।
[caption id="attachment_247486" align="aligncenter" width="600"]
'ডে লা নোরিয়া' খনি[/caption]
আটাকামার রুক্ষ বুকে মাথা তুলেছিল 'লা নোরিয়া' শহর
খনি ও শোধনাগারগুলিতে কাজ করতে, পরিবার নিয়ে এসেছিলেন প্রচুর শ্রমিক। মাটির নীচে পাওয়া গিয়েছিল মহার্ঘ জল। আটাকামা মরুভূমির বুকে গড়ে উঠেছিল এক আধুনিক শহর। 'ডে লা নোরিয়া' খনিটির নামেই শহরটির নাম হয়ে গিয়েছিল 'লা নোরিয়া'। রুক্ষ আটাকামার বুকে গড়ে উঠেছিল শ্রমিকদের প্রায় দুশোটি কলোনি। গড়ে উঠেছিল দোকান, বাজার, হাসপাতাল, স্কুল, চার্চ, আদালত থেকে সমাধিক্ষেত্র। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩২২৭ ফুট ওপরে থাকা 'লা নোরিয়া' শহরটিকে, দূর থেকে এসে ছুঁয়ে ফেলেছিল রেললাইন। তৈরি হয়েছিল রেলস্টেশন। ১৮৭২ সালে লা নোরিয়াতে বাস করতে শুরু করেছিলেন প্রায় হাজার দশেক মানুষ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, আটাকামার ভেতরে সঞ্চিত থাকা তামা, নাইট্রেট ও রুপোর অধিকার নিয়ে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিল বলিভিয়া, পেরু ও চিলি। আটাকামার বেশকিছুটা অঞ্চল তখন পেরু ও বলিভিয়ার মধ্যে থাকলেও, ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৩ সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধে জিতে গিয়েছিল চিলি। আটাকামা মরুভূমি চলে গিয়েছিল চিলির দখলে। ব্যাপকভাবে পটাশিয়াম নাইট্রেট উৎপাদন করতে শুরু করেছিল চিলি। আড়ে বহরে আরও প্রসারিত হয়েছিল 'লা নোরিয়া' শহর।
ভাগ্যের আকাশে সহসা নেমে এসেছিল অন্ধকার
লা নোরিয়ার পতন শুরু হয়েছিল রেলের হাত ধরেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, এলাকাটির উত্তরে পাওয়া গিয়েছিল পটাশিয়াম নাইট্রেটের আর একটি বিশাল ভাণ্ডার। 'লা নোরিয়া' ছাড়িয়ে রেল লাইন চলে গিয়েছিল উত্তরে। গড়ে উঠেছিল পোজো আলমোন্ট শহর। বিবর্ণ হতে শুরু করেছিল প্রাণচঞ্চল নগরী 'লা নোরিয়া'।
১৯০০ সালের নভেম্বর মাসে, বিধ্বংসী আগুন লেগে গিয়েছিল 'লা নোরিয়া' শহরে। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল বহু খনি, শোধনাগার ও বাড়িঘর। হতাহত হয়েছিলেন বহুমানুষ। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, লা নোরিয়াকে মেরে ফেলতেই আগুন লাগানো হয়েছিল। পরবর্তীকালে আর চালু হয়নি পুড়ে যাওয়া খনি ও কারখানাগুলি।
খনি থেকে তোলা পটাশিয়াম নাইট্রেটের বাজার পড়ে গিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। কারণ জার্মানি তৈরি করে ফেলেছিল কৃত্রিম পটাশিয়াম নাইট্রেটে। ধুঁকতে ধুঁকতে চলা, লা নোরিয়ার খনি ও শোধনাগারগুলি পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাজ হারিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। বেশিরভাগই 'লা নোরিয়া' ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ফেলে গিয়েছিলেন নিজেদের হাতে তৈরি করা শহর।
এর পরেও শহরে থেকে গিয়েছিল কয়েকশো অসহায় পরিবার। তাদের যাওয়ার জায়গা ছিল না, রোজগারও ছিল না। ফলে প্রায় অনাহারে ও অপুষ্টিজনিত রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন মানুষগুলি। কিছু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন একাধিক রহস্যজনক বিষ্ফোরণে। ১৯২৯ সালে, চিরতরে পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছিল 'লা নোরিয়া'।
গুপ্তধনের সন্ধানে নেমেছিল কিছু অপরাধী
শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পর, মুখে মুখে ছড়িয়েছিল একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্প্যানিশদের হাত থেকে বাঁচাতে, তিনশো বছর আগে, পেরু নাকি দুটি বিশাল রত্নভাণ্ডার লুকিয়ে রেখেছিল এই এলাকায়। সেই জায়গাটিতেই নাকি তৈরি করা হয়েছিল শহরের সমাধিক্ষেত্র। খবরটি ছড়িয়ে যাওয়ার পর জনমানবহীন 'লা নোরিয়া' চলে গিয়েছিল গুপ্তধন সন্ধানী দুর্বৃত্তদের দখলে।
যন্ত্রপাতি নিয়ে তারা তোলপাড় করেছিল 'লা নোরিয়া' শহর। সমাধিক্ষেত্র খুঁড়ে তুলে ফেলেছিল শয়ে শয়ে কফিন। কফিনের ঢাকনা ভেঙেও তন্ন তন্ন করে খুঁজতে চেষ্টা করেছিল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের গুপ্তধন। মেলেনি কিছুই, তবুও তারা হাল ছাড়েনি। আজও গুপ্তধন সন্ধানীরা হানা দিয়ে চলেছে লা নোরিয়ায়।
আসতে শুরু করেছিলেন অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় পর্যটকেরা
প্রায় সাত দশক পর, হঠাৎই প্রচারের আলোয় এসেছিল, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া মৃতনগরী 'লা নোরিয়া'। গুপ্তধনের সন্ধানে যাওয়া অস্কার মুনোজ, ২০০৩ সালে লা নোরিয়ায় খুঁজে পেয়েছিলেন পাঁচ ছ'ইঞ্চি লম্বা একটি কঙ্কাল। ভিনগ্রহ থেকে আসা জীবের কঙ্কাল ভেবে তোলপাড় হয়েছিল পৃথিবী। [এ প্রসঙ্গে পড়ুন: আটাকামা মরুভূমিতে পাওয়া ছ’ইঞ্চি লম্বা কঙ্কালটি কার! রহস্য এখনও অমীমাংসিত! ] এর পর থেকে দলে দলে পর্যটকেরা যেতে শুরু করেছেন লা নোরিয়াতে।
যদিও লা নোরিয়া শহরে পৌঁছানো খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। পরিত্যক্ত শহরে যাওয়ার প্রধান রাস্তাটি বন্ধ। অত্যুৎসাহী পর্যটকেরা তাই অন্য পথ ধরেন। কিছুটা পাহাড়ি রাস্তায়, কিছুটা বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এগোতে হয় শহরের দিকে। একটা সময় গাড়িও এগোবার পথ পায় না। শুরু করতে হয় হাঁটা। হাঁটতে হয় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার।
শহরে ঢুকেই চমকে ওঠেন পর্যটকেরা
একটা দুটো নয়, শয়ে শয়ে ভাঙা কফিন আর কঙ্কালে ভরে রয়েছে লা নোরিয়া শহর। শহরের শুনশান রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের হাড়গোড়। মাটির ওপরে উঠিয়ে আনা কফিনগুলি ভেঙে, মাটির ওপরেই ফেলে গিয়েছে গুপ্তধন সন্ধানীরা। প্রখর রোদে ফেটে গিয়েছে কফিনের কাঠ। কঙ্কালগুলি বেরিয়ে এসেছে বীভৎস চেহারা নিয়ে।
সাহসী পর্যটকেরাও লা নোরিয়ার রাস্তা দিয়ে দিনের বেলা হাঁটতে ভয় পান। নিজের পদধ্বনির প্রতিধ্বনিতে চমকে ওঠেন। অত্যন্ত সাহসী কিছু পর্যটক লুকিয়ে থেকে যান শহরে। রাতের লা নোরিয়াকে দেখবেন বলে। যদিও গাইডেরা বারণ করেন। তাঁরা জানেন, রাতের অন্ধকারে লা নোরিয়াতে ঢুকতে ভয় পায় গুপ্তধন সন্ধানীরাও। কিন্তু অর্থের লোভ দেখিয়ে গাইডদের থাকতে বাধ্য করেন পর্যটকেরা।
সূর্য ডুবলে নাকি জেগে ওঠে মৃতের শহর 'লা নোরিয়া'
রাতের অন্ধকারে 'লা নোরিয়া' দেখায় তার বীভৎস রূপ। কফিনগুলি থেকে নাকি থেকে বেরিয়ে আসে থেকে কঙ্কালেরা। রাস্তায় পড়ে থাকা হাড়গুলি নিজে থেকে জোড়া লেগে যায়। দলবেঁধে কঙ্কালের দল খুঁজতে শুরু করে কফিনগুলির লাঞ্ছনাকারীদের। যাঁরাই রাতে থেকেছেন, তাঁরা শুনেছেন, মানুষের আর্তনাদ, কঙ্কালের হাঁটার খটখট শব্দ, পচা মাংসের দুর্গন্ধ। অনুভব করেছেন ঘাড়ের পাশে পড়তে থাকা গভীর দীর্ঘশ্বাস।
অনেক সাহসী পর্যটককেও পরের দিন সকালে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেছেন গাইডেরা। যুক্তিবাদী মন বলে, পুরোটাই অবাস্তব ও পর্যটক টানার কৌশল। সেটা জেনেও, গা ছমছম করা অভিজ্ঞতার আশায় ছুটে যান পর্যটকেরা। তাঁদের পদধ্বনি কান পেতে শুনতে থাকে মৃতশহর 'লা নোরিয়া'। হয়তো হু হু করে ওঠে, তার ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বুকের ভেতরটা।