Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

২৪ বছরের এই যুবক কোনও সেলিব্রেটি নন, তবু তাঁকেই কুর্নিশ জানায় সমাজ

রূপাঞ্জন গোস্বামী জায়গাটা চেন্নাইয়ের হাসপাতাল বা পুলিশ থানার পিছনে থাকা মর্গের উঠোন। হয়ত সেখানে শুয়ে আছেন এক পুরুষ বা মহিলা নিথর হয়ে। তিনি কোনও দিন কারও বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, ভাই বা বোন ছিলেন। আজ তিনি কারও নন। তাঁর ঠিকানা নেই, নাম নেই, তিন

২৪ বছরের এই যুবক কোনও সেলিব্রেটি নন, তবু তাঁকেই কুর্নিশ জানায় সমাজ

শেষ আপডেট: 25 April 2020 08:38

রূপাঞ্জন গোস্বামী
জায়গাটা চেন্নাইয়ের হাসপাতাল বা পুলিশ থানার পিছনে থাকা মর্গের উঠোন। হয়ত সেখানে শুয়ে আছেন এক পুরুষ বা মহিলা নিথর হয়ে। তিনি কোনও দিন কারও বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, ভাই বা বোন ছিলেন। আজ তিনি কারও নন। তাঁর ঠিকানা নেই, নাম নেই, তিনি তাই বেওয়ারিশ লাশ। একজন মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেছেন,অথচ আশেপাশে একফোঁটা চোখের জল ফেলার লোক নেই। দূরে কয়েকটা কাক ও শকুন লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে পচতে থাকা শরীরটির দিকে। ঠিক সেই মুহুর্তে দেহটির পাশে এসে দাঁড়ান চব্বিশ বছরের মিষ্টি চেহারার এক যুবক। সঙ্গে তাঁর কয়েকজন বন্ধু বান্ধবী। তাঁদের মধ্যে অনেক আবার টিন-এজার। হাতে গ্লাভস পরে, মুখে মাস্ক লাগিয়ে, বেওয়ারিশ লাশকে যত্ন করে মুড়ে নেন সাদা কাপড়ে। তারপর খুব সাবধানে, ধরাধরি করে দেহটিকে তোলেন শববাহী অ্যাম্বুলেন্সে। গাড়ি ছোটে নির্দিষ্ট কবরস্থানের দিকে। কবরস্থানে পৌঁছে, যুবকটি ও তাঁর বন্ধুরা, নিজেরাই কোদাল চালিয়ে কবর খোঁড়েন। তারপর গর্তে নেমে নিথর মানুষটিকে পরম মমতায় শেষ বিছানায় শুইয়ে দেন। কবরে মাটি চাপা দিয়ে মানুষটির জন্য প্রার্থনা করেন খালিদ আহমেদ ও তাঁর সঙ্গীরা। না কোনও ধর্মীয় প্রার্থনা নয়। মানুষটির জন্য কয়েক মুহুর্ত চিন্তা করা। তাঁর কাছে মানবজাতির পক্ষে থেকে ক্ষমা চাওয়া। এভাবেই তাঁরা বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যাওয়া মানুষটিকে সম্মান দেখান। এভাবেই তাঁরা মৃত মানুষটির অবিনশ্বর আত্মাকে বোঝান, পৃথিবী থেকে তাঁর চিহ্ন মুছে যাওয়ার দিনে, তিনি একলা ছিলেন না। পৃথিবী থেকে মানুষটিকে অসম্মানজনক ভাবে বিদায় নিতে হয়নি। তাঁর পাশেই ছিলেন খালিদ ও তাঁর বন্ধুরা।
আমিই থাকব ওঁদের পাশে
২০১৫ সালে বন্ধুদের সঙ্গে খালিদ গিয়েছিলেন কোয়েম্বাটোর। সেখানে দেখেছিলেন একজন গৃহহীন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ রাস্তায় শুয়ে কাতর ভাবে জল চাইছিলেন পথচারীদের কাছ থেকে। মানুষটির গা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। পথচারীরা মানুষটিকে দেখে, দূরত্ব রেখে দ্রুত পায়ে চলে যাচ্ছিলেন। খালিদ ও তাঁর বন্ধুরা মানুষটিকে জল দিয়েছিলেন। জল দেওয়ার কিছু পরে মানুষটি মারা গিয়েছিলেন। মানুষটি মারা যাওয়ার পর খালিদ পুলিশে খবর দিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষটিকে, কোথা থেকে কোয়েম্বাটোর এসেছিলেন, তাঁর পরিবারে কে কে আছেন, তার কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। পুলিশ একটা এফআইআর নিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় মানুষটির মৃতদেহ মর্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কয়েকদিনের জন্য মর্গে দেহটি রাখা ছিল। যদি কেউ খোঁজ করে। কিন্তু পনেরো দিন কেটে যাওয়ার পরেও কেউ খোঁজ নিতে আসেননি। এই পনেরো দিন খালিদ ও তাঁর বন্ধুরা রোজ যেতেন মর্গে। খবর নিতেন, মানুষটির পরিবারের কেউ এলেন কিনা। পনেরো দিন পর হতভাগ্য মানুষটির শেষকৃত্য করেছিলেন খালিদই, পুলিশের সহায়তায়।” ঘটনাটি খালিদের মনে ভীষণভাবে প্রভাব ফেলেছিল। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে খালিদ ঠিক করেছিলেন, এমন একটি সংস্থা তৈরি করবেন, যেটি বেওয়ারিশ মৃতদেহকে অসম্মানিত হতে দেবে না। তৈরি করেছিলেন 'উরাভুগাল' নিজের অর্থে খালিদ তৈরি করেছিলেন 'উরাভুগাল ট্রাস্ট'। তামিলে 'উরাভুগাল' শব্দটির অর্থ আত্মীয়তা। সেইদিন থেকে বেওয়ারিশ লাশেরা হয়ে গিয়েছিল খালিদের আত্মীয়। খালিদের পাশে ছিলেন তাঁর বন্ধুরা। প্রথম দিকে মাসে দু এক বার খালিদদের ডাক পড়ত, অসনাক্ত মৃতদেহের শেষকৃত্য করার জন্য। ধীরে ধীরে এই অসাধারণ যুবকগুলির কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল চেন্নাই শহরে। ফোন আসতে শুরু করেছিল চেন্নাইয়ের সবকটি পুলিশ স্টেশন থেকে। এখন মাসে কমপক্ষে কুড়িটা বেওয়ারিশ লাশের সৎকার করে খালিদের 'উরাভুগাল ট্রাস্ট'। খালিদের মনে পড়ে রাস্তায় পড়ে থাকা মৃত্যুপথযাত্রী কিছু মানুষের শেষ ইচ্ছার কথা। যাঁদের খবর পেয়ে টিম নিয়ে হাজির হয়েছিলেন খালিদ। খোলা আকাশের তলায় পড়ে পড়ে মরতে থাকা মানুষগুলির বেশিরভাগই খালিদের হাত জড়িয়ে বলেছিলেন, তাঁদের যেন শেষকৃত্য হয়। লাঞ্ছনাময় এক মর্মান্তিক জীবন কাটিয়ে তাঁরা চাননি মৃত্যুর পরেও তাঁদের মৃতদেহ লাঞ্ছিত হোক। শকুনে কুকুরে খাক। খালিদ তাঁদের হাত ধরে কথা দিতেন। মৃত্যুপথযাত্রী অজ্ঞাতপরিচয় মানুষগুলির শেষ ইচ্ছাকে সম্মান দিতেন।
 তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে শুরু করেছিলেন নবীন প্রজন্ম
শুরুটা করেছিলেন খালিদ, আজ 'উরাভুগাল' ট্রাস্টের যোগ দিয়েছেন প্রায় ৪০০ সেচ্ছাসেবক। খালিদের সঙ্গী সেচ্ছাসেবকদের বয়েস শুনলে অবাক হতে হয়। ১৮ থেকে ২৫। এই বয়েসের ছেলে মেয়েরা সাধারণত কেরিয়ার, প্রেম আর ইন্টারনেট নিয়ে পড়ে থাকে। সেখানে এই নবীন প্রজন্মের সেচ্ছাসেবকেরা ঘুণ ধরা সমাজ বদলাতে নেমে পড়েছেন শত প্রলোভন দূরে সরিয়ে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ টি বেওয়ারিশ লাশের অন্ত্যেষ্টি করেছেন খালিদ ও তাঁর সঙ্গীরা। দুটি হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ চালান খালিদ। তাঁর কাছে কোনও বেওয়ারিশ লাশের খবর এলেই তিনি হোয়াটস গ্রুপে জানিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ ছ’জন যুবক যুবতী চেন্নাইয়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেরিয়ে পড়েন সৎকারের উদ্দেশ্যে। আজ উরাভুগাল ট্রাস্টের নিজস্ব শববাহী অ্যাম্বুলেন্স হয়েছে। আজ ২৪x৭ ঘন্টা খালিদের টিম তৈরি থাকে অসনাক্ত মৃতদেহের শেষকৃত্য করার জন্য। যতই গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজ থাকুক। খালিদ সেই বেওয়ারিশ মানুষটির জন্যই সময় বের করবেনই, যাঁর জন্য আজ কারও সময় নেই। খালিদের টিম প্রত্যেকটি অসনাক্ত মৃতদেহের সৎকার করে, মৃত মানুষটির আত্মীয় হয়েই।
বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছিলেন খালিদ
উরাভুগাল ট্রাস্টের বর্তমান সেক্রেটারী একজন যুবতী, নাম ডঃ ভুবনেশ্বরী। তিনি ট্রাস্টের প্রথম মহিলা সেচ্ছাসেবক। ট্রাস্টে যোগ দিয়ে প্রথম প্রথম কাগজপত্রের কাজগুলি দেখতেন। একদিন উরাভুগালের মূল দলটি একটি সৎকারের কাজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। কিন্তু সেদিন সেচ্ছাসেবকদের সংখ্যা কম ছিল। তাই ডঃ ভুবনেশ্বরী নিজেই খালিদকে বলেছিলেন, তিনি সৎকারের কাজে যেতে চান। খালিদ বাধা দেননি। ডঃ ভুবনেশ্বরী গিয়েছিলেন খালিদদের সঙ্গে বেওয়ারিশ লাশের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ায়। সেই শুরু, আজ উরাভুগাল ট্রাস্টে প্রায় ৭০ জন মহিলা সেচ্ছাসেবক আছেন। যাঁরা নিয়মিত বেওয়ারিশ লাশের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার সমস্ত কাজকর্ম হাসিমুখে করে থাকেন। এদিক থেকে খালিদ একটা নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ভারতের প্রায় সব ধর্মেই, মহিলাদের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ায় যাওয়া ও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া বারণ। সেই সংস্কারের মূলে আঘাত করেছেন খালিদ [caption id="attachment_213247" align="aligncenter" width="670"] খালিদ আহমেদ[/caption]
প্রশংসা চান না খালিদ, চান বাড়িয়ে দেওয়া হাত
এরকম একটি মহান সংকল্প দিনের পর দিন হাসিমুখে পালন করার পরেও খালিদ আজ নিরুত্তাপ ও বিনয়ী। তিনি চান তাঁর আন্দোলন ভারতের প্রতিটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। হাতে হাত দিয়ে এগিয়ে আসুক যুবসম্প্রদায়। তিনি তাঁর চেনা অচেনা সকল ভারতীয় তরুণ তরুণীদের বলতে চান, "জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, প্রত্যেকটি মানুষকেই স্পর্শ করবে মৃত্যু। এটাই জীবনের চরম সত্য। রাস্তায় ফেলে দেওয়া, বাতিল মানুষদের জীবন ও মৃত্যু দুটোই মর্মান্তিক। এরকম মানুষদের দেখতে পেলে, এগিয়ে গিয়ে প্রথমে তাঁদের জীবনে ফেরানোর চেষ্টা করবেন। যদি একান্তই বাঁচানো না যায়, তাহলেও এগিয়ে আসুন, আমরা সবাই মিলে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যাওয়া মানুষগুলির শেষ বিদায়টা অন্তত মানুষের মত করার চেষ্টা করি।" আজ তামিলনাড়ু উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করে খালিদ ও তাঁর উরাভুগাল ট্রাস্টের প্রত্যেক সেচ্ছাসেবককে। কামনা করে ঘরে ঘরে যেন খালিদদের মত ছেলে মেয়েরা জন্মায়। পেয়েছেন প্রচুর পুরষ্কার, প্রচুর সম্মান, তবুও সে সব দিকে খালিদের নজর থাকে না। তাঁর নজর সব সময় থাকে তাঁর মোবাইলের স্ক্রিনে। এই বুঝি বেজে ওঠে ফোন,"খালিদ ভাই…থানা থেকে বলছি… আরেকটা লাশ…চলে আসুন”।

```