
শেষ আপডেট: 27 November 2018 11:51
বাংলা গানের ভাটা চলছে বেশ কিছু দিন ধরেই। শিল্পীদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। নিশ্চয় আপনিও আঁচ পাচ্ছেন। এই মুহূর্তে এই সব নিয়ে কতটা হতাশ মনোময়?
শিল্পী হয়েছি নিজের প্রতিভাকে তুলে ধরতেই। সেখান থেকে পিছিয়ে আসা বা হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা কখনও কল্পনাও করতে পারি না। গান গাইছি, শুনছেন শ্রোতারা। লাগাতার সাধনায় মগ্ন থাকলে শ্রোতাদের মন জয় করা অসম্ভব কিছু নয়। আজ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর সঙ্গীত জগতে নিজেকে তুলে ধরেছি তিলে তিলে। ভালো-মন্দ তো থাকবেই। এখনও পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা নিয়ম মেনেই চলে। খারাপ সময়টা উত্তীর্ণ হওয়ার সময় হতাশার বা ক্ষোভে কখনও কখনও শিল্পীদের মনেও নেতিবাচক প্রভাব বাসা বাঁধে।
https://youtu.be/F4XO4h8pQ7Y
অন্য পেশার কথাও তার মানে মাথায় ঘুরছে?
না। কখনও না। এ ধরনের হতাশা আমাকে এখনও অবধি ছুঁতে পারেনি। বাংলা গান গোল্লায় গেল বলে অন্য পেশায় চলে যেতে হবে-– এমন মন্তব্য কেউ কেউ করলেও আমি করি না। যে ধরনের গান গাইতে চাই বা গাইতে পারছি না, এমনকী শিল্পীর ইচ্ছে বা ভালোবাসার কোনওটাই শিল্পী জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না, এমন তো জীবনের সব ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতি এলেই অন্য পেশা বা নিদেনপক্ষে তেলেভাজার দোকান খুলতে হবে? এমন চিন্তাভাবনা যদি মাথায় আসে তবে আর শিল্পী হওয়া কেন?
মানতে পারছি না, আপনিই শুধু সব হতাশার ঊর্ধ্বে?
না। এক বারের জন্যও সে কথা বলতে চাইছি না। ‘মনের মানুষ’ গানটা জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছলেও এখনও তো সব সময় সব ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছে ও চাহিদা মতো গাইতে পারি না। শ্রোতাদের কথা ভেবে এমন গান গাইতে হয়, এমনকী তাঁদের নাচাতেও হয়, যা প্রকৃত শিল্পীর কাছে বড়ই দুঃখজনক। কিন্তু শ্রোতাদের মনোরঞ্জনই শেষ কথা। আসলে যুগের পরিবর্তনে রুচি বদলের ধাক্কায় লন্ডভন্ড হতে বসেছে গানবাজনার জগৎ। দুঃখ হয়, কত ভালো ভালো নতুন গানও ঠিক মতো শ্রোতাদের শোনাতে পারছি না। ফলে কী করে নতুন গান তাঁদের মনে গাঁথবে? তাই ক্ষোভ তো হয়ই। আর ক্ষোভ আছে বলেই শিল্পী সত্ত্বা বিসর্জন দিতে হবে? না, একদম মানতে পারি না। যুগে যুগে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আসবেও। এই পরিবর্তনে নিজেকে সওয়ারি করতে চাই। নিজের ওপর ভরসা ও বিশ্বাস রাখি। রাখতেও হবে।
‘তেলেভাজার দোকান খুলতে হবে...’ এমন চিন্তাভাবনায় আপনি নেই, তাই তো?
আমার চিন্তাভাবনা একদম অন্য ধরনের। কে কী বলেছেন ঠিক জানি না। তবে আমি আমার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্দিষ্ট করে রেখেছি। ভবিষ্যতে নতুন অ্যাকাডেমি খুলব। সেখানে পরবর্তী প্রজন্ম শুধু গান নিয়েই মেতে থাকবে। আপনারা হয়তো জানেন না, কত নতুন প্রতিভা একটু সুযোগ ও সঠিক গাইডলাইনের অভাবে উঠে আসতে পারেন না। তাঁদের প্রদীপের সামনে আনা আমার একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমার জীবনের সব অভিজ্ঞতা তাঁদেরই দিতে চাই, যাঁরা বাংলা গানের অন্ধকার কাটিয়ে নতুন গানে বিপ্লব আনবে।
টিকে থাকতে গেলে সবাইকেই তো লড়াই করতে হয়। তাই না?
খাঁটি কথা। বাংলা গানের স্বর্ণযুগের সময়ের শিল্পীরা গানের জন্য কত লড়াই করেছেন, ভাবলে এখনও শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তাঁরা এক একটি গানে সাফল্যের মুখ দেখেছেন। ঘাত প্রতিঘাত তো তখনও ছিল। তাই বলে কেউ কখনও বাংলা গানের জগৎ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতেও পারতেন না। বরং আরও কঠিন লড়াইয়ের জন্য নিজেকে তৈরি করতেন। এ সব যত শুনি, তত মনের মধ্যে আরও চ্যালেঞ্জ বাসা বাঁধে।
অবশ্য আগে মিডিয়ার অনেক ভূমিকা ছিল, এখন নেই। বাংলা গান নিয়ে অত প্রচারও নেই। তাই না?
একদম ঠিক। আকাশবাণীর পুজোর গান, গ্রামোফোন কোম্পানির পুজোর বই-- এ সব তো এখন ইতিহাস। দূরদর্শনেও এখন তেমন প্রচার নেই। বেশির ভাগই বানিজ্যিক প্রচার। ফলে বাংলা গান নিয়ে শ্রোতাদের মনে নতুন করে আর আগ্রহ জন্মাচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, বলতে বাধ্য হচ্ছি, কোনও অনুষ্ঠানে গাইতে বসলে যদি নতুন গান শোনাতে চাই, সঙ্গে সঙ্গে অন্য ধরনের গানের অনুরোধে সেই চেষ্টা বিফলে যায়। সীমিত সময়, তাই মঞ্চ ছাড়তেই হয়। শ্রোতারা তো জানেনই না, নতুন কিছু গান কত পরিশ্রম ও সাধনায় তৈরি করেছি, এক এক সময়ে রাগ হয়। কিন্তু শিল্পীর রাগ অভিমান প্রকাশ করতে নেই।
দারুণ কথা বললেন তো!
এক জন প্রবীন শিল্পী আমাকে একটা সুন্দর উদাহরণ দিয়েছিলেন। ষাট-সত্তর দশকে মান্না দে-র একের পর এক হিট গান মানুষকে মাতিয়ে দিচ্ছিল। তারই ফাঁকে সেই শিল্পীরই একটা গান ‘ললিতা, ওকে আজ চলে যেতে বল না।’ প্রথম দিকে শ্রোতাদের নজরেই আসেনি, বা তেমন প্রচার পায়নি। এত সাধের গান কেন জনপ্রিয় হল না তা নিয়ে মনে বেশ কষ্টও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু না, ভুল ভাঙল বেশ কিছু দিন পরে। আকাশবাণী ও গ্রামোফোন কোম্পানির দৌলতে সেই গান ছড়িয়ে পড়ল আমজনতার দরবারে। কয়েক দশক পরেও সেই গানের জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি।
কিন্তু শ্রোতারা তো অবুঝ নন। দেরিতে হলেও ভালো গান খুঁজে নিতে পারেন। নব্বই দশকের পর থেকে বাংলা গানে ‘জগাখিচুড়ি’ চলছে। শ্রোতারাও দিশাহারা...
শ্রোতাদের কোনও মতেই দোষ দেওয়া যায় না। তাঁরাও বিরক্ত অনেক কারণে। সবাই জানেন, বেনোজল যখনই এই সঙ্গীত জগতে ঢুকে পড়েছে, তখন থেকেই বাংলা গানের তাল কাটতে শুরু করেছে। অপরিণত কণ্ঠ, বেসুরো গলা, জোলো গানের কথা ও সুরে শ্রোতাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়েছিল। এমন গান তো ‘না ঘরকা না ঘাটকা’। ধৈর্য হারিয়ে ভালো গান শোনা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখছিলেন সমঝদার শ্রোতারাও। এই পরিস্থিতির জন্য অবশ্য অনেকেই দায়ী। মাপ করবেন, এক জন শিল্পী হয়ে কোনও শিল্পীকে হেয় করতে চাই না।
https://youtu.be/eQaDFgTfdxA
রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়েও তো ছেলেখেলা চলছে?
সে আর বলতে? ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে’... গানটাতে জীবনের এক কঠিন সংকটের ঈঙ্গিতপূর্ণ দিককে উন্মোচন করেছেন কবি। দুঃখকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন তিনি। আর সেই গান যখন কোনও শিল্পী ‘ড্রামস’ এর সঙ্গে পরিবেশন করেন, তখন বুঝে নিতেই হয়, গানটার মর্মার্থ তিনি নিজেই বুঝতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে গেলে কিছুটা বুঝতে হয়, জানতে হয়। তা না করলে তার পরিণাম কী দাঁড়াতে পারে, এখনও অনেকেই তা বুঝতে চান না। ‘অশিক্ষা’ আর ‘অপরিণত’ এই শব্দ দু'টো অন্তত রবীন্দ্রসঙ্গীতকে পরিপূর্ণতা দিতে পারে না।
ভালো শিল্পী হতে গেলে কোন যোগ্যতা সব চেয়ে আগে জরুরি?
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কিছুটা তালিম নেওয়া। যে কোনও গানের মেরুদণ্ডই তো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত।
ভালো গান শুনতে তো শ্রোতারা এখন আর অত সময় দিচ্ছেন না। সেটাও তো ভাবতে হবে, তাই না?
একটা সময় তো এন্টারটেনমেন্ট মানে শুধু গান শোনাকেই বোঝাত। পরবর্তীতে টিভি সিরিয়াল, সিনেমা-- এ সব ঝড়ের মতো এসে মানুষের রুচির বড় বদল ঘটিয়ে দেয়। বাংলা গানের অভাব আরও প্রকট হয়ে ওঠে। রুচি বদলের ধাক্কায় মানুষ গানের প্রতি একমুখী মনোভাব দ্রুত বদলে নেয়।
ভালো গান, প্রকৃত শিল্পী – দুইয়ের মিলন ঝড় তুলবে বাংলা গানের দুনিয়ায়। সে দিন আর কত দূরে?
সবাই বুঝতে পেরেছেন, জোড়াতালি দিয়ে আর যাই হোক, কোনও সৃষ্টি হয় না। সেই সুবর্ণ দিন আসবেই আসবে, আমার অন্তত তাই মনে হয়। নতুন বহু প্রতিভা সেই সুযোগের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
এত কথার পরেও আপনার মুখে কোনও হতাশার কথা শুনলাম না। বড় ভরসা পেলাম। অন্তত আপনি গান বাজনা ছেড়ে তেলেভাজার দোকান খুলছেন না।
বিরহ বুকে থাকা ভালো। হতাশাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। বরং হতাশাকে জয় করা ভালো। আবারও বলছি, আমি গান গাই, আমি শিল্পী। আমার লক্ষ্য একটাই, আমি ভবিষ্যতে অ্যাকাডেমি খুলব। যেখানে আমার সব স্বপ্ন পূরণ হবে। আর তা হবেই হবে।