
শেষ আপডেট: 10 April 2020 05:07
কুট্টিয়াগৌন্ডানপুদুর গ্রাম।[/caption]
কৃষক দম্পতির মেধাবী পুত্র আধিয়াগাই নামী কলেজে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। কীভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বকেয়া অর্থ মেটাবেন, সেই চিন্তাই কুরে কুরে খাচ্ছিল রামেশ্বরন দম্পতিকে। টেবিলে বসে পড়তে পড়তে, বাবা মায়ের বিষণ্ণ ও চিন্তিত মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন পুত্র আধিয়াগাই।
বাবা মায়ের ম্লান মুখ আর বৃষ্টিহীন বিষন্ন বিকেল, পালটে দিয়েছিল ২২ বছরের আধিয়াগাই রামেশ্বরনকে। বহুজাতিক সংস্থায় লোভনীয় চাকরির স্বপ্ন দেখা আধিয়াগাই, ফোর্থ ইয়ারে পড়তে পড়তে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে দিয়েছিলেন। যে জমি থেকে এক মুঠো ধান পেতে তাঁর বাবা মায়ের রক্ত আর ঘাম এক হয়ে যাচ্ছে, সেই জমিতেই সোনা ফলিয়ে দেখিয়ে দেবেন আধিয়াগাই।
[caption id="attachment_206955" align="aligncenter" width="670"]
আধিয়াগাই রামেশ্বরণ।[/caption]
গ্রামে গ্রামে ঘুরে বীজ সংগ্রহ করেছিলেন আধিয়াগাই[/caption]
আজ আধিয়াগাইয়ের সেই অর্গানিক ফার্ম শুধু তামিলনাড়ুর নয়, ভারতেরও গর্ব। ছয় একর ফার্মের তিন একর জায়গা জুড়ে হয় চিনা বাদামের চাষ। বাকি তিন একর জায়গায় হয়, একদম দেশী প্রজাতির বিভিন্ন সবজি। তার মধ্যে আছে টমাটো,কাঁচা লঙ্কা, ঢ্যাঁড়স, বিনস, লাউ, বেগুন ও প্রায় ৩০০ স্থানীয় সবজি এবং ফল। প্রত্যেক বছর একই ধরনের সবজি চাষ না করেন না আধিয়াগাই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন সবজি চাষ করেন। এর ফলে, কীটপতঙ্গের আক্রমণের আশঙ্কা থাকেনা বললেই চলে। আধিয়াগাইকে কীটনাশক কিনতে হয় না, ফলে সবজিগুলি হয় বিষমুক্ত।
স্থানীয় ও বিশুদ্ধ দেশী প্রজাতির সবজি বেছে নিয়েছিলেন আধিয়াগাই
একদা এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মেধাবী ছাত্র আধিয়াগাই, মাঠে নামার আগে যথেষ্ট গবেষণা করে নিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন তাঁদের গ্রামটি খরা কবলিত এলাকায় অবস্থিত। তবুও সেখানে কিছু স্থানীয় সবজি ফলে। এই সবজিগুলির বীজ প্রাকৃতিক ভাবেই উর্বর এবং খরাতেও টিকে থাকতে সক্ষম। একই সঙ্গে রোগ ও জীবাণুর আক্রমণও সামলে দেয়। এছাড়া এই সব স্থানীয় সবজি ফলানোর জন্য অতিরিক্ত যত্ন দরকার নেই। এমনকি গবাদিপশুর মলও দরকার হয় না। একবার সামান্য বৃষ্টি হলেই যথেষ্ট ফলন দেবে। তাই আধিয়াগাই তাঁর ফার্ম হাউসে কেবল মাত্র স্থানীয় সবজি লাগিয়েছিলেন।
আধিয়াগাই দেখেছিলেন, প্রাকৃতিক কারণ, কৃষকদের অনিচ্ছা ও মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের জন্য অনেক সবজি হারিয়ে গিয়েছে বাজার থেকে। অথচ সেই সবজিগুলি সামান্য জল পেলেও বাঁচতে পারে। তাই অবলুপ্ত হতে বসা, দেশী প্রজাতি সবজিগুলিকে বাঁচাতে আধিয়াগাই তৈরি করেছিলেন বীজ ব্যাঙ্ক। বর্তমানে তাঁর বীজ ব্যাঙ্কে ১৩ প্রজাতির ঢ্যাঁড়স, ৩০ প্রজাতির বেগুন, ৩০ প্রজাতির লাউ, ১০ প্রজাতির ভুট্টা ও দুর্লভ প্রজাতির ২০০ সবজির বীজ জমা আছে।
[caption id="attachment_206958" align="alignnone" width="759"]
আধিয়াগাইয়ের ফার্মে হওয়া বিভিন্ন প্রজাতির ঢ্যাঁড়স, আছে দুর্লভ গোলাপী ঢ্যাঁড়সও।[/caption]
আধিয়াগাই জানিয়েছেন, “হাইব্রিড প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছের আয়ু মাত্র ১০০ থেকে ১২০ দিন। কিন্তু স্থানীয় প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছগুলির আয়ু, ছয় মাস থেকে তিন বছর। ফলে স্থানীয় প্রজাতির ঢ্যাঁড়স চাষে লাভও প্রচুর।" তামিলনাড়ুর গ্রামে গ্রামে ঘুরে কয়েকশো প্রজাতির ঢ্যাঁড়স গাছ খুঁজে বার করেছেন আধিয়াগাই। যেগুলি বাজার থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। প্রায় অবলুপ্ত হতে বসা গোলাপী ঢ্যাঁড়সকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন, 'কঙ্গু' নামের একটি জায়গা থেকে। তামিলনাড়ুতে পাঁচশ প্রজাতির বেগুন আছে জেনে অবাক হয়েছিলেন আধিয়াগাই ।
অর্গানিক ফার্ম খুলে স্থানীয় সবজি চাষ করে একা বড়লোক হবেন, এই ধরনের মানসিকতার যুবক আধিয়াগাই নন। ফার্মের জন্য সময় দেওয়ার পর, বাকি সময় তিনি ব্যয় করেন স্থানীয় চাষীদের পিছনে। স্থানীয় চাষিদের রাসায়নিক মুক্ত সবজি চাষ ও লুপ্তপ্রায় দেশি সবজির চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কম পরিশ্রম করতে হয়নি আধিয়াগাইকে। স্থানীয় কৃষকদের অল্প জায়গায় দেশী ও স্থানীয় সবজিগুলি লাগাবার জন্য দিনের পর দিন অনুরোধ করে যেতেন আধিয়াগাই। বাড়িতে খাবার জন্য হলেও অন্তত একবার চাষ করে দেখতে বলতেন।
[caption id="attachment_206959" align="alignnone" width="1024"]
ফার্মে হয় নানান জাতের দেশী বেগুন।[/caption]
সাফল্য পেয়েছিলেন আধিয়াগাই। স্থানীয় কৃষকরা ব্যাবসায়িক ভাবে উৎপাদন করতে শুরু করেছিলেন মানুষের পাত থেকে হারিয়ে যাওয়া সবজিগুলি। অভাবের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলে কয়েকশো স্থানীয় কৃষকের পরিবার। বন্ধ্যা এলাকার দিগন্তবিস্তৃত ধুসর জমিতে পড়েছিল সবুজের প্রলেপ। হাসি ফুটে উঠেছিল প্রায় অনাহারে থাকা মুখগুলিতে।
আধিয়াগাইয়ের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। ভারতের এমন কোনও বিখ্যাত পত্রিকা নেই যেখানে তাঁর সাক্ষাতকার ছাপা হয়নি। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশেও। তাঁকে দেখে উদবুদ্ধ হয়েছেন বৃষ্টিচ্ছায়া ও খরা প্রবণ অঞ্চলে থাকা ভিনদেশী কৃষকেরাও। বাবা মায়ের হতাশাকে নিজের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছেন আধিয়াগাই। তাঁরা এখন আধিয়াগাইকে নিয়ে গর্বিত। আজ আধিয়াগাই কোটিপতি কৃষক, তবুও স্বপ্ন দেখেন গরীব চাষীদের জন্য। একটা বড় 'বীজ ব্যাঙ্ক' করে যেতে চান। যে ব্যাঙ্কটি থেকে গরীব চাষীদের বিনামূল্যে বীজ দেওয়ার হবে। যে ব্যাঙ্কটি বাঁচিয়ে দেবে লুপ্ত হতে বসা বেশ কিছু দেশী সবজিকে।
[caption id="attachment_206960" align="aligncenter" width="1024"]
ধুসর মাটি আজ সবুজ ।[/caption]