রূপাঞ্জন গোস্বামী
আমেরিকার কলম্বাস ইস্ট এলাকার যমজ দুই ভাই, স্ট্যানলি ও স্টিফেন মায়ার। ছোটবেলা থেকেই দুই ভাইয়ের মধ্যে স্ট্যানলির উদ্ভাবনী শক্তি দেখে বিস্মিত হতেন পাড়া প্রতিবেশীরা। সবাই যখন খেলনার জন্য ব্যতিব্যস্ত করে তুলত বাবা মায়েদের, তখন স্ট্যানলি নিজেই বানিয়ে নিত চমৎকার সব স্বয়ংক্রিয় খেলনা। ১৯৪০ সালে জন্ম নেওয়া স্ট্যানলি, ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে মেতে উঠেছিলেন আবিষ্কারের নেশায়। নিত্য নতুন ইলেকট্রনিকস যন্ত্র আবিষ্কার করতেন। যা দৈনন্দিন জীবনে মানুষের কাজে লাগত। ব্যাঙ্ক থেকে সমুদ্রবিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা থেকে চিকিৎসা শাস্ত্র, তৎকালীন আমেরিকায় এমন কোনও সংস্থা ছিল না, যারা স্ট্যানলি মায়ারের আবিষ্কৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্র কাজে লাগায়নি।
[caption id="attachment_208859" align="aligncenter" width="320"]

স্ট্যানলি মায়ার।[/caption]
গ্যাজেট গুরু স্ট্যানলি
কয়েক হাজার ইলেকট্রনিক যন্ত্রের আবিষ্কারক ছিলেন স্ট্যানলি। সেই সব আবিষ্কারের পেটেন্ট ছিল স্ট্যানলির নামেই। ফলে উল্কাগতিতে ধনী হয়ে গিয়েছিলেন স্ট্যানলি। তাঁর আবিষ্কারগুলির পেটেন্ট নেওয়ার আবেদন দ্রুত মঞ্জুর হয়ে যেত। অন্যদের ক্ষেত্রে সময় লাগত বছরের পর বছর।
আমেরিকার পেটেন্ট অফিস স্বীকার করে নিয়েছিল, প্রযুক্তির অভিনবত্বের দিক থেকে স্ট্যানলি ছিলেন সবার থেকে এগিয়ে। সবার থেকে আধুনিক। কেউ কোনও যন্ত্র বানাবার স্বপ্ন দেখার আগেই সেটি বানিয়ে ফেলতেন স্ট্যানলি। 'ওহায়ো'র বাটেল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্ট্যানলি, যে সংস্থাটি মানবসভ্যতার স্বার্থে নানান প্রযুক্তি আবিষ্কার করত। এছাড়াও নাসার 'জেমিনি স্পেস প্রোগ্রাম' এবং 'স্টার ওয়ারস' প্রজেক্টের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন স্ট্যানলি মায়ার।
[caption id="attachment_208861" align="aligncenter" width="494"]

নাসার জন্য তৈরি যন্ত্রের সঙ্গে স্ট্যানলি মায়ার।[/caption]
সত্তরের দশকে শুরু হয়েছিল জ্বালানি যুদ্ধ
আরবের জ্বালানি তেলের ওপর ১৯৭৫ সালে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। আমেরিকায় তেল রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছিল সৌদি আরব। তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছিল আমেরিকার বাজারে। আমেরিকার তেল কোম্পানি এবং গাড়ি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলি দেউলিয়া হতে বসেছিল। নতুন গাড়ি বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল আমেরিকার ভাঁড়ারে থাকা পেট্রল।
এই সময়, সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে স্ট্যানলি বলেছিলেন,"আমাদের দ্রুত কিছু একটা করতে হবে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতেই হবে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা করতেই হবে, আমেরিকায় গাড়ির চাকা বন্ধ হওয়ার আগে। কয়েক মাসের মধ্যে তৈরি করে ফেলেছিলেন 'ওয়াটার ফুয়েলড কার'। বিশ্বকে চমকে দিয়ে স্ট্যানলি ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর আবিষ্কৃত গাড়ি চালাতে খনিজ তেল লাগবে না। জলই হল তাঁর গাড়ির জ্বালানি।
[caption id="attachment_208862" align="aligncenter" width="600"]

স্ট্যানলি আবিষ্কৃত সেই ঐতিহাসিক গাড়ি।[/caption]
তেল ছাড়া কীভাবে চলবে স্ট্যানলির গাড়ি!
স্ট্যানলি আবিষ্কৃত ফুয়েল ব্যাটারির ভেতর, তড়িৎ-বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে জল ভেঙে তৈরি হবে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন। হাইড্রোজেনকে জ্বালিয়ে উৎপন্ন হবে শক্তি। যার সাহায্যে ঘুরবে চাকা। জল ভেঙে তৈরি হওয়া অক্সিজেন ও অতিরিক্ত জল বাস্প হয়ে বেরিয়ে যাবে একজস্ট পাইপ দিয়ে। স্ট্যানলির মেয়ারের আবিষ্কারটি ছিল বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী। স্ট্যানলির গাড়ি থেকে বায়ুদূষণ হবে না। ফলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং হবে না। এছাড়াও কমবে খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা।
সবচেয়ে বড় কথা জল ছড়িয়ে আছে প্রকৃতিতে। তাই চার চাকার গাড়ি চড়া, সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে। স্ট্যানলি দাবি করেছিলেন, মাত্র ৭৫ লিটার জল দিয়ে তাঁর গাড়ি আমেরিকার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যেতে সক্ষম। সেদিন অবিশ্বাস করেনি আমেরিকা। কারণ কথাটা বলেছিলেন স্ট্যানলি মায়ার।
[caption id="attachment_208863" align="aligncenter" width="480"]

গাড়ির প্রযুক্তি দর্শকদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন স্ট্যানলি।[/caption]
শুরু করেছিলেন গাড়ির প্রদর্শনী
সারা আমেরিকা জুড়ে স্ট্যানলি মায়ার তাঁর তার সদ্য আবিষ্কৃত গাড়ির প্রদর্শনী করতে শুরু করেছিলেন। ভিড় উপচে পড়ছিল প্রতিটি প্রদর্শনীতে। প্রত্যেকেই মুগ্ধ হয়েছিলেন এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি দেখে। স্ট্যানলির 'ওয়াটার ফুয়েলড কার' দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন লন্ডনের মেরি কলেজের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন ,প্রফেসর মিচেল লাউটন, ব্রিটিশ নেভির প্রাক্তন অ্যাডমিরাল স্যার আন্থনি গ্রিফিন, ব্রিটিশ রসায়নবিদ ডঃ কিথ হিন্ডলেও। তাঁর প্রজেক্টে টাকা লগ্নী করার জন্য দলে দলে ছুটে আসতে শুরু করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। বিরাট ভাবে 'ওয়াটার ফুয়েলড কার' উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা নিতে শুরু করেছিলেন স্ট্যানলি মায়ার।
সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল চক্রান্তের জাল
কয়েক মাসের মধ্যেই আসতে শুরু করেছিল উকিলদের চিঠি। জল দিয়ে চলা গাড়ির আইডিয়াটি নাকি নিছকই বুজরুকি এবং অবৈধ। আবিষ্কারটির বিরুদ্ধে প্রচুর মামলা শুরু হয়েছিল আমারিকার আদালতে আদালতে। মামলাগুলি চলাকালীন তিনজন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে আদালত স্ট্যানলির 'ওয়াটার ফুয়েলড কার' পরীক্ষা করিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা আদালতকে জানিয়েছিলেন ,গাড়িটির ব্যাটারিতে নতুনত্ব কিছু নেই। ব্যাটারিতে চিরাচরিত তড়িৎ বিশ্লেষণ (electrolysis) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
কিন্তু আদালতের নিয়োগ করা বিশেষজ্ঞরা একবারও স্ট্যানলির আবিষ্কারকে খারিজ করে দেননি। রজার হার্লে নামে এক বিচারক সরাসরি স্ট্যানলির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন অনেক মানুষ যাঁরা স্ট্যানলির উদ্ভাবনী শক্তির সাথে পরিচিত ও উপকৃত। কিন্তু ঝামেলায় না যাওয়ার জন্য বিনিয়োগকারীরা লগ্নী করা অর্থ ফেরত চেয়েছিলেন। আদালত অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিয়েছিল। কারণ এভাবে টাকা নেওয়া আদালতের মতে ছিল অবৈধ। আদালতের কথা মেনে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে অর্থ ফেরত দিয়েছিলেন স্ট্যানলি মায়ার।
১৯৯৮ সালের ২১ মার্চ
একটি রেস্টুরেন্ট ভাই স্টিফেনকে সঙ্গে নিয়ে বেলজিয়ামের দুজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা বলছিলেন স্ট্যানলি। কথা বলতে বলতে ক্র্যানবেরি জুসে চুমুক দিয়েছিলেন। পরমুহূর্তেই দুই হাতে নিজের গলা চেপে ধরেছিলেন স্ট্যানলি। স্ট্যানলির মুখের রঙ হয়ে ছিয়েছিল ফ্যাকাশে নীল। দৌড়ে রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন স্ট্যানলি। দরজার কাছে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে বমি করতে শুরু করেছিলেন।
টেবিল থেকে দৌড়ে এসেছিলেন ভাই স্টিফেন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হয়েছে স্ট্যান?” হাঁ করে শ্বাস নিতে নিতে ঘোলাটে চোখ তুলে স্ট্যানলি তাকিয়েছিলেন ভাইয়ের দিকে, বলেছিলেন, “ওরা আমাকে বিষ দিয়েছে।” তারপর লুটিয়ে পড়েছিলেন ফ্লোরে। তাঁর চোখ আর খোলেনি ৫৮ বছরের স্ট্যানলি মায়ারের। রেস্টুরেন্টের টেবিলে তখনও শান্ত হয়ে বসেছিলেন দুই বেলজিয়ান বিনিয়োগকারী।
[caption id="attachment_208865" align="aligncenter" width="702"]

গাড়ির পাশে স্ট্যানলির ভাই স্টিফেন মেয়র।[/caption]
খুনের তত্ত্বে বিশ্বাস করেছিল সংবাদ মাধ্যমও
হয়েছিল তদন্ত। তিন মাসের তদন্তের শেষে সবাইকে অবাক করে আমেরিকার পুলিশ জানিয়েছিল 'সেরিব্রাল অ্যানিউরিজম' রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল স্ট্যানলির। কিন্তু স্ট্যানলির ঘনিষ্ঠরা পুলিশি তদন্তের রিপোর্টকে বিশ্বাস করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন স্ট্যানলির মৃত্যুকালীন জবানবন্দি “ওরা আমাকে বিষ দিয়েছে।” তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন খুন করা হয়েছিল প্রতিভাবান আবিষ্কারক স্ট্যানলি মায়ারকে।
কারণ তাঁর আবিষ্কার অনেকের স্বার্থে আঘাত করেছিল। স্ট্যানলির আবিষ্কৃত গাড়ি প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া জলে শক্তিতে চলত। এরফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানী তেলের বাজার পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বহুদেশ, বহু তেল কোম্পানি, গাড়ি কোম্পানি ও তেল মাফিয়াদের মৃত্যুঘন্টা বাজাতে শুরু করেছিল স্ট্যানলি মেয়ারের অবিশ্বাস্য আবিষ্কার। কেউ বলেছিলেন, স্ট্যানলির আবিষ্কারকে আমেরিকা অন্য সব আবিষ্কারের থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল বলে স্ট্যানলিকে সরিয়ে দিয়েছিল তাঁর প্রতিদ্বন্দী কোম্পানিগুলি।
[caption id="attachment_208866" align="aligncenter" width="700"]

খুনের তত্ত্বে বিশ্বাস করেছিল সংবাদ মাধ্যমও।[/caption]
ভাই স্টিফেন বলেছিলেন,"২১ মার্চ খাওয়ার টেবিলে থাকা দুজন বেলজিয়ান অনেক কিছু জানতেন। আমি তাঁদের বলেছিলাম স্ট্যানলি মারা গেছেন। কিন্তু সেটা শুনেও তাঁরা ছিলেন নির্বিকার। একটাও কথা বলেননি। কোনও প্রশ্ন করেননি। আমাকে কোনও সান্তনা দেননি। আমি তাদের মুখে আমি এক ফোঁটা দুঃখের অভিব্যক্তি দেখিনি” ঘটনাটির পরে বেলজিয়ান লোক দুটি আমেরিকা থেকে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
স্ট্যানলির কল্পনা কিন্তু অবাস্তব ছিল না
ভারতের রুরকি আইআইটির একদল ছাত্রছাত্রী, স্ট্যানলির মতই 'ওয়াটার ফুয়েলড কার' উৎপাদনের পথে। জল, গ্রেফিন রড ও অ্যালুমিনিয়ামের পাতের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুতে চলবে গাড়ির ইঞ্জিন। এক লিটার জলে গাড়িটি চলবে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। প্রতি ১,০০০ কিলোমিটার চলার পর পাল্টে ফেলতে হবে অ্যালুমিনিয়ামের পাত। রুরকি আইআইটির ছাত্রছাত্রীদের সংস্থার নাম
Log9 Materials।
[caption id="attachment_208867" align="aligncenter" width="1024"]

রুরকি আইআইটি আবিষ্কৃত ওয়াটার ফুয়েলড কার।[/caption]
কল্পনা করুন পাঠক, আজ থেকে দশ বছর পরে হয়ত ঝাঁ চকচকে হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে আপনার 'ওয়াটার ফুয়েলড কার'। ড্যাশ বোর্ডের ইন্ডিকেটর বলছে আপনার গাড়ির জ্বালানি শেষ হয়ে আসছে। ঘুমিয়ে থাকা একের পর এক পেট্রল পাম্পকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে আপনার গাড়ি। গাড়ির স্টিরিওতে বাজছে, “জিন্দেগী এক সফর হ্যায় সুহানা… ইঁয়াহা কাল কেয়া হো কিসনে জানা।”
একসময় আপনি থামিয়েছিলেন গাড়ি। সামনেই আপনার ফুয়েল স্টেশন। মানে, একটি টিউবয়েল। জ্যারিকেন ভর্তি জল এনে ফুয়েল ট্যাঙ্কে ঢেলে দিয়েছিলেন। আবার ছুটতে শুরু করেছিল আপনার গাড়ি। সেদিন কিন্তু, সময়ের আগে 'ওয়াটার ফুয়েলড কার' আবিষ্কার করে ফেলা স্ট্যানলি মায়ারকে ভুলবেন না। কারণ তিনিই প্রমাণ করে গিয়েছিলেন, “ইঁয়াহা কাল কেয়া হো... কিসনে জানা।”