
শেষ আপডেট: 14 May 2020 04:17
শেখ দীন মুহাম্মদ[/caption]
বিয়ের পর দীন মুহাম্মদ লন্ডনের একটি ‘বাষ্প স্নান’ পার্লারে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। এই পার্লারটিতে জল ফুটিয়ে বাস্প তৈরি করে, সেই বাস্পে স্নান করানো হতো গ্রাহকদের। এই পার্লারে দীন মুহাম্মদ চালু করেছিলেন নিজের আবিষ্কৃত বাস্প-স্নানের পদ্ধতি। যার নাম দিয়েছিলেন চাম্পুই (champooi)। হিন্দি ভাষার চাম্পো বা চাম্পু শব্দ থেকে দীন মুহাম্মদ শব্দটি নিয়েছিলেন। চাম্পো বা চাম্পু শব্দ দুটির উৎস হল সংস্কৃত ভাষার 'চপতি' শব্দ। যার অর্থ হলো ম্যাসাজ করা। আজও হিন্দি বলয়ে ম্যাসাজকে চাম্পো বলা হয়।
তাঁর পার্লারে আসা গ্রাহকদের শরীরে ভারতীয় জড়িবুটির নির্যাস মাখিয়ে, কিছুক্ষণ ম্যাসেজ করার পর, বড় বড় পাত্র থেকে উঠে আসা গরম বাস্পে গ্রাহকদের স্নান করাতেন দীন মুহাম্মদ। লন্ডনে খুবই জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল দীন মুহাম্মদের 'চাম্পুই' স্নান। 'চাম্পুই' শব্দটি উচ্চারণ করতে ব্রিটিশদের অসুবিধা হওয়ায়, 'চাম্পুই' নামটি বদলে দিয়ে, এনেছিলেন 'শ্যাম্পু' ( shampoo) নামটি। পদ্ধতির নাম হয়েছিল 'শ্যাম্পুইং'।
[caption id="attachment_220637" align="aligncenter" width="1400"]
চিত্রশিল্পীর আঁকা দুশো বছরের পুরানো ছবিতে দীন মুহাম্মদের পার্লার।[/caption]
দীন মুহাম্মদের বাস্পস্নান পদ্ধতি 'শ্যাম্পুইং' , অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার পর, পার্লারের চাকরি ছেড়ে, ১৮১৪ সালে ব্রাইটনে নিজের প্রথম 'শ্যাম্পুইং' পার্লার খুলেছিলেন দীন মুহাম্মদ। আজ যেখানে বিখ্যাত কুইনস হোটেল, সেখানেই ছিল সেই 'শ্যাম্পুইং' পার্লারটি। বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে 'শ্যাম্পুইং'কে সারা ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রখর ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন দীন মুহাম্মদ। বাস্পস্নানের নাম 'চাম্পুই' থেকে 'শ্যাম্পুইং' হওয়ার পর, পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এনেছিলেন দীন মুহাম্মদ।
প্রথমে ফুটন্ত জল থেকে বেরিয়ে আসা বাষ্প দিয়ে গ্রাহকদের শরীর ভেজানো হত। সাধারণ জলের বদলে দীন মুহাম্মদ ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন সমুদ্রের লবণাক্ত জল। বাস্পস্নানের পরে রোগীদের মাথায় ও সারা দেহে মাখিয়ে দেওয়া হত দীন মুহাম্মদের আবিস্কৃত ভেষজ উপাদান। তারপর আধঘণ্টা ধরে চলত নিখাদ ভারতীয় মালিশ। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি পরিস্কার হয়ে যেত। এরপর পনেরো মিনিট ধরে আবার চলত বাস্পস্নান। তরতাজা হয়ে পার্লার থেকে বেরিয়ে আসতেন দীন মুহাম্মদের পার্লারের গ্রাহকেরা। বড় চুলের জটও আপনা আপনি ছেড়ে যেত 'শ্যাম্পুইং' করার পর।
[caption id="attachment_220640" align="aligncenter" width="600"]
১৮২৬ সালে প্রকাশিত, শ্যাম্পু বাথ নিয়ে লেখা শেখ দীন মুহাম্মদের বই।[/caption]
দীন মুহাম্মদের 'শ্যাম্পুইং'-এর সুনাম ছড়াতে শুরু করেছিল দ্রুত। ব্রিটেনের কাগজগুলিতে 'শ্যাম্পুইং' নিয়ে লেখালিখি শুরু হয়ে গিয়েছিল। নামী কাগজে লেখা হয়েছিল, ভারতীয় চিকিৎসকের মিরাকেল 'শ্যাম্পুইং', বাত, প্যারালাইসিস, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, মচকানো ব্যথা, গেঁটেবাতের মতো রোগ অবিশ্বাস্যভাবে সারিয়ে দিয়েছে। বিতর্কের ঝড় উঠেছিল ইংল্যান্ড জুড়ে। ইংল্যান্ডেরসেরা চিকিৎসকেরা বলেছিলেন 'শ্যাম্পুইং'কে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও অপ্রমাণিত চিকিৎসা পদ্ধতি।
কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবেই ইংল্যান্ডের হাসপাতালগুলি, রোগী রেফার করতে শুরু করেছিল দীন মুহাম্মদের 'শ্যাম্পুইং' পার্লারে। এরপর হঠাৎই একদিন দীন মুহাম্মদের হাতে এসেছিল সেই চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল, "কিং চতুর্থ জর্জ ও চতুর্থ উইলিয়ামের 'শ্যাম্পুইং' চিকিৎসক হিসেবে দীন মুহাম্মদকে নিয়োগ করা হল।"
ইংল্যান্ডের রাজা ব্রিটিশদের কাছে আবহমান কাল ধরেই ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তিনি যখন দীন মুহাম্মদকে নিজস্ব 'শ্যাম্পুইং' চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ করেছেন। তখন দীন মুহাম্মদের 'শ্যাম্পুইং' পদ্ধতির রোগ নিরাময় ক্ষমতা অবশ্যই আছে। এক লহমায় পালটে গিয়েছিল দীন মুহাম্মদের জীবন। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সব সমালোচনা। ইংরেজি ভাষার ডিকশনারিতে উঠে গিয়েছিল, 'শ্যাম্পু' নামটি'। তুঙ্গে উঠেছিল 'শ্যাম্পুইং' পার্লারের ব্যবসা। রাতারাতি দীন মুহাম্মদের নাম হয়ে গিয়েছিল ডঃ ব্রাইটন। ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে টার্কিশ বাথ-এর মতোই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল ভারতীয় ম্যাসাজ বাথ চাম্পুই ওরফে 'শ্যাম্পুইং'।
[caption id="attachment_220641" align="aligncenter" width="601"]
১৭৯৪ সালে, প্রথম ভারতীয় লেখক হিসেবে ইংরেজি ভাষায় বই লিখেছিলেন দীন মুহাম্মদ[/caption]
আরেকটি অসামান্য কীর্তি আছে দীন মুহাম্মদের। ভারত বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবিদ মাইকেল এইচ ফিশারের মতে, দীন মুহাম্মদই প্রথম ভারতীয়, যিনি ইংরাজি ভাষায় বই লিখেছিলেন। দীন মুহাম্মদের ইউরোপ ভ্রমণের ডায়েরি, বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৯৪ সালে। নাম ছিল 'দ্য ট্রাভেলস অফ দীন মহম্মদ'। এছাড়া দীন মুহাম্মদের লিখেছিলেন 'শ্যাম্পুইং' নিয়ে দুটি বই। ১৮২০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল 'Cases Cured' এবং ১৮২৬ সালে প্রকাশ হওয়া 'Shampooing; or, benefits resulting from the use of the Indian medicated vapor bath'।
ইংল্যান্ডের সাসেক্সে, ১৮৫১ সালে, ৯১ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছিলেন দীন মুহাম্মদ। আজও ইউরোপ তাঁকে চেনে শ্যাম্পুর আবিস্কারক হিসেবে। তাই 'শ্যাম্পু' শব্দটি আধুনিক মনে হলেও, তা আদপেই নয়। আজ থেকে প্রায় ২৩৪ বছর আগে ইউরোপকে 'শ্যাম্পু' উপহার দিয়েছিলেন ভারতের দীন মুহাম্মদ।