রূপাঞ্জন গোস্বামী
এই মূহুর্তে ফোর্বস পত্রিকায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সেরা ধনীদের তালিকায় প্রথম স্থানে আছেন জেফ বেজোস, দ্বিতীয় বিল গেটস, তৃতীয় ওয়ারেন বাফেট, চতুর্থ বার্নাড আর্নল্ড পরিবার ও পঞ্চম কার্লোস স্লিম হেলু। কিন্তু এঁরা কেউ নিশ্চিন্ত নন তাঁদের স্থান নিয়ে। যেকোনও মুহুর্তে ভাগ্যের সাপলুডো চালে কেউ নীচে নেমে যাবেন, উঠে আসবেন তালিকায় নীচে থাকা কেউ। কিন্তু গান্থার-ফোরের সে চিন্তা নেই। কারণ তার স্থান ধনীদের বিশেষ এক তালিকায় সব সময় থাকে এক নম্বরে এবং থাকবেও।
কে এই গান্থার-ফোর! কী করে পেল সে এত টাকা! গান্থার-ফোর হল এক জার্মান শেফার্ড কুকুর। আসলে বহু যুগ ধরে পৃথিবী দেখছে ধনকুবেরদের আজব খেয়াল। কেউ আকাশছোঁয়া সম্পত্তি ভোগ করে যান, কেউ সম্পত্তি বিলিয়ে দিয়ে যান দরিদ্রদের মাঝে বা সমাজসেবায়। কেউ কেউ তাঁদের সম্পত্তি পোষ্য পশুপাখির নামেও লিখে দিয়ে যান। সেভাবেই গান্থার-ফোরের কপালে জুটে গিয়েছে কুবেরের ধন।
[caption id="attachment_213614" align="aligncenter" width="660"]

গান্থার-ফোর[/caption]
অবাক লাগছে শুনতে? কিন্তু ঘটনাটি সত্যি। ধনীদের এই অভ্যেস অনেক পুরোনো। টেলর সুইফটের পোষা বিড়াল অলিভিয়া বেনসন, এখন পৃথিবীর ধনীতম বিড়াল। ৬৯৬ কোটি টাকা গচ্ছিত আছে তার নামে। বিশ্বখ্যাত আমেরিকান তারকা ওপরা উইনফ্রের পোষা পাঁচটি কুকুর, ওপরার কাছ থেকে পেয়েছে ২১৫ কোটি টাকা। স্কটিশ মুরগি গিগু, তার মালিক ব্ল্যাকওয়েলের কাছ থেকে পেয়েছে ১০৭ কোটি টাকা।
ইতালির কালো বিড়াল টোম্মাসোকে তার মালিক দিয়েছে ৯৩ কোটি টাকা। বিড়ালটিকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী মারিয়া অসান্তা। ব্ল্যাকি নামে এক বিড়ালের নামে আছে ৮৯ কোটি টাকা। টিঙ্কার নামে এক রাস্তার বিড়ালের ভাগ্যেও জুটেছে ৫৭ কোটি টাকার প্রাসাদ ও ১৬ কোটি টাকা ক্যাশ। কনচিটা নামে এক চিহুয়াহুয়া কুকুরের আছে ২১ কোটি টাকা ক্যাশ ও আমেরিকার মিয়ামিতে ৫৯ কোটি টাকার ম্যানসন। ফ্লসি নামের এক কুকুরকে তার প্রভু ড্রিউ ব্যারিমোর ও টম গ্রিন তাঁদের ১৯ কোটি টাকার প্রাসাদ দিয়ে গিয়েছিলেন আগুনের হাত থেকে তাঁদের বাঁচানোর জন্য।
[caption id="attachment_213617" align="aligncenter" width="491"]

পৃথিবীর ধনীতম বিড়াল অলিভিয়া বেনসন, ৬৯৬ কোটি টাকার মালিক।[/caption]
ভাবছেন, পশুপাখিগুলির নামে কি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে! এত টাকা কীভাবে খরচ করা হয়! পশুপাখিগুলি মারা গেলে টাকার কী হবে! এসব নিয়ে কি ধনকুবেররা চিন্তা করেননি ভাবছেন? এই সব ধনীরা তাঁদের পোষ্য পশুপাখির নামে একটা ট্রাস্ট গড়ে দিয়ে যান। সেই ট্রাস্ট এই তহবিল পরিচালনা করে। গচ্ছিত টাকা খরচা করা হয় এই সব পোষ্যদের পিছনে। তারা মারা গেলে উত্তরাধিকার সূত্রে টাকা পায় তাদের সন্তানসন্ততিরা। সন্তানসন্ততি না থাকলে তহবিলের টাকা লাগানো হয় জনসেবার কাজে। এমনকি ট্রাস্টটি রিয়েল সেই তহবিল থেকে টাকা নিয়ে এস্টেট ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগও করে।
তবে শুধু ধনী পশুপাখিদেরই নয়, মানুষ ধনকুবেরদেরও চমকে দিয়েছে এই জার্মান শেফার্ড কুকুর ‘গান্থার-ফোর’। যার জীবনযাত্রাকে ইর্ষা করেন অনেক ধনী মানুষও। এইমুহূর্তে গান্থার-ফোর ৩০০০ কোটি টাকার মালিক। বিশ্বাস না হলে আপনার হাতেই আছে ইন্টারনেট, আরও বিশদে জেনে নিন।
কীভাবে এত টাকার মালিক হল গান্থার-ফোর!
ঘটনার শুরু ১৯৯২ সালে, জার্মানির কাউন্টেস কার্লোটা লেইবেনস্টাইনের প্রিয় পোষ্য ছিল গান্থার-ফোরের বাবা গান্থার-থ্রি। কুকুরটিকে খুব ভালোবাসতেন কাউন্টেস কার্লোটা। জার্মান শেফার্ড কুকুরটিকে তিনি তাঁর সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মানতেন। একবার জঙ্গলের পথে চলার সময় কাউন্টেস কার্লোটাকে বন্যভাল্লুকের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল গান্থার-থ্রি। সে ঘটনা জীবনে ভোলেননি কাউন্টেস। মৃত্যুর আগে কাউন্টেস একটি অবিশ্বাস্য উইল তৈরি করেছিলেন।
তাঁর ৫৭৩ কোটি টাকার সম্পত্তি দিয়ে গিয়েছিলেন দীর্ঘদিনের সঙ্গী গান্থার-থ্রি নামের কুকুরটিকে। টাকাটা দেখভাল করার ভার দিয়ে গিয়েছিলেন একটি ট্রাস্টের হাতে। গান্থার-থ্রির মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পত্তিটি পেয়েছিল গান্থার-থ্রির পুত্র গান্থার-ফোর। ৫৭৩ কোটি টাকা এখন সুদক্ষ ট্রাস্টি বোর্ডের পরিচালনায় ও সঠিক বিনিয়োগে ফুলেফেঁপে হয়েছে ৩০০০ কোটি টাকা। যার একমাত্র মালিক গান্থার-ফোর নামের কুকুরটি।
[caption id="attachment_213620" align="aligncenter" width="602"]

নিজস্ব সুইমিংপুল ও বডিগার্ডদের সামনে গুন্ঠের-ফোর।[/caption]
গান্থার-ফোরের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও চোখ কপালে তোলার মতো
অনেক ধনী মানুষও যে জীবনযাত্রার কথা ভাবে ভাবতে পারেন না, সেরকমই জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত গান্থার-ফোর। বাহামা, ইতালি ও জার্মানির বিভিন্ন জায়গায় কুকুরটির নামে কেনা আছে বিশাল বিশাল এস্টেট। ৫৩ কোটি ডলার দিয়ে আমেরিকার মিয়ামিতে কেনা হয়েছে বিলাসবহুল প্রাসাদ। যে প্রাসাদ একসময় ছিল বিশ্বখ্যাত গায়িকা ও অভিনেত্রী ম্যাডোনার। নিজের প্রাইভেট জেটে করে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রাসাদে নিয়মিত ঘুরে বেড়ায় গান্থার-ফোর। সঙ্গে থাকে একদল বডি গার্ড। রাস্তায় তার পা পড়ে না, কারণ সে চড়ে দামি লিমুজিনে। মাঝে মাঝে গান্থার-ফোর যায় সমুদ্রভ্রমণে, নিজস্ব বিলাসবহুল ইয়টে চড়ে।
গান্থার-ফোরের প্রাসাদে তার জন্য আছে ম্যাসাজ পার্লার, নিজস্ব জিম ও সুইমিং পুল। আছে মাইনে করা নিজস্ব চিকিৎসক, পাচক, নিরাপত্তারক্ষী ও সুন্দরী সেবিকার দল। তার নিজস্ব ‘মানুষ’ কর্মীরা সর্বদাই তাকে চোখে চোখে রাখেন। মাঝে মাঝে ট্রাস্টিদের সঙ্গে নিলামে যায় গান্থার-ফোর। নিলামে তার হয়ে অংশ নেন ট্রাস্টিরা। ২০০১ সালে ইতালির তুরিনে একটি নিলামে অংশগ্রহণ করে ৩০ লক্ষ লিরা বা ৮ কোটি দিয়ে গান্থার-ফোর কিনেছিল অত্যন্ত দুর্লভ ও দামি মাশরুম 'হোয়াইট ট্রাফল'। গান্থার-ফোরের প্রিয় খাবার মাছের ডিম ‘ক্যাভিয়ার’। যার দাম কিলো প্রতি ২৫ লক্ষ টাকা। রোদে বেরোলেই গগলস লাগে তার। আজ পর্যন্ত তার গলায় চেন পরানোর হিম্মত হয়নি মানুষের।
[caption id="attachment_213621" align="aligncenter" width="627"]

প্রধান পাচক ও সেবিকাদের সঙ্গে গান্থার-ফোর।[/caption]
সমালোচকরা বলেন, কুকুরটিকে এক দেশ থেকে অন্য দেশের প্রাসাদে নিয়মিত ঘোরানো হয়। যা কিনা কুকুরটির মনের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটা স্থায়ী থাকার জায়গা চাই তার। মানুষের বাচ্চাকে নিয়ে এটা করলে বাচ্চাটির মনের যে ক্ষতি হত, কুকুরটির ক্ষেত্রেও একই ক্ষতি হচ্ছে। কুকুরটির জীবনযাত্রা যতই রাজকীয় হোক না কেন। তাঁদের মতে গান্থার-ফোরকে সামনে রেখে টাকার পাহাড় বানিয়ে চলেছে একদল মানুষ। আসলে তারাই ভোগ করছে সম্পত্তির স্বাদ।
এমনিতেই গান্থার-ফোর খুব মুডি। তার ওপর অতিরিক্ত প্রশ্রয়, গান্থার-ফোরের ব্যবহারে নেতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সমালোচকরা। কিন্তু গান্থার-ফোরের ভক্তদের বক্তব্য, পৃথিবীর ধনীতম পশুর ব্যবহার কি সাধারণ কুকুরের মতো হবে? রাজারাজড়াদের ব্যবহার কবে আমআদমির মতো ছিল? এ নিয়ে বিতর্ক চলছেই, তারই মধ্যে আপাতত খাসা আছে গান্থার-ফোর, শখানেক ‘মানুষ’ কর্মীর ওপর প্রভুত্ব কায়েম করে।