
শেষ আপডেট: 9 May 2020 05:54
সে যুগ ছিল দূরদর্শনের।[/caption]
সালমা সুলতান
সংবাদ পাঠিকাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন সম্ভবত সালমা সুলতান। ১৯৬৭ সালে দূরদর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। কাজ করেছিলেন টানা ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। ইন্দিরা গান্ধী প্রয়াত হওয়ার খবর দেশকে প্রথম জানিয়েছিলেন এই সালমা সুলতানই। সেদিন কান্না চেপে তাঁর খবর পড়া, শোকাতুর ভারতবাসীদের হৃদয়ে চিরতরে গেঁথে দিয়েছিল সালমা সুলতানের নাম। সারাদিন না খেয়ে, একটানা জলভরা চোখে ইন্দিরা গান্ধীর প্রয়াণের খবর পড়ে গিয়েছিলেন সালমা সুলতান।
[caption id="attachment_218008" align="aligncenter" width="601"]
সালমা সুলতান[/caption]
দূরদর্শনের পর্দায় সালমা সুলতান এলেই, দর্শকদের চোখ চলে যেত তাঁর মাথার বাম পাশে গোঁজা গোলাপগুচ্ছের দিকে। বিশেষ একটি কায়দায় শাড়ির পাড় রাখতেন ঘাড়ের কাছে। কারণটা জানলে অবাক হবেন। সে যুগে সংবাদ পাঠিকারা, আজকের মতো বিজনেস স্যুট তো দূরের কথা সালোয়ার কামিজও পরতে পারতেন না। শাড়ি পরতে হত বাধ্যতামূলকভাবে। প্রত্যেকটি শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ ছিলনা সালমার। তাই ঘাড়ের কাছে শাড়ির পাড়টি আধা ঘোমটার মতো রেখে, অন্য রঙের ব্লাউজকে ক্যামেরার চোখ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। অবসরের পর সালমা দূরদর্শনের জন্য বানিয়েছিলেন বিভিন্ন সিরিয়াল। সেগুলির মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল পঞ্চতন্ত্র, সুনো মেরি কহানি, জ্বলতে সওয়াল।
[caption id="attachment_218009" align="alignnone" width="734"]
রিনি সাইমন[/caption]
রিনি সাইমন,
অল ইন্ডিয়া রেডিওর 'ন্যাশনাল নিউজ' পড়তেন রিনি সাইমন। দূরদর্শনে খবর পড়তে চলে এসেছিলেন ১৯৮৫ সালে। দূরদর্শনে এসেই দর্শকের হৃদয়ে ঝড় তুলেছিলেন, তাঁর শাণিত ইংরেজি উচ্চারণ এবং সৌন্দর্যের জন্য। দর্শকরা ভাবতেন, রিনির খবর পড়তে আসা উচিত হয়নি। তাঁদের মতে বলিউড ছিল রিনি সাইমনের আদর্শ জায়গা। সিনেমা জগতে গেলে আরও নাম পেতেন রিনি। সপ্রতিভ রিনি ছিলেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, দিল্লিতে বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে ঘোষক হিসেবে তাঁর কণ্ঠ শোনা যেত। বিভিন্ন ডকুমেন্টারি ফিল্ম, বিজ্ঞাপন ও ফিচার ফিল্মে নেপথ্যকণ্ঠ দেওয়ায় তাঁর ছিল কল্পনাতীত দক্ষতা।
[caption id="attachment_218010" align="aligncenter" width="757"]
নিথি রবীন্দ্রন[/caption]
নিথি রবীন্দ্রন
রিনির মতোই আরেক এক জনপ্রিয় সংবাদপাঠিকা ছিলেন নিথি রবীন্দ্রন। তিনি ছিলেন একটু গম্ভীর ধরনের। তখনকার দিনে ‘বয়েজ কাট’ স্টাইলে চুল কাটা নিথি, প্রতিরাতে দূরদর্শনের পর্দায় খবর পড়তে আসতেন তাঁর অভিজাত চেহারা ও অপেক্ষাকৃত ভারী গলা নিয়ে। সংবাদপাঠিকা ছাড়াও নিথি ছিলেন একজন অসামান্য ভয়েস-ওভার আর্টিস্ট। বিভিন্ন ডকুমেন্টারি ও শর্ট ফিল্মের নেপথ্যে ভারতবাসী তাঁর কণ্ঠ শুনতে পেতেন। ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রকের তৈরি 'ফিফটি ইয়ারস অফ ইন্ডিয়াজ ইন্ডিপেন্ডেন্স' নামের বিখ্যাত তথ্যচিত্রটির নেপথ্যে ছিলেন এই নিথি রবীন্দ্রন।
[caption id="attachment_218011" align="aligncenter" width="600"]
গীতাঞ্জলি আয়ার[/caption]
গীতাঞ্জলি আয়ার
তিনি ছিলেন আর এক বিখ্যাত সংবাদপাঠিকা। এয়ারহোস্টেসের মতো পোশাক পরে, পাথরের মূর্তির মতো সোজা হয়ে বসে খবর পড়তেন। মাথাটা সামনের দিকে খুব সামান্য ঝোকানো থাকত। কিন্তু চোখ থাকত ক্যামেরার দিকে। খবর পড়ার সময় মাথা একটুও নড়তো না। চোখের পাতা ফেলতেন খুব কম। মুখে হাসি প্রায় দেখাই যেত না। কিন্তু গলার ওঠানামায় বুঝিয়ে দিতেন খবরের গুরুত্ব।
[caption id="attachment_218013" align="aligncenter" width="470"]
উষা আলবুকার্ক[/caption]
উষা আলবুকার্ক
বিভিন্ন ইংরেজি ম্যাগাজিনে লিখতে লিখতে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেছিলেন উষা আলবুকার্ক। পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিলেন দূরদর্শনের এক অসামান্য সংবাদপাঠিকা। এছাড়াও বিভিন্ন নিউজ ফিচার, টক-শো, কুইজ, এয়ারফোর্সের এয়ার-শোতে ধারাভাষ্য দিয়েছেন উষা আলবুকার্ক। করেছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সংযোজনাও। তাঁর অনবদ্য কন্ঠকে ব্যবহার করেছে পর্তুগিজ ব্যাঙ্ক, এমনকি ব্রাজিলের টিভি চ্যানেলগুলিও।
[caption id="attachment_218014" align="aligncenter" width="738"]
অবিনাশ কাউর সারিন[/caption]
অবিনাশ কাউর সারিন
প্রথমে দূরদর্শনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সূত্রধর ছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি চলে এসেছিলেন প্রধান সংবাদপাঠিকার ভূমিকায়। সে যুগে অবিনাশ কাউর সারিন ছিলেন বিরল ও একমাত্র সংবাদপাঠিকা, যিনি সংবাদের শুরুতে ও শেষে স্মরণীয় একটি হাসি হেসে দর্শকদের অভিবাদন জানাতেন।
[caption id="attachment_218015" align="aligncenter" width="537"]
সরলা মাহেশ্বরী[/caption]
সরলা মাহেশ্বরী
দূরদর্শনের সোনালি যুগের আর একজন বিখ্যাত সংবাদপাঠিকা ছিলেন সরলা মাহেশ্বরী। অসামান্য সৌন্দর্য, কিন্তু অতিসাধারণ অথচ মার্জিত পোশাক। কোনও ধরনের অলঙ্কার ব্যবহার করতেন না। তাঁর থুতনিতে থাকা একটি বড় তিল, টিভির পর্দায় তাঁকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলত। খবর পড়ার সময় তাঁকে সাধারণত ভাবলেশহীন লাগত। কিন্তু তিনি একবার হাসলে বুকের রক্ত চলকে উঠত না, এটা সেই সময়ের কোনও পুরুষ হলফ করে বলতে পারবেন না।
[caption id="attachment_218017" align="aligncenter" width="400"]
মিনু তলোয়ার[/caption]
মিনু তলোয়ার
প্রায় ৩৫ বছর ধরে দূরদর্শনের সংবাদপাঠ ও নানান অনুষ্ঠান সংযোজনার দায়িত্বে ছিলেন মিনু তলোয়ার। কম বয়েসের ছায়াদেবীর মতো দেখতে মিনুকে বাঙালি ঘরের মেয়ে বলে মনে হত। খুব ধীরে সুস্থ্যে খবর পড়তেন মিনু। মুখে একটা আলগা হাসি থাকত।
[caption id="attachment_218018" align="aligncenter" width="454"]
মঞ্জরী যোশী[/caption]
মঞ্জরী যোশী
রসায়নে স্নাতক মঞ্জরী যোশীর ছিল রাশিয়ান ভাষায় উচ্চতর ডিগ্রি। হিন্দি থেকে বহু বই ও পত্রপত্রিকা রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। কাজ করেছেন পেশাদার দোভাষী হিসেবেও। তবুও কিন্তু ভারত তাঁকে চেনে এক অসামান্য সংবাদপাঠিকা হিসেবে।
সংবাদ পাঠের ময়দানে পিছিয়ে ছিলেন না পুরুষরাও
স্বামী নারঙ্গ
৭০-এর দশকে প্রায় এক লাখ আবেদনকারীর মধ্য থেকে সংবাদপাঠক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল স্বামী নারাঙ্গকে। উচ্চমানের উচ্চারণ ও ভরাট কণ্ঠের অধিকারী স্বামী নারঙ্গ, ৭০ ও ৮০-এর দশকে হয়ে উঠেছিলেন ‘দূরদর্শনের মুখ’। ভারতবর্ষের বিভিন্ন মেট্রো রেলের হিন্দি ঘোষণাগুলির নেপথ্যে আছে, এই স্বামী নারাঙ্গের কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর।
[caption id="attachment_218021" align="aligncenter" width="480"]
স্বামী নারাঙ্গ[/caption]
রামু দামুদরন
দূরদর্শনের পর্দায় সংবাদ পাঠের আগে রামু দামুদরন স্ক্রিপ্টে চোখই বোলাতেন না। সরাসরি নিঁখুতভাবে পড়তে শুরু করতেন না দেখা স্ক্রিপ্ট। সংবাদ পাঠে তিনি এতটাই দক্ষ ছিলেন। পরবর্তীকালে সংবাদপাঠকের কাজ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের প্রাইভেট সেক্রেটারি হয়েছিলেন রামু দামুদরন। ভারতীয় কূটনীতিক হয়ে মস্কো ও আমেরিকাতে দীর্ঘদিন কাজও করেছেন।
[caption id="attachment_218022" align="aligncenter" width="739"]
রামু দামুদরন[/caption]
তেজেশ্বর সিং
আশি ও নব্বইয়ের দশকের আর এক বিখ্যাত পুরুষ সংবাদপাঠক ছিলেন তেজেশ্বর সিং। বলিষ্ঠ গঠন, চাপদাড়ি ও জলদগম্ভীর কন্ঠস্বরের জন্য বিখ্যাত ছিলেন রাশভারী ব্যক্তিত্বের অধিকারী তেজেশ্বর। ইংরেজিতে খবর পড়তেন রিনি সাইমনের সঙ্গে, বেশিরভাগ সময়।
[caption id="attachment_218023" align="aligncenter" width="281"]
তেজেশ্বর সিং[/caption]
সুনীত ট্যান্ডন
ছিপছিপে চেহারা, কিন্তু চোস্ত ইংরেজি উচ্চারণ ও ভরাট গলার সুনীত ট্যান্ডন, সংবাদপাঠক হিসেবে দূরদর্শনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন ২০০৭ পর্যন্ত। সারা ভারত একডাকে চিনত তাঁকে। যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন এই সংবাদপাঠক।
[caption id="attachment_218024" align="aligncenter" width="733"]
সুনীত ট্যান্ডন[/caption]
বেদ প্রকাশ
দূরদর্শনের আর একজন সুপরিচিত সংবাদপাঠক। প্রয়োজনে সারাদিন ধরে, প্রত্যেক ঘন্টায় খবর পড়ে যেতে পারতেন। অত্যন্ত মার্জিত এই সংবাদপাঠক, খবরকে দর্শকের একেবারে চোখের সামনে তুলে ধরতেন তাঁর গলার জাদুতে। পরবর্তীকালে 'স্টুডেন্ট টুডে' ম্যাগাজিনের চিফ এডিটর হয়েছিলেন। খবর পড়ার সাথে, বিখ্যাত খবরের কাগজ ও ম্যাগাজিনগুলিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন।
[caption id="attachment_218026" align="aligncenter" width="538"]
বেদ প্রকাশ[/caption]
বিনোদ দুয়া
১৯৭৪ সাল থেকে দূরদর্শনে সঙ্গে যুক্ত ছিলে। একটি মাত্র চ্যানেলের দূরদর্শন যুগ থেকে, আজকের স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগ, আজও দাপটের সঙ্গে রয়ে গেছেন বিনোদ দুয়া, সেই সময়ের সঙ্গী প্রণয় রায়ের সঙ্গে। ভারতের বিভিন্ন নির্বাচনের আগে ও ফল ঘোষণার দিন, দূরদর্শনের পর্দায় হৃদকম্প ধরানো উত্তাপ নিয়ে আসার মূল কারিগর ছিলেন এই দু‘জন মানুষ। যা আজকে বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলগুলি চোখ বুজে অনুসরণ করে চলেছে মাত্র। ভোটের পরে প্রণয় রায় ও বিনোদ দুয়া জুটির বিশ্লেষণ শোনার জন্য সেই সময় মুখিয়ে থাকত দেশ।
[caption id="attachment_218028" align="aligncenter" width="602"]
প্রণয় রায় এবং বিনোদ দুয়া[/caption]
জানি লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়নি আরও অনেক বিখ্যাত নাম। কিন্তু লেখায় না থাকলেও হৃদয় থেকে বাদ পড়েননি তাঁরা। আজও মনের আকাশে চাঁদোয়া হয়ে রয়েছেন সাদাকালো টেলিভিশন যুগের সেইসব নক্ষত্রেরা। এক আকাশ নক্ষত্র থেকে মাত্র কয়েকটি নক্ষত্রকে এই নিবন্ধে তুলে আনা হয়েছিল, নবীন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করানোর উদ্দেশ্য নিয়ে।