
শেষ আপডেট: 10 September 2021 12:10
ভানগড় দুর্গ[/caption]
আরাবল্লী পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ১৫৮ হেক্টর জায়গা জুড়ে থাকা ভানগড় দুর্গে পাঁচটি ফটক দিয়ে প্রবেশ করা যায়। প্রধান ফটকটির নাম স্থানীয়রা দিয়েছেন ভুত বাংলো। বাকি চারটি ফটকের নাম, লাহোরি গেট, আজমেরি গেট, ফুলবাড়ি গেট ও দিল্লি গেট। ২৩৭ বছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে থাকা দুর্গটি, একসময় প্রায় ছোট খাটো একটি শহর ছিল। দুর্গের ভেতরে আছে প্রচুর প্যালেস, হাভেলি, মন্দির ও দোকানবাজারের ধ্বংসাবশেষ। মন্দিরগুলির মধ্যে সবচেয়ে দর্শনীয় মন্দিরগুলি হল হনুমান মন্দির, সোমেশ্বর মন্দির, কেশব রাই মন্দির, মঙ্গলা দেবী মন্দির,গণেশ মন্দির ও নবীন মন্দির। তবে বেশিরভাগ মন্দিরে কোনও বিগ্রহ নেই। রাজপ্রাসাদটি অবস্থিত দূর্গের একেবারে প্রান্তে।
অন্ধকার গাঢ় হলে ভানগড় দুর্গ নাকি হয়ে ওঠে রাতের বিভীষিকা
স্থানীয় লোকেরা বলেন, দুর্গের ভেতর থেকে ভেসে আসে হাড় হিম করা বিভিন্ন আওয়াজ। কখনও গোঙানির আওয়াজ, কখনও কোনও নারীর আর্ত চিৎকার, কখনও নূপুরের ছম ছম শব্দ, কখনও অস্ত্রের ঝনঝনানি। নাকে ভেসে আসে পোড়াবারুদের গন্ধ। দুর্গের এখানে সেখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় অজস্র মৃতদেহ। ধ্বংস হওয়া দুর্গের বাজারে প্রাণ ফিরে আসে। যিনি রাতে একবার ভানগড় দুর্গে ঢোকেন তিনি নাকি আর ফিরে আসেন না।
এনডিটিভি'র বিখ্যাত শো 'ইন্ডিয়াজ মোস্ট হন্টেড' পরিচালনা করেন রকি সিং ও ময়ূর শর্মা। ভারতের ও পৃথিবীর নানা জায়গার হানাবাড়িতে রাত কাটাবার অভিজ্ঞতা আছে তাঁদের। সাধারণত তাঁরা কোনও হানাবাড়িতে গিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে রাত কাটান। নাইট-ভিশন ক্যামেরায় ধরে রাখেন নানান অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার ছবি। একমাত্র ভানগড় দুর্গেই দু'জনে আলাদাভাবে রাত কাটাতে পারেননি। দুর্গের ভেতরে তাঁরা শুনেছিলেন পায়ের আওয়াজ। নারী কন্ঠের আর্ত চিৎকার। তাঁদের নাইট ভিশন ক্যামেরার মোশন সেনসর কাজ করা হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাঁদের দিকে ছুটে আসছিল টুকরো পাথর।
[caption id="attachment_229450" align="aligncenter" width="600"]
চাঁদনি রাতে ভানগড় দুর্গ।[/caption]
গৌরব তেওয়ারি ছিলেন ভারতের বিখ্যাত প্যারানরম্যাল রিসার্চার। দিল্লিতে থাকতেন। তিনি তাঁর টিম নিয়ে রাত কাটিয়েছিলেন ভানগড় দুর্গে এবং সেখানে প্রেতাত্মার অস্ত্বিত্ব নাকচ করছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর ঠিক পাঁচ বছর পর, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই নিজের ফ্ল্যাটে গৌরবকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। ফরেনসিক রিপোর্ট বলেছিল আত্মহত্যা করেছিলেন গৌরব। তাঁর পরিবারের লোকেরা বলেছিলেন, মৃত্যুর একমাস আগে গৌরব তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, অশুভ শক্তি তাঁকে টানছে। গৌরব চেষ্টা করেও বেরিয়ে আসতে পারছেন না।
কিছুদিন আগে একজন পর্যটক, ভানগড় দুর্গে লাফাতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে গাড়ি ছুটেছিল হাসপাতালের পথে। কিছুদূর গিয়ে গাড়িটি পড়েছিল দুর্ঘটনায়। দু'জন আরোহী মারা গিয়েছিলেন দুর্ঘটনায়। যুক্তিবাদীরা মনে করেন পুরোটাই গালগল্প ও কাকতালীয়। কিন্তু যাঁরা বিভিন্ন অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃতিক কাণ্ডকারখানা বিশ্বাস করেন, তাঁরা দেখান দুর্গের বাইরে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার লটকে দেওয়া একটি নোটিস। যেটির শুরুতেই লেখা আছে একটি লাইন, "সূর্য্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের পরে ভানগড় দুর্গে প্রবেশ নিষেধ"।
[caption id="attachment_229451" align="aligncenter" width="600"]
আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সেই নোটিস।[/caption]
এই সরকারি নোটিসটিই চুম্বকের মতো ভানগড় দুর্গে টেনে আনে হাজার হাজার রোমাঞ্চপ্রেমী পর্যটককে। প্রত্যেক বছর কয়েকজন পর্যটক মারা যান দূর্গের ভেতরে, এটা জেনেও ছুটে আসেন তাঁরা। পর্যটকেরা জানতে চান কেন ভানগড় দুর্গ ২৩৭ বছর ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে। কার অভিশাপ জড়িয়ে আছে দুর্গের গায়ে। কেন ভানগড় দুর্গ আজ প্রেতাত্মাদের শহর। ভানগড় দুর্গের বিষণ্ণ বাতাস পর্যটকদের শোনায় দুটি কাহিনি।
বাবা বালুনাথের অভিশাপ
আরাবল্লী পর্বতের পাহাড়ি ঢালে শুয়ে থাকা অসংখ্য ঝরনা আর মায়াবী সবুজে ঘেরা জায়গাটা পছন্দ হয়ে গিয়েছিল রাজা ভগবন্ত দাসের। আকবরের সেনাপতি অম্বরের রাজা মান সিং-এর ভাই রাজা মাধো সিং-এর পুত্র ভগবন্ত দাস। তিনি তাঁর পুত্র আজব সিং-এর জন্য একটি দুর্গ নির্মাণের কথা ভেবেছিলেন ১৫৭৩ সালে। মন্ত্রী রাজাকে জানিয়েছিলেন, এলাকাটিতে বাবা বালুনাথ নামে এক সাধু বাস করেন। রাজা ভগবন্ত দাসের উচিত সাধুবাবার আশীর্বাদ নিয়ে দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করা। মন্ত্রীর কথা মেনে বাবা বালুনাথের সঙ্গে দেখা করেছিলেন ভগবন্ত দাস। রাজার অভিপ্রায় শুনে বাধা দেননি সাধুবাবা। কিন্তু একটি শর্ত রেখেছিলেন। দুর্গটির জন্য তাঁর কুটিরে সূর্যের আলো আসতে বাধা যেন না পায়। তাঁর শর্ত ভাঙ্গা হলে, তাঁর অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাবে দুর্গ ও দুর্গের বাসিন্দারা।
[caption id="attachment_229455" align="alignnone" width="600"]
২৩৭ বছর ধরে মানুষ বাস করে না এখানে।[/caption]
রাজা ভগবন্ত দাস, সাধু বালুনাথের শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। শুরু হয়েছিল দুর্গ তৈরি। দুর্গের নাম রাখা হয়েছিল ভানগড় দুর্গ। কারণ রাজা ভগবন্ত দাসকে রাজস্থানের মানুষরা চিনতেন রাজা ভান সিং নামে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করেছিল সুবিশাল ভানগড় দুর্গ। কিন্তু দুর্গের কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন রাজা ভগবন্ত দাস। দুর্গ নির্মাণের ভার নিয়েছিলেন ভগবন্ত দাসের পুত্র আজব সিং।দুর্বিনীত আজব সিংয়ের ব্যবহারের জন্য কেউ তাঁকে পছন্দ করতেন না।
বাবা বালুনাথকে তাঁর পিতার দেওয়া কথার মান রাখেননি আজব সিং। দুর্গের একটি গম্বুজ এমন ভাবে বানিয়েছিলেন, সাধুবাবার কুটিরে সূর্যের আলো আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সাধুবাবা অভিশাপ দিয়েছিলেন, "ধ্বংস হয়ে যাবে অহঙ্কারীর দুর্গ।" বাবা বালুনাথের শাপে ধ্বংস হয়েছিল ভানগড় দুর্গ। মারা গিয়েছিলেন দুর্গের সব অধিবাসী। প্রয়াণের পর বাবা বালুনাথকেও নাকি ওই দুর্গের পাশে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। রাতের অন্ধকারে আজও নাকি তাঁকে দেখা যায় দুর্গের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে।
সিঙ্ঘিয়া তান্ত্রিকের অভিশাপ
রাজা ভগবন্ত দাসের কন্যা ছিলেন রত্নাবতী। রাজকন্যা রত্নাবতীকে তাঁর ব্যবহারের জন্য সবাই ভালোবাসতেন। সারা রাজস্থানে সেই সময় রত্নাবতীর মতো রূপসী আর কেউ ছিলেন না। সিঙ্ঘিয়া নামে একজন তান্ত্রিক বাস করতেন ভানগড় দুর্গের কাছে। রাজকন্যা রত্নাবতীকে রোজ তান্ত্রিক দেখতেন সখীদের নিয়ে জঙ্গলের পথে ঘোড়া ছোটাতে। রূপসী রত্নাবতীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন সিঙ্ঘিয়া। কিন্তু তান্ত্রিক জানতেন রাজকন্যা তাঁর প্রস্তাব মেনে নেবেন না। বশীকরণের কৌশল জানতেন তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়া। তাই সিঙ্ঘিয়া বেছে নিয়েছিলেন সেই পথ।
রাজকন্যা রত্নাবতী একদিন এক আতর বিক্রেতার কাছ থেকে আতর কিনছিলেন। হাতসাফাইয়ে ওস্তাদ তান্ত্রিক আতরের শিশি বদলে দিয়ে সেই জায়গায় মন্ত্রপড়া সুগন্ধী জল রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু তান্ত্রিকের হাতসাফাই রত্নাবতীর নজর এড়ায়নি। রেগে তান্ত্রিকের শিশিটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন একটি বড় পাথরের গায়ে। বিস্ময়করভাবে পাথরটি গড়াতে শুরু করেছিল তান্ত্রিকের দিকে। পাথরের তলায় পিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছিলেন তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়া।
মৃত্যুর আগে তিনি অভিশাপ দিয়েছিলেন, রাজকন্যা রত্নাবতী সহ ধ্বংস হয়ে যাবে ভানগড় দুর্গ। পরের বছরেই মুঘল সেনা ভানগড় দুর্গ আক্রমণ করেছিল। মুঘল সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন রত্নাবতী ও দুর্গ শহর ভানগড়ের সকল অধিবাসী। স্থানীয়রা বলেন সেইদিন থেকে দুর্গের মধ্যে বন্দি আছে রানী রত্নাবতী, সকল অধিবাসী ও তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়ার আত্মা। আজও তাই রাতে পাথর গড়ায়। জ্বলে ওঠে যজ্ঞের আগুন।
কাহিনি দুটি ইতিহাস ছোঁয়া হলেও ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত হয়নি
কাহিনি দুটির অলৌকিক ঘটনাগুলি অবাস্তব হওয়া স্বাভাবিক। তাহলে কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল ভানগড় দুর্গ! ইতিহাস বলে, ১৭২০ সালে জয়পুর রাজ দ্বিতীয় জয় সিং আক্রমণ করেছিলেন ভানগড় দুর্গ এবং একবার নয় একাধিক বার। প্রচুর মানুষ মারা গিয়েছিলেন। আবার অনেকে বলেন ১৭৮৩ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষেই প্রাণ হারিয়েছিলেন দুর্গের সকল অধিবাসী। নয়ত পালিয়ে গিয়েছিলেন দুর্গ ছেড়ে।
ভানগড় দুর্গে প্রেতাত্মার উপস্থিতির কথা গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, জয়পুর সার্কেলের পুরাতত্ত্ব বিভাগের সুপারিন্টেন্ডেন্ট কুমার স্বর্ণকার। তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীর প্রত্যেকটি পরিত্যক্ত দুর্গ ও প্যালেসে রাতে গেলে মানুষের একইরকম অনুভুতি হতে পারে। প্রহরীরা প্রত্যেক রাতে দুর্গ পাহারা দেন, কোনও অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা তাঁদের চোখে কখনও পড়েনি। তবে রাতের ভানগড় দুর্গ বিপজ্জনক।
কুমার স্বর্ণকার জানিয়েছিলেন,ভানগড় দুর্গটি সারিস্কা টাইগার রিজার্ভের প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় বন্য জন্তুর ভয় আছে। রাতে দুর্গে হানা দিতে পারে শেয়াল, হায়না, প্যান্থার এমনকি বাঘও। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, দুর্গে কিছু মৃত্যু ঘটেছে। তবে সে সব মৃত্যু ঘটেছে রাতে ও দিনের বেলায় দুর্গের ভাঙাচোরা অংশে প্রবেশ করার জন্য। সম্ভবত আলগা বোল্ডার গড়িয়ে পড়ে বা ওপর থেকে পা পিছলে।
[caption id="attachment_229462" align="aligncenter" width="600"]
বিপজ্জনক ধ্বংসাবশেষে দিনের বেলাও ঘটতে পারে বিপদ।[/caption]
কুমার স্বর্ণকারের কথা শতকরা একশো ভাগ সত্যি। তবুও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন। ১৭৮৩ সাল থেকে দুর্গটি পরিত্যক্ত, দুর্গ থেকে কয়েক মাইল দূরে থাকা গ্রামটি আগে দুর্গের কাছেই ছিল, কেন গ্রামবাসীরা আস্ত গ্রামটিকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন? গ্রামটির বাড়িগুলিতে ঢালাই ছাদ দেওয়ার চেষ্টা করলে ছাদ ভেঙে পড়ে কেন? রাজস্থান ট্যুরিজমের সরকারি ওয়েবসাইটে কেন লেখা আছে, "ভারতের সবচেয়ে ভুতুড়ে স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম বলে গণ্য করা হয় অভিশপ্ত ভানগড় দুর্গকে।" [https://www.tourism.rajasthan.gov.in/bhangarh-fort.html]
ভুতে অবিশ্বাসী ও যুক্তিবাদীরা বলেন, সবটাই ব্যবসায়িক কৌশল! ভুতবিশ্বাসীরা প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কেন স্থানীয় মানুষেরা গলা নামিয়ে বলেন, "ভানগড় মে হার সাল কুছ লোগ মরতে হ্যায়। উনকে ভুত তো ইয়েহি পর রুকেঙ্গে না।ইসলিয়ে তো ভানগড় উয়ো জাগা হ্যায়, যাহাঁ সে লোগ ভাগ যাতে"।