
শেষ আপডেট: 18 April 2020 02:38
ছুটে এসেছিলেন গ্রামবাসীরা। শিলাখণ্ডটির চারপাশের মাটি সরিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন কয়েকশো গ্রামবাসী। পাতালঘুম থেকে উঠে এসেছিলেন ফুট পাঁচেক উচ্চতার এক দেবীমূর্তি। পাথর কুঁদে তৈরি করা দেবী পদ্মাসনে বসে আছেন। চারটি হাত, মুখে স্মিত হাসি। দুদিকে দুই রক্ষী, দেবীর পায়ের নীচে পড়ে আছে এক দৈত্য। এই ধরনের বিগ্রহ চেরিয়ান গ্রামবাসীরা আগে কখনও দেখেননি। চিনের অন্য কোনও মন্দিরের বিগ্রহের সঙ্গে দেবীর বিগ্রহটির কোনও মিল ছিল না। গ্রামের বয়স্করা বলেছিলেন গ্রামকে রক্ষা করতেই নতুন এই দেবী পাতাল থেকে উঠে এসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে ঝরনার জল নিয়ে এসে বিগ্রহটি ধোয়ার কাজ শুরু হয়েছিল।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে গিয়েছিলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। তাঁরা বলেছিলেন, বিগ্রহটি এক হিন্দুদেবীর। কিন্তু তাঁরা সেই হিন্দু দেবীর নাম জানতেন না। তাই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বলেছিলেন, সেই হিন্দুদেবীকে গ্রামে নিয়ে গিয়ে ভগবান বুদ্ধ বা বোধিসত্ত্বর মহিলা রূপ গুয়ানাইন হিসেবে পুজো করতে। মহাসমারোহে বিগ্রহটিকে গ্রামে নিয়ে এসেছিলেন গ্রামবাসীরা। ভূমিকম্প বিদ্ধস্ত চেরিয়ান গ্রামটিতে তখন তৈরি হচ্ছিল গ্রামবাসীদের নতুন বাড়িঘর। সেগুলির সঙ্গে চেরিয়ান গ্রামে মাথা তুলেছিল পাথর দিয়ে তৈরি করা সুদৃশ্য একটি মন্দির। নিজেদের শ্রম ও অর্থ দিয়ে মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন গ্রামবাসীরা। সেই মন্দিরে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্থাপন করা হয়েছিল হিন্দু দেবীর বিগ্রহটিকে।
[caption id="attachment_210062" align="aligncenter" width="650"]
এই সেই দেবী, যাঁকে গ্রামবাসীরা গুয়ানাইন রুপে পুজো করেন।[/caption]
সেই থেকে ধর্মভীরু বৌদ্ধ গ্রামটিতে পুজো পেয়ে আসছেন সেই হিন্দু দেবী। শত শত বছর ধরে বরাভয় দিয়ে চলেছেন গ্রামটিকে। গ্রামবাসীরা বলেন গ্রামে দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর গ্রামে আর কোনওদিন ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দূর্যোগ হয়নি। গ্রামবাসীরা ভীষণ শ্রদ্ধা করেন এই দেবীকে। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা পূজা করেন। চিনের অন্যান্য দেবতার আরাধনার চেয়ে এই দেবতার আরাধনা পদ্বতি একেবারে আলাদা। এই মন্দিরে হাত-ঘণ্টা বাজানো হয়। ধূপ, ফল, ফুলের অর্ঘ্য দেওয়া হয়। চিনা ভাষায় মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়, কিন্তু মন্ত্রগুলি বৌদ্ধধর্মের মন্ত্রগুলির চেয়ে একেবারে আলাদা।
চেরিয়ান গ্রামের বাসিন্দা লি সাং লং সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন,“এটা সম্ভবত চিনের একমাত্র মন্দির, যেখানে হিন্দু দেবতার পূজা করা হয়। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন এই হিন্দুদেবীই তাঁদের সৌভাগ্যের উৎস। সেই বিশ্বাস এত শতাব্দী পরেও অটুট আছে।” ছোটবেলা থেকে এই দেবীকে নিয়ে অনেক গল্প শুনেছেন লি সাং লং। বাড়ির বয়স্কদের কাছ থেকে। একবার গ্রামে ভয়ানক খরা দেখা দিয়েছিল, গ্রামের মানুষ পড়েছিলেন শোচনীয় অবস্থায়। গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়েছিলেন অনেক গ্রামবাসী। কিন্তু গ্রামের রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন দেবী। তিনি হাত তুলে পলায়নরত গ্রামবাসীদের গ্রামে ফিরে যেতে বলেছিলেন। দেবীর রুদ্রমূর্তি দেখে ভয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিলেন গ্রামবাসীরা। সেই রাতেই আকাশ থেকে অঝোর ধারায় নেমে এসেছিল বৃষ্টি। চেরিয়ান গ্রামে এসে গিয়েছিল বহুকাঙ্খিত বর্ষা।
[caption id="attachment_210065" align="aligncenter" width="630"]
মন্দিরের সামনে লি সাং লং।[/caption]
চেরিয়ান গ্রামের দেবী 'গুয়ানাইন' যে কোনও প্রাচীন এক হিন্দুদেবীর পরিবর্তিত রূপ, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ গুয়াংঝাউ মেরিটাইম মিউজিয়ামের সহকারী কিউরেটর ওয়াং লিমিং। তিনি বলেছিলেন, এই সুপ্রাচীন মন্দিরটি ছাড়াও অতীতে গুয়াংঝাউ সংলগ্ন অঞ্চলে অনেক হিন্দু মন্দির ছিল। তবে এটা বলা কঠিন যে সে যুগে এই অঞ্চলে ঠিক কতগুলি মন্দির ছিল। কারণ প্রায় সবগুলিই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, বা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চিনের গবেষকেরা এখনও দেবীর পরিচয় সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনও ধারণায় আসতে পারেননি। তবে গবেষকেরা একটি ব্যাপারে নিঃসন্দেহ। চেরিয়ানের মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর সঙ্গে চিনের কোনও সম্পর্কই নেই। সম্পর্ক আছে হাজার হাজার কিমি দূরে থাকা দেশ ভারতবর্ষের। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে দক্ষিণ ভারতের। কোনও কোনও গবেষকের মতে, মূর্তিটি দক্ষিণ ভারতের দেবী মারিয়াম্মানের (দূর্গা) হতে পারে।
চিনের গবেষকদের মতে এই বিগ্রহটি তৈরি করার জন্য প্রকাণ্ড পাথরের খণ্ডটি আনা হয়েছিল দক্ষিণ ভারত থেকে। পাথরের খণ্ডটি প্রথমে বন্দরনগরী গুয়াংঝাউতে আনা হয়েছিল। কারণ কয়েক শতাব্দী আগে গুয়াংঝাউ ছিলো চিনের নৌ বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল। এই বন্দরে প্রায় আটশো বছর আগে ব্যবসা করতেন কিছু তামিল ব্যবসায়ী। তাঁদের অনেকে বাস করতেন এই চেরিয়ান গ্রামে। তাঁরাই তাঁদের আরাধনার জন্য স্থানীয় ভাস্করকে দিয়ে এই বিগ্রহটি বানিয়ে নিয়েছিলেন। তারপর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মন্দিরে। যে মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষ মাটির তলা থেকে উঠে এসেছিল ভূমিকম্পের পর।
[caption id="attachment_210066" align="aligncenter" width="660"]
মন্দিরের গায়ে খোদাই করা আছে দেবতাদের মূর্তি।[/caption]
চিনের ঐতিহাসিকরাও মনে করেন, চেরিয়ান মন্দিরটি হলো প্রাচীন চিনের ডজন খানেক হিন্দু মন্দির নিয়ে গঠিত একটি মালার অংশ! এই মালার মধ্যে ছিল গুয়াংঝাউ সংলগ্ন দুটি অতিকায় হিন্দু মন্দির! যে মন্দিরগুলি বানিয়েছিলেন, চিনে ব্যবসা করতে এসে চিনের বাসিন্দা হয়ে যাওয়া তামিল ধনপতি সওদাগরেরা। চিনের প্রায় সমস্ত হিন্দু মন্দির বানানো হয়েছিল সং ও ইউয়ান সাম্রাজ্যে। যার প্রায় সব কটিই হারিয়ে গিয়েছে কালের নিয়মে বা বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপ্তির কারণে।
কিন্তু চিনে হিন্দুধর্মের শেষ চিহ্নটুকু হারাতে দেননি চেরিয়ান গ্রামের বাসিন্দারা। অবিশ্বাস্য ভাবে এবং কিছুটা নিজেদের অজান্তেই চিনদেশে হিন্দুধর্মের নিভু নিভু বাতিটি এখনও প্রজ্বলিত রেখেছেন তাঁরা। বিগ্রহটি কে বানিয়েছিলেন, কে নিয়ে এসেছিলেন, কোন ধর্মের বিগ্রহ, এ নিয়ে কোনও মাথা ব্যথা নেই গ্রামবাসীদের। আজও তাঁরা বুকে আগলে রাখেন বিগ্রহরূপী হিন্দু দেবীকে। কারণ গ্রামবাসীরা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনে আসছেন, এই দেবীর কল্যাণেই মাঠে ফসল ফলে। ঘরে আসে সন্তান। সংসারে আসে সুখ, গ্রামে আসে সমৃদ্ধি। তাই সুদূর চিনের চেরিয়ান গ্রামে ভরা সংসার নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী কাটিয়ে দিচ্ছেন এক হিন্দুদেবী।