Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

ছবির মতো দেশ, আর তার রক্তাক্ত ইতিহাস— ভুলে যাননি তো?

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: এদেশের মানচিত্রের নীচে শ্রীলঙ্কা বা সিংহল নামের দ্বীপরাষ্ট্রকে দেখে মনে হয় ভারত মহাসাগরের বুকে ভাসমান একটুকরো সবুজ অশ্রু। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন—'ওই সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ কাঞ্চনময় দেশ/ ওই চন্দন যার অঙ

ছবির মতো দেশ, আর তার রক্তাক্ত ইতিহাস— ভুলে যাননি তো?

শেষ আপডেট: 17 July 2022 17:23

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: এদেশের মানচিত্রের নীচে শ্রীলঙ্কা বা সিংহল নামের দ্বীপরাষ্ট্রকে দেখে মনে হয় ভারত মহাসাগরের বুকে ভাসমান একটুকরো সবুজ অশ্রু। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন—
'ওই সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ কাঞ্চনময় দেশ/ ওই চন্দন যার অঙ্গের বাস তাম্বুল বন কেশ।'

যে দেশে কোনও কোনও জায়গায় ২০/৩০ মিটার মাটি খুঁড়লেই নানা মহার্ঘ মণি পাওয়া যায় সেই কাঞ্চনময় দেশ আজ ঘোরতর ঋণগ্রস্ত, অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া। কাগজের অভাবে ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষা দিতে পারছে না। লেখাপড়াও বন্ধ। পেট্রল ও জ্বালানি গ্যাসের জন্য ফুয়েল-স্টেশনগুলিতে আধ কিলোমিটার লম্বা লাইন পড়েছে। তেলের দাম আকাশচুম্বী। সারাদেশে প্রবল খাদ্যসঙ্কট। যুদ্ধের জন্য ইউক্রেন, রাশিয়ায় চা রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। কোভিডের জন্য পর্যটন শিল্প গত দুবছরে মুখ থুবড়ে পড়েছে। সর্বোপরি চিনের কাছে পর্বতপ্রমাণ দেনা। গণবিদ্রোহের আতঙ্কে দেশের শাসকেরা আকাশ বা জলপথে দেশ ছেড়ে গোপনে পাড়ি দিচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। রাষ্ট্রপতি-ভবনে ঢুকে পড়ে দিশাহীন উন্মাদের মতো ভাঙচুর করছে বিক্ষুব্ধ জনতা। আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে। (Srilanka)

অতীতেও এই দেশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে এবং গৃহযুদ্ধে বারবার রক্তাক্ত হয়েছে।তবে দেশের সার্বিক অবস্থা কখনও এমন সর্বহারার মতো ছিল না। বরং বরাবরই এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র ছিল ধনসম্পদে সমৃদ্ধ।

কালো সমুদ্রের বুকে সবুজ পান্নার মতো - সে দেশ

বহুবার নাম পরিবর্তনের পর শ্রীলঙ্কার বর্তমান নামটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সুপ্রাচীন মহাকাব্যে এর নাম ছিল লঙ্কাপুরী। প্রাচীন গ্রিক ভূবিশারদেরা এর নাম দিয়েছিল তপ্রোবান। আরবরা একে সেরেনদীব নামে ডাকত। ১৫০৫ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজরা এই দ্বীপে পা দিয়ে এর নাম রাখে শেইলাও, যার ইংরেজি শব্দ হল সিলন। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশশাসনাধীন শ্রীলঙ্কা সিলন নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৪৮ সালে এই নামেই স্বাধীনতা পায় দেশটি। ১৯৭২ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়,‌‍‌‍‌‌ 'মুক্ত সার্বভৌম ও স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী শ্রীলঙ্কা।' সংস্কৃত শব্দ শ্রী অর্থ পবিত্র এবং সুন্দর। আর লঙ্কা শব্দের অর্থ দ্বীপ। তাই শ্রীলঙ্কার অর্থ সুন্দর বা পবিত্র দ্বীপ।

রাজধানী, পাশে সমুদ্র

শ্রীলঙ্কার ইতিহাস প্রায় ৩০০০ বছরের পুরনো। সেখানে প্রাগৈতিহাসিক মানুষদের বসবাসের প্রমাণ রয়েছে যা অন্তত ১২৫০০০ বছর আগেকার। গৌতম বুদ্ধের মহাপ্রয়াণের পর ভারতীয় শাক্যজাতির বিজয়বাহু তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে প্রথম এই দ্বীপে আসেন। তারপর তিনি শ্রীলঙ্কায় পাকাপাকিভাবে রাজ্য স্থাপন করেন। কথিত আছে স্বয়ং ভগবান বুদ্ধ শ্রীলঙ্কায় এসেছিলেন।

সুপ্রাচীনকাল থেকেই শ্রীলঙ্কা একটি উল্লেখযোগ্য সমুদ্র-সৈকত এবং বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে দেশ-বিদেশের বণিকদের কাছে পরিচিত ছিল। মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের বণিকেরা এখানে বাণিজ্য করতে আসত। চণ্ডীমঙ্গলকাব্যের বণিকখণ্ডে ধনপতি ও শ্রীমন্ত সদাগরের উপাখ্যান মূলত এই সিংহল দ্বীপকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। চিতোরের রানি পদ্মাবতী বা পদ্মিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কাব্যের মূলেও রয়েছে সিংহলের রাজকন্যা। যদিও সৈয়দ আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যের অথবা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মিনী উপাখ্যানের বিশ্বাসযোগ্য কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে বলে অনেকেই স্বীকার করেন না।

১৫০৫ সালে পর্তুগীজরা সর্বপ্রথম এই দ্বীপে পা রাখে। তারপর ১৭শ শতাব্দীর দিকে ওলন্দাজরা। ১৭৯৬ সালে এই দ্বীপটি ব্রিটিশদের কুক্ষিগত হয়। ১৮১৫ সালে ক্যান্ডি অঞ্চলটি ব্রিটিশরা দখল করে নিলে দেশটি সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশদের করায়ত্ত হয়ে পড়ে। তখন থেকেই এই উপনিবেশে চা, রাবার, চিনি, কফি এবং নীলের চাষ শুরু হয়। কলম্বো তখন প্রশাসনিক কেন্দ্র। তৈরি হয় আধুনিক স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট এবং চার্চ ইত্যাদি। ১৯৩০ সালের কাছাকাছি সময়ে স্থানীয় মানুষদের প্রতি ব্রিটিশদের নির্যাতনের বাড়াবাড়ির জন্য শুরু হয় শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতা-আন্দোলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। শেষমেশ ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সিলন নামে দেশটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৭২ সালে শিরিমাভো বন্দেরনায়েকের প্রধানমন্ত্রিত্বে সিলন নামের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কা নামকরণ করা হয়।

এই সুপ্রাচীন দ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা আনুমানিক ২ কোটি ২২ লক্ষ। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ সিংহলি। বাকি ২৫ শতাংশের মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কান তামিল, ভারতীয় তামিল, মুসলমান, ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী। সিংহলিরা প্রধানত এই সুপ্রাচীন দ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা আনুমানিক ২ কোটি ২২ লক্ষ। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ সিংহলি। বাকি ২৫ শতাংশের মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কান তামিল, ভারতীয় তামিল, মুসলমান, ক্যাথলিক খ্রিস্টান ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী। সিংহলিরা প্রধানত বৌদ্ধ। আর তামিলরা মূলত হিন্দু। ঔপনিবেশিক শাসনকালে ব্রিটিশ সরকার এখানেও ডিভাইড এ্যান্ড রুল নীতি চালু করেছিল। সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতাকে তারা নিজেদের স্বার্থে উসকে দেয়।। আর তামিলরা মূলত হিন্দু। ঔপনিবেশিক শাসনকালে ব্রিটিশ সরকার এখানেও ডিভাইড এ্যান্ড রুল নীতি চালু করেছিল। সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতাকে তারা নিজেদের স্বার্থে উসকে দেয়।

খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ বা তার কিছু আগে থেকেই তামিলরা শ্রীলঙ্কায় বাস করছে। ব্রিটিশ আমলে আরও বহু ভারতীয় তামিলকে কৃষিকাজের জন্য ওই দ্বীপে নিয়ে যায় ইংরেজরা। তাদের উত্তরপুরুষেরাও সেখানে রয়ে যায়। শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ইতিহাস বৌদ্ধদের লেখা মহাবংশ। তাতে তামিলদের কথা উল্লিখিত আছে। তখনও সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক ছিল সংঘাতময়।

সিংহলিরা ধর্মে বৌদ্ধ হলেও তামিল হিন্দুদের প্রতি তারা ছিল সহিংস ও বিদ্বেষপরায়ণ।

বৌদ্ধধর্মের শান্তি প্রভাব ফেলেনি সিংহলি ও তামিলদের সম্পর্কে

শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলটি ‘উত্তরাদেসা’ নামে পরিচিত ছিল। ত্রয়োদশ শতকে মাঘ নামে একজন ক্ষমতাশালী মানুষ উড়িষ্যার কলিঙ্গ রাজ্য থেকে এসে উত্তরাদেসায় একটি রাজ্য গড়ে তোলেন। মাঘ-এর শাসনকাল: ১২১৫ থেকে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দ। সিংহলিরা বলেন, মাঘ ছিলেন চরম অসহিষ্ণু এবং নির্মম শাসক। তিনি উত্তরাদেসা থেকে সিংহলিদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। নির্বাসিত সিংহলিরা বাধ্য হয়ে দ্বীপের পশ্চিম ও দক্ষিণ প্রান্তে চলে যায়।
মাঘের এই জাতীয় সিংহলি-বিদ্বেষের ফলে উত্তরাদেসায় তামিল জনগোষ্ঠীর প্রাবল্য দেখা দেয়। মাঘের মৃত্যুর পর তামিলরা উত্তরাদেসায় একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলে। সেই রাজ্যেরই নাম হয় জাফনা।

স্বাধীনতার পরবর্তীকালে সংবিধান রচনার সময় তামিল ও সিংহলিদের মধ্যে প্রবল সংঘাতের সূত্রপাত হয়। প্রধানমন্ত্রী বন্দরনায়েকে ‘সিনহালা ওনলি অ্যাক্ট’ ঘোষণা করলেন, যার অর্থ হল শ্রীলঙ্কার একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে 'সিনহালা'। এই ভাষাতেই শ্রীলঙ্কার ৭০ শতাংশ মানুষ কথা বলে। কিন্তু এই অমানবিক ঘোষণার পর উত্তরাদেসার (জাফনা) তামিল জনগোষ্ঠী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তামিলদের সেই বিক্ষোভ থেকেই এই দ্বীপরাষ্ট্রে সর্বনাশা গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। একের পর এক বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনা ঘটতে থাকে। তামিলরা জঙ্গি আক্রমণ শুরু করে। অন্যদিকে সিংহলিরাও কঠোরভাবে তামিলদের প্রতিরোধ করে।
এই যুদ্ধে তামিলদের মহানায়ক হয়ে ওঠেন ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। প্রভাকর শব্দের অর্থ সূর্য। তামিলদের কাছে প্রভাকরণ ছিলেন সাক্ষাৎ সূর্যদেবতা। জীবন্ত স্বপ্নের নায়ক। এক অতিমানব। সিংহলিদের কাছে ভয়ংকর ত্রাস তিনি।
ইন্টারপোল প্রভাকরণের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার সময় বলেছিল, প্রভাকরণ এমন এক মানুষ যিনি যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারেন। তিনি আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহারে ভয়ংকর পারদর্শী৷ তাঁকে খুব কমই প্রকাশ্যে দেখা গেছে৷ নিহত এলটিটিই বিদ্রোহীদের স্মরণে প্রতি বছর নভেম্বরে এক বারের জন্য তিনি জন সমক্ষে আসতেন ৷ জীবনের সর্বশেষ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'দখলদার সিংহলি বাহিনীকে আমাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ না করা পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলবে।' (LTTE Prabhakaran)

ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ

১৯৫৪ সালের ২৬-শে নভেম্বর জাফনার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত উপকূলবর্তী অঞ্চল ভেলভেত্তিয়াথুরাইতে জন্মগ্রহণ করেন প্রভাকরণ৷ মা-বাবার চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে ছোটো৷ শৈশবে খুব লাজুক ছিলেন। বই পড়তে ভালোবাসতেন, বিশেষত বীররসাত্মক ইতিহাসের বই ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। তামিলদের প্রতি শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগুরু সিংহলিদের অত্যাচার ও বৈষম্য দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তিনি। যোগ দেন বিভিন্ন প্রতিবাদী আন্দোলনে। তাঁর জীবনের আদর্শ ছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ভগত সিং, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং নেপোলিয়ান বোনাপার্ট। তামিলরা স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করতে পারলে তিনি আজ বীর নায়কের মর্যাদা পেতেন। কিন্তু ৩৭ বছরের মহাযুদ্ধের এই ব্যর্থ নায়ক আজ সিংহলিদের কাছে নিছক এক ভয়ংকর টেররিস্ট, এক ঐতিহাসিক খলনায়ক। আর তামিলদের কাছে তিনি এখনও এক গোপন দীর্ঘশ্বাস।

সদ্য তরুণ প্রভাকরণ

১৯৮০ র দশকের মাঝামাঝি সময়ে শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের প্রতিশোধ নেবার জন্য রাজীব গান্ধীকে হত্যার আদেশ দেন প্রভাকরণ৷ ১৯৯১ সালে চেন্নাইয়ের কাছে আত্মঘাতী হামলায় রাজীব গান্ধী বীভৎসভাবে মারা যান। এর জন্য দায়ী করা হয় প্রভাকরণকে। (LTTE Prabhakaran)
ইন্টারপোলের 'মোস্ট ওয়ান্টেড' তালিকায় নাম উঠে আসে তাঁর। যদিও তিনি নিজে এই হত্যার দায় স্বীকার করেননি। কিন্তু এর পরেও অকুতোভয় প্রভাকরণের টাইগার বাহিনী ১৯৯৩ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসাকে, ২০০৫ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষণ কাদির গামারসহ অসংখ্য মেয়র, পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে৷ ক্রমশ শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে তামিল বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন অঞ্চল গড়ে তোলেন তিনি৷

টাইগারদের সবচেয়ে মারাত্মক হামলাটি সংগঠিত হয় ১৯৯৬ সালে কলম্বোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। এক আত্মঘাতী হামলাকারী পুরো এক ট্রাকভর্তি বিস্ফোরক নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং বিস্ফোরণ ঘটায়। সেই ঘটনায় নিহত হয় ৯০ জন। আহত হয় ১৪০০ বেশি মানুষ। হতাহতদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ মানুষ। কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও নিহত হন।
এই ভয়াবহ হামলার ঘটনায় ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার একটি আদালত প্রভাকরণের অনুপস্থিতিতে বিচার করে তাকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। (LTTE Prabhakaran)

টাইগার বাহিনীর সর্বেসর্বা

২০০৭ সালে নরওয়ের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা বিফল হলে, কলম্বো সরকার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে চূড়ান্ত সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করে। বহু অঞ্চল তামিল বিদ্রোহীদের হাতছাড়া হয়ে যায়৷ ২০০৯ সালের প্রথম দিকে টাইগারদের প্রশাসনিক রাজধানী কিলিনোচ্ছি হাতছাড়া হয়ে গেলে অসহায় অবস্থায় পড়েন প্রভাকরণ৷ বাতাসে গুজব ছড়ায় দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন প্রভাকরণ৷

শ্রীলঙ্কার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে নির্যাতিত তামিলদের জন্য একটি পৃথক বাসভূমি গড়তে চেয়েছিলেন তিনি আজীবন। এই কঠিন কর্মযজ্ঞে তাঁর জীবনের প্রায় সবটুকুই কেটেছে গোপন বাংকারে, জঙ্গলে,পাহাড়ে, গুহায়, নানা ছদ্মবেশে। তবুও শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি।

শ্রীলঙ্কার মুল্লাইতিভু জেলার পুথুকুরিইউরুপ্পা অঞ্চলে ছিল প্রভাকরণের গোপন আস্তানা। সেখানেই ছিল তাঁর গোপন বাংকার। এখন এই এলাকার নাম 'টাইগার ট্রেল'। গভীর অরণ্যের মধ্যে দিয়ে এই ডেরায় প্রবেশ করতে হয়। প্রবেশপথে রয়েছে কাদায় ঘেরা দুর্গমতা। যা সহজে পার হওয়া দুঃসাধ্য। এই সিক্রেট ডেন এমনভাবে বানানো যে আকাশপথ থেকেও নীচের কিছুই দেখা যাবে না।

৬০ একরের এই গোপন ডেরায় পাঁচ-স্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। প্রথমে কাঁটাতারের বেড়া। তারপর সারি সারি মাইন পাতা। ছিল এক দল প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কুকুর। আর ছিল অন্তত ১০০ জন সশস্ত্র ও সতর্ক প্রহরী।
যাঁরা এলটিটিইর বিরোধিতা করতেন, তাঁদের ধরে নিয়ে এসে প্রভাকরণের গোপন ডেরায় হাতি বাঁধার মোটা শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হত। ১০ বাই ১২ ফুটের জেলে তাঁদের আটকে রাখা হত। জেলের দেওয়াল জুড়ে ছিল চাপ চাপ রক্তের দাগ।
১৮ মে ২০০৯ সালে যখন শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে প্রভাকরণের গোপন এলাকা তখন আর পালাবার পথ পায়নি এই তামিল নেতা। শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর হাতে সেই দিনই মৃত্যু হয় প্রভাকরণের। একই সঙ্গে মৃত্যু হয় তাঁর ১২ বছরের ছেলে চার্লস অ্যান্টনির।

শ্রীলঙ্কা সরকার তিন বছর আগে প্রভাকরণের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি এবং তামিল গেরিলাদের অনেকের সমাধিও ধ্বংস করে দেয় বলে খবর পাওয়া গেছে।

এলটিটিই গেরিলারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করলেও অন্তত ৩০টি দেশ একে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছিল। সংগঠনটির বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও জোর করে বাহিনীতে সদস্য নিয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। প্রতি পরিবার থেকে একজন ছেলেকে নাকি এলটিটিইতে যোগদান করতেই হত।

এলটিটিইর বিরুদ্ধে প্রায় চার দশক ধরে লড়াই করেছে সেনাবাহিনী। প্রভাকরণের বাংকারটি এখন একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একসময় এর ভেতরে ছিল শব্দহীন বৈদ্যুতিক জেনারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম, নজরদারি ক্যামেরা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও বেশ কিছু অস্ত্র।
এলটিটিইর বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর রক্তক্ষয়ী চূড়ান্ত লড়াইকালে এক মাসে প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছিল বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ জানায়। যদিও শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে, ওই যুদ্ধে ১৯৭২ থেকে ২০০৯ সালের মে মাস পর্যন্ত অন্তত এক লক্ষ মানুষ মারা যায়।


```