দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাহুল দেব বর্মণের বয়স তখন বড়জোর মেরেকেটে ১২ বছর। প্রচণ্ড দুরন্ত এক ছেলে। সেই হাফ প্যান্ট পরা বয়স থেকেই রাহুলকে অর্থাৎ পঞ্চমকে দেখছেন আজকের সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে লতা নিজেই বলেছেন সে কথা। আজ রাহুল দেব বর্মনের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রিয় পঞ্চমের স্মৃতিতে ট্যুইট করলেন লতা। লিখলেন একদিন আচমকাই পঞ্চম এসে বলেছিল তাঁর লতাদি'কে, 'তোমাকে দিয়ে একেবারে অন্যরকম একটা গান রেকর্ড করাতে চাই... একেবারে অন্যধারার সেই গান, যা পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এক নতুন মাইলস্টোন হয়ে যাবে... কারবাঁ বা ক্যারাভান সিনেমার সেই আশ্চর্য গান দিলবর দিলসে প্যারে'...
বস্তুত, পঞ্চমের সেই হাফপ্যান্ট-বেলা থেকেই তাঁর ভীষণ কাছের মানুষ ছিলেন লতা মঙ্গেশকর। শ্রদ্ধা,বিশ্বাস আর ভালবাসার একটা আশ্চর্য বাঁধন ছিল দুজনের মধ্যে। কীভাবে তাঁদের প্রথম দেখা, সে কথা স্পষ্ট মনে আছে লতার। এসডি বর্মনের সঙ্গে একটা গানের রেকর্ডিংয়ে ব্যস্ত তখন তিনি। অটোগ্রাফের খাতা হাতে সেই রেকর্ডিং রুমেই গুটিগুটি এগিয়ে এসেছিল এক সলজ্জ কিশোর। সেদিন কী লিখেছিলেন সেই অটোগ্রাফের খাতায় লতা মঙ্গেশকর? আজও সে কথা মনে পড়লে হেসে ফেলেন সুরসম্রাজ্ঞী৷ সেদিন রাহুল দেবের অটোগ্রাফের খাতায় সই করার বদলে তিনি লিখে দিয়েছিলেন "পঞ্চম, বদমাশি ছোড় দো", যা দেখে হেসে পালিয়েছিল সেদিনের কিশোর পঞ্চম। তবে রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে লতার যে প্রায়শই দেখা হত, তা নয়। দিদিমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন রাহুল। ছোটবেলায় বেশিরভাগ সময়টাই কাটত তার মামাবাড়িতে। বাবা-মা'র কাছে বিশেষ থাকা হত না তার।

১৯৫১ সালে 'নওজওয়ান' ছবিতে শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে প্রথম কাজ করেন লতা মঙ্গেশকর। শচীনকর্তার সুরে লতার কণ্ঠে এই সিনেমারই বিখ্যাত গান 'ঠান্ডি হাওয়ায়ে'। বেশ কিছু বছর কেটে যায় তারপরে। বাবা শচীন দেব বর্মনের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চলতি কা নাম গাড়ি (১৯৫৮), কাগজ কে ফুল (১৯৫৯), গাইড (১৯৬৫)-এর মতো ছবিতে কাজ করে ততদিনে হাত পাকিয়ে ফেলেছেন পঞ্চম।
এর পরে স্বাধীন সুরকার হিসাবে তাঁর প্রথম কাজ গুরু দত্তের সিনেমা 'রাজ' এ। কিন্তু নানা গোলোযোগে ছবিটা মুক্তিই পেল না। শেষপর্যন্ত মেহমুদের 'ছোটে নওয়াব' সিনেমায় সুরারোপ করার দায়িত্ব পেলেন আর. ডি। কিন্তু গান গাওয়াবেন কাকে দিয়ে? লতা মঙ্গেশকর ততদিনে বম্বে ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সেরা প্লেব্যাক গায়িকা। একের পর এক হিট তাঁর ঝুলিতে৷ তবু সাহস করে তাঁকেই গান গাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বসলেন সদ্য একুশের কোঠায় পা দেওয়া তরুণ পঞ্চম। সেই শুরু।

এর পরে ১৯৭১ সালে নাসির হুসেনের পরিচালনায় মুক্তি পায় হিন্দি ছায়াছবি 'ক্যারাভান'। আততায়ী স্বামীর হাত থেকে পালিয়ে জিপসি ক্যারাভানে আশ্রয় নেওয়া একটি মেয়ে, প্রেমে পড়ে যায় সেই ক্যারাভানেরই যুবক ড্রাইভার মোহনের। সেখান থেকেই থেকে তৈরি হওয়া সম্পর্ক আর সমস্যার গল্প নিয়ে তৈরি হয় 'ক্যারাভান'।
বলাই বাহুল্য, এই সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন রাহুল দেব বর্মনই। জিতেন্দ্র, আশা পারেখ, অরুণা ইরানি অভিনীত 'ক্যারাভান' ৭০ দশকের বড় হিট ছিল। সেই সময়েই প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ব্যবসা করে এই ছবি৷ আলাদা করে বলতেই হয় সিনেমার গানগুলোর কথা। ওয়েস্টার্ন রিদমকে ভবঘুরে জিপসিদের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে বলিউড সিনেমায় নিয়ে আসা হল সেই প্রথম। লোকের মুখে মুখে ফিরত সেসময় এই সিনেমার গান।

তবে, সে সময়ে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা এত সহজও ছিল না। কারণ ততদিনে শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি প্রায় বন্ধ লতার। এমন সময় একদিন নিজেই ফোন করলেন শচীনকর্তা। জিজ্ঞেস করলেন "কী ব্যাপার! এত অভিমান কীসের!'' পরে জানা গেছিল, পিছনে থেকে কলকাঠি নেড়েছিলেন স্বয়ং রাহুল দেব বর্মন। তিনিই বাবাকে জোর দেন ঝামেলা মিটিয়ে নেওয়ার জন্য। লতার কথা ভেবে ততদিনে যে গান ঠিক করে ফেলেছেন তরুণ সঙ্গীতকার। এর পরেই রেকর্ড হয় রাহুল দেবের সুরে লতা মঙ্গেশকরের সেই অবিস্মরণীয় গান, "ঘর আ যা ঘির আয়ে বদরা..."
সত্যি কথা বলতে, রাশভারী এসডি বর্মনের থেকে প্রাণখোলা, আমুদে রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গেই অনেক বেশি একাত্ম ছিলেন লতা। দুজনে একসঙ্গে কাজ করেছেন অগুনতি গানে। স্বাভাবিকভাবেই একটা কমফোর্ট জোন তৈরি হতে গেছিল। লতা মঙ্গেশকরের কথা মাথায় রেখে আলাদা ভাবে সুর দিতেন গানে রাহুল। 'ক্যারাভান' ছবির গানটি তেমনই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
https://www.youtube.com/watch?v=n33xaq7ueFo
পঞ্চমের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একটা জিনিস বুঝেছিলেন লতাজি। এত বড় মাপের একজন সুরকারের সন্তান হয়েও বাবাকে কখনও কপি করতেন না তিনি। চাইলে শচীনদেব বর্মনের স্টাইল নকল করে দ্রুত জনপ্রিয় হতেই পারতেন রাহুল। সে সুযোগ তাঁর ষোলো আনা ছিল। কিন্তু অন্যের দেখিয়ে দেওয়া রাস্তা নয়, সবসময় নতুন পথে চলতেই ভালোবাসতেন পঞ্চম। ছোটবেলা থেকেই খুব ভাল তবলা আর সরোদ বাজাতে জানতেন, আর সেই জন্যই হয়তো ওয়েস্টার্ন মিউজিকের প্রতি তাঁর একটা অন্যরকম টান ছিল। আফ্রিকার ব্ল্যাক মিউজিসিয়ানদের কাজ, বিশেষকরে 'ঘেটো মিউজিক' তাঁর বিশেষ পছন্দের ছিল।
এরকম একটা কথা চালু আছে, যে ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল ঘেঁষা গানগুলো লতাকে দিয়ে গাইয়ে পশ্চিমি সুরের গানগুলো আশাকে দিয়ে গাওয়াতে বেশি পছন্দ করতেন আ ডি। সত্যিই এমনটা ছিল কী না জিজ্ঞেস করা হলে, প্রায় প্রতিবাদের সুরে লতাজি বলেন, "আমি বরং বলব, আমাদের জন্য বরাবর ঠিকঠাক গানই নির্বাচন করত পঞ্চম। আমার জন্য সুর দেওয়া গান সে আশাকে গাইতে দিত না। আবার উল্টোটাও সত্যি।"

আর শুধু ক্লাসিকাল মিউজিক কই! এই প্রসঙ্গে লতাজি মনে করিয়ে দিয়েছেন পঞ্চমের সুরে তাঁর গাওয়া অনামিকা ছবির "বাহো মে চলে আও" গানটির কথা। আজকের প্রজন্মের কাছেও অবিশ্বাস্য জনপ্রিয় এই গানটিকে রাহুল দেব বর্মনের কেরিয়ারেরও এক মাইলস্টোন বলা চলে। লতাজি নিজেও স্বীকার করেন, এই গানটি তাঁর কাছে খুব স্পেশ্যাল। সঙ্গে জয়া ভাদুড়ির সেই অসামান্য অভিনয়, যা আজও জীবন্ত করে রেখেছে ওই গানকে৷ আসলে রাহুল দেব জানতেন কে, কোন গান যথাযথ ক্যারি করতে পারবে। এই হিসেবে সচরাচর ভুল হত না সুরকার পঞ্চমের৷ কণ্ঠশিল্পীর প্রতি গীতিকার-সুরকারের এই অটুট বিশ্বাস আজকের দিনেও কিন্তু ভীষণ শিক্ষনীয়।
একটা আলাদা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এই দুজনের মধ্যে। লতা মঙ্গেশকরকে বরাবর 'দিদি' বলেই ডাকতেন পঞ্চম। শুধু ভাই নয়, তাঁকে প্রায় নিজের সন্তানের মতো দেখতেন লতাও। রাহুল দেব বর্মন বিয়ে করেন লতা মঙ্গেশকরেরই ছোট বোন আশা ভোঁসলেকে। বিয়ের সময় দিদি লতার কাছে পঞ্চম না কি একটা চিঠির আবদার রেখেছিল। এমন একটা চিঠি যা তিনি আজীবন সযত্নে ব্যাঙ্কের লকারে তুলে রাখবেন। সত্যি সত্যিই তিনি আজীবন নিজের কাছেই রেখেছিলেন তাঁর 'দিদি'র লেখা সেই চিঠি। আরডি বর্মনের জীবনে ঠিক এতটাই মূল্যবান ছিলেন লতা।

যেদিন রেকর্ডিং স্টুডিওতে পঞ্চমের প্রথম হার্ট অ্যাটাকের খবর সহকারী স্বপন চক্রবর্তী মারফত পৌঁছয় লতার কানে। সে খবরে ভেঙে পড়েছিলেন লতা৷ যখন লন্ডনে হার্ট সার্জারি করতে যাচ্ছেন আরডি বর্মন, তখনও তাঁর সঙ্গ ছাড়েননি 'দিদি' লতা। পঞ্চমের কাছ থেকে একটা মেসেজ পেয়েছিলেন লতা। তাতে লেখা ছিল 'সার্জারির আগে একবার দেখা করতে চাই।' ভাইয়ের ডাকে সেদিন সঙ্গীতসম্রাজ্ঞী ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালে৷ যদি আর দেখা না হয়, সেই ভয়েই বোধহয় সেদিন দিদিকে একঝলক দেখতে চেয়েছিল আরডি বর্মন।
এত বছর পরে রাহুল দেব বর্মনের মৃত্যুদিনে লতাজির এই টুইট আবার নতুন করে আবেগতাড়িত করে গেল পঞ্চমপ্রেমী বাঙালিকে। কে বলবে ৯১ বছর বয়স হয়েছে লতাজির! নিয়ম করে দেশ দুনিয়ার খবর রাখেন। এই তো গতকালই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে স্ত্রী ডোনাকে ফোন করে কুশল সংবাদ জেনেছেন। সোশাল মিডিয়াতেও যথেষ্টই সক্রিয় তিনি।
https://twitter.com/mangeshkarlata/status/1346010477839716354
সে যাই হোক, আজকের টুইটটি অবশ্যই অন্যরকম। বস্তুত, ৬০-৭০ দশকের হিন্দি-বাংলা ছায়াছবি আর আধুনিক গানের জগতে প্রায় একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন আরডি বর্মন। কিন্তু সময়ের মাপকাঠি দিয়ে কোনও দিনও বাঁধা যায়নি তাঁকে। সুর নিয়ে কত যে মেধাবী এক্সপেরিমেন্ট করে গেছেন আজীবন! অরুণা ইরানির লিপে ক্যারাভান' ছবির এই অসামান্য গানটির মধ্যেও রয়েছে সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর তার সফল প্রয়োগের ছাপ৷ সত্যিই একেবারে অন্যরকম একটা গানই সেদিন তিনি বসিয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে, প্রচলিত সুরের থেকে একেবারে আলাদা হয়েও, স্বকীয়তায় যা আজও একইরকম আধুনিক আর জনপ্রিয়।