শেষ আপডেট: 30 January 2020 16:12
গতকাল বইমেলা দেখল, বাঙালির প্রেম দিবসের অঘোষিত উদযাপন। আর আজ মেলায় আগতদের মধ্যে একটা অংশ অবশ্যই স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। গতকাল পুজোর জন্য আসতে না পারলেও আজ প্রতিষ্ঠান ছুটি। সেটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতেই মেলায় সক্কাল সক্কাল ছুটে এসেছেন সুস্মিতা চক্রবর্তী, কোলাঘাটের নবীন কাঁড়ার, রানাঘাটের স্বপন দাসঅধিকারী, বরাভূমের অলক তপাদার প্রমুখ।
বইয়ের হাটে পরিচয় হল সুদূর ফরাক্কা থেকে আসা সত্তরোর্ধ্ব তপোগোপালবাবুর সঙ্গে। বললেন, ‘বই তো সারাবছর ধরেই কিনি, কিন্তু হাটে এসে ছেলেপুলে দেখার যে প্রাণের আরাম, তা মেটে না দোকান থেকে কিনে বা অর্ডার দিয়ে আনানো বইয়ে...।’ হককথা। বইমেলা হল পাঠক-পড়ুয়াদের সঙ্গে বইয়ের অভিসার-ক্ষেত্র। আর অভিসারের জন্য যে ন্যূনতম পরিসর দরকার, বইয়ের বেলা সেটা মেটাতে পারে একমাত্র বইমেলাই।
কানে এল এমন বাক্যও: ‘টয়লেটটা কিন্তু গতবারের থেকে অনেকটাই ভাল আর পরিচ্ছন্ন।’ অন্তত এখনও পর্যন্ত। সত্যিই আগের থেকে বাড়ানো হয়েছে এ বারে টয়লেটের সংখ্যা। আরেকটি গণসুরাহা, যা চোখে পড়বে মেলার বাইরে এলে; তা হল, করুণাময়ী থেকে ছাড়া প্রত্যেকটা অটোর গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে ভাড়ার তালিকা। গতবার অভিযোগ উঠেছিল, অনেক অটোওয়ালাই মওকা বুঝে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নিয়েছেন-- তার ফলস্বরূপ এই অটো-দাওয়াই। একইভাবে মোবাইলে যোগাযোগের সমস্যা মেটাতে বসানো হয়েছে ৪টে টাওয়ার। যদিও একাদশীর মেলা-সন্ধ্যায় কাঙ্ক্ষিত নম্বরে যোগাযোগ করতে বা জরুরি মেসেজ পাঠাতে না পেরে ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে-- এমন দৃশ্য মোটেই বিরল নয়।
বিধাননগর পুরসভা এলাকায় প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ। এই নিয়ম যাতে বইমেলাতেও সকলে মেনে চলেন, সে জন্য পরিবেশকর্মীদের সংগঠন ‘সবুজ মঞ্চ’র পক্ষ থেকে আগাম চিঠি দেওয়া হয়েছে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে।
এ বারের মেলায় স্টল হয়েছে প্রায় ৬০০টি। লিটল ম্যাগাজিনের টেবল প্রায় ২০০টি। এসেছে চারশোরও বেশি প্রকাশনা সংস্থা। বাংলাদেশ মণ্ডপে আছে ছত্রিশটি প্রকাশনা। গিল্ডের হিসেব অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা, পেরু, গুয়াতেমালা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভিয়েতনাম, জাপান, ফ্রান্স সহ মোট ২৯টি দেশের বই-বৈভব পুস্তকপ্রেমীদের স্পর্শের অপেক্ষায়! আজ বইমেলায় উদযাপিত হল রাশিয়া দিবস। আয়োজন করা হয় অশোক সরকার মেমোরিয়াল লেকচার-এর।
জাতীয় স্তরের প্রকাশনায় অংশ নিয়েছে যে সব রাজ্য: বিহার, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, পঞ্জাব, দিল্লি, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, কেরল, উত্তরপ্রদেশ, অসম, ঝাড়খন্ড, তেলেঙ্গানা। আলাদা নাম করতেই হয় অরুণাচল প্রদেশের। গোটা স্টলটায় রয়েছে পাক্কা গৃহিণীপনার ছাপ।
প্রবেশপথে মেটাল ডিটেক্টর, প্রান্তসীমায় নজরমিনার, চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সিসি টিভি ক্যামেরার দৌলতে রীতিমত হাইটেক বইমেলা। ৮ নম্বর প্রবেশপথের বাইরে দেখা গেল মোবাইল এটিএম! বইমেলার নবতম সংযোজন। বাইরে-ভেতরে চারদিক দিয়ে গোটা মেলাচত্বর কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীতে মোড়া। এনআরসি, সিএএ নিয়ে একাধিক বই প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি দেখা গেল মানবাধিকার সংক্রান্ত বইয়ের স্টল। তৃণমূল, এসএফআই, এসইউসিআই প্রভৃতি বই-আপণের অঙ্গসজ্জায় ফুটে উঠেছে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে মুখর প্রতিবাদ। যার ছোঁয়া লেগেছে মেলায় আগত বইবন্ধুর টি-শার্ট বা শাড়িতে, চাপানউতোর অব্যাহত চা-কফির চুমুকে, বিশেষত লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে।
ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষ নিয়ে লেখা রূপক সাহার বই বেরিয়েছে। চার্লস ফ্রেডরিক হোল্ডারের লেখা দুষ্প্রাপ্য ‘চার্লস ডারউইন/ হিজ লাইফ অ্যান্ড ওয়র্ক’ বইটির সুচারু পুনর্মুদ্রণ করেছে নেচারিজম। বসন্ত জানাকে নিয়ে চমৎকার বই প্রকাশ করেছে ঋত প্রকাশন। ‘খুদ্দুর যাত্রা’র মাত্র ২০টি কপি এসেছে বইমেলায়। সদ্যপ্রয়াত পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী-লেখক তুষার কাঞ্জিলালের (১৯৩৫-২০২০) ছবিতে মালা-- বইমেলার মাঠে এমন আন্তরিক স্মরণ সংস্কৃতিমনস্কতার স্বাক্ষর।