আজ, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর সেই মহান আত্মত্যাগী সংগ্রামীর জন্মদিন।

ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়েছিল ১৯০৮ সালের ১১ অগস্ট।
শেষ আপডেট: 3 December 2025 11:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্মৃতপ্রায় কিন্তু প্রথম আত্মোৎসর্গ করা বিপ্লবীর নাম ক্ষুদিরাম বসু। আজ, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর সেই মহান আত্মত্যাগী সংগ্রামীর জন্মদিন। ক্ষুদিরাম বসু ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মেদিনীপুর শহরের কাছাকাছি কেশপুর থানার মৌবনী (হাবিবপুর) গ্রামে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু ছিলেন নাড়াজোলের তহসিলদার। মায়ের নাম ছিল লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী। ক্ষুদিরাম ছিলেন সবার ছোট। তাঁর তিন দিদি ছিল। লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর দুই ছেলে অকালে মারা গিয়েছিলেন। ক্ষুদিরামের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি কুসংস্কার থেকে তাঁর ছেলেকে নিজের বড় মেয়ের কাছে তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে বিক্রি করেছিলেন। খুদের বিনিময়ে বিক্রি করেছিলেন বলেই শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল ক্ষুদিরাম। তাঁর যখন পাঁচ বছর বয়স সেই সময় তাঁর মা মারা যান। এর একবছর পর তাঁর বাবাও মারা যান।
এইসব জীবনকথা এখনও অনেকের মনে আছে। এই প্রজন্মের কাছে ‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’ বসুর জীবন উৎসর্গ করার দৃষ্টান্ত বিরল নয়, একমাত্র। ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়েছিল ১৯০৮ সালের ১১ অগস্ট। সেসময় ঘড়িতে ছিল ভোর ৪টা। মহাত্মা গান্ধী তখন ভারতেই আসেননি। ক্ষুদিরামের ফাঁসির বেশ কয়েক বছর পরে ১৯১৫ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ভারতে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। কিন্তু, তখনও শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা দেশবাসীর মুখে মুখে ঘুরত বিপ্লবী ক্ষুদিরামের নাম।
ক্ষুদিরামের আইনজীবী ছিলেন উপেন্দ্রনাথ সেন। তিনি পরে জানান, ফাঁসির মঞ্চে ক্ষুদিরাম নির্ভীকভাবে উঠে গিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে কোনও ভয় বা অনুশোচনা ছিল না। সেসব শুনে বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস গান লিখেছিলেন, 'একবার বিদায় দে-মা ঘুরে আসি।' ক্ষুদিরামের যখন ফাঁসি হয়েছিল, সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন।
শুধু কিংসফোর্ড হত্যার বদলে নিরীহ দুই শ্বেতাঙ্গিনী ও এক সহিসকে বোমা মেরে হত্যার অপরাধ নয়, ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধে তারও আগে ব্রিটিশ পুলিশ প্রথম রাজদ্রোহের মামলা করেছিল, যাকে বর্তমানের ইউএপিএ ধারায় মামলা বলা চলে, তা এই বাঙালির বিরুদ্ধেই হয়েছিল।
১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুর শহরের মারাঠা কেল্লার পুরনো জেলের মাঠে একটি মেলায় ক্ষুদিরাম একটি প্রচারপত্র বিলি করছিলেন। মেদিনীপুর গুপ্ত সমিতি থেকে ক্ষুদিরামকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যাতে অত্যাচারী শাসকদের প্রাণে মারার কথাও লেখা ছিল। কিছু কিছু জায়গায় ওই প্রচারপত্রের নাম বন্দে মাতরম উল্লেখ করা হয়েছে। হেমচন্দ্র কানুনগোর বইতে ওটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে সোনার বাংলা বলে।
প্রচারপত্রটির ইংরেজি অনুবাদ পাইওনিয়ার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল নো কম্প্রোমাইজ শীর্ষক প্রবন্ধে। সত্যেন্দ্রনাথ বসু এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। সেটাই বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ক্ষুদিরামকে। কিন্তু এক বাঙালির অপচেষ্টায় ক্ষুদিরামকে পুলিশ হাতেনাতে ধরলে তিনি হাবিলদারের মুখে ঘুসি মেরে রক্তাক্ত করে পালিয়ে যান। ক্ষুদিরামকে গ্রেফতারে দায়িত্ব দেওয়া হয় ইন্সপেক্টর নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে। শোনা যায় রানি বিষ্ণুপ্রিয়া তাঁকে জমিদার বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে গ্রেফতার হন। আদালতে তোলা হলে প্যারীমোহন ঘোষ ক্ষুদিরামের জামিনের ৫০০ টাকার বিনিময়ে তাঁকে মুক্ত করেন।
ক্ষুদিরামের মুক্তির দিনটি ছিল মেদিনীপুর শহরের একটি চিরস্মরণীয় দিন। শহরের তরুণ-ছাত্ররা ফুলের মালা পরিয়ে একটি ফিটন গাড়িতে বসিয়ে শোভাযাত্রা বের করেছিলেন। সঙ্গে চলে স্বদেশী গান। তখনকার বিখ্যাত মেদিনীপুরের শিল্পী গোষ্ঠচন্দ্র চন্দ সেই শোভাযাত্রায় গান ধরেছিলেন। সকলের কণ্ঠে ছিল বন্দে মাতরম ধ্বনি। সেদিন অরবিন্দ ঘোষও উপস্থিত ছিলেন শহরে। তিনি প্রাণভরে আশীর্বাদ করেন ক্ষুদিকে। সন্ধেবেলায় মেদিনীপুরের আকাশে দেখা যায় নানান আতশবাজির খেলা। এই মামলাই ছিল বাংলাদেশে বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকারের করা প্রথম রাজদ্রোহের মামলা।
নিজের দোষ স্বীকার করে নেওয়ায় ক্ষুদিরাম বসুর শেষ বিচার খুব কম সময়ের মধ্যেই শেষ হয়। উকিলরা অনেক চেষ্টা করেও ক্ষুদিরামকে নিজের দোষ অস্বীকার করানোর জন্য রাজি করাতে পারেননি। তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন, বোমা ছোঁড়ার দোষ প্রফুল্ল চাকীর উপর চাপিয়ে দিয়ে সাজা যদি কিছু কমানোর ব্যবস্থা করা যায়। কিন্তু কিছুতেই লাভ হয়নি।
”উকিল: তুমি কি কাউকে দেখতে চাও?
ক্ষুদিরাম: হ্যাঁ, আমি একবার মেদিনীপুর দেখতে চাই, আমার দিদি আর তাঁর ছেলেপুলেদের।
উকিল: তোমার মনে কি কোন কষ্ট আছে ?
ক্ষুদিরাম: না, একেবারেই না।
উকিল: আত্মীয় স্বজনকে কোন কথা জানাতে চাও কি? অথবা কেউ তোমায় সাহায্য করুন এমন ইচ্ছা হয় কি? ক্ষুদিরামের জবাব ছিল না আমার কোনও ইচ্ছা নেই।
ধরা পড়ার পর বোমা ছোড়ার সমস্ত দায় নিজের উপর নেন ক্ষুদিরাম। পূর্ববঙ্গ থেকে রংপুরের উকিল সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, কুলকমল সেন ও নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী মামলা লড়েন। ৬ দিন বিচার চললেও শুরু থেকেই ক্ষুদিরাম দোষ স্বীকার করে নেন। ঘটনার তিন মাস তের দিন পর ১৯০৮ সালের ১১ অগস্ট তাঁর ফাঁসি হয়।
১৯০২ বা ১৯০৩ সালের দিকে অরবিন্দ এবং ভাগিনী নিবেদিতার মেদিনীপুর সফর এবং তাদের দেশাত্মবোধক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেন খুদি। পরে, তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন এবং বারীন্দ্রনাথের সংস্পর্শে আসেন এবং সেখান থেকে তাঁর দেশাত্মবোধক কাজ শুরু হয়। ১০ আগস্ট আইনজীবী সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তীকে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, 'রাজপুত নারীরা যেমন নির্ভয়ে আগুনে ঝাঁপ দিয়া জওহরব্রত পালন করিত, আমিও তেমন নির্ভয়ে দেশের জন্য প্রাণ দিব। আগামীকাল আমি ফাঁসির আগে চতুর্ভুজার প্রসাদ খাইয়া বধ্যভূমিতে যাইতে চাই।' আর ফাঁসির আগে ক্ষুদিরামের শেষ ইচ্ছা কী ছিল জানেন? সেইসময়ও দেশের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামকে এগিয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করে গিয়েছেন তিনি। বলেছিলেন, তিনি বোমা বানাতে জানেন। ব্রিটিশদের অনুমতি পেলে সেই বিদ্যা ভারতের অন্য যুবকদের শিখিয়ে যেতে চান। গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো মাত্র জল্লাদকে ক্ষুদিরাম প্রশ্ন করেছিলেন 'ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?'